ছোটবেলায় শুনেছিলাম- ‘পড়াশোনা করে যে, গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সে’। এ বাক্যের পক্ষে-বিপক্ষে নানান কথা থাকতেই পারে কিন্তু বাক্যের মূলে লুকিয়ে আছে একটি চমৎকার দর্শন, তা হলো তুমি ছোটবেলা থেকে অর্জন শুরু করো, সেই অর্জন তোমাকে মানসিক হিমালয়ে উঠিয়ে দেবে। মানে তুমি ছোটবেলা থেকেই শিখতে শুরু করলে, ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ও আলোকিত জীবন পাবে। এখন আসি এর একটু বিশ্লেষণে- সেটি হলো, এই পড়াশোনা বা বিদ্যাশিক্ষা কি শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমেই অর্জন করা যায়? না, এই বিদ্যাশিক্ষার এলাকা বিশাল, যেমন- জগৎ, প্রকৃতি, মানুষ, জীবন, সমাজ, গণিত, বিজ্ঞান, মানবিক অধ্যায়, শিল্প-সাহিত্য-সংগীত ইত্যাদি বহু বহু বিষয়েই করা যায়। এখান থেকে শেষ বিষয়টি অর্থাৎ সংগীত নিয়ে একটু কথা বলতে চাই।
প্রথমেই সংগীত কী- একটু তুলে ধরি: আমার নিজের উপলব্ধি থেকে বলি- সাধারণভাবে সংগীত হলো, কথা বা বাণী, সুর ও বাদ্যের সমন্বিত উপস্থাপনা, যা কানে প্রবেশ করলে আমাদের মনকে আকুলিত করে, ব্যাকুলিত করে, মনের ভেতরে আলোড়ন তৈরি করে, মস্তিষ্ককে স্পর্শ করে, স্পন্দন দেয়, নিয়ে যায় এক অজানা আনন্দের সোপানে। কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর একটি কবিতায় আছে- ‘যে কবিতা শুনতে জানে না/ সে আজন্ম ক্রীতদাস থেকে যাবে/ আমি উচ্চারিত সত্যের মতো স্বপ্নের কথা বলছি’। অর্থাৎ সাধারণ করে বললে, কবিতাকে ধারণ না করলে, বংশ পরম্পরায় দাসত্বই বরণ করে নিতে হবে অর্থাৎ জীবনে বৈচিত্র্য আসবে না, ধনাঢ্য হওয়া যাবে না অর্থাৎ পরের বাক্যের মতো স্বপ্নের সত্য উচ্চারিত হবে না অর্থাৎ একঘেয়েমি জীবন আপনাকে ঘিরে থাকবে। প্রতিদিনের সূর্যকে আপনার একটি একই রকম মনে হবে। প্রতি ঋতুকে আপনার একটিই ঋতু মনে হবে। কলার প্রকারভেদ বোঝা থেকে আপনি দূরে থাকবেন? আশ্চর্য না!
একটাই জীবন অথচ জীবন সুন্দর- এ কথা রবীন্দ্রনাথ উপলব্ধি থেকেই নিশ্চয়ই বলেছেন, সুন্দর ভুবনের কথা। তা হলে, সেই সুন্দরের পেছনে আমরা কজন ছুটি? সবাই হয়তো নয়, কেউ কেউ। যুক্তি তো সবক্ষেত্রেই আছে- বলেতে পারি কর্মব্যস্ততা, নুন আনতে পান্তা ফুরায়, অসভ্য থেকে সভ্য হওয়ার প্রযুক্তি জীবন- ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা। কথা তো থাকবেই, যুক্তি তো থাকবেই, তবু? তবু আপনাকে খুঁজতে হবে পাতার মর্মর, ছুটতে হবে নদীর দিকে, দেখতে অন্ধ সন্ধ্যায় জোনাকির আলো, সবুজ বৃক্ষের নীরব শুয়ে থাকা- আর তা পথে যেতে যেতেই বা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখার ফাঁকে যদি চান, তা হলেই আপনি বুঝবেন- সংগীতের অনুরণন। বলতে পারেন, সংগীত কি আসলেই অনুরণন তৈরি করতে পারে? হ্যাঁ পারে। না পারলে, দেশে দেশে, ভাষায় ভাষায় এই ক্ষেত্রটি বা জগৎটির নির্মাণ হতো না এবং এই নির্মাণ হয়েছে মানুষেরই প্রয়োজনে। আমাদের জিজ্ঞাসা হতেই পারে- সংগীতের শুরু কেন হলো? আমি যতটা বুঝি- মানুষের ভেতরটা বহুমুখীন, বহু দরোজার ফাঁক দিয়ে তারা দেখতে চায়, দূরের আকাশ, অনুভব করতে চায় অজানা শব্দের আচরণ, ভাসতে চায় সুরের অবগাহনে। সেই অবগাহন কখনো একা করতে চায়, কখনো দলগতভাবে, কখনো নিঃসঙ্গ সময়ে, কখনো উত্তাল সময়ে। যেমন- আপনি যখন শুনবেন- ‘ওকি গাড়ি আল ভাই...’ তখন আপনি এক রকম অনুভূতিতে জেগে উঠবেন, যখন শুনবেন- ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি সেই আগের মতোই আছ...’ তখন এক রকম অনুভূতি হবে, যখন শুনবেন- ‘কারার ঐ লৌহ কপাট...’ কিংবা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল রক্ত লাল...’ তখন এক রকম অনুভূতি হবে, যখন শুনবেন- ‘ভালোবেসে সখি, নিভৃত যতনে...’ অথবা শুনবেন- ‘মিলন হবে কত দিনে/ আমার মনের মানুষের সনে...’, অথবা ‘হরি দিন যে গেল সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে...’ তখন হৃদয়ে অনুভূত হবে অন্যরকম অনুভূতি। এই যে অনুভূতির স্পন্দনের কথা বললাম, তা কি আমাদের প্রয়োজন আছে অথবা এই অনুভূতি কি আমাদের কোথাও নিয়ে যায়, জীবনানন্দের ভাষায়: (‘আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন’) আমাদের কিছুটা হলেও শান্তি দেয়? দেয় বৈকি। আসুন তা নিয়ে একটু কথা বলি।
বাঙালি সংগীতপ্রিয় জাতি। এ জাতির মানুষ জন্মলগ্নেই সুরের মূর্ছনায় আপ্লুত হয়েছে। জন্মের পরই চোখ মেলে দেখেছে কুলো কুলো বয়ে যাওয়া অসংখ্য নদী, গায়ে লেগেছে ষড়ঋতুর বহু রকমের ঝিরিঝিরি বাতাস, সবুজ অবারিত মাঠ, দূরের নীলাকাশ, সরু ধুলিমাখা পথ, ফুল-পাখির সরব উচ্চারণ অর্থাৎ প্রাকৃতিকভাবেই আবেগের এক অনন্য ভূমিতে জাতি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে নিজেদের। সেই যে বাংলার মাঠে-ঘাটে, বনে-বাদাড়ে, হাট-বাজারে পরবর্তীতে মঞ্চে-বেতারে-টেলিভিশনে বাংলার বাউল, মারফতি, মুর্শিদি, ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, জারি-সারি, বাঁশির সুর, পল্লিগীতি, দেশাত্মবোধক, লালন-রবীন্দ্র-নজরুল, আধুনিক, ব্যান্ডসংগীতসহ সব রকমের গান ছড়িয়ে গেল। বাংলার এসব নানা রকম গান এ দেশে তো বটেই, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও মর্যাদা পেয়েছে। তবে গান বা সংগীতে এমন মন্ত্র বা জাদু থাকে- পৃথিবীর যে কোনো দেশের হোক, যে কোনো ভাষার হোক, তা প্রতিটি মানুষকেই ছুঁয়ে যায়, যদি তিনি সংগীত ভালোবাসেন। এখানে অবশ্যই হতে হবে- শুদ্ধ সংগীত।
এখন বলতে চাই- সংগীত বা গান আমাদের কেন, কীভাবে এবং কখন ভালো লাগে বা স্পর্শ করে? সংগীত কি আসলেই ওষুধের মতো মনকে সুস্থ্য রাখতে কাজ করে? দূর করে নিঃসঙ্গতাকে? প্রাণকে জাগায়? কেন সংগীত আমাদের ভালো লাগে? প্রথমতঃ এর উত্তরে আমরা বলতে পারি, প্রতিটি মানুষের জীবন যন্ত্রের মতো, চব্বিশ ঘণ্টা একটানা চলে, এই চলার পথে ক্লান্তি থাকে, মানসিক যন্ত্রণা থাকে, কাজ থাকে, কষ্টও থাকে- যদি বলি এসব থেকে কিছুটা সময় বিরতি বা অন্য অর্থে বিনোদন চায়, তখনই প্রয়োজন হয় সংগীত, বইপড়া, নৃত্য, নাটক, সিনেমা ইত্যাদি নানা মাধ্যমে নিজেকে অবগাহন করে ক্লান্তি দূর করা, বৃহত্তর অর্থে আনন্দ আহরণ করা। আপনার হয়তো সব সময়ই গান শুনতে বা গাইতে ভালো লাগবে না। কিন্তু কোনো কোনো সময় আপনার পছন্দের গান আপনাকে মনের খোরাক জোগাবেই। দ্বিতীয়ত, আপনি কীভাবে ও কখন গান শুনবেন? উত্তর- যখন আপনার শুনতে ইচ্ছে করবে, তখনই। আপনার মন খারাপ থাকলে গান অবশ্যই শুনবেন, গান আপনার যন্ত্রণা ও মানসিক কষ্টকে দূর করবেই।
আমরা সবাই বুঝি, ভিন্ন ভিন্ন গান ভিন্ন ভিন্ন ইমেজ তৈরি করে, সে বিষয়ে অন্য একদিন বলব। এখন একটু এই লেখার শুরুর দিকে ফিরে যাই। আমাদের মনে রাখতে হবে- সংগীতের উর্বর এই দেশে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মানবিক ও মানসিকভাবে সুন্দর জীবন দিতে হলে- শুদ্ধ সংগীতচর্চা ও সংগীত শুনতে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কারণ জাতি গঠনে সংগীতেরও বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আরও মনে রাখতে হবে- সংগীতের সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়ে যেন বিরোধ না বাঁধে? আমরা যেন শিক্ষালয়েই এর চর্চা অব্যাহত রাখি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সম্প্রতি ছোটদের শিক্ষালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার জন্য শিক্ষক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে! তাহলে? তাহলে ভাবুন, উদ্বিগ্ন হয়ে জাতির কলা চর্চা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আপনার দাবি নিয়ে এগিয়ে আসুন। মনে রাখুন- সংগীত আত্মাকে শুদ্ধ করে, সংগীত নিঃসঙ্গতাকে দূর করে, সংগীত জাতির পরিচয়কেও বহন করে।
লেখক: কবি
[email protected]
.jpg)
.jpg)
