এবারের ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি কমাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে টহল দল। যেসব স্থানে যানজট হতো সেসব এলাকা চিহ্নিত করে বসানো হয়েছে রোড ডিভাইডার। এ সড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কাঁচপুর সেতু থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার এলাকায় যানজট হওয়ার শঙ্কা না থাকলেও মেঘনা টোল প্লাজায় যানবাহন আটকে থাকলে ভোগান্তির শঙ্কা রয়েছে। টোল প্লাজায় সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। তবে টোল আদায়ের পাঁচটি মেশিনে যান্ত্রিক ত্রুটি থাকায় টোল আদায়ে ধীরগতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া অটোরিকশাসহ থ্রি হুইলারের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ার ফলে মহাসড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
মহাসড়কের কাঁচপুর, মদনপুর, মোগরাপাড়া, মেঘনা ব্রিজের টোল প্লাজা পর্যন্ত যানজট এড়াতে শতাধিক পুলিশ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। এসব এলাকায় ইউটার্ন, ইউলোবসহ আলাদা লেন নির্মাণ করায় আগে যেখানে যানজট হতো এবার সম্ভাবনা নেই। এমনকি রোড ডিভাইডার বসানোয় যানবাহন দ্রুতগতিতে চলাচল করতে পারবে। একই সঙ্গে মেঘনা টোল প্লাজায় যানজট এড়াতে তদারকি বাড়িয়েছে সড়ক জনপদ বিভাগ। গত বছরও এ সড়কে যানজট এড়িয়ে নির্বিঘ্নে রাজধানী ছাড়তে পারছেন ঘরমুখো যাত্রীরা। তবে মহাসড়কে কয়েকটি স্থানে এখনো স্ট্যান্ড থাকায় সেখান দিয়ে যানচলাচলে বিঘ্ন হতে পারে। তাছাড়া ঢাকা-সিলেট মহাসড়কসহ দুটি মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত থাকা মদনপুর-গাজীপুর এশিয়ান হাইওয়ে সড়কের যানবাহনের চাপে প্রায় প্রতিদিনই যানজট হচ্ছে। এছাড়া মহাসড়ক ও এশিয়ান হাইওয়ে সড়কে নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। কাঁচপুর থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত মহাসড়কের মধ্যে চলাচল করছে অটোরিকশা ও থ্রি হুইলার। এমনকি উল্টো পথেও এসব যানবাহন দিন-রাত চালিয়ে যাচ্ছে চালকরা। এতে প্রায় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।
গত শনিবার সকালে মেঘনা টোল প্লাজায় গিয়ে দেখা যায়, ১২টি কাউন্টারের মধ্যে সাতটিতে টোল আদায় করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে পাঁচটিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে টোল আদায় সম্ভব হচ্ছে না। টোল প্লাজায় প্রতি পাঁচ মিনিটে ১৬ থেকে ১৮টি যানবাহন পার হচ্ছে। তবে ঈদের তিনদিন আগে থেকে এ সড়কের ওপর যাত্রীদের চাপ দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি যানবাহনের চাপও বাড়বে। ওই সময় একই পরিমাণ গাড়ি টোল প্লাজা দিয়ে পারাপার হলে টোল দেওয়ার অপেক্ষায় আটকে পড়তে পারে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানবাহন। এতে যানজটের শঙ্কা থেকেই যায়। এদিকে সকাল ৬টা থেকে ৮টা পর্যন্ত এ টোল প্লাজা হয়ে ঢাকামুখী যেসব যানবাহন চলাচল করেছে সেখানেও বাড়তি চাপ দেখা যাচ্ছে।
মেঘনাঘাট টোলপ্লাজার কার্যনির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল আলিম জানান, ১২টি কাউন্টারের মধ্যে সাতটি সচল রয়েছে। পাঁচটি কাউন্টারে নেটওয়ার্কিং ত্রুটি সারানোর চেষ্টা চলছে। টোল প্লাজায় ছোট সংস্কার কাজ চলমান আছে। আজ সোমবার নাগাদ সেটি শেষ হওয়ার কথা। ঈদকে কেন্দ্র করে টোল প্লাজার প্রত্যেকটি কাউন্টার সচল রাখার চেষ্টা চলছে। যাত্রীবাহী যানবাহনগুলো যাতে করে সহজেই তাদের গন্তব্যস্থলে যেতে পারে, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা করেছে সড়ক জনপদ বিভাগ। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার যানজটের শঙ্কা কম। তবে পণ্যবাহী যানবাহন একই সময় আসা-যাওয়া করলে কাউন্টারগুলোতে চাপ বেড়ে যাবে। এতে করে যানবাহনের চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মোগরাপাড়া এলাকায় চট্টগ্রামগামী একটি বাস কাউন্টারের কর্মচারী (টিকিট কাউন্টারম্যান) আসাদুজ্জামান মাসুম জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বাস কাউন্টারগুলোয় যাত্রীদের চাপ বেশি। যদি মহাসড়কের ব্যবস্থাপনা বর্তমান অবস্থার মতো চলে তাহলে যানজটের আশঙ্কা কম থাকবে। নাহলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়বে।
কাঁচপুর এলাকায় খাগড়াছড়িগামী টিকিট বিক্রয়কর্মী রিপন মিয়া বলেন, এখনই যাত্রীরা বাড়ি যাওয়ার টিকিট সংগ্রহ করছেন। আমাদের টিকিট বিক্রিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মহাসড়কগুলোতে এখনো তেমন যানজট নেই। কিন্তু মেঘনা সেতুর টোল প্লাজা ও গোমতী সেতুর টোল প্লাজায় যদি বিলম্ব হয় তাহলে ঈদের আগে যাত্রীদের গন্তব্য স্থানে পৌঁছাতে প্রচুর ভোগান্তি পোহাতে হতে পারে।
মদনপুর যাত্রীবাহী বাস কাউন্টার এলাকায় সাব্বির আহামেদ নামে চট্টগ্রাম পথের এক যাত্রী বলেন, ব্যবসায়িক কারণে আমি প্রতি সপ্তাহে চারদিন এ পথে যাতায়াত করি। ঈদের এক সপ্তাহ আগের চেয়ে ঈদের সময় রাস্তায় যেমন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তেমনি যানবাহন বাড়ে দ্বিগুণ। এতে করে অন্যান্য সড়কের মতো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কেও যানচলাচলে চাপ বাড়ে। বর্তমানে রাস্তায় ফাঁকাই থাকে, তবে মেঘনা টোল প্লাজা যদি এমন রাখা না যায় তাহলে যানজট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সোনারগাঁয়ের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মামুন বলেন, এ সড়কের কয়েকটি এলাকায় এখনো স্ট্যান্ড রয়েছে। কাঁচপুর, মদনপুর, দড়িকান্দি, টিপরদী ও মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় লোকাল বাসের স্ট্যান্ড থাকায় সার্ভিস লেনে যানবাহন আটকে পড়ে। সড়কে যানবাহন থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা চলে। পাশাপাশি মহাসড়কটি ঘিরে কাঁচপুর মোড়, মদনপুর মোড় এবং মোগরাপাড়া চৌরাস্তা এলাকায় সড়কের পাশে বহু অবৈধ স্থাপনা ও ছোট যানবাহনের স্ট্যান্ড থাকায় প্রায় যানজট লেগে যায়। এসব কারণে প্রায় দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তবে ঈদে ঘরমুখো মানুষের ভোগান্তি এড়াতে হলে এসব বিষয়ে তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন।
মেঘনা টোল প্লাজায় চট্টগ্রামগামী ট্রাকচালক খোরশেদ আলম বলেন, কাঁচপুর থেকে মেঘনা টোল প্লাজায় আসতে স্বাভাবিকভাবে আধা ঘণ্টা লাগার কথা। এমনিতে যানজট না থাকলেও যত্রতত্র গাড়ি থামানো আর মেঘনা টোল প্লাজার টিকিট কাউন্টারগুলো কার্যক্রম ধীরগতির কারণে কিছুটা সময় বেশি লেগে যায়, তবে এ বছর ঈদকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে। লাঙ্গলবন্দ সেতুর ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে ওই এলাকায় ধীরগতিতে গাড়ি চালাতে হচ্ছে।
কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) বিষ্ণুপদ শর্মা বলেন, অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার মহাসড়কে আরও বেশি পুলিশ মোতায়েন থাকবে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে ৮২ জনের টিম সড়ক মহাসড়কে কাজ করবে। পাশাপাশি টহল দল, মোটরসাইকেল দল থাকছে। দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যেতে অ্যাম্বুলেন্স দলের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কে যেকোনো যানবাহন বিকল হয়ে গেলে কিংবা কোনো সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত সরানোর জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শিমরাইল মোড় এবং মদনপুর অংশে দুটি রেকার রাখা হয়েছে।
লাঙ্গলবন্দ সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণে ওই এলাকায় আমাদের একটি টিম কাজ করবে। যানজট এড়িয়ে নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছাতে হাইওয়ে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করবে।
নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট নিরসনে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। মহাসড়কে ছোট ছোট সংস্কার কাজ চলমান আছে। লাঙ্গলবন্দ ব্রিজের সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে। ঈদে ঘরমুখো যাত্রীরা সহজেই তাদের গন্তব্যস্থলে যেতে পারবেন। তবে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অবৈধ স্থাপনা না থাকায় ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন হবে।