দেশে সাংবাদিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবং গণমাধ্যমের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি কার্যকর ও স্বাধীন ‘ইউনিফাইড ইনস্টিটিউশন’(একীভূত প্রতিষ্ঠান) গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন।
একই সঙ্গে তিনি মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের (গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন) ২০২৫ সালের প্রস্তাবনা এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইজেক) ইন্টারভিউ থেকে প্রাপ্ত আইনের খসড়াটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনার আহ্বান জানান।
শনিবার (১৩ জুন) মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) আয়োজিত দেশে একটি স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে অংশীজনদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করার ঘোষণার প্রেক্ষিতে এই আলোচনার আয়োজন করেছে সংস্থাটি।
এমআরডিআই জানায়, প্রস্তাবিত স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন প্রক্রিয়া, এর পরিধি এবং কমিশনের কাছে অংশীজনদের প্রত্যাশার ব্যাপারে সুস্পষ্ট মতামত ও পরামর্শ তুলে আনাই এই সভার মূল উদ্দেশ্য।
আলোচনা সভায় উপস্থিত রয়েছেন খবরের কাগজের প্রকাশক ও সম্পাদক মোস্তফা কামাল।
সারা হোসেন বলেন, ‘আমাদের বর্তমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অত্যন্ত খণ্ডিত। প্রেস কাউন্সিল প্রায় অকার্যকর। এছাড়া বিটিআরসি, আদালত কিংবা কপিরাইট অফিস- সব আলাদা আলাদা ফোরাম কাজ করছে, যা মোটেও কার্যকর নয়। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তান কিংবা যুক্তরাজ্যে ওভাররাইডিং রেসপন্সিবিলিটিসহ সুনির্দিষ্ট বডি রয়েছে।’
গণমাধ্যম সংস্কারে দুই খসড়ার তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরে তিনি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট উল্লেখ করেন। আইজেকের খসড়া অনুযায়ী ৯ সদস্যের একটি ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে, যার অধিকাংশ সদস্যই আসবেন মিডিয়া সেক্টর থেকে। এই কমিশন গণমাধ্যমের স্ট্যান্ডার্ড সেট করা ও সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।
তবে সারা হোসেন জোর দিয়ে বলেন, ‘‘কমিশন যেন নিজেই সব নিয়ন্ত্রণ না করে, বরং মিডিয়ার নিজস্ব স্ট্যান্ডার্ড সেটিংয়ে ‘ফ্যাসিলিটেটর’ বা সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখে। এখানে সেলফ-রেগুলেশন (আত্ম-নিয়ন্ত্রণ) অত্যন্ত জরুরি।’’
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে প্রেস কাউন্সিল বিলুপ্ত করার কথা বলা হলেও ২৬-এর আইজেক খসড়ায় প্রেস কাউন্সিলকে রেখে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সারা হোসেন একে একটি ‘রিস্ক’ বা ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, একদিকে গণমাধ্যম কমিশনকে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, আবার ৫০ বছরের পুরনো প্রেস কাউন্সিলকেও রাখা হচ্ছে। এতে কাজের ওভারল্যাপিং হবে। একটি ‘ইউনিফাইড ইনস্টিটিউশন’ বা একীভূত প্রতিষ্ঠান হওয়াই সবচেয়ে যৌক্তিক।
প্রস্তাবিত কমিশনের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে রিফর্ম কমিশনের ১ শতাংশ কন্ট্রিবিউশন মডেলের প্রশংসা করেন তিনি, যেখানে মিডিয়া হাউসগুলোর নিজস্ব কন্ট্রিবিউশনের পাশাপাশি সরকারের গ্রান্ট ও বিদেশি অনুদান গ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া কমিশনে দেশের বৈচিত্র্য রক্ষায় মাইনরিটি রেপ্রেজেন্টেশন (সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব) রাখার প্রস্তাবকে স্বাগত জানান তিনি।
আইজেক খসড়ায় সিলেকশন কমিটিতে কেবল একজন সরকারি প্রতিনিধি (ক্যাবিনেট সেক্রেটারি) রাখার ইতিবাচক দিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের অভিজ্ঞতার আলোকে এই সিলেকশন প্রক্রিয়া যেন অত্যন্ত স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও আন্তর্জাতিক মানের হয়, তা বিধিমালায় স্পষ্ট করতে হবে। এছাড়া ফৌজদারি অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি যেন দুই বছর পার হলেই নিয়োগ না পান, সেই ডিসকোয়ালিফিকেশন বা অযোগ্যতার ধারাটি কঠোর করার তাগিদ দেন তিনি।
মোবাইল জার্নালিজমের এই যুগে সাংবাদিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট শিক্ষাগত বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করার বিরোধিতা করেন সারা হোসেন। তিনি বলেন, যোগ্যতা নির্ধারণ যেন কোনোভাবেই লাইসেন্সিং-এর মতো না হয়ে দাঁড়ায়। এটি বাধ্যতামূলক না করে বরং প্রশিক্ষণ, প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট ও অ্যাক্রেডিটেশনের সুযোগ রাখা উচিত।
আইজেকের খসড়ায় কমিশনকে জরিমানা করার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। দেশের অতীত প্রেক্ষাপট ও সাংবাদিকদের ওপর জুলুম-হয়রানির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সারা হোসেন বলেন, ফাইন বা জরিমানা করাকে নেতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই, কারণ এটি অন্য কোনো বড় সাজা বা হয়রানির চেয়ে ভালো। তবে জরিমানা করার আগে নোটিশ দেওয়া, জবাব দেওয়া এবং আপিল করার একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া (ডিউ প্রসেস) থাকতে হবে, যা রুলসের ওপর ছেড়ে না দিয়ে মূলেই রাখা দরকার।
এছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘কনফিডেনশিয়ালিটি অব সোর্সেস’ বা সোর্সের গোপনীয়তা সুরক্ষার ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ যেন না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন মনে করেন, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনা এবং পরবর্তী খসড়া দুটি গণমাধ্যম সংস্কারের আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি চমৎকার ভিত্তি তৈরি করেছে এবং নির্বাচিত সরকারের উচিত এই সুযোগটি কাজে লাগানো।
জয়ন্ত সাহা/অন্তরা/