অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাই শেষে ২০টি অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের গঠিত বিশেষ কমিটি।
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ষষ্ঠ দিনে সংসদে এই প্রতিবেদন উত্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়েছে, আলোচিত অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ৯৮টি অবিকল বহাল রাখা হয়েছে, ১৫টি সংশোধন করে আইন হিসেবে গ্রহণ এবং ২০টি বাতিল বা বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে রাত পৌনে ৮টার দিকে কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন প্রতিবেদনটি সংসদে উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে আইনগত কাঠামোর মধ্যে আনতেই এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাতিলের তালিকায় থাকা ২০টির মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশ আপাতত সংসদে বিল আকারে উত্থাপন না করে ভবিষ্যতে নতুন করে আরও শক্তিশালীরূপে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। আর বাকি চারটি অধ্যাদেশ স্থায়ীভাবে রহিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ওপর এখন সংসদে আলোচনা শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের বড় অংশই আইন হিসেবে বহাল রাখার পথে এগোচ্ছে। কমিটি বলেছে, ৯৮টি অধ্যাদেশ কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সংসদে উত্থাপন করে পাস করা যেতে পারে।
এদিকে সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারির পর পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে উত্থাপন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাওয়ার বিধান রয়েছে। সে হিসাবে এই ২০টি অধ্যাদেশ আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে ল্যাপস হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো অধ্যাদেশগুলোর আলোকে বিল উত্থাপন ও পাস না হলে এগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে ১২টি অধ্যাদেশে জামায়াতের তিন সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও গাজী নজরুল ইসলাম নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছেন। বাতিল হওয়া কিছু অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে সংসদে আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
১৬টি বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ
বিশেষ কমিটি ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে সংসদে উত্থাপনের সুপারিশ করেছে। সেগুলো হচ্ছে–গণভোট অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা (সংশোধন), মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (দ্বিতীয় সংশোধন), কাস্টমস (সংশোধন), আয়কর (সংশোধন), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (দ্বিতীয় সংশোধন), দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন), বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন), বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধন), মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন, মাইক্রো ফাইন্যান্স ব্যাংক এবং তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
বিশেষ কমিটির মতে, এসব অধ্যাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনই আইন হিসেবে পাস করার মতো পর্যাপ্ত পর্যালোচনা হয়নি। তাই এগুলো আপাতত বাতিল হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো ভবিষ্যতে নতুন করে বিল আকারে সংসদে আনতে পারে।
৪ অধ্যাদেশ স্থায়ীভাবে বাতিলের প্রস্তাব
বিশেষ কমিটি চারটি অধ্যাদেশ সরাসরি রহিত করার সুপারিশ করেছে। এগুলো হলো–জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংশোধন অধ্যাদেশ। কমিটির মতে, এসব অধ্যাদেশ বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং আইন হিসেবে বহাল রাখার প্রয়োজন নেই।
অন্যদিকে ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধনের মাধ্যমে আইন হিসেবে প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো–নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন), ব্যাংক রেজল্যুশন, সন্ত্রাস বিরোধী (সংশোধন), কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (দ্বিতীয় সংশোধন), জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশ শ্রম অধ্যাদেশ (সংশোধন), মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ দমন অধ্যাদেশ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন), বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
বিরোধী দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’
প্রতিবেদনটি সর্বসম্মত হলেও ২০টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্যরা দ্বিমত পোষণ করেছেন এবং ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রদান করেছেন। তাদের আপত্তির জায়গাগুলো হলো, অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা চারটি অধ্যাদেশ। অধ্যাদেশগুলো হলো–জেলা পরিষদ (সংশোধন), উপজেলা (সংশোধন), স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) (সংশোধন), স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) (সংশোধন) অধ্যাদেশ। দুটি অধ্যাদেশ সংশোধনের সুপারিশ করা হয়। বাতিল করে পুনরায় বিল আকারে আনার তালিকায় থাকা ১১টি অধ্যাদেশ। স্থায়ীভাবে বাতিলের তালিকায় থাকা তিনটি অধ্যাদেশ। তাদের মতে, কিছু অধ্যাদেশ অপরিবর্তিতভাবে বহাল রাখা বা বাতিলের সিদ্ধান্ত যথাযথ নয়।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের আলোকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগ সংবিধানবিরোধী ও বেআইনি। অতএব উক্ত অধ্যাদেশসমূহ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
গত ১২ মার্চ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন ১৩ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ধারাবাহিক তিনটি বৈঠকে অধ্যাদেশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সংসদীয় কমিটির এই প্রতিবেদনটি এরপর সংসদে আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য গৃহীত হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আইনি পদক্ষেপগুলোকে স্থায়ী রূপ দিতেই এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে সংসদে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আবারও আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বুধবার সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক এ বিষয়ে একটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জানান, সংসদের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো সরকারি দলের সদস্যের আনা মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। কার্যপ্রণালি বিধির ৬৫(২) অনুযায়ী প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়েছে এবং আগামী ৫ এপ্রিল এ বিষয়ে ২ ঘণ্টা আলোচনা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে গণভোটের ফলাফল কার্যকর করার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশনও এখনো আহ্বান করা হয়নি। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে সংসদে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিপুলসংখ্যক অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদীয় কমিটির এই প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব অধ্যাদেশের মধ্যেই রয়েছে নির্বাচন, প্রশাসন, মানবাধিকার, অর্থনীতি ও বিচারব্যবস্থাসংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্ত। একদিকে সংসদীয় যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে অনেক অধ্যাদেশ স্থায়ী আইন হওয়ার পথে এগোচ্ছে, অন্যদিকে বিতর্কিত বা অসম্পূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ বাতিল বা পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে এসব ইস্যুতে সংসদে সামনে যে আলোচনা হতে যাচ্ছে, তা কেবল আইনি কাঠামো নয়, দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক রূপান্তরের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।