দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয় গতকাল রবিবার ৯ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন আনসার সদস্যরা। পরে রাত ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনরত আনসার সদস্যদের ধাওয়া দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেন। এ সময় আনসার সদস্যদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ৫১ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে আটজন শিক্ষার্থী। বাকিরা আনসার সদস্য।
আহতরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে কেউ গুরুতর আহত নন। তারা সবাই প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। এ সময় একটি সেনাবাহিনীর গাড়িসহ ৫টি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আনসার সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা সেখানে ফেসবুকে লাইভ দেওয়ার পর সেখানে আরও সাধারণ শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে থাকেন। এতে পুরো সচিবালয় অঙ্গন শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
এ সময় সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে সচিবালয়ে অবরুদ্ধ থাকা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বাইরে বের হয়ে আসেন। এদিকে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ চলাকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী, আনসার সদস্য ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুপুর ১২টা থেকে চাকরি জাতীয়করণসহ চার দফা দাবিতে সচিবালয় ঘেরাও করে অবস্থান নেন আনসার সদস্যরা। দুপুর ১টার দিকে আনসার সদস্যরা পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে ভেতরে প্রবেশ করেন। তারা সচিবালয় থেকে কাউকে বের হতে দেননি। পরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করতে যায় আনসার সদস্যদের ছয়জনের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে তারা তাদের চার দফা দাবি পেশ করেন। ওই বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যোগ দেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা তাদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলে তারা সেখান থেকে চলে আসেন। ওই প্রতিনিধিদল বাইরে এলে আনসার সদস্যরা দাবি করেন, তাদের এক দফা দাবি- চাকরি জাতীয়করণ করতে হবে। এ সময় আরও কিছু আনসার সদস্য সচিবালয়ে আসেন। এতে সচিবালয়ের থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে বৈষম্যবিরোধী কয়েকজন ছাত্র সচিবালয়ে গেলে আনসার সদস্যরা কয়েকজনকে মারধর করেন। এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলম তাদের ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদের আটকে রাখার খবর পোস্ট করলে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে জমা হতে থাকেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মোতাসিম বিল্লাহ মাহফুজ এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘উপদেষ্টা নাহিদ ভাইসহ হাসনাত ও সার্জিস ভাইকে সচিবালয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন বিপথগামী কিছু আনসার সদস্য ও ছাত্রলীগের প্রেতাত্মারা। আমরা সবাই মিলে সচিবালয়ে মার্চ করে তাদের মুক্ত করে নিয়ে আসব। সবাই যোগ দিন, বিষয়টি সবাইকে অবগত করুন।’
পরে রাত ৯টায় শিক্ষার্থীরা সচিবালয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন। শিক্ষার্থীদের মিছিলটি শিক্ষা ভবন পার হয়ে সচিবালয়ের দিকে গেলে আনসার সদস্যরা তাদের ধাওয়া দেন। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। প্রায় ১ ঘণ্টা ধরে উভয়পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। উভয়পক্ষ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীরা ধাওয়া দিয়ে আনসার সদস্যদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
পরে আনসার সদস্যরা সচিবালয় ছেড়ে দৌড় দিয়ে চলে যান। সেনাবাহিনীর সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন। উভয়পক্ষের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় ৫১ জন আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোহেল নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সচিবালয় অবরোধ হওয়ার পর আমরা ঘটনাস্থলে যাই। আনসার সদস্যদের বোঝানোর চেষ্টা করি যে দেশে বন্যা হচ্ছে। পরিস্থিতি ভালো নয়। আপনারা আজ চলে যান। কিন্তু তারা আমাদের মারধর করেন।’
ওয়াদুদ নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আনসার সদস্যরা আমাদের মারধর করেছেন। তারা গত ১৫ বছর কেন তাদের দাবি নিয়ে গত আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে কিছু বলেননি? তাদের দাবির পেছনে একটি মহলের ষড়যন্ত্র আছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে নসাৎ করার ষড়যন্ত্র চলছে। আমরা একে প্রতিরোধ করব।’
ঢামেকে সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ
সচিবালয় এলাকায় আনসার সদস্যদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ চলাকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ইমারজেন্সি সেন্টারে (ওসেক) নেওয়া হয়েছে। ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া এ তথ্য নিশ্চিত করে গণমাধ্যমে বলেন, সচিবালয়ে অবরুদ্ধ থাকায় হঠাৎ তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। জরুরি বিভাগে তাকে অক্সিজেন লাগিয়ে রাখা হয়েছে।