দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। বাজারে যে কয়টি শেয়ার ও ইউনিটের দর বেড়েছে, তার চেয়ে প্রায় ১০ গুণ সংখ্যকের দরপতন হয়েছে। বড় এ দরপতনে মূল্যসূচক দিনের ব্যবধানে ১ শতাংশ বা তার বেশি কমেছে। লেনদেনের পরিমাণও দিনের ব্যবধানে কিছুটা কমেছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে দীর্ঘ বছর ধরেই বাজারে একটি অস্থিরতা দেখা যায়। তবে এবারের অস্থিরতা আগের সময়কার তুলনায় কিছুটা বেশিই পরিলক্ষিত হচ্ছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে অনেকটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কোনো কোনো দল দাবি করছে, নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার। এ অনিশ্চয়তার প্রভাব পুঁজিবাজারেও আসছে। এ ছাড়া সম্প্রতি মার্জিন ঋণ নিয়ে প্রকাশিত গেজেটের একটি নেতিবাচক প্রভাব বাজারে আসছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। কাজেই নির্বাচিত অনিশ্চয়তার একটি প্রভাব পুঁজিবাজারে দেখা যাচ্ছে। অতীতে হওয়া জাতীয় নির্বাচনের আগেও এমন প্রভাব দেখা গেছে। এর সঙ্গে মার্জিন বিধিমালার গেজেট নিয়েও অনেক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। যদিও মার্জিন ঋণের বিষয়গুলো অনেক আগে থেকেই বাজারে জানান দেওয়া হয়েছে। এটির নেতিবাচক প্রভাব এখন পুঁজিবাজারে আসার কথা নয়।
উল্লেখ্য, মার্জিন ঋণ বিধিমালায় পুরোনোদের জন্য সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নতুন যারা মার্জিন ঋণ নেবে তাদের জন্য কিছু শর্তারোপ করা হয়েছে। এখানে পুরোনোদের ঋণ সমন্বয় করে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেওয়া হবে। মূলত বাজারের পতনে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তার বিষয়টি বেশি নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না থাকার কারণে, বাজারে নতুন করে বিনিয়োগও আসছে না, আর বাজারও তার নিজস্ব গতি ফিরে পাচ্ছে না।
শেয়ারবাজারে যদি পুনর্বিনিয়োগ করা সম্ভব হয় তাহলে শেয়ারবাজারে পয়েন্ট অনেক বেশি বাড়বে। বর্তমানে শেয়ারবাজারে তারল্যসংকট দেখা দিয়েছে। মুদ্রা পাচার বন্ধ হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার বাড়তির দিকে আছে। আমাদের আমদানি বাড়ছে। গত মাসেও আমাদের আমদানি বেড়েছে। এখন সুদের হারও কমে যাবে। আমরা আশা করছি, সুদের হার আরও কমে আসবে। বিদেশে সুদের হার কমছে। যুক্তরাষ্ট্রে কমছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নেও কমছে। বাংলাদেশে শুধু মূল্যস্ফীতি কমানোটা সম্ভব নয়। এটা প্রমাণিত হয়েছে বারবার। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোয় ক্ষতি হয়েছে। এখন তুলনামূলক রেমিট্যান্স বাড়ছে, ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। রেমিট্যান্স এখন পুরোটাই বাংলাদেশে আসছে। পুঁজিবাদকে পুনর্গঠিত করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে টাকা দিতে হবে। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে শেয়ারবাজারের সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করার বা ভালো শেয়ারের প্রাপ্তির ব্যাপারে কাজ করছে। যে যে রিপোর্ট দেবে তা আমাদের পলিসি মেকারদের জন্য একটা সহায়ক প্রমাণপত্র হিসেবে কাজ করবে। শেয়ারবাজারের সমস্যাগুলো সম্পর্কে এখন সরকারি উচ্চ মহল অবহিত আছে। শেয়ারবাজার বাইরের কিছু না- এটা আমাদের অর্থনীতিবিদদের একটা অংশ এবং অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকারি শেয়ারগুলো বেচা সরকারের অগ্রাধিকারে আছে। বিদেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা- সেটাও আছে। কীভাবে তা করা যায় সে বিষয়ে আমরা সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করেছি। বিদেশি ভালো কোম্পানি আমাদের তালিকায় নিয়ে আসতে হবে।
আবার, সোনার দাম বাড়ার কারণে বাজার খারাপ অবস্থায় চলছে। ৫০ শতাংশ ব্যবসা কমে গেছে। কারণ দেশের অর্থনীতির যে অবস্থা, মানুষ আয়ের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। প্রধানত, দাম বাড়ার দুটি কারণ। প্রথম কারণ হচ্ছে, আমেরিকার অর্থনৈতিক অবস্থা নিম্নগতি। এর কারণ সহজে বিনিয়োগ করতে ডলারকে বাদ দিয়ে গোল্ডে বা সোনায় ঝুঁকছেন মানুষ। দ্বিতীয়ত হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের পরিবর্তে সোনা রিজার্ভ রাখছে। এ জন্য সোনা কেনার পরিমাণ বেড়ে গেছে। অনেকেই ব্যাংকে টাকা আমানত রাখার পরিবর্তে সোনা কেনা বেশি নিরাপদ মনে করছেন। এ জন্য সোনার দিকে ঝুঁকছেন মানুষ। যাদেরই টাকা রয়েছে দাম বেশি হলেও সোনায় বিনিয়োগ করছেন। যাদেরই অতিরিক্ত টাকা রয়েছে তারা এই পথেই আসছেন। সাজসজ্জার বাইরে ভবিষ্যৎ নিশ্চয়তার জন্যই বিনিয়োগ করছেন। কারণ ব্যাংকে আমানত রাখলে বছর শেষে কিছু লাভ পাওয়া যায়। স্বাধীনতার পর থেকেই সোনার দাম ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ডলারের দাম উত্থান-পতনের পর একটা স্থিতিশীল অবস্থায় এসে গেছে। দেশে সোনার প্রকৃত বৈধ উৎস হচ্ছে সনাতনি সোনা। সেগুলো রিসাইক্লিং করেই বিভিন্ন ধরনের স্বর্ণালংকার তৈরি করে বাজারে গ্রাহকের চাহিদা মেটানো হয়। দেশে সোনা চোরাচালান অবশ্যই বন্ধ করা সম্ভব। সরকারের কড়াকড়ির কারণে আগের তুলনায় সোনার চোরাচালান অনেক কমেছে। সংশ্লিষ্টদের নজরদারি আরও বাড়ানো হলে এটা বন্ধ করা সম্ভব হবে।
সোনা চোরাচালান বন্ধ করার জন্য অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর অবস্থানে আনতে হবে। এমন নীতি আরোপ করতে হবে যাতে সোনা চোরাচালানে মানুষ নিরুৎসাহী হয়। ‘ব্যাগেজ রুলস’ কঠোর করা, সোনার বার আনা বন্ধ করা এবং সোনা চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা ও তা কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত ও ধরতে দেশব্যাপী চিরনি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাসপোর্ট স্ক্যান করে যাত্রীর তথ্য সংরক্ষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে চোরাচালান-প্রবণ যাত্রীদের ঘন ঘন বিদেশ যাতায়াত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ব্যাংকের মাধ্যমে সোনা কেনাবেচার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং উচ্চ শুল্কের কারণে অবৈধ পথে সোনা আনার প্রবণতা কমানোর জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে সোনা আমদানি বাড়ানোর জন্য অবশ্যই শুল্কর পরিমাণ কমাতে হবে। এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে যাতে ব্যাগেজে এবং চোরাই পথে সোনা না আসে। আমদানি করা সোনায় যেন দেশের বাজারে একমাত্র সোনা হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। এসব করণে কর আহরণ কম হচ্ছে। ব্যাংকে তারল্যসংকট যেটা আছে, সেটা সহজ হবে। ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলো তারল্যসংকট থেকে অনেকটা মুক্তি পাবে। তখন এমনিতেই বিনিয়োগ বাড়বে। বর্তমানের অবস্থা পর্যালোচনা করলে এটাই হচ্ছে বাস্তব চিত্র। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ সরবরাহ করছে। টিসিপি পণ্য আরও বেশি বেশি লোকের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সেদিকে এখন আমাদের খেয়াল করতে হবে। গরিব, নিম্ন-মধ্যবিত্তের মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পৌঁছে দিতে হবে। মূল কথা হলো, আমাদের সরবরাহ বাড়াতে হবে। তার জন্য উৎপাদন বাড়াতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে গেলে, সুদের হার কমাতে হবে। ব্যবসায়ীদের কথা শুনতে হবে। সব ব্যবসায়ী খারাপ নয়, দোসর নয়। কিছু ভালো ব্যবসায়ীও আছেন। সরকারের উচিত ব্যবসায়ীদের কথা শোনা।
সর্বত্র বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে। তবে আমরা যদি বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারি আমরা সহযোগিতা পাব। তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। সেটাই হচ্ছে আসল কথা। বাংলাদেশের দেড় কোটি মানুষ বিদেশে আছেন। তারা আমাদের অমূল্য সম্পদ। তারা যে অর্থ আমাদের পাঠান, সেটা আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে এবং তা আরও ভালো হবে। তার পরও আমরা যখন বলি, রিজার্ভ বাড়ছে না কেন? আমার কথা, আগের যে ঋণ নেওয়া ছিল অর্থাৎ বকেয়া ছিল সেগুলো এখন পরিশোধ করা হচ্ছে, এটাই মূল কারণ! মনে রাখতে হবে, একটি স্থিতিশীল অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আমাদের আরও অনেক বেশি বেগ পেতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান আইসিবি
.jpg)
.jpg)
.jpg)