কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপ উপকূলীয় পাখির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এখানে শীতকালে অনেক প্রজাতির জলচর উপকূলীয় পাখি দেখা যায়। বিশেষ করে পৃথিবীর মহাবিপন্ন পাখি চামুচঠুঁটো বাটানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হলো এ দ্বীপ।
সোনাদিয়া দ্বীপে পরিবেশ গবেষণার কাজে এবং পাখি দেখতে কয়েকবার গিয়েছিলাম। ২০১৪ সালে কয়েকজন পাখি গবেষকের সঙ্গে সোনাদিয়া দ্বীপে গিয়ে দেখা হয় সুন্দর দুটি হাঁসের সঙ্গে। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর নরম কাঁদামাটিতে হাঁস দুটি খাবার খুঁজছিল। আমাদের নৌকা কিছুটা কাছে যাওয়ায় ওদের খুব কাছ থেকে দেখতে পেরেছিলাম। সেই বুনোহাঁসের নাম উত্তুরে খুন্তেহাঁস। এ হাঁসের আরেক নাম পান্তামুখী হাঁস। এ হাঁসের চ্যাপ্টা পাতলা ঠোঁটের আগা, গোড়ার চেয়ে দ্বিগুণ চওড়া। পুরুষ পাখিটি দেখতে বর্ণিল এবং বেশ সুন্দর। শীতের সময় দেশের নদী ও নদীর মোহনা এবং উপকূলে এদের দেখা যায়। এরা সাধারণত ঝাঁক ধরে চরে বেড়ায়। মাঝে মাঝে এদের অনেক বড় ঝাঁকেও দেখা যায়।
খুন্তেহাঁস পরিযায়ী পাখি। এটি মাঝারি আকারের হাঁস। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হাঁস প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার এবং নারী ৪৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। এদের লম্বা ঠোঁটের দূরবর্তী প্রান্ত প্রশস্ত এবং পার্শ্বীয় প্রান্ত বরাবর চিরুনির মতো। পাখিটি অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া সারা বিশ্বের সব মহাদেশে দেখা যায়। ইউরোপের উত্তরাঞ্চল, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ অঞ্চলজুড়ে এরা প্রজনন করে।
আমি যখন দেখেছি, তখন হাঁস দুটি দেখতে কিছুটা আলাদা লেগেছে। প্রজননের সময় হাঁসার মাথা ও ঘাড়-গলা চকচকে সবুজ থাকে। এ ছাড়া গলার নিচের অংশ ও বুক সাদা থাকে। লেজের মধ্যপালক সবুজ। চোখ হলুদ ও ঠোঁট থাকে কালো। হাঁসির পুরো দেহ হলুদাভ-বাদামি ও তাতে গাঢ় রঙের ফোঁটা থাকে। ঠোঁট কমলা ও চোখ কালো হয়ে থাকে। তবে প্রজননকাল ছাড়া উভয় হাঁস দেখতে প্রায় একই রকম লাগে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর শীতের সময় উপকূলীয় অঞ্চল ও স্বাদু পানির জলাশয়ে এদের দেখা যায়। খুন্তেহাঁস অগভীর পানি থেকে জলজ আগাছা, পোকামাকড়, লার্ভা ও মাছের পোনা ধরে খায়। ডানায় শন শন শব্দ তুলে এরা দ্রুত উড়ে চলে। প্রজনন ঋতু ছাড়া অন্য সময় ডাকাডাকি কম করে। প্রজনন মৌসুমে নারী হাঁস নীড়ের জায়গা নির্বাচন করে। বাসা খোঁজার সময় পুরুষ হাঁস নারীকে সঙ্গ দেয়। এরা বাসা বাঁধার জন্য সাধারণত লম্বা ঘাস এবং ছোট ঘাসের প্রেইরি এলাকা এবং জলাশয়ের কাছাকাছি তৃণভূমি নির্বাচন করে। এরা ঘাস ও পালক দিয়ে ছোট করে বাসা বানায়। সেখানে ৯-১২টি ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে ছানা আসতে ২২-২৭ দিন লাগে। মেয়ে পাখি একা ডিমে তা দেয়। পুরুষ সাধারণত নিষ্ক্রিয় থাকে। খুব সকালে নারী পাখি ছানাদের নিয়ে বাসা ছাড়ে। এ হাঁসের ইংরেজি নাম Shoveler বা Northern Shoveler. Anatidae গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Spatula clypeata.
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার