ঢাকা ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

পৃথিবীর ইতিহাসে ফিলিস্তিনিদের মতো কেউ ত্যাগ স্বীকার করেনি: ইউসুফ রামাদান

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৪, ১১:১৫ এএম
পৃথিবীর ইতিহাসে ফিলিস্তিনিদের মতো কেউ ত্যাগ স্বীকার করেনি: ইউসুফ রামাদান
বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান

বাংলাদেশে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস ওয়াই রামাদান। ৯ বছর ধরে এ দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার নেপথ্যে তার অবদান অতুলনীয়। হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যকার যুদ্ধ, ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি, বিশ্বব্যাপী চলমান আন্দোলনসহ তার ব্যক্তিজীবন ও ফিলিস্তিনসংক্রান্ত নানা প্রসঙ্গ নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিরাজ রহমানরিয়াজ উদ্দীন। সঙ্গে ছিলেন রায়হান রাশেদ

খবরের কাগজ: প্রথমেই জানতে চাই, ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতি কী? 

ইউসুফ রামাদান: ফিলিস্তিনের সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রথমে ইসরায়েলের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হলে তারা কিছু সংশোধনী দেয় এবং হামাস এ প্রস্তাবে সম্মতি জানায়। হামাসের সম্মতির বিষয়টি নেতানিয়াহুকে খুবই অবাক করেছে। কারণ, তিনি এমনটা শুনতে চাচ্ছিলেন না। নেতিবাচক কিছু শুনতে চেয়েছিলেন তিনি। তারা ভেবেছে, এ সংশোধনী হামাস প্রত্যাখ্যান করবে। 

নেতানিয়াহুর হয়ে যারা কাজ করে, তারা তাকে বলেছে- এ প্রস্তাব হামাস মেনে নেবে না। কিন্তু হামাস শেষ মুহূর্তে চমক দেখিয়েছে, মেনে নিয়েছে। নেতানিয়াহু এবং তার সরকারের জন্য এটি অবাক করা খবর। কারণ তিনি যেকোনো উপায়ে, যেকোনো মূল্যে এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান। এ যুদ্ধের ধারাবাহিকতা ধরে রাখা তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সঙ্গে তার ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ জড়িত। যুদ্ধ বন্ধ হয়ে গেলে নেতানিয়াহুর ক্যারিয়ারও থমকে যাবে। 

বিশ্বের প্রায় সব সচেতন মানুষ বিশ্বাস করে, এ যুদ্ধটা ইসরায়েলের নয়; নেতানিয়াহুর এবং তার সরকারের যুদ্ধ। যদিও বর্তমান সময়ের সবকিছু নেতানিয়াহুর স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। 

মিসর, কাতার, আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহু প্রভাবশালী দেশসহ ফিলিস্তিনিরা চাচ্ছেন, এবার অন্তত এ যুদ্ধটি বন্ধ হোক। কিন্তু নেতানিয়াহুর একগুঁয়েমির কারণে বিষয়টি থমকে আছে। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরায়েল একা লড়তে পারে। সুতরাং আমরা অপেক্ষা করছি সামনে কী ঘটে। 

খবরের কাগজ: ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের বর্তমান অবস্থা কেমন?

ইউসুফ রামাদান: ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করার মতো নেই। এ পরিস্থিতির সঠিক ব্যাখ্যা করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। গাজার মানুষ পুরোপুরি দুর্দশাগ্রস্ত, এমনকি পশ্চিম তীরের মানুষও মারা হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যার মধ্যে বহু নারী ও শিশু রয়েছে। গাজার বর্তমান পরিস্থিতিটা আসলে অনুমান করা সম্ভব নয়, লাখ লাখ মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছে এবং আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছে। গাজা ভূখণ্ডের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অসংখ্য মানুষ গৃহহীন হয়ে এখন নিজ দেশেই শরণার্থী। এর ওপর খাবারের চরম সংকট বিরাজ করছে। গাজায় যে পরিমাণ খাবার প্রবেশ করছে, তাতে ২০ শতাংশ মানুষের চাহিদাও মিটছে না। ২০ শতাংশ মানুষের অপ্রতুল খাবার বণ্টিত হচ্ছে পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে। ফলে তৈরি হচ্ছে তীব্র খাদ্যসংকট। 

এর মানে এই নয় যে, বহির্বিশ্ব আমাদের সহযোগিতা করছে না। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ খাবার ও ওষুধসহ বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সহযোগিতা করছে। কিন্তু ইসরায়েল সেসব সামগ্রী ফিলিস্তিনে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। ইন্টারনেট নেই, যোগাযোগের ব্যবস্থা নেই, খাদ্য ও পানি নেই, ওষুধ নেই। সব বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। মসজিদ, চার্চ ধ্বংস করা হয়েছে। হামলার কারণে অকার্যকর হয়ে গেছে সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক। কারও কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধও নেই। ছোট একটি উদাহরণ দিই, কোথাও কোনো অ্যানেস্থেসিয়ার ব্যবস্থা নেই। অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়া সব ধরনের অপারেশন করা হচ্ছে। ১০ বছরের একটি বালকের পা কেটে ফেলা হয়েছে অ্যানেস্থেসিয়া ছাড়াই। এবার আপনি চিন্তা করে দেখুন, সেখানকার মানুষ কেমন জীবন যাপন করছে!

খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী?

ইউসুফ রামাদান: দেখুন, রাজনীতিতে সবাই নিজ নিজ স্বার্থের কথা চিন্তা করে কাজ করে। যুদ্ধের প্রথম দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ ছিল যেকোনো উপায়ে, যেকোনো মূল্যে ইসরায়েলকে সমর্থন করা। ‘ইসরায়েলেরও তাকে রক্ষা করার অধিকার রয়েছে’- এমন নীতির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। আমরা অনেকেই জানি, আমেরিকায় জায়োনিস্ট লবি (কট্টরপন্থি ইহুদিদের প্রভাব ও গ্রুপিং) খুবই শক্তিশালী এবং কার্যকর। তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো অন্য কোনো লবি আমেরিকায় নেই। এটা যেমন বর্তমানে আছে, তেমন অতীতেও ছিল। ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধের শুরু (১৯৪৮ সাল) থেকে, আমেরিকার জায়োনিস্ট লবি ইসরায়েলের পক্ষে কাজ করছে। দেখুন, আমেরিকায় ৬০-৬৫টি দেশের ৩০-৪০ লাখ মুসলমান রয়েছে। তারা সবাই আলাদা দলে, কমিউনিটিতে বিভক্ত। আলাদা স্থান ও সমাজে বসবাস করে। তাদের মধ্যে শক্তিশালী ঐক্য নেই। আর এই অনৈক্য ভিন্ন লবিকে আমেরিকায় যেভাবে খুশি সেভাবে প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ করে দিচ্ছে। 

এ ছাড়া জায়োনিস্ট লবির আর্থিক সামর্থ্য অনেক বেশি এবং গণমাধ্যমেও তারা খুবই সক্রিয়। ফলে জায়োনিস্ট লবি আমেরিকায় খুবই শক্তিশালী। হোয়াইট হাউস, সিনেট, কংগ্রেসসহ আমেরিকার সর্বত্র এদের বিচরণ। আমি এটাকে ‘আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়া ক্যানসার’ বলে থাকি। এ লবি আমেরিকার সরকারের মাধ্যমে মানুষের স্বাধীনতাকে বাজেয়াপ্ত করার মতো প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা রাখে। পরিস্থিতি এখন এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনি আমেরিকান হলে আমেরিকার সবকিছু নিয়ে সমালোচনা করতে পারবেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস সদস্যদের নিয়েও কথা বলতে পারবেন, কিন্তু কোনোভাবেই ইসরায়েলের সমালোচনা করতে পারবেন না। এভাবে আপনার কাছ থেকে স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যেটা নিয়ে আমেরিকারও কিছু করার নেই। ইসরায়েলের সমালোচনা করলে তারা আপনাকে অ্যান্টিসিমেটিকের তকমা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করলে কিছুই হবে না।

বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফিলিস্তিনের চৌকস কিছু সাংবাদিক সবকিছু রেকর্ড করছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের অনেকেই জীবন হারিয়েছেন, অনেকে পরিবার হারিয়েছেন। তবু তারা কাজটি চালিয়ে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবে আমেরিকায় ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়েছে।

খবরের কাগজ: আপনার কথার সূত্র ধরে জানতে চাই, আমেরিকার ছাত্র আন্দোলনকে ফিলিস্তিন কীভাবে দেখে?  

ইউসুফ রামাদান: এই বিপ্লব, ছাত্রদের এই আন্দোলন আমেরিকার প্রশাসনকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে, কার পক্ষে অবস্থান নেবে তারা। আমেরিকার জনসাধারণের স্বার্থ দেখবে নাকি ইসরায়েলের স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেবে। আর এ কারণে আমেরিকা এখন জোরালোভাবে যুদ্ধবিরতি চাচ্ছে। অথচ তারা ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদের দাবিতে আলজেরিয়ার প্রস্তাবে ভেটো দেওয়াসহ তিনবার যুদ্ধবিরতিতে ভেটো দিয়েছে। ছয় মাসে তারা চারবার ভেটো দিয়েছিল। আর এটাই জায়োনিস্ট লবিস্টদের অভূতপূর্ব ক্ষমতা। এভাবেই নেতানিয়াহু সমর্থকরা জো বাইডেনকে প্রতিবন্ধকতায় ফেলে। 

পরিস্থিতি এখন কিছুটা পাল্টেছে। বাইডেন বুঝতে পারছেন, বারবার একই পথে যাওয়াটা তার দেশ, জনগণ ও প্রশাসনের স্বার্থের বিপক্ষে যাচ্ছে। তিনি বিকল্প ভাবতে শুরু করেছেন। তিনি ইসরায়েলকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ না দেওয়ার কথাও বলছেন। এর মানে এই নয় যে, তিনি গাজার মানুষকে ভালোবাসেন কিংবা তাদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন; আসলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলবিরোধী আন্দোলনের কারণে তিনি এমনটা করতে বাধ্য হচ্ছেন। আমরা আশাবাদী। কারণ ইসরায়েল বর্তমানে সারা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। হামাসের প্রস্তুাব মেনে নেওয়াটা ইসরায়েলকে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। এখন হয়তো তারা চরমভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, নয়তো ভিন্ন কিছু চিন্তা করবে।   

খবরের কাগজ: বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ, বিশেষত আরব বিশ্বের ভূমিকায় কি আপনারা সন্তুষ্ট?

ইউসুফ রামাদান: আরব বিশ্বের ভূমিকা কিংবা সাধারণ মুসলিম দেশের ভূমিকা নিয়ে কিছুটা সমস্যা আছে এবং সেটা যে কেবল ফিলিস্তিন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ, বিষয়টা কিন্তু এমন নয়। বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের ভূমিকা নিয়ে সমস্যা আছে। অনেক ইস্যুতেই যথার্থভাবে তারা পাশে দাঁড়াচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলা যায়। ফিলিস্তিন ইস্যুর তুলনায় এটা অনেক অনেক সহজ ইস্যু। এখানে কি মুসলিম বিশ্ব কিংবা আরব বিশ্ব কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছে? তারা এখনো উদ্বাস্তু এবং বাংলাদেশ একমাত্র দেশ যারা এটি বহন করছে এবং দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে তারা (আরব বিশ্ব) অবশ্যই তাদের মতো করে ভূমিকা পালন করছে। তারা কি পর্যাপ্ত ভূমিকা পালন করছে? না, সেটা তারা করছে না। তারা কাজ করছে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়।

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ-আমেরিকাসহ বিভন্ন দেশে আন্দোলন হচ্ছে, একে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ইউসুফ রামাদান: এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। ফিলিস্তিনি মানুষের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট। এমনটা এর আগে ঘটেনি। একেবারেই নতুন কিছু হচ্ছে। এটা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রাপ্য। কারণ তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তার মূল্যটা বেশ ভারি। যে পরিমাণ ধ্বংসযজ্ঞ, দুর্দশা ও নির্যাতন ফিলিস্তিনের মানুষ সহ্য করছে, তারা এমন একটি সংহতি পাওয়ার প্রকৃত হকদার। 

গোটা বিশ্বের মানুষ এখন ফিলিস্তিনের পক্ষে একাত্মতা ঘোষণা করছে। তারা বুঝতে পেরেছে, ইসরায়েলের এ হামলা শুধু ফিলিস্তিনের বিপক্ষে নয়, এটা মানবতা ও ন্যায়ের বিপক্ষে এবং এ কারণে মানবতা কলঙ্কিত হচ্ছে। 

আমেরিকার মানুষ তাদের সরকারকে প্রশ্ন করছে, ‘কোথায় তোমার মানবতা, কোথায় তোমার নীতি-আদর্শ, কোথায় তোমার নৈতিকতা ও মোরালিটি? তোমরা আমাদের যেসব নীতি ও মানবতার কথা বলেছ, তা কি শুধু নির্দিষ্ট কিছু মানুষের জন্য? আমরা কি সেসব নীতির পক্ষে অবস্থান নেব?’ সুতরাং এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্দোলন এবং এমন কাজ চালু রাখতে আমরা তাদের আরও উৎসাহিত করি। 

বাংলাদেশের জনসাধারণকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ বাংলাদেশের জনগণ যে আন্দোলন-সংহতি বাস্তবায়ন করছে, তা খুব দারুণ। আশা করি, বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও একই কাজ করবে। ফিলিস্তিনি মানুষের সমর্থনে এগিয়ে আসবে এবং আশা করি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ সংহতি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে। 
 
খবরের কাগজ: বাংলাদেশের সঙ্গে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক কেমন?

ইউসুফ রামাদান: বাংলাদেশ ও ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক অসাধারণ। এ সম্পর্ক খুবই গভীর ও আন্তরিক। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ, যাদের সরকার ও জনগণ যেকোনো ইস্যুতে ব্যাপকভাবে ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে থাকে। গত ৯ বছর ধরে আমি বাংলাদেশে বসবাস করছি, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে পরিমাণ এবং যে মানের সাহায্য-সহযোগিতা ফিলিস্তিন গ্রহণ করেছে, আমি তা স্বচক্ষে দেখেছি এবং আমি এর প্রধান সাক্ষী। 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি স্বীকৃতি পত্র পাঠিয়েছিল। যদিও সে সময়ে বাংলাদেশের জন্য এ স্বীকৃতির প্রয়োজন ছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে তখন ফিলিস্তিনের সম্পর্ক তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের অকৃত্রিম বন্ধু।

বর্তমানে সবাই পরিষ্কারভাবে বুঝতে সক্ষম হয়েছেন, ফিলিস্তিনের যুদ্ধের বিষয়টি কেবল ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সীমাবন্ধ নেই; বরং এটা ভালো ও মন্দের মধ্যকার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ তাদের স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকেই ভালোর পক্ষে থাকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিলিস্তিনের পাশে ছিল, আছে এবং আশা করি থাকবে। 

খবরের কাগজ: বাংলাদেশ থেকে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ফিলিস্তিনে যেসব সহযোগিতা পাঠানো হচ্ছে, আদৌ কি তা সেখানে পৌঁছে?

ইউসুফ রামাদান: বাংলাদেশর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় আমরা প্রথমবার বিপুল পরিমাণ ওষুধ এবং পরবর্তী সময়ে শুকনো খাবার সাহায্য হিসেবে গ্রহণ করেছি এবং কায়রোয় থাকা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তা গ্রহণ করে রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছেন। বাংলাদেশের এ সাহায্য ফিলিস্তিনের মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। সবাই বাংলাদেশের প্রশংসা করেছেন। এগুলো হস্তান্তর করা, পৌঁছানো, বিতরণ, রান্না করা এবং খাওয়ার অনেক ভিডিও রয়েছে। বাংলাদেশের পতাকা পেছনে রেখে সাহায্য গ্রহণ করার সময় শিশুরা বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে- এমন ভিডিও রয়েছে। 

এ ছাড়া বেসরকারিভাবেও বহু মানুষ এবং অনেক সংগঠনের কাছ থেকে আমরা বিপুল সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছি। গত রমজানেও আমরা সরকারি ও বেসরকারিভাবে ইফতারের সহযোগিতা গ্রহণ করেছি এবং যথাযথভাবে তা ফিলিস্তিনে পৌঁছিয়েছি। তবে সমস্যা হচ্ছে, যে পরিমাণ সাহায্য পাচ্ছি, সব পৌঁছাতে কষ্ট হচ্ছে। কারণ ইসরায়েল ফিলিস্তিনে কোনো কিছু প্রবেশ করাতে প্রচণ্ড বাধার সৃষ্টি করছে। 

গাজায় ‘বাংলাদেশ অনাথ আশ্রম’ নামে একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ ফিলিস্তিনের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে বলে আশা করি। আরও একটি খুশির সংবাদ হলো, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ফিলিস্তিনিদের ফুল ফ্রি শিক্ষাবৃত্তি প্রদানে সম্মত হয়েছে, যেটা ফিলিস্তিনের জন্য অনেক বড় সুসংবাদ। অনেক বড় সহযোগিতা। প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পেয়েছি আমরা। এ জন্য আমি বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। 

খবরের কাগজ: বাংলাদেশের জনসাধারণের কাছে ফিলিস্তিনের প্রত্যাশা কী? 

ইউসুফ রামাদান: এটা খুবই পরিষ্কার। তারা অতীতে যা করেছেন, বর্তমানে যা করছেন- এটাকে অব্যাহত রাখুন। হাল ছেড়ে দেবেন না। এ দেশের জনগণ যা করছে, তা অভূতপূর্ব। ফিলিস্তিন একে মূল্যায়ন করে। ফিলিস্তিনের ইতিহাসের পাতায় এসব সাহায্য-সহযোগিতার কথা খচিত থাকবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা পড়বে এবং জানবে। ফিলিস্তিন মুক্ত হওয়ার পর, আশা করছি আমরা একদিন বাংলাদেশের এ ভালোবাসার মর্যাদাপূর্ণ প্রতিদান দেব।  

খবরের কাগজ: গাজায় ইসরায়েলের হামলার ক্ষতির প্রভাব কী?

ইউসুফ রামাদান: এ হামলার ক্ষতির প্রভাব অবর্ণনীয়। আমি আগেই বলেছি, গাজার প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা একেবারে ধ্বংস হয়ে গেছে। কীভাবে আমরা এগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব? এগুলো পুনর্নির্মাণ করতে বহু অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু ফিলিস্তিনের সে সামর্থ্য নেই। ফিলিস্তিনের আর্থিক সক্ষমতা এমনিতেই কম। এ হামলা ও যুদ্ধের ফলে তারা আরও পঙ্গু হয়ে গেছে। 

ফিলিস্তিনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ধ্বংস হওয়া জনপদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ফিলিস্তিনের যেহেতু এ সামর্থ্য নেই, সুতরাং সারা বিশ্বের সহযোগিতা প্রয়োজন। 

এ যুদ্ধ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এ জনপদ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কেউ সহযোগিতাও করবে না। কারণ আজকে নির্মাণ করলে কালকে যে আবার ইসরায়েল তা ধ্বংস করে দেবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।    

খবরের কাগজ: গাজায় আপনার কি কোনো আত্মীয় রয়েছে? 

ইউসুফ রামাদান: সরাসরি রক্তের সম্পর্কের কোনো আত্মীয় নেই। তবে আমার একজন জামাতা রয়েছে সেখানে। যুদ্ধের প্রথম তিন সপ্তাহে সে তার পরিবারের ৫৯ সদস্যকে হারিয়েছে। আর আমি গাজার অধিবাসীও নই। আমি ফিলিস্তিনের অন্য অংশের অধিবাসী। ফলে গাজায় আমার সরাসরি কোনো আত্মীয় নেই। তবে আমি বিশ্বাস করি, গাজায় যত ফিলিস্তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এবং বর্তমানে যত মানুষ জীবিত রয়েছেন, সবাই আমার আত্মীয়। তাদের কেউ আমার মা, কেউ বাবা, কেউ আমার বোন, কেউ ভাই, কেউবা ছেলে কিংবা মেয়ে। তারা সবাই আমার পরিবারের সদস্য।

খবরের কাগজ: ইসরায়েল কেন ফিলিস্তিনে হামলা চালাচ্ছে? এখানে কি কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক কারণ জড়িত? মূলত কি কারণে তারা হামলা চালাচ্ছে বা যুদ্ধ করছে? 

ইউসুফ রামাদান: তাদের যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য পরিষ্কার। লুকানোর কিছু নেই। ৭৬ বছর ধরে যার জন্য তারা যুদ্ধ চালাচ্ছে, সেটা হলো- ফিলিস্তিনের পুরো ভূখণ্ড তারা দখলে নিতে চায়। পুরো ভূমি দখল করার পর তারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গঠন করতে চায়। অন্য সব কারণ গৌণ। এটাই মূল বা প্রধান কারণ। নেতানিয়াহুর মতো কিছু কট্টরপন্থি ইহুদি এ মিশন বাস্তবায়নে জড়িত। এই মিশনের অংশ হিসেবে এখন তারা যেকোনো মূল্যে গাজার জনসাধরণকে ভূমিছাড়া করতে চাচ্ছে। গাজাকে খালি করে এটা দখল করবে এবং তাদের ‘বৃহত্তম ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার একটি ধাপ সম্পন্ন করবে, এটাই তাদের উদ্দেশ্য। ফিলিস্তিনি জনগণ তাদের এ মিশন কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করতে দেবে না। তারা তাদের জন্মভূমি রক্ষায় আমরণ লড়াই করে যাবে। ফিলিস্তিনি মানুষের দেশপ্রেম ও সাহসিকতা বিশ্বের মানুষকে বিস্মিত করেছে। 

পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো জাতি ফিলিস্তিনিদের মতো ত্যাগ স্বীকার করেনি। ফিলিস্তিনিরা বিশ্বাস করে, তারা স্বাধীনভাবে এখানে জন্মেছে এবং স্বাধীনভাবে বসবাস করার অধিকার তাদের আছে। কেউ তাদের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার রাখে না। তারা সৃষ্টিকর্তার দাস। নেতানিয়াহু, বাইডেন কিংবা অন্য কারও দাসত্ব করার জন্য তাদের জন্ম হয়নি। 

খবরের কাগজ: অনেকে বলেন, ‘হামাস ও ফাতাহ গ্রুপে বিভক্ত থাকা এবং শক্তিশালী বিশ্বস্ত নেতা না থাকার কারণে ফিলিস্তিনের এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না’- এ মন্তব্যকে আপনি কীভাবে দেখেন? 

ইউসুফ রামাদান: ইয়াসির আরাফাত কি শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত নেতা ছিলেন না? অবশ্যই ছিলেন। তো তখন এ সমস্যার সমাধান হলো না কেন? ১৯৯০ সালে মাদ্রিদ থেকে তিনি এ সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা শুরু করেন এবং ২০০৪-এ এসে মারা যান। ১৪ বছর চেষ্টা করে তিনি কী পেয়েছেন? তখন তো হামাস ছিল না, ফাতাহও ছিল না। আমরা তখন একসঙ্গে ছিলাম। দেখুন, এটা ইসরায়েলের ছড়ানো একটি অজুহাত মাত্র। প্রোপাগান্ডা। তারা বলে বেড়ায়, ফিলিস্তিনিরা দেশ গড়তে পারবে না, কারণ তারা বিভক্ত। আমার দৃষ্টিতে, তারা (হামাস ও ফাতাহ) উভয়ই একই ভিশনে কাজ করছে। তারা উভয়ই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা চায়। তবে দুই পক্ষের পন্থা ও চিন্তা আলাদা। কিন্তু ভিশন এক। স্বাধীন রাষ্ট্র চায় তারা। 

ইসরায়েল ফিলিস্তিনকে বিভক্ত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং আমেরিকা তাকে এ কাজে মদদ দিচ্ছে। আশার কথা হলো, বর্তমান পৃথিবী বাস্তবতা বুঝতে সক্ষম হয়েছে এবং পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করেছে।

খবরের কাগজ: ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ কী? আপনি কি কোনো আশার আলো দেখছেন?

ইউসুফ রামাদান: অবশ্যই, সব সময় আশা ছিল, আছে এবং থাকবে। আশা ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। আশাবাদী না হলে আমরা বাঁচতে পারব না। আমরা মুসলিম। আপনি জানেন, মুসলিম মানে কী? ‘আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না।’ হতাশ হওয়া যাবে না। সব সময় আল্লাহর ওপর আশা-ভরসা রাখতে হবে। আপনি যদি এই আশা হারিয়ে ফেলেন, তাহলে আপনি মানবতাকে হারিয়ে ফেলবেন। 

আমরা আশার ওপর বেঁচে থাকি, আশা নিয়েই অগ্রসর হই। আর এ কারণেই ৭৬ বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা বেঁচে আছে। নইলে আমরা অনেক আগেই অনেকের মতো হারিয়ে যেতাম। ফিলিস্তিনিরা ব্যতিক্রম। আল্লাহর ওপর আমাদের শক্ত বিশ্বাস আছে। আমাদের যা করার আছে, আমরা তা করছি- মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য স্বাভাবিক সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি। বাকিটা আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়েছি। তিনি যা ভালো মনে করেন, তার ফয়সালা করবেন। প্রত্যেক ফিলিস্তিনি দৃঢ়ভাবে এমনটা বিশ্বাস করে।

খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ। 

ইউসুফ রামাদান: আপনাদেরও ধন্যবাদ।  

যানজট এড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরযানের ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০৭ পিএম
যানজট এড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরযানের ব্যবহার সীমিত রাখতে হবে
নজরুল ইসলাম

মহানগরী বলতে বেশ একটি বড় এলাকা বা অঞ্চলকে বোঝায়। আমরা যাকে পুরান ঢাকা বলে জানি, তার বিস্তৃতি বুড়িগঙ্গার উত্তর পাড় থেকে পুরোনো রেললাইন সড়ক পর্যন্ত। অর্থাৎ এর উত্তর প্রান্তে অবস্থিত নগর ভবন বা ঢাকা সিটি করপোরেশন ভবন। পৃথিবীর যেকোনো মহানগরীর তুলনায় এই ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি, এমনকি মুম্বাই কিংবা হংকংয়েও এত বেশি ঘনত্ব চোখে পড়ে না। ঢাকার উচ্চ জনঘনত্ব গড়ে উঠেছে নিচু উচ্চতার ঘরবাড়িতে। প্রধানত পুরোনো দুই-তিন-চারতলা দালান অথবা বস্তির একতলা সেমিপাকা বাড়ি, কাঁচা ঘর বা ঝুপড়ি হচ্ছে পুরান ঢাকার আবাসিক ধরন। 

ব্যবসা-বাণিজ্যও পরিচালিত হচ্ছে একই ধরনের ভবনাদি বা দালানে। সম্প্রতি পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বহুতল দালান তৈরি হচ্ছে। ঢাকা মূলত গড়ে উঠেছে ষোলো থেকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সাড়ে ৩০০ বছরে। একেবারে গোড়ার দিকের কিছু ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভবন বা মসজিদ বা দুর্গ এখনো টিকে আছে। ঢাকার বেশির ভাগ বাড়িঘর বিগত এক শ থেকে দেড় শ বছরের মধ্যে নির্মিত। পুরান ঢাকার প্রায় গোটা এলাকাই গড়ে উঠেছে প্রাক-শিল্প বা প্রাক-মোটরযান যুগের শহর হিসেবে। এতে সড়কবিন্যাস অত্যন্ত অগোছালো, এলোমেলো। 

অধিকাংশ রাস্তাই আঁকাবাঁকা এবং সরু, এমনকি খুবই সরু। প্রশস্ত সড়ক বলতে ছিল শুধু উত্তর-দক্ষিণ জনসন রোড, নবাবপুর রোড এবং পূর্ব-পশ্চিশে ইসলামপুর-পাটুয়াটুলী রোড ও মদনমোহন বসাক রোড। এসব সড়কের প্রশস্ততা বড়জোর ২০-৪০ ফুট। অন্যান্য রাস্তা আসলে গলি, এগুলোর প্রস্থ ২০ ফুটের নিচে। অনেক গলি আছে, যার প্রস্থ ৪-৬ ফুট। ১৯৫০-এর আগে পর্যন্ত এ ধরনের সড়কব্যবস্থা নিয়েই শহর চলত। কেননা তখন শহরের লোকসংখ্যা ছিল অনেক কম; বর্তমানের ডিসিসি এলাকার ৭৫ লাখের জায়গায় মাত্র ৩ লাখ, পুরান ঢাকার বর্তমান ২০ লাখের জায়গায় বড়জোর ২ লাখ। যানবাহনের সংখ্যাও ছিল খুব কম। অধিকাংশ মানুষ ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা, হেঁটে বা সাইকেলে চলাফেরা করত।

১৯৪৭ থেকে ২০০৩ সাল- এই দীর্ঘ সময়ে পুরান ঢাকার নতুন সড়ক তৈরি হয়েছে একেবারে হাতে গোনা কয়েকটি, যেমন- ধোলাইখাল সড়ক (পূর্ব-পশ্চিম প্রলম্বিত), নর্থ-সাউথ রোড (উত্তর-দক্ষিণ প্রলম্বিত), নারিন্দা, যাত্রাবাড়ী সড়ক এবং পুরোনো রেললাইন সড়ক। এখন বুড়িগঙ্গার ওপর দুটি সেতু তৈরি হয়েছে, এই সেতু দুটি দিয়ে হাজার হাজার গাড়ি প্রতিদিন নদী পার হচ্ছে এবং এগুলো পুরান ঢাকার ভেতর দিয়েই যাতায়াত করে। পুরান ঢাকায় অনেক পাইকারি বাজার অবস্থিত। এ ছাড়া কাঁচাবাজার, খুচরা ব্যবসার বাজার, কোর্ট-কাচারি, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজও রয়েছে। যেহেতু পুরান ঢাকা পাইকারি ব্যবসা-বাণিজ্যেরও কেন্দ্র, সে কারণে এখানে দূরপাল্লা এবং মাঝারি ও নিকটবর্তী নানান সাইজের ট্রাক আসা-যাওয়া করে, বিভিন্ন স্থানে পার্কিংও করে।

পুরান ঢাকার অধিকাংশ রাস্তাই এত সরু যে, ফুটপাত বা সাইডওয়াক রাখার কোনো সুযোগই থাকে না। সাধারণত একটি বড় শহরের মোট ভূমির ১৫-২৫ ভাগ বরাদ্দ করতে হয় রাস্তার জন্য। সে জায়গায় ঢাকা মহানগরীতে রাস্তার পরিমাণ বড়জোর ৮ ভাগ, পুরান ঢাকায় এই অনুপাত আরও কম, সম্ভবত ৫-এর বেশি নয়। অন্যদিকে জনসংখ্যার ঘনত্ব অস্বাভাবিক রকম বেশি। ফলে সব সময়েই পুরান ঢাকায় যানজট লেগে থাকে। অধিকাংশ সড়ক এতই সরু যে, সেগুলো দিয়ে মোটরযান চলাচল করতে পারে না, অথবা বড়জোর একদিকে চলতে পারে। রিকশার সংখ্যাও এত বেশি যে, ‘পিক আওয়ারে’ পিঁপড়ার মতো পিল পিল করে একটার পেছনে একটা এগোতে পারে। শুধু যে রাস্তার দৈর্ঘ্য-প্রস্থ কম তাই নয়, অধিকাংশ রাস্তার সারফেসের অবস্থাও ভালো নয়, ফলে যান চলাচলে অসুবিধা হয়। গতিও শ্লথ হয়ে যায়। ছোটখাটো দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

ঢাকার সড়কব্যবস্থা কিংবা যানজট পরিস্থিতির উন্নতি করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। উপরন্তু জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে, পুরান ঢাকার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়, অথবা নতুন ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। ঢাকার কোনো সড়ক প্রশস্ত করা বা ভূমি অধিগ্রহণ করে নতুন সড়ক নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। ব্যাপক স্কেলের ‘আরবান রিনিউয়াল’ বা ‘নগর নবায়ন’ ছাড়া পুরান ঢাকার যানজট হ্রাস করা কঠিন। দীর্ঘ মেয়াদে সদরঘাট থেকে উত্তরের টঙ্গী, গাজীপুর বা আরও দূরবর্তী কোনো স্থানের সঙ্গে (অত্যন্ত ব্যয়বহুল) পাতাল রেল বা উড়াল সড়ক (ওভারহেড এক্সপ্রেসওয়ে) যোগাযোগ হয়তো সমস্যা কিছুটা লাঘব করতে পারবে। বিকল্প হিসেবে পুরান ঢাকা থেকে বেশ কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড বাইরে স্থানান্তর করতে হবে, মানুষও সরাতে হবে। শুধু বিকল্প নয়, অন্য উপায়ের পাশাপাশি এ কাজটি করতে হবে।

ঢাকার যানজটের সঙ্গে বাতাসদূষণের সম্পর্ক নতুন ঢাকার চেয়ে সম্ভবত কিছুটা কম সংকটাপন্ন এ কারণে যে, পুরান ঢাকায় মোটরযানের ব্যবহার বা চলাচল তুলনামূলকভাবে কম। তবে ডিজেল ব্যবহারকারী ট্রাক পুরান ঢাকায় যথেষ্ট চলাচল করে, মিনি ট্রাকের ব্যবহারও যথেষ্ট রয়েছে। এসব যানবাহন থেকে ধোঁয়া নির্গমনের মাধ্যমে বাতাসদূষণ হচ্ছে। দুই স্ট্রোকের বেবিট্যাক্সিও বাতাসদূষণের জন্য দায়ী ছিল। 

সম্প্রতি এ ধরনের যান নিষিদ্ধ করায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। যানবাহনের হর্নের কারণে যে শব্দদূষণ, তারও প্রকোপ নতুন ঢাকার তুলনায় পুরান ঢাকায় কম। উদাহরণস্বরূপ একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মগবাজার, ফার্মগেট কিংবা মৌচাকে যখন শব্দদূষণ মাত্রা ১০৩-১০৪ ডেসিবেল, সদরঘাটে তখন ৮৭। বলা বাহুল্য, এই মাত্রাও গ্রহণযোগ্য মাত্রার অনেক ওপরে। ঢাকায় চলাচলকারী ট্রাক, মিনিট্রাক ইত্যাদিও অধিকাংশ বেশ পুরোনো এবং সত্যিকার অর্থে ফিটনেসহীন। বায়ুদূষণ হ্রাস করতে হলে ফিটনেসহীন বা ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি পেট্রল বা গ্যাসোলিনের মানও নিশ্চিত করতে হবে। তবে কাজটি মোটেও সহজ নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে, যানজট নিরসনে মোটরযানের ব্যবহার সীমিত রাখার দিকেই দৃষ্টি দিতে হবে। (বই সূত্র: ঢাকা এখন ও আগামীতে)

লেখক: নগরবিদ এবং ইমেরিটাস অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

জেনারেল (অব.) আজিজ, আইনের ঊর্ধ্বে নন

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০৪ পিএম
জেনারেল (অব.) আজিজ, আইনের ঊর্ধ্বে নন
শহীদুল্লাহ ফরায়জী

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে একজন নাগরিকও আইনের ঊর্ধ্বে নন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী পর্যন্ত, অর্থাৎ রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিক সংবিধানের অধীন। শুধু রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করবেন, যা সংবিধানের ৪৮-এর (২) অনুচ্ছেদ নিশ্চিত করেছে। রাষ্ট্রপতি সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নন। 

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ সুতরাং রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক অপরাধে জড়িত হলে তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে। কারণ রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিক সমান। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাউকে পদমর্যাদার ভিত্তিতে রেহাই দেওয়া বা অব্যাহতি দেওয়া কিংবা আনুকূল্য প্রদর্শনের কোনো সুযোগ রাষ্ট্রের নেই। 

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তারা উল্লেখ করেছে, দুর্নীতির সঙ্গে ব্যাপক সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় গত সোমবার দুপুরে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোরে) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাইডেন প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করে। 

তার (আজিজ আহমেদ) কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবমূল্যায়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার ওপর জনগণ আস্থাহীন হয়ে পড়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, আজিজ আহমেদ তার এক ভাইকে বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি এড়াতে সহযোগিতা করেন। এটা করতে গিয়ে তিনি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি করেন। 

এ ছাড়া অন্যায্যভাবে সামরিক খাতে কনট্রাক্ট পাওয়া নিশ্চিত করার জন্য তিনি তার ভাইদের ঘনিষ্ঠভাবে সহায়তা করেন, সরকারি নিয়োগের বিনিময়ে বিরাট অঙ্কের ঘুষ নেন। জেনারেল আজিজ এবং তার পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা এসেছে দেশটির ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যাক্ট ৭০৩১ (সি)-এর আওতায়। যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বাইডেন প্রশাসন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জেনারেলের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এতে জনমনে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল যেমন জন্ম নিচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্র এবং দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

এখন সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা। এটা সরকারের জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এ ধরনের উচ্চমাত্রার অভিযোগের সঙ্গে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস জড়িত। সেটার নিষ্পত্তি অবশ্যই প্রয়োজন। এটা নিছক কোনো ঘটনা নয়। কারও অপরাধ বা অপরাধ সম্পৃক্ততা বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার প্রশ্ন যখন বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসছে, তখন প্রজাতন্ত্রের পক্ষে এটা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।

দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে যদি যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ উত্থাপন করত, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সরকার সারা দেশে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করত। কিন্তু বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির বেলায় সরকারের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা কোনোক্রমেই সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে সুরক্ষা দেয় না। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করতে সমর্থ হবে না, এটা সংবিধান ২০ (২) অনুচ্ছেদে নির্দেশনা দিয়েছে।

সুতরাং অনুপার্জিত আয়, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি বা পদের কর্তব্য পালনের নামে সংবিধান লঙ্ঘনে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার আইন অনুযায়ী তদন্ত করবে। অপরাধী হলে শাস্তির আওতায় আসবে, নিরপরাধী হলে অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবে। সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে দেশে এবং দেশের বাইরে বেআইনি কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। এনআইডিতে ভুল তথ্য দেওয়ার প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। অপরাধীদের সহযোগিতা করার প্রমাণ হাজির করা হচ্ছে, কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। কেউ অপরাধে জড়িত থেকে তদন্তের মুখোমুখিও হবে না, আর কাউকে বিচার-প্রক্রিয়ার সুযোগ না দিয়ে অহেতুক কারাগারে দিনের পর দিন অন্তরীণ রাখা হবে- এটা প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

কোনো ব্যক্তিই রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নন। জেনারেল (অব.) আজিজ কোনো দায়মুক্তির আওতায় নন যে, তার  বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সংবিধান বারিত করেছে। সরকার যদি উত্থাপিত অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী কলঙ্কের কালিমা বহন করতে থাকবে; যা রক্তের তলদেশ থেকে উত্থিত মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রের জন্য সম্মানজনক নয়। 

রাষ্ট্র যদি পদ-পদবি দেখে অপরাধীকে রেহাই দেয়, তাহলে আইন সবার জন্য সমান- এটা সমাজে চিহ্নিত করার কোনো জায়গা থাকবে না। ন্যায্যতা খোঁজার প্রক্রিয়া অনুপস্থিত হয়ে পড়বে। কোনো দেশের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বা নাগরিক যদি দেশের ভেতর এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে, তা না দেখার ভান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য হতে পারে না। প্রকৃত অপরাধীকে আদালত বা ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে দণ্ড দিতেই হবে। তারপর সরকার চাইলে দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারবে কিন্তু অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতেই হবে।

যারা অপরাধী তাদের বিচারের আওতায় আনা, যারা অপরাধী নন তাদের অভিযোগ থেকে মুক্ত করা-  এটা রাষ্ট্রের কর্তব্য ও দায়িত্ব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির কাছ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ- আত্মসর্বস্ব সংকীর্ণতায় অস্বীকার করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপরাধ প্রবণতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে  রাষ্ট্র বা সমাজে আইনের শাসন, নৈতিকতা ও  সৎ গুণ আহরণ ক্রমাগতভাবে বিলীন হয়ে যাবে। 

বিদেশি রাষ্ট্র যেখানে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করছে, সেই প্রশ্নে সরকার কেন দ্বিধাগ্রস্ত বা সরকার কেন প্রয়োজনীয় কর্তব্য পালন করতে পারছে না! সরকার কারও প্রতি বিরাগভাজন হয়ে কাজ করবে না কিন্তু সরকার আইন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে দ্বন্দ্বহীনভাবে কর্তব্য পালন করবে। সমাজকে অন্যায় ও অপরাধপ্রবণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের মহাবিপ্লবী বা অসাধারণ কথা সমাজের কোনো কাজে আসবে না। 

অন্যায়ের কোনো অনুসন্ধান থাকবে না, অপরাধের জন্য কোনো হুমকি থাকবে না, অনাচার ও অবিচার, ক্ষুধা-দারিদ্র্য, দমনমূলক আচরণ, অকারণ বন্দিত্বের প্রতিকার থাকবে না, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যাবে। আমরা ক্ষমতার মোহে রাষ্ট্রকে অসম্ভাব্যতার পরিণামের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, নৈরাশ্যকে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছি।

যে আওয়ামী লীগ জনগণের মনে নিরপেক্ষ নির্বাচন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিল, এখন তারাই জনগণের সম্মতিবিহীন অবাধ ক্ষমতা প্রয়োগ করে যাচ্ছে। এখন নির্বাচনের নামে তামাশা বা ভোটাভুটির কূটাভ্যাস (Voting Paradox) তাদের চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নকেই তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে একটি সমাজে কী ভয়ংকর সংস্কৃতি দাঁড়াচ্ছে, সরকার তা বিবেচনায়ই নিচ্ছে না। একটি প্রজাতন্ত্রে সরকার আছে, অথচ তার কাছে ন্যায্যতার কোনো অস্তিত্ব নেই। 

সরকারের এমন কোনো নৈতিক অবস্থান নেই, যা আমাদের ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাবে, আর রাষ্ট্র শাসকদের অপরিণামদর্শিতায় এক চরম অনিশ্চয়তার পরিমণ্ডলে ঢুকে পড়ছি আমরা। আইনের শাসন ও ন্যায্যতার অভাবে সমাজ ক্রমাগত ভয়ংকর হয়ে উঠছে। সর্বনাশা ক্ষমতার রাজনীতি অগণিত মানুষের আত্মদানকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দিচ্ছে।
দর্শনের শিক্ষক সক্রেটিস বলেছিলেন- ‘যে রাষ্ট্রে আইন থাকে অথচ আইনের প্রয়োগ হয় না, আইন বাস্তবায়নের অভাব বা অগ্রাহ্যতা দেখা যায়, সেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নস্যাৎ হয়ে যায় এবং পরিশেষে রাষ্ট্রটি ধ্বংস হয়’।
 
লেখক: গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক 
[email protected]

বিনিয়োগকারীদের হাতেই শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ নিহিত

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১০:৪৬ এএম
বিনিয়োগকারীদের হাতেই শেয়ারবাজারের ভবিষ্যৎ নিহিত
আবু আহমেদ

একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি সেই দেশের অর্থনীতি। এ নিয়ে জনমনে যথেষ্ট শঙ্কা-সংশয় আছে। মূল্যস্ফীতি, দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস, ডলারসংকট, টাকার অবমূল্যায়নসহ নানাবিধ অসংগতি এর প্রধান কারণ। অন্যদিকে দেশের রপ্তানি সূচকও আশাব্যঞ্জক নয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কাঙ্ক্ষিতভাবে অর্জিত হচ্ছে না। বলা বাহুল্য, এই সংকট এক দিনে সৃষ্টি হয়নি। বছরব্যাপী ধাপে ধাপে এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। এর কারণ দুটি- প্রথমত, দেশের আয় বিদেশে চলে গেছে এবং যাচ্ছে। ঋণখেলাপি, আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও সরকারের সুবিধাভোগী কিছু লোক এ জন্য দায়ী।

ব্যাংকিং খাতে সুদের হার বাড়ানোর ফলে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগ ও উৎপাদন কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আনুপাতিক হারে কর্মসংস্থান কমে যাচ্ছে। বাইরের কোনো বিনিয়োগ আশাব্যঞ্জক নয় অথবা বিনিয়োগ করার ফলে তারাও অনিশ্চয়তায় ভুগতে থাকে। সার্বিকভাবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির ফলে টাকা তার মূল্যমান হারিয়েছে। যে কারণে দেশে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। রিজার্ভ বৃদ্ধি না পেলে নানাবিধ সমস্যা বাড়তে থাকে। রিজার্ভ বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান হচ্ছে না। রপ্তানি আয়ও খুব একটা বাড়ছে না। 

অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগও অনেক কমে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রা যেভাবে দেশে আসত, সেগুলোও অনেকটা স্থবির হয়ে গেছে। এটি আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ আমাদের আমদানি করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সরকারের ঋণ অনেক বেড়ে গেছে। সরকারকে বুঝেশুনে প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে বলা হয়েছে। বেসরকারি খাতে খরচ হ্রাস করার জন্য বলা হয়েছে। লাগামহীন ব্যয় ও গঠনমূলক পরিকল্পনার অভাবে এসব সমস্যা আমরা প্রত্যক্ষ করছি। আজকে তার নেতিবাচক ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। সংকট মোকাবিলায় মনোযোগ না দিলে অর্থনীতির এই দুর্দশা আরও চরম আকার ধারণ করতে পারে। 

বাংলাদেশ হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপি, যা দেশের এযাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ। অনেক ব্যাংকে তারল্যসংকট আছে। ব্যাংকিং খাতে তারল্যসংকট উপেক্ষা করা যায় না। নতুন করে কেউ ডিপোজিট রাখছেন না। ব্যাংকের ওপর তাদের কোনো বিশ্বাস নেই। ব্যাংকিং খাতে সুদের হার বৃদ্ধির সঙ্গে শেয়ারবাজারের সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমানে শেয়ারবাজার নিম্নমুখী এবং কেনাবেচা ঠিকমতো হচ্ছে না। বিভিন্ন দেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো। মূল্যস্ফীতিও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। আমাদের দেশ সেই তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। 

দেশের শেয়ারবাজারের আমদানি-রপ্তানি, অর্থনীতির সঙ্গে একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। তার চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ব্যাংকের সুদহারের। ব্যাংকের সুদহার যদি বেড়ে যায়, তখন বুঝতে হবে বাজারে তারল্য কমবে। আবার ব্যাংকে সুদহার কমতির দিকে থাকলে বুঝতে হবে শেয়ারবাজারে তারল্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ধনী লোকেরা বিদেশে বিভিন্ন কায়দায় অর্থ পাচার করছে, এটি আস্থাহীনতার আরেকটি অংশ। আস্থাহীনতা ও নিরাপত্তাজনিত দুশ্চিন্তা থেকেই মানুষ বিদেশে অর্থ পাচার করে। 

পরিবারে সন্তানসন্ততিদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তারা বিদেশে টাকা পাচার করে থাকে। কারণ নিজেরা নানা রকম অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। শেয়ারবাজারের বড় একটি তহবিল হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। বলা যায়, সিন্ডিকেট করে কিছু ব্যবসায়ী নামধারী দুষ্কৃতকারী অতীতের মতোই শেয়ারবাজার থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি সুদে টাকা-পয়সা ঋণ নিয়ে নিচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য যারা ব্যাংকে লেনদেন করেন, সেটির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। 

বিনিয়োগকারীদের হাতেই শেয়ারবাজারের বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ ও ভালো-মন্দ নির্ভর করে। যেকোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে সেই কোম্পানি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়াটা খুবই জরুরি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারী না বুঝে কোম্পানির শেয়ার ক্রয় করে থাকেন। সে কারণে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ সঠিক হয় না। পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, বিনিয়োগকারী লোকসান গুনছেন। মনে রাখতে হবে, ভালো ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ একটি খারাপ কোম্পানিকেও অনেক সময় ভালো কোম্পানিতে রূপ দিতে পারে। আবার ব্যবস্থাপনা দক্ষ না হলে ভালো কোম্পানিও অনেক সময় খারাপ হয়ে যায়। 

অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বাড়লেও বাড়েনি মানুষের আয়। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম লাগামহীন হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল, তেল, ডিম, আটা থেকে শুরু করে সব পণ্যের দাম বেড়েছে। সীমিত আয়ের মানুষ পড়েছেন বিপাকে। ফলে অনেকেই ব্যয় কাটছাঁট করছেন। দ্রব্যমূল্যের দাম প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ফলে জনজীবনে মানুষ দুঃখ-কষ্ট ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। শুধু চাল নয়, ডাল, আটা, ভোজ্যতেল, শুকনা মরিচ, পেঁয়াজ, চিনিসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামই এখন বাড়তির দিকে। 

এভাবে ক্রমাগত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্যবিত্তসহ স্বল্প আয়ের মানুষের। গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহনের মতো সেবা সার্ভিসের মূল্য দফায় দফায় বেড়ে যাওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে। করোনার পর ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইত্যাদি বৈশ্বিক সমস্যা কাটিয়ে সাধারণ মানুষ যখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে, ঠিক তখনই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে খেত-খামার, কল-কারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের ওপর। তাদের জীবন ধারণ প্রায় দুষ্কর হয়ে উঠেছে। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো বলা যাবে না। বড় ধরনের কোনো সংস্কার ছাড়া অর্থনীতির সংকট মোকাবিলা করা কঠিন হবে। 

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ 

সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভাজন তুষের আগুনে পুড়ছে ভবিষ্যৎ

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১০:৪৪ এএম
সাংস্কৃতিক সংগঠনে বিভাজন তুষের আগুনে পুড়ছে ভবিষ্যৎ
রেজানুর রহমান

আমরা বোধকরি আসল ছেড়ে নকলের পেছনেই দৌড়াচ্ছি। ঐক্য গড়ার চেয়ে অনৈক্যের পালে হাওয়া দিচ্ছি। রাজনীতিতে ঐক্য নেই অনেক দিন। একই অবস্থা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও। দেশে ভিন্ন নামে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন। গণমানুষের পক্ষে কথা বলাই সবার লক্ষ্য। অথচ অনেক ক্ষেত্রে সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। একই সংগঠনে বিভক্তির রেখা স্পষ্ট। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, টিভি নাটকের পরিচালকদের সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ড, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতিসহ (বাচসাস) একাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠনে দীর্ঘদিন ধরেই বিভক্তি জিইয়ে আছে। মশারির ভেতর মশারি টাঙিয়ে প্রকাশ্য বিরোধে লিপ্ত অনেক সংগঠন। কে আসল কে নকল- এই বাদানুবাদ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে অনেক সংগঠনের ক্ষেত্রে। ফলে দেশে প্রকৃত অর্থে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ব্যাহত হচ্ছে। 

সংস্কৃতির ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র একটি দেশের আয়নাও বটে। ভালো চলচ্চিত্রের কথা উঠলে দেশ হিসেবে ইরানের নামটা সহজেই উঠে আসে। একদা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও অহংকার করার মতো একটা জায়গা তৈরি করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে চলচ্চিত্রের অবস্থা বড়ই নাজুক। এ জন্য চলচ্চিত্রের মানুষই কমবেশি দায়ী। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ঘিরে ছোট-বড় ২০টিরও বেশি সংগঠন আছে। সবাই চায় চলচ্চিত্রের উন্নয়ন। এ জন্য ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। অথচ দেশের চলচ্চিত্র পরিবারে অনৈক্যই প্রকাশ্যে ছড়ি ঘোরাচ্ছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। 

নাটক, সিনেমার অভিনয়শিল্পীরা একটি দেশের অলংকারও বটে। একা শাকিব খানই প্রিয় মাতৃভূমিকে বিশ্বে মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরার ভূমিকা নিতে পারেন। অথচ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে শিল্পীদের মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। একই সংগঠনে নানা পক্ষ। কেউ কাউকে মানেন না। অশিক্ষিত মূর্খ বলে গালাগাল দেন। কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুটি প্যানেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আনন্দমুখর পরিবেশে এফডিসিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই পরাজিত সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী নিপুণ আক্তার বিজয়ী প্রার্থীদের বিশেষ করে নতুন সভাপতি মিশা সওদাগর এবং সাধারণ সম্পাদক ডিপজলের গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে অভিনন্দন জানান। নিপুণের এই উদারতায় গোটা চলচ্চিত্র পরিবারে একটা স্বস্তির হাওয়া বয়ে যায়। 

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নতুন নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করে। কিন্তু হঠাৎ করে নিপুণ আক্তার নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুললেন। নির্বাচন বাতিল চেয়ে তিনি আদালতে রিট করেছেন। ফলে দেশের চলচ্চিত্র পরিবারে বিশেষ করে শিল্পীদের মধ্যে বিভাজনের রেখা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনের ফলাফল জানার পরই সবার আগে নিপুণ আক্তার বিজয়ী প্রার্থীদের অভিনন্দন জানান। অথচ নিপুণই হঠাৎ কেন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুললেন? নিপুণ এই মুহূর্তে দেশে নেই। বিদেশে অবস্থান করছেন। বিদেশ থেকেই প্রচারমাধ্যমে বলেছেন, আমি ভোটের ফলাফল পর্যন্ত ছিলাম। ওই সময় আমি যা করেছি তা করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপি হয়েছে। তাই আমি বাধ্য হয়ে আদালতে রিট করেছি। রিটে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনের ফলাফল বাতিল ও নতুন করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। 

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চিত্রনায়িকা নিপুণ ও খলনায়ক ডিপজলের মধ্যেই বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। ডিপজলকে অশিক্ষিত দাবি করে নিপুণ বলেছেন, সরি টু সে, আমাকে বলতে হচ্ছে, শিল্পী সমিতিতে এমন একজন সেক্রেটারি পদে এসেছেন, যার কোনো শিক্ষা নেই। আমরা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়ে আছি। এটা অশিক্ষিতদের জায়গা না। আনকালচারডদের জায়গা না। এটা কাজ করে দেখিয়ে দেওয়া লোকদের জায়গা। শুধু কাজ করলেই হবে না। জ্ঞান থাকতে হবে। শিক্ষিত হতে হবে। আমি একজন গ্র্যাজুয়েট। আমার তিন প্রজন্ম গ্র্যাজুয়েট। 

এদিকে ডিপজল বলেছেন, তিনি (নিপুণ) তো বাপকেই অস্বীকার করেন। রক্তের সমস্যা না হলে এমন বলতে পারেন না। কারণ ও (নিপুণ) যাকে দিয়ে চলচ্চিত্র চিনেছে তাকেই ভুলে গেছে। নিপুণকে উদ্দেশ করে ডিপজল আরও বলেছেন, কেস খেলার মন চায় খেল। যেটা খেলার মন চায় খেলবা আসো। আমরা চাই ভদ্রতা, নম্রতা। আমরা মামলা চাই না। এই মামলা করে সিনেমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আমরা সিনেমাশিল্পকে ধ্বংসের পথ থেকে এগিয়ে নিতে চাই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। 

বাস্তবতা যা বলছে- নিপুণ এবং ডিপজলের দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি কার্যত আবারও দুই ভাগ হয়ে গেছে। নিপুণ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল চেয়ে নতুন নির্বাচন দাবি করেছেন। এদিকে নতুন নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিক সভা করে নিপুণের দাবিকে ষড়যন্ত্রমূলক আখ্যা দিয়ে বলেছে, এ ব্যাপারে নিপুণের বক্তব্য চাওয়া হবে। নিপুণ যদি বক্তব্য না দেন অথবা বক্তব্য দিলেও তা যদি সন্তোষজনক অর্থাৎ যৌক্তিক না হয় তাহলে তাকে শিল্পী সমিতি থেকে বহিষ্কার করা হবে। 

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়। এর আগের মেয়াদে সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে জায়েদ খানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন নিপুণ। সেবারও নির্বাচনে কারচুপি ও অর্থ দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ তুলেছিলেন নিপুণ। এবারের অভিযোগও অনেকটা একই রকম। গতবার নিপুণ আইনি লড়াইয়ে জিতেছিলেন। এবার কী হবে তা এখনই বলা যাবে না। তবে একটা কথা বলাই যায়, শিল্পীদের মধ্যে এই বিভেদ চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য মোটেই মঙ্গলজনক নয়। শিল্পীদের মধ্যে এই বিভেদ তুষের আগুনের মতো আমাদের চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎকে পোড়াবে। যখন টের পাব তখন হয়তো করার কিছুই থাকবে না। 

শুধু কি চলচ্চিত্রশিল্পীদের মধ্যেই এই বিভেদ? না, বিভেদ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন দেশের মঞ্চ আন্দোলনের প্রেরণাশক্তি। অথচ বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনেও অনৈক্য স্পষ্ট। অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগে ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কামাল বায়েজীদ সংগঠন থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। কামাল বায়েজীদ মানতে নারাজ তিনি দুর্নীতি করেছেন। তাই তিনি ফেডারেশনের কর্মকাণ্ড ও আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে আদালতে রিট করায় ফেডারেশনের ঐক্যে ফাটল ধরেছে। কার্যত মঞ্চকর্মীরাও এখন বিভক্ত। এখানেও তুষের আগুন জ্বলছে। 

টিভি নাটকের পরিচালকদের সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ড। এই সংগঠনেও বিভেদ স্পষ্ট। দুটি পক্ষ বিবাদে জড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটিকে নানা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বর্তমান সময়ে সংগঠনটির কার্যক্রম স্থবির। একটাই কারণ অনৈক্য। কেউ কারও কথা শুনতে নারাজ। নাট্যজন মামুনুর রশীদসহ টিভি নাটকের বর্ষীয়ান পরিচালকরা দুই পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতার পরিবেশ সৃষ্টির একাধিক উদ্যোগ নিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। 

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি, বাচসাস নামেই যার ব্যাপক পরিচিতি। বিনোদন সাংবাদিকদের এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটিও বিভেদের চোরাবালিতে নিমজ্জিত। দৃশ্যত যাদের পক্ষে সংগঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মীরা আছেন, তারা প্রতিপক্ষের অহেতুক প্রতিবন্ধকের কারণে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ভালো কাজ করতে পারছে না। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
 
একটি গানের লাইন মনে পড়ছে। যেভাবেই তুমি সকাল দেখো সূর্য কিন্তু একটাই। যত ভাগে ভাগ করো না প্রেম হৃদয় কিন্তু একটাই। কাজেই আমরা যে যাই ভাবি না কেন, দেশ কিন্তু একটাই- প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। প্রতিটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্দেশ্য হলো দেশের জন্য ভালো কিছু করা। কিন্তু বিভাজন থাকলে ভালো কিছু করা সম্ভব নয়। বিভাজন হলো তুষের আগুন। দেখা যায় না। অথচ ভেতরে ভেতরে পুড়িয়ে ফেলে। যখন টের পাওয়া যায় তখন হা-হুতাশ ছাড়া আর করার কিছু থাকে না। আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হই। ঐক্যই শক্তি। ঐক্যেই মুক্তি। শুভকামনা সবার জন্য। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও 
সম্পাদক, আনন্দ আলো 

সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট প্রণেতারা মানবিক হবেন

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৪, ১০:৫০ এএম
সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট প্রণেতারা মানবিক হবেন
ড. আতিউর রহমান

বাংলাদেশের  অর্থনীতি এখন বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতোভাবে জড়িত। কাজেই অর্থনীতিতে বিশ্বায়নের সমকালীন চাপ ও তাপের প্রভাব তো পড়বেই। এমনই এক জটিল প্রেক্ষাপটে আগামী মাসে আসন্ন ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব পেশ করা হবে জাতীয় সংসদে। নতুন সরকারের এটাই প্রথম বাজেট। সব মিলিয়েই একে ঘিরে মানুষের যথেষ্ট আগ্রহ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এই সময়টায় দারুণ সব চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে বাইরের এবং ভেতরের কারণগুলো যুগপৎ কাজ করছে। শুধু বিদেশিদের দায়ী না করে একই সঙ্গে আমাদের নিজস্ব সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোগত সমস্যাগুলোর উৎসও চিহ্নিত করার দরকার রয়েছে। 

সামষ্টিক অর্থনীতির রক্ষাকবচ কৃষি খাতে সরকারি বিনিয়োগ যেন বাধা না পড়ে এবং কৃষির উপকরণের ক্ষেত্রে দেওয়া ভর্তুকি সম্ভব হলে আরও বাড়ানোর জন্য বাজেটে যথাযথ বরাদ্দ বহাল রাখা একান্ত জরুরি। পাশাপাশি বাজেটে সংকোচনমুখিতা যেন রপ্তানিমুখী শিল্প, বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে, সেদিকগুলোতেও সদা জাগ্রত দৃষ্টি রাখা চাই। সর্বোপরি মূল্যস্ফীতির কারণে জনজীবন যে বেশ খানিকটা চাপের মুখে আছে, সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হচ্ছে বাজেট প্রণেতাদের। পরিসংখ্যান ব্যুরো দুই অঙ্কের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতির কথা বললেও বিআইডিএসের সর্বশেষ মাঠ জরিপের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারে। কাজেই মূল্যস্ফীতির এই চাপ থেকে জনগণকে, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর নিম্ন আয় শ্রেণির পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বাজেটে সামাজিক সুরক্ষা খাতের বরাদ্দ আরও বলশালী করা দরকার।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে সংকোচনমুখী বাজেট করার সময় তাই বাজেট প্রণেতাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রবাসমুখী শ্রমিকসহ সবার দক্ষতা ‍উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো খাতগুলোর প্রতি অবশ্যই বেশি করে সংবেদনশীল থাকতে হবে। দেড় দশক ধরেই আমাদের বাজেট প্রণেতারা গণমুখী বাজেট প্রণয়নে যে ধারাবাহিকতা দেখিয়ে চলেছেন, তাতে এ খাতগুলোর দিকে বাজেট প্রণেতারা যে সংবেদনশীল থাকবেন, তেমনটা আমরা আশা করতেই পারি। তবে এ কথাটাও মানতে হবে যে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং জনগণের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা কেবল বাজেট বা রাজস্ব নীতি দিয়ে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে মুদ্রানীতির ভূমিকাটাও অনস্বীকার্য। সে বিচারে আসছে অর্থবছরের বাজেট পেশের আগে রিজার্ভ ক্ষয়রোধ ও সামষ্টিক-অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে যে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি ছিল তার তৃতীয় কিস্তির ১১৫ কোটি টাকা স্বল্প সময়ের মধ্যেই ছাড় হওয়ার খবরটা নিশ্চয়ই ইতিবাচক। আইএমএফ প্রতিনিধিদলের হালের সফর শেষে জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারকে তারা নীতি সংস্কারের যে পরামর্শগুলো দিয়েছিল, তার বেশির ভাগই পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে দুই কিস্তিতে আইএমএফ ১০৬ কোটি ডলার ছাড় করেছে। আমরা আগেই বলেছি, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের যে প্রশংসনীয় ট্র্যাক রেকর্ড বাংলাদেশের রয়েছে, তার সুবাদে বাংলাদেশ আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের বিশেষ আস্থার জায়গাতেই রয়েছে। তাই জনস্বার্থের প্রতি সংবেদনশীল থেকে কাঠামোগত সংস্কারগুলো এগিয়ে নিতে পারলে আমাদের পক্ষে চলমান এই আর্থিক টানাপোড়েন কাটিয়ে ওঠা অসম্ভব হওয়ার কথা নয়। 

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার পুনরুদ্ধার করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সাহসী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে আইএমএফ। বাহ্যিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের জন্য একটি ক্রান্তিকালীন পদক্ষেপ হিসেবে বৃহত্তম বিনিময় হারে ক্রলিং পেগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হারের উদারীকরণের পর এবং বিনিময় হার সংস্কারের ফলে যেকোনো মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়ক হবে। মুদ্রানীতির কড়াকড়ির সহায়ক হওয়া উচিত রাজস্বভিত্তিক আর্থিক নীতি। যদি বাহ্যিক ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্র হয়, তাহলে আরও কঠোর নীতি করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে বলে মত দিয়েছে আইএমএফ। দীর্ঘকাল ধরেই অর্থনীতিবিদরা ব্যাংকের সুদের হার বেঁধে দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছিলেন। টাকা-ডলার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা দেরিই করে ফেলেছে। তবু দেরিতে হলেও এই নীতি সংস্কারের উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানাই। এসব সংস্কারের ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ কমার বদৌলতে মূল্যস্ফীতি বাগে আসতে শুরু করবে এবং ডলারের চাহিদা নিয়ন্ত্রণের সুবাদে রিজার্ভ ক্ষয়রোধ ঠেকানো সম্ভব হবে। এতে কিছু ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি হলেও এই ত্যাগ আমাদের স্বীকার করতেই হবে। তবে বছরখানেক আগে এই দুটি কাজ করা গেলে জনগণের ওপর এতটা চাপ হয়তো পড়ত না।

মুদ্রানীতিতে এই ব্যাপক সংস্কারের পরিপ্রেক্ষিতে রাজস্বনীতি তথা বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিশেষভাবে ভেবে দেখা দরকার। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, এর আগেই পেট্রোলিয়াম পণ্যের জন্য একটি সূত্রভিত্তিক জ্বালানি মূল্য সমন্বয়-প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর সঙ্গে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় টাকার অঙ্কে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। প্রথমত, সরকারি প্রকল্পের জন্য আমদানির ক্ষেত্রে আগে অল্প দামে, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক থেকে ডলার পাওয়া যাচ্ছিল। এখন এই আমদানি ব্যয় বেশ খানিকটা বেড়ে যাবে। ফলে বাজেটের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ দেওয়ার সময় তুলনামূলক কম দরকারি প্রকল্পে অনেকখানি কাটছাঁট আমাদের করতেই হবে। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি আমদানিকারকরা টাকার এই সর্বশেষ অবমূল্যায়নের আগে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে বেশি দামে আমদানি করছিলেন। কাজেই এখন নতুন বর্ধিত বিনিময় হারের প্রভাব তাদের আমদানি ব্যয়ে খুব বেশি প্রভাব পড়ার কথা নয়। তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা যেন এই সর্বশেষ অবমূল্যায়নের সুযোগ নিয়ে অযথা দাম বাড়িয়ে অনৈতিক অতি মুনাফা করতে না পারেন, সে জন্য বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে। বিশেষ করে কিছু বৃহৎ ভোগ্যপণ্য আমদানিকারকের কারসাজির দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমিশন ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরকে বেশি বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

ক্রমাগত ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়বেই। এ অবস্থায় জনগণকে বাড়তি দামের চাপ থেকে মুক্ত রাখতে আমদানি করের ক্ষেত্রে যথার্থ সংবেদনশীলতা দেখাতে হবে। আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে সব পণ্যে ঢালাওভাবে ছাড় দেওয়া যাবে না। তবে জরুরি নিত্যপণ্য (যেমন- ওষুধ ও মেডিকেলসামগ্রী), নবায়নযোগ্য শক্তিসংশ্লিষ্ট আমদানি, কৃষি-উপকরণ এবং বিপুল কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সঙ্গে জড়িত প্রকল্পের জন্য আমদানির ক্ষেত্রে দরকারমতো শুল্কছাড় দেওয়ার কথা বিবেচনা করা যায়। এ কথা সত্য যে, কর-জিডিপি হার কম হওয়ায় আমাদের বেশি বেশি কর আদায়ের চাপ রয়েছে। উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকে স্বনির্ভর করতে বেশি বেশি কর আহরণ জরুরিও বটে। করদাতা বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। কিছু নীতি সংস্কার এবং কর আদায়ে এআই টুলসহ ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে নিশ্চয়ই করের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব। তবে বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে গিয়ে পুরো অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাই যেন হুমকির মুখে পড়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখা চাই। 

সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর (এমএফআই) সার্ভিস চার্জের ওপর করারোপের বিষয় নিয়েও আলোচনা উঠছে। ব্যাংকের সুদের হারে উদারীকরণের এই সময়ে এমএফআইগুলো এমনিতেই ব্যাংক থেকে টাকা সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে আছে। এ অবস্থায় তাদের ওপর করের বোঝা চাপানো একেবারেই ঠিক হবে না। এমএফআইগুলোর ওপর করের বোঝা চাপালে তাদের করপোরেটগুলোর মতো নীতি গ্রহণে বাধ্য করা হবে। এতে সবচেয়ে ক্ষতি হবে প্রান্তিক মানুষের। কারণ এমএফআইগুলো শুধু আর্থিক সেবা দেয় না। তাদের কাজের বড় অংশজুড়ে থাকে আর্থসামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম। সার্ভিস চার্জ হিসেবে তারা যে টাকা পায়, তা দিয়ে পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করার পর বেঁচে যাওয়া অংশ বিনিয়োজিত হয় এসব উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে। করের চাপ পড়লে এমএফআইগুলো বাণিজ্যিক ঋণদানকারীতে পরিণত হবে এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হবে। তারাও তখন শুধু লাভজনক ব্যবসা খুঁজবে। এতে তারা যে তৃণমূলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবা এবং সেই সুবাদে বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ শিক্ষিত বেকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিচ্ছে, তা ব্যাহত হবে। তা ছাড়া এদের দেওয়া ঋণের প্রায় অর্ধেক যায় সরাসরি কৃষি খাতে। বাকিটা অকৃষি খাতে। অকৃষি খাতের উন্নতিও কৃষির অগ্রগতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই এদের ওপর করারোপ করলে দারিদ্র্য নিরসন ও খাদ্য নিরাপত্তা- দুই-ই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

বিদ্যমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাজেট প্রণেতারা রাজস্ব বাড়াতে নতুন নতুন উদ্যোগ নিলে তাকে স্বাগত জানাতেই হবে। তবে এ ক্ষেত্রে যারা কর দিচ্ছে, তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা কিংবা যে খাতগুলোর ওপর কর চাপালে আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন অভিযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেগুলোর ওপর নতুন করে করারোপ করার কৌশল নেওয়া ঠিক হবে না। তার চেয়ে বরং কর-জালটা যতটা সম্ভব বড় করার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। সর্বোপরি কর আহরণ-প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশনকে বেগবান করাটাও বিশেষভাবে কাম্য। আশা করি, বাজেট প্রণেতারা মূল্যস্ফীতির এই তপ্ত সময়ে যথেষ্ট সংবেদনশীলতা দেখিয়ে একটি বাস্তবানুগ বাজেট দেবেন। 

লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর