শোষণ, বঞ্চনা ও নিপীড়নের দিন পেরিয়ে বীর বাঙালি হাতে তুলে নেয় অস্ত্র। কখনো সম্মুখ সমরে, কখনো গেরিলা যুদ্ধে বিপুল বীরত্বে বাংলা মায়ের দামাল ছেলে জানান দেয়- জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার/তবুও মাথা নোয়াবার নয়।
৯ মাসের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে প্রাণ দেন বাংলার ৩০ লাখ মানুষ। লাখো মা-বোনের আত্মদানে বাংলার আকাশে উড়ে লাল সবুজের বিজয় নিশান। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে খচিত হয়েছিল, এক নতুন দেশের নাম ‘বাংলাদেশ’৷
আজ ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ পদার্পণ করল পঞ্চান্নতম (৫৫ তম) বর্ষে। এ দিন জাতি বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে একাত্তরের সেই লড়াকু যোদ্ধাদের। লাখো শহিদ স্মরণে শ্রদ্ধার ফুল হাতে তারা চলেছেন মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক বা বধ্যভূমি প্রাঙ্গণে।
মঙ্গলবার ভোর থেকে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে ছুটেছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। মঙ্গলবার প্রত্যুষে ঢাকায় তেজগাঁওয়ের পুরাতন বিমানবন্দরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বিজয় দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয়।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলবার ভোর ৬টা ৩৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। তিনি ৬টা ৪০ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধ ত্যাগ করেন। তখন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এরপর ৬টা ৫৩ মিনিটে জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্রবেশ করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি সকাল ৭টায় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা ৭টা ৫ মিনিটে স্মৃতিসৌধ এলাকা ত্যাগ করেন।
এরপর সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন শ্রদ্ধার ফুল অর্পণ করেন।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদও সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা বীরপ্রতীক ফারুক-ই-আজমের নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টার নেতৃত্বে বিদেশি কূটনীতিকরা শহিদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে আজ সব সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবন এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনা আলোকসজ্জিত করা হবে।
ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন ও রঙিন নিশান দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।
অন্যান্য আয়োজনের পাশাপাশি এবার সর্বাধিক পতাকা উড়িয়ে প্যারাস্যুটিং করে বিশ্বরেকর্ড গড়ার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ।
বিজয় দিবসের দিন বেলা ১১টা থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পৃথকভাবে ফ্লাই পাস্ট মহড়া পরিচালনা করবে। চলবে বিজয় দিবসের বিশেষ ব্যান্ড-শো।
সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, আনসার বাহিনী ও বিএনসিসির বাদক দল বাদ্য পরিবেশন করবেন।
দিবসটি উপলক্ষে এবারও দেশের সব জেলা-উপজেলায় তিন দিনব্যাপী বিজয়মেলা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন, কুচকাওয়াজ ও ডিসপ্লে প্রদর্শন করা হবে।
বিকেল ৩টা থেকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরিবেশিত হবে বিজয় দিবসের গান। পাশাপাশি সারা দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান পরিবেশন করবেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, বাংলাদেশ শিশু একাডেমিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের চিত্রাঙ্কন, রচনা ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করবে।
বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসেও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
বিকেলে বঙ্গভবনে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেবেন রাষ্ট্রপতি। এ ছাড়া মহানগর, জেলা ও উপজেলায় বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহিদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ এ উপলক্ষে স্মারক ডাক টিকিট প্রকাশ করবে।
দেশের সব হাসপাতাল, জেলখানা, বৃদ্ধাশ্রম, এতিমখানা, পথশিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র, ডে-কেয়ার ও শিশু বিকাশ কেন্দ্র এবং শিশু পরিবার ও ভবঘুরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রীতিভোজের আয়োজন করা হবে।
সব শিশুপার্ক ও জাদুঘরে বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে এবং ঢাকাসহ সারা দেশের সিনেমা হলগুলোতে বিনামূল্যে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য প্রদর্শিত হবে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র।
চট্টগ্রাম, খুলনা, মংলা ও পায়রা বন্দর, ঢাকার সদরঘাট, পাগলা ও বরিশালসহ বিআইডব্লিউটিসির ঘাটে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্টগার্ড একক ও যৌথভাবে জাহাজগুলো সকাল ৯টা থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জনসাধারণের দর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখবে।
জয়ন্ত/এসজি/