ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩১, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

ভারতের নির্বাচনি ফল দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১১:৩১ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৪, ১১:৩১ এএম
ভারতের নির্বাচনি ফল দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলবে না
মো. তৌহিদ হোসেন

সম্প্রতি ভারতের লোকসভা নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। নির্বাচনের আগে বিজেপি একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল যে, তারা ৪০০ আসন প্রত্যাশা করছে। ভারতীয় মিডিয়াও এর সঙ্গে অনেকটা সুর মিলিয়ে বলতে চেয়েছিল যে, বিজেপি নিশ্চয়ই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। বিজেপির আসন পাওয়ার বিষয়ে এরকমই একটা ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা অবধারিতভাবেই হয়নি। বিজেপি জোট পেয়েছে ২৯৩টি আসন। সরকার গঠনের জন্য বিজেপি এককভাবে ২৭২ আসনও পায়নি। তারা পেয়েছে ২৪০টি আসন। 

এ ক্ষেত্রে কিছু চমক নিশ্চয় ছিল বলা যায়। কংগ্রেস গত ১০ বছর ধরে খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল। বিরোধীদল হওয়ার জন্য ন্যূনতম যেটুকু প্রয়োজন সেটাও তাদের ছিল না। প্রকৃতপক্ষে বিরোধী দল বলে ১০ বছর ধরে ভারতীয় লোকসভায় কিছু ছিল না। সেদিক বিবেচনায় কংগ্রেস পুনরায় ফিরে এসেছে বলা যায়। কংগ্রেস জোট থেকে ২৩২টি আসনের মতো পেয়েছে। বিজেপির যেমন তার জোটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে কিন্তু মূল অংশটি বিজেপির পাওয়ার ছিল। কংগ্রেস অর্ধেকও পায়নি। যদিও আগের নির্বাচনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ আসন তারা পেয়েছে। 

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গতকাল ৯ জুন সন্ধ্যায় টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন নরেন্দ্র মোদি। নির্বাচনে কংগ্রেস জোট ২৩২টি আসন পেলেও এককভাবে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা মাত্র ৯৯টি।
অনেকেই এমনকি নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছিলেন ছিলেন, ৪০০ না হলেও ৩৫০ আসন পাচ্ছেন মোদি।  কিন্তু তাদের ধারণা ও উত্তেজনা সবই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ‘বিজেপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে এটা আমার কাছেও অতিপ্রত্যাশা বলে মনে হয়েছিল এবং এক প্রশ্নোত্তরে আমি সেটা বলেছিলাম।

বিজেপি যেহেতু একক সংখ্যাগড়িষ্ঠতা পায়নি অথবা বলা যায়, জোটসঙ্গীদের সমর্থন নিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করছে। ইতোমধ্যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। বলা বাহুল্য, বিজেপির আসনসংখ্যা ২৪০-এ নেমে আসা এবং কংগ্রেসের ৫২ থেকে ৯৯ আসনে উত্তরণ, সেই সঙ্গে ১০ বছর দোর্দণ্ড প্রতাপে এককভাবে ভারত শাসনের পর সরকার গঠনে মোদির জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়াকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরাজয় এবং উদারনৈতিকতার একপ্রকার বিজয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। 

লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে দুটি দিক পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রথমত, মোদি টানা তিনবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। অন্যদিকে লোকসভায় গত ১০ বছরব্যাপী বিজেপির এককভাবে আধিপত্যের অবসান হলো। অন্যদিকে ভারতীয় লোকসভায় একটি বাস্তব বিরোধী দল থাকছে, যাদের কণ্ঠস্বরও এখন থেকে শোনা যাবে। দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস দলের ভরাডুবি হলেও সেই অবস্থা থেকে তারা আবার মূলধারায় ফিরতে পেরেছে। 

গত দুটি লোকসভায় কোনো স্বীকৃত বিরোধী দল ছিল না। প্রয়োজনীয় ৫৫টি আসন লাভেও ব্যর্থ হয় কংগ্রেস। ৯৯টি আসন নিয়ে কংগ্রেস এবার স্বীকৃত বিরোধী দল হিসেবে স্বস্তিদায়ক অবস্থায় থাকবে। ভারতের গণতন্ত্রের ক্রান্তিলগ্নে দুটি বিষয়ই আশাব্যঞ্চক খবর। কিন্তু আরেকটু যদি গভীরে প্রবেশ করা হয় তাহলে দেখা যাবে, আঞ্চলিকভাবে হয়তো কিছু কিছু মেরুকরণ ঘটেছে, কিন্তু সর্বভারতীয় পর্যায়ে ২০১৯-এর তুলনায় বিজেপির ভোট কমেছে। 

সাধারণ মানুষের ক্ষমতাসীনদের ওপর অসন্তোষ, সে কারণেই হোক এমনকি আরেকটু বেশিও তফাৎ হতে পারত। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের মাঝে বিজেপির সার্বিক প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। লোকসভায় আসন লাভে যদিও ব্যাপক হ্রাস-বৃদ্ধি হয়েছে, জনসমর্থনে পরিবর্তন সে তুলনায় তেমন স্পষ্ট নয়। দুই দলই আগামী পাঁচ বছর পর ২০২৯-এর নির্বাচনের জন্য তাদের কার্যকৌশল নির্ধারণ করবে বলেই মনে হয়।

ভারতের এই নির্বাচনি ফল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে হয়। কারণ, দুই দেশের কোথাও নীতিগত পরিবর্তন হয়নি এবং উভয় দেশের নেতৃবৃন্দ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে পুনঃ পুনঃ সন্তোষ ব্যক্ত করে আসছেন। বাংলাদেশের চাওয়া-পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু ঘটবে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। যেহেতু বাংলাদেশের উদ্বেগের বিষয়গুলোর সমাধান না করেই ভারত তার স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে, কাজেই বিষয়গুলো খুব দ্রুত সমাধান হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই বলা যায়। 

তাছাড়া নিয়মমতো পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম ছাড়া শীর্ষ বৈঠকে বড় কোনো সিদ্ধান্ত সাধারণত হয় না। এমন কোনো দ্বিপক্ষীয় কার্যক্রম আমাদের চোখে পড়েনি। কিছুদিন আগে সংক্ষিপ্ত সফরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব যখন এসেছিলেন, তিনি দ্বিপক্ষীয় আলোচনা নয় বরং তিনি এসেছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে নিমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করতে, দুই দেশের বিষয়ভিত্তিক কোনো আলোচনা করতে নয়। 

প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরে হয়তো দুই দেশের সরকারেরই নতুন মেয়াদে প্রবেশ উপলক্ষে একটি সৌজন্য সফর হলেও যদি কোনো পাস্পরিক সমস্যা সমাধানে প্রকৃত অগ্রগতি হয়, যেমন তিস্তা বা সীমান্ত  হত্যা, বাংলাদেশের মানুষ তাকে সানন্দে স্বাগত জানাবে। আমার মনে হয় বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এমন কোনো বড় প্রভাব পড়বে না। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে মোদি এবং বিজেপির অবস্থান যেমন ছিল সেটা তারা ধরে রাখতে পারবে বলেই প্রতীয়মান হয়। 

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের কথা যদি বলি, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক বেশ ভালো অবস্থায় আছে। আমাদের পক্ষ থেকে হয়তো কিছু চাওয়া-পাওয়ার আছে। সেটাও পাওয়ার ব্যাপারে আমার মনে হয় না দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। সম্পর্ক যেরকম আছে কমবেশি সেরকমই থাকবে বলেই আমি মনে করি।

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব

শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫২ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫২ পিএম
শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক

আজিজ আর বেনজীর অপরাধমূলক কাজ করে গেছেন ক্রমাগতভাবে। এখন যেভাবে তদন্ত হচ্ছে সেখানে অনেক সত্য বের হয়ে আসছে। এখন পক্ষপাতমুক্ত অবস্থান থেকে বিষয়টার বিচার করা দরকার জাতীয় স্বার্থে। অপরাধীদের শাস্তি হওয়া দরকার।

এ ছাড়া দুর্নীতিপ্রবণ মানসিকতা যেন আর অন্যদের মধ্যে দেখা না দেয় সেরকম একটা ধারণা দিতে হবে। আমাদের দেশে অন্য দেশের তুলনায় দুর্নীতি, অনাচার অনেক বেশি। কিন্তু এর আগে সরকার এরকম অগ্রসর হয়নি। এবার অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ হয়েছে। 

এখন শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। পুরস্কার যে সরকার কী উদ্দেশ্যে দেয়? এই সরকার গত দশ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরস্কার প্রবর্তন করেছে। পুরস্কার বাবদ অর্থও দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে সঙ্গে রাখা হচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে পুরস্কার দিচ্ছে সেসব পুরস্কার সম্পর্কে বিভিন্ন সভা, সমাবেশে নানা কথা শুনি। সরকার যদি সঠিক নীতি দিয়ে পুরস্কার দেয় তাহলে ভালো হবে। দলীয় মনোভাব থেকে পুরস্কার দিলে তার ফল ভালো হয় না।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

নির্বাচন-প্রক্রিয়া সৎভাবে মানা হচ্ছে না

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৫০ পিএম
নির্বাচন-প্রক্রিয়া সৎভাবে মানা হচ্ছে না
সুলতানা কামাল

শুদ্ধাচার পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পরবর্তী সময়ে দুর্নীতিবাজ হিসেবে চিহ্নিত বা প্রমাণিত হওয়ার ঘটনাই সাক্ষ্য দেয় যে, এসব পুরস্কারের জন্য যে নির্বাচন-প্রক্রিয়া রয়েছে, সৎভাবে কিংবা নীতিনিষ্ঠভাবে তা মানা হচ্ছে না। যারা এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে রয়েছেন, হয় তারা নিজ স্বার্থে বা কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়ে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এটা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং গর্হিত একটি কাজ। 

রাষ্ট্রের এত সম্মানীয় পুরস্কার দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব ব্যক্তি নিশ্চয়ই সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারাই যখন এ ধরনের অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান, তখন বুঝতে হবে সমাজের নৈতিকতাবোধের কত অধঃপতন ঘটেছে এবং তাদের মাধ্যমে দুর্নীতি কতটা প্রশ্রয় লাভ করেছে। 

কাজেই  এসব পদক দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে ভাবলে চলবে না,  ক্ষমতার কাছাকাছি অবস্থান করা প্রভাবশালী, শক্তিধর ব্যক্তিদের নৈতিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ব্যতীত এ ধরনের স্খলনের কোনো সুরাহা হবে না। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও চেয়ারম্যান, টিআইবি

এটা এখন মূল্যহীন আনুষ্ঠানিকতা

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৮ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০১:৪৮ পিএম
এটা এখন মূল্যহীন আনুষ্ঠানিকতা
গোলাম রহমান

অশুদ্ধ কিছু আছে বলেই শুদ্ধাচারের কথা উঠেছে। দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে সেবা প্রদান নিয়ে পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকা উচিত নয়। এটা যদি ইন্টিগ্রিটির উপাদান বা মানদণ্ডের দিক বিবেচনায় হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক আছে। পুরস্কার পাওয়ার পর কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে, এটাই স্বাভাবিক। 

যাদের বিরুদ্ধে নৈতিক স্থলন, অসদাচরণ, অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ আছে তাদেরকে পুরস্কারের বিবেচনায় আনা ঠিক নয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচকদের নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। এতে পুরস্কার প্রদানকারী এবং পুরস্কার প্রদানের প্রক্রিয়া দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এমনটাই হচ্ছে। এখন এটা শুধু মূল্যহীন আনুষ্ঠানিকতা। 

সাবেক চেয়ারম্যান, দুর্নীতি দমন কমিশন
 

দেশের উপজেলা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চার নির্বাচন: বয়ান ও বিশ্লেষণ

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:৩২ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:৩২ এএম
দেশের উপজেলা ও বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ চার নির্বাচন: বয়ান ও বিশ্লেষণ
ড. তোফায়েল আহমেদ

২০২৪ সাল বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬০টি দেশের নির্বাচন বর্ষ। ইতোমধ্যে অনেক দেশে নির্বাচন হয়ে গেছে। সম্প্রতি শেষ নির্বাচন হলো বড় দেশ ভারতে। ভারতের ৯৭ কোটির বেশি ভোটারের সাত দফা নির্বাচনের পর ফলাফল ঘোষিত হলো। ৫৪৩ আসনের লোকসভায় বিজেপির (২৪০ আসন লাভ), একক নিয়ন্ত্রণ শিথিল এবং কংগ্রেসসহ বিরোধীরা অর্থাৎ ইন্ডিয়া জোটের বিজেপি-এএনডিএর মুখোমুখি অবস্থান। দক্ষিণ আফ্রিকায় জাতীয় পরিষদের ৪০০ আসন ও ৯টি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ২৯ মে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এবং প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, ৩০ বছর পর এএনসির একক প্রাধান্য থাকল না। 

জুলাই মাসের ৪ তারিখ যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচন ঘোষিত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে। চলতি বছর নভেম্বর ৫-এ অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের ৬০তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা, বিশ্লেষণ ও উত্তেজনার পারদ ধীরে ধীরে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। বাংলাদেশে উপজেলা পরিষদের নির্বাচন শেষ হলো। ভোটকেন্দ্রে ভোটার অনুপস্থিতি বরাবরের মতো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন নানাভাবে আলোচিত ও বিশ্লেষিত হচ্ছে।

বাইডেন ও ট্রাম্প একে অপরের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রধান দুই দলের প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্তই বলা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মামলায় শাস্তিমূলক রায় হলেও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে রিপাবলিকানরা তাতে প্রভাবিত হচ্ছে না। আপিলের সর্বশেষ রায় আসতে আসতে নির্বাচনি প্রক্রিয়া প্রায় সমাপ্ত হয়ে যেতে পারে, তবে এখন পর্যন্ত যে জনমত তা একে অপরের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলার মতো। কিছু বোদ্ধা বিশ্লেষকের অভিমত, শেষ পর্যন্ত কম মার্জিনে হলেও জো বাইডেন বেরিয়ে আসতে পারেন। 

ট্রাম্পের অপরাধ জগৎ, একগুঁয়েমি, গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থান, গর্ভপাতবিরোধী অবস্থানে অনেকের নানা অস্বস্তি জো বাইডেনকে ভোট দিতে বাধ্য (Relacted Voting) করতে পারে। আবার ইসরায়েলের গাজা অভিযান ও গণহত্যা, অভিবাসন ও আইনশৃঙ্খলা ইস্যুতে ট্রাম্প ও বাইডেন দুজনকেই অপছন্দের কারণে অনেকে ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। তৃতীয় প্রার্থী হিসেবে জন এফ কেনেডি জুনিয়র কোনো চমক দেখাতে পারেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে। কেনেডি এগিয়ে গেলে তা বাইডেনের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে এবং ট্রাম্প তাতে কিছু সুবিধা পেতেও পারেন।

বর্ণবাদোত্তর দক্ষিণ আফ্রিকায় এএনসির প্রথম হার

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ অবসানের প্রায় ৩০ বছর পরের এ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এবারে দীর্ঘদিন পর এএনসির প্রাধান্য ক্ষুণ্ন হলো। গত নির্বাচনে ৫৭.৫০ শতাংশ ভোট পেয়ে এএনসি ৪০০ আসনের জাতীয় পরিষদে ২৩০ আসন লাভ করেছিল। পরের তিনটি বড় দল যথাক্রমে ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স, ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইট ও ইনডিপেনডেন্ট ফ্রিডম পার্টি সর্বসাকল্যে ৩৪.৯৪ শতাংশ ভোট পেয়ে ৮৪+৪৪+১৪=১৪২ আসন পেয়েছিল। 

এবার নানা বিশ্লেষণে দেখানো হচ্ছে এএনসির ভোটে ধস নেমেছে। গত নির্বাচনে ছোট-বড় ১৪টি দল অংশ নেয়। এবার তাদের সবারই আঞ্চলিক ও জাতীয়ভাবে ভোট ও আসন বাড়তে পারে। এখানে একটি বিষয় জেনে রাখা দরকার, তা হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকায় আমাদের মতো সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (Majoritarian) পদ্ধতির নির্বাচন হয় না। দক্ষিণ আফ্রিকা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (Proportional Representation) নির্বাচন পদ্ধতি অনুসরণ করে। সেখানে জাতীয় পরিষদের ৪০০+৯০টি আসন ও ৯টি প্রদেশে একই সঙ্গে বদ্ধ তালিকার আনুপাতিক (Close-list PR) প্রতিনিধিত্বশীলতার নীতি অনুসৃত হয়। 

তাই প্রাপ্ত ভোটসংখ্যা ও হার এখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ভোট প্রাপ্তির হারের ভিত্তিতে আসনসংখ্যা নির্ণীত হবে। নির্বাচনের আগেই প্রার্থী তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা হয়ে যায়। নির্বাচনের পর প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী ওই তালিকা থেকে আসন বণ্টন হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন পদ্ধতি অত্যন্ত আধুনিক ও অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

ব্রিটেনে টোরিদের পতন কি অত্যাসন্ন!

যুক্তরাজ্যে ক্ষমতাসীন টোরি দল একটি টার্ম পার করতে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী বদলাতে হয়েছে। এটি দলের অভ্যন্তরে একটি বড় সংকটের ঈঙ্গিতবহ। তবে বরিস জনসনকে পদত্যাগে বাধ্য করে রক্ষণশীল দল তাদের নৈতিক অবস্থানে অটল থেকেছে। দীর্ঘদিন একনাগাড়ে ক্ষমতায় থাকা ব্রিটেনে ভোটারদের মধ্যে একধরনের ‘টোরি ক্লান্তি’ (Tory Fatigue) বোধ হয় তৈরি করেছে। 

শ্রমিক দল বেশ চাঙা, সঙ্গে লিবারেল ডেমোক্রেটও। টোরি দলের প্রায় ৭০ জন বর্তমান এমপি এবার ভোটে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এটি টোরিদের জন্য একটি অশনিসংকেত। পরাজয় আঁচ করতে পেরেই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সাধারণভাবে মানুষ ধরে নেবে। তা ছাড়া সম্প্রতি সমাপ্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে টোরি দলকে ‘হোয়াইট ওয়াশ’ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫-৬ সপ্তাহের বিশ্লেষণে অনেক নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে। এ প্রশ্নটি ঘুরেফিরে আসছে- টোরিদের পতন কি অত্যাসন্ন?

ভারতের নির্বাচনে পিলে চমকানো ফলাফল!

ভারতের নির্বাচনের ফলাফলের নানা জরিপকে ভুল প্রমাণ করেছে সর্বশেষ প্রাপ্ত ফলাফল। পাঁচটি সংস্থার আটটি জরিপের ফলাফল বিশ্লেষণ করে মোদির এনডিএ জোটকে ৫২-৪২ শতাংশ ভোট ও ৪১১-৩৭৩ আসন প্রাপ্তির একটি সম্ভাব্য ফলাফল দেখানো হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ইন্ডিয়া জোটের ১৫৫-১০৫ আসন জয়ের ইঙ্গিত ছিল। এসব ভোট-পূর্ব জরিপ ও বুথফেরত জরিপ সঠিক হয়নি। ভারতের গণতন্ত্র ও নির্বাচনের সৌন্দর্যের একটি প্রকাশ হচ্ছে, সে দেশের অত্যন্ত মেধাবী, প্রতিশ্রুতিশীল ও পেশাদার একাডেমিক ও গবেষকদের মনোগ্রাহী নির্বাচন বিশ্লেষণ এবং কিছু মেধাবী, অধ্যয়নশীল, অভিজ্ঞ ও ক্ষুরধার সাংবাদিকের তীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ। ভারতের নির্বাচন বিশ্লেষকদের মধ্যে দুজনকে আমি এখন অনুসরণ করার চেষ্টা করি। 

একজন প্রশান্ত কিশোর, অপরজন যোগেন্দ্র যাদব। প্রথমজন পেশাদার সেফোলজিস্ট এবং দ্বিতীয়জন গবেষক, একাডেমিক ও রাজনীতিবিদ। প্রশান্ত কিশোরের সর্বশেষ বিশ্লেষণে এনডিএ জোট ও মোদি কিছু আসন হারিয়েও ৩১০-এর কাছাকাছি যাবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। তিনি রাজ্যওয়ারি লাভ-লোকসান হিসাব করে তা দেখিয়েছেন। বিপরীত দিকে যোগেন্দ্র যাদব মহাশয়ও রাজ্যভিত্তিক একটি হিসাব কষেন, যা তার ভাষায় খুব রক্ষণশীল হিসাব। তাতে ষষ্ঠ ধাপ শেষে সর্বভারতীয় ফলাফলে এনডিএ ২৪৮, অর্থাৎ ২৫০-এর কম আসনে এগিয়ে আছে। সপ্তম ধাপে তা পূরণ হয়ে ২৭২-এ যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। 

বাস্তবে হয়েছেও তাই, বিজেপি এককভাবে ২৪০ অতিক্রম করতে পারেনি। তিনি উত্তর প্রদেশ, বিহার, কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ আরও কিছু রাজ্যে বিজেপির হার ও ইন্ডিয়া জোটের বেশ কিছু অর্জন দেখছেন। তিনি সারা ভারত ঘুরেছেন এবং প্রতিটি রাজ্যের একটি সাধারণ বিশ্লেষণ আবার ঝুঁকিপূর্ণ বা দোদুল্যমান আসনগুলোর নানা গতিধারা বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি নিজে ষষ্ঠ দফায় হরিয়ানায় ভোট দিয়েছেন। সেখানে তিনি ইন্ডিয়া জোটের ৩-৪টি অর্জন দেখতে পান। একইভাবে দিল্লিতেও কংগ্রেস-আম আদমির চারটি অর্জন দেখেছেন, যা অবশ্য সঠিক হয়নি। বিহারে তেজস্বী যাদবের রুপালি রেখা ও উত্তর প্রদেশে অখিলেশ-রাহুলের ‘গাটবন্ধন’ ভালো ফল দেবে বলে তার স্থির অনুমান ছিল, তা বহুলাংশে সফল হয়েছে। বাংলায়ও অবস্থা আশাতিরিক্ত ভালো হয়েছে। 

জোট সঙ্গীদের নিয়ে ‘ঐশ্বরিকভাবে আবির্ভূত বা জন্ম নেওয়া’ মোদি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসবেন। তবে এবারের আসন রাজাসন হওয়ার নয়। এবার তিনি হবেন সমঝোতার প্রধানমন্ত্রী। বিহারের নীতিশ কুমার ও অন্ধ্রের চন্দ্রবাবু নাইডু কিং মেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তাদের নানা চাওয়া-পাওয়া আছে। তা কতটুকু মেটানো হয় বা মেটে তা দেখার বিষয়। 

ভারতীয় কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের আশঙ্কা এ ‘ম্যারেজ অব কনভেনিয়ান্স’ ও এর মধুচন্দ্রিমা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ মোদি সিংহাসনে বসেই তার দলের আসন ২৭২-এর কাছে নিয়ে যাওয়ার নানা ছলচাতুরীতে লেগে যাবেন এবং এই দুই শরিককে নানাভাবে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করবেন। এখন এই দুই শরিকের মোদির সঙ্গে থাকাটা ভারতীয় প্রেক্ষিত থেকে একধরনের ‘মজবুরি’। ছয় মাস পর কিছু উথাল-পাতাল শুরু হতে পারে। 

মোদি মহাশয় নির্বাচনে ফলাফলের পর সংসদীয় দলের সভা না করেই তড়িঘড়ি করে হিন্দি প্রবাদের ‘ঝট করে মাগনি, ফট করে বিয়ে’র মতো জোটসঙ্গীদের দস্তখত সংগ্রহ করে নিলেন। কারণ বিজেপি দলের অভ্যন্তরে নিথিন গটকরিসহ কিছু নেতার অসন্তোষ আছে, তা দলীয় সভায় ওঠার সম্ভাবনা ছিল। তিনি জোটসঙ্গীদের সমর্থনের ওপর ভর করে বিজেপি সংসদীয় দলের আনুষ্ঠানিকতা শেষ না করেই সব জল্পনা-কল্পনার ওপর এক কলস জল ঢেলে দিলেন। এখন জোটসঙ্গীদের নিয়ে সহজে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হলেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বের জোট আপাতত বিরোধী দলে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার আছে। বাংলাদেশে অনেক নির্বাচন পর্যবেক্ষক ব্যক্তি ও সংস্থা আছে, কিন্তু সত্যিকারের কোনো সেফোলজিস্ট এখানে গড়ে ওঠেনি। এখানে বিশ্লেষণের অবকাশ সীমিত। কিছু বয়ান-বর্ণনা থাকে। কিছু বিরোধিতা, কিছু প্রশস্তি এবং অনেক অনেক পিঠ চুলকানি। আমাদের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সব ধাপ পেরিয়ে এখন শেষ। 

ফলাফলে ঘুরেফিরে চারটি বিষয়। এক. প্রার্থীর সম্পদ ও পেশা, দুই. সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে আত্মীয়তা, তিন. অপরাধ ও সন্ত্রাস এবং চার. ভোটে মানুষের অংশগ্রহণ খুবই কম। প্রায়ই ফোনে রিপোর্টারা প্রশ্ন করেন, স্যার অংশগ্রহণ এত কম কেন? আমি পাল্টা প্রশ্ন করি, আপনি কী জানেন না? আমতা আমতা করে বলেন, ‘জানি স্যার, তবু যদি একটু বলতেন’! ‘যা জানেন, তা দলিল-প্রমাণসহ লেখেন’। সাংবাদিক নিরুত্তর। এখানে কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা নেই। নেই গভীর একডেমিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। আমরা বাংলাদেশে সব দিক দিয়ে একটি বন্ধ্যা সময় অতিক্রম করছি।

লেখক: শিক্ষক ও স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ
[email protected]

মানব পাচার ও দুষ্ট শ্রমবাজার চক্র: ব্যবস্থা নেবে কে?

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:২৭ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ১১:২৭ এএম
মানব পাচার ও দুষ্ট শ্রমবাজার চক্র: ব্যবস্থা নেবে কে?
ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

সাধারণত জোরপূর্বক শ্রম, যৌন দাসত্ব অথবা পাচারকৃত মানুষের ব্যবসায়িক যৌন শোষণমূলক কাজে নিয়োজিত করার জন্য সংঘটিত অবৈধ মানব-বাণিজ্যকে মানব পাচার বলা হয়। মানব পাচার একটি দেশের অভ্যন্তরে বা এক দেশ থেকে অন্য দেশে সংঘটিত হতে পারে। তবে মানব পাচার যেখানে এবং যেভাবেই সংঘটিত হোক না কেন, তা বড় ধরনের অপরাধ। মানব পাচার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সংঘটিত এমন একটি অপরাধ, যা মানুষের মুক্ত চলাচলের অধিকারকে হরণ করে। 

মানব পাচার আইন ২০১২ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অধিকার হরণ করে জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়, দাসত্বমূলক আচরণ, পতিতাবৃত্তি বা যৌন শোষণ বা নিপীড়নের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে শোষণ বা নিপীড়ন করা হলে মানব পাচার হিসেবে গণ্য হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, শিশুশ্রমিক, সংখ্যালঘু এবং বেআইনি অভিবাসীরা প্রচণ্ডভাবে শোষিত হওয়ার সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছে। আর আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী, মানব পাচার হচ্ছে মানুষের অধিকারের লঙ্ঘন। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, মানব পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। দেশ থেকে মানব পাচারের ঘটনা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অভাবের তাড়নায় বা অর্থনৈতিক সংকট দূর করতে বা উন্নত জীবনের আশায় বাংলাদেশ থেকে নারী-পুরুষ ও শিশু মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাচারের শিকার হচ্ছেন। উন্নত জীবন আর ভালো চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পাচার করার পর শেষ পর্যন্ত তাদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হচ্ছে। অর্থলোভী, অসৎ লোক এবং দালালদের খপ্পরে পড়ে এভাবে অনেক মানুষের জীবন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। 

বাস্তবতা হচ্ছে, মানব পাচারসংক্রান্ত ঘটনায় অনেক মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত এসব মামলার তদন্ত এবং বিচার সেভাবে এগোয় না। গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালে দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পর থেকে গত বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মানব পাচারসংক্রান্ত প্রায় ৬ হাজার মামলা দায়ের করা হয়। 

এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় ৯ হাজার ৬৯২ জনকে। ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এসব মামলায় সাজা হয়েছে মাত্র ৫৪ জনের। আর মানব পাচারসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির হারই খুব কম, যা দুঃখজনক। মূলত পাচারের শিকার অধিকাংশ পরিবারই ভোগান্তি ও সমস্যার মধ্য দিয়ে দিন যাপন করে এবং মানব পাচারকারী ও দালালরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিনেমার দাদা ভাইয়ের মতো পর্দার আড়ালে বা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।

ফলে মানব পাচার বন্ধ হয় না, বন্ধ হচ্ছে না। আবার মানব পাচারসংক্রান্ত মামলার তদন্তে ঘাটতি থাকায় অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায়। মানবাধিকারকর্মীরা প্রায়ই অভিযোগ করে বলেন, দেশে আইনের শাসন থাকলে এত মানুষ পাচারের শিকার হতো না। মানব পাচারকারীরা অনেককেই টাকার ভাগ দেন। আর এটা বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার প্রয়োজন। 

ইতোপূর্বে দেশে মানব পাচারবিষয়ক কোনো সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মানব পাচারসংক্রান্ত অপরাধের বিচার করা নিষ্পত্তি করা হতো। সর্বশেষ ২০১২ সালে দেশে ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২’ নামক আইন প্রণয়ন করা হয়। 

এ আইনের ৬ ধারায় মানব পাচার নিষিদ্ধ করে এর জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। আইনটির ৭ ধারায় সংঘবদ্ধ মানব পাচার অপরাধের দণ্ড মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। 

এই আইনের অধীনে কৃত অপরাধগুলো কগনিজেবল বা আমলযোগ্য অপরাধ এবং আপস ও জামিনের অযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন হওয়ার পরের আট বছরে এ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ৫ হাজার ৭১৬টি এবং ওই সময়ের মধ্যে মাত্র ২৪৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়। অর্থাৎ মামলা নিষ্পত্তির হার মাত্র ৪ শতাংশ। 

দ্বিতীয়ত, অতি সম্প্রতি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মীদের পাঠানো নিয়ে সৃষ্ট পরিস্থিতি ও শেষ সময়ে কর্মীদের যেতে না পারার বিষয়টি দেশের সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। খবরে প্রকাশ, গত মে মাসের শেষ ১০ দিনে প্রায় ৩০ হাজার মালয়েশিয়াগামী যাত্রীর কাছ থেকে বিমানের টিকিটের কথা বলে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া ভিসা ও ছাড়পত্র পেয়েও যথাসময়ে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। 

এ জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান ও জড়িত ব্যক্তিরা কোনোভাবেই এই দায় এড়াতে পারে না। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্বাগ্রে মালোয়েশিয়ার ভিসাপ্রাপ্ত শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর ব্যাপারে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার পক্ষ থেকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দেশে যেন শ্রমবাজার নিয়ে দুষ্টচক্র এ ধরনের নৈরাজ্যকর ও জঘন্য পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়টিও সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সুনিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
[email protected]