প্রতিনিয়ত খাদ্যপণ্যে দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়, তবে মহামারি আকার ধারণ করবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি জাতীয় সংকট হয়ে দাঁড়াবে। দেশের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, আমাদের খাবারে ভারী ধাতু, কীটনাশক ও জীবনাশকের অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা এবং জৈবদূষক- এই চার ধরনের দূষকের উপস্থিতি লক্ষণীয়। অধিকাংশ জনগণ মনে করে না যে ভেজাল খাবার বা খাদ্যদূষণ একটি অপরাধ। সেসব মানুষের এই বিবেক টুকু নেই যে, দূষিত বা ভেজাল খাদ্য নীরবে জনগণকে হত্যা করছে।…
খাদ্য আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহের প্রধান উৎস। প্রতিদিন আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তা আমাদের শরীরে ভেঙে গিয়ে শক্তি, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদানে রূপান্তরিত হয়। এই উপাদানগুলো আমাদের শরীরের বৃদ্ধি, মেরামত এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। দেশের খাদ্যপণ্যে দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি প্রতিনিয়ত খাদ্যদূষণ বাড়াচ্ছে। ফলে আমাদের সন্তান, বাবা-মা, ভাই বোন আপনজন সবাই ভুক্তভোগী। নিজেদের স্বার্থেই আমাদের সবাইকে একসঙ্গে এই সংকট মোকাবিলায় কাজ করতে হবে। দেশে খাদ্যপণ্যে দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির চিত্র ভয়ংকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণা অনুযায়ী, খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত তিন ভাগের এক ভাগ শিশু মারা যাচ্ছে। শুধু খাদ্যবাহিত রোগে প্রতি বছর বিশ্বে ৬০ কোটি এবং বাংলাদেশে ৩ কোটি শিশু আক্রান্ত হয়। খাবারে চার ধরনের দূষণ থাকতে পারে। ভারী ধাতু, কীটনাশক-জীবনাশকের অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা ও জৈবদূষক। অন্যদিকে, হাঁস-মুরগির খামারগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ প্রয়োগ হয়। মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হলে তা ৭ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত থেকে যায়। ২৮ দিন পার হওয়ার আগেই মুরগিকে বাজারজাত করা হলে সেই মুরগির মাংসের মাধ্যমে মানবদেহে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকতে পারে।
দেহের জন্য অত্যাবশ্যক পুষ্টি উপাদান হলো- শর্করা (কার্বোহাইড্রেট), প্রোটিন (আমিষ), ফ্যাট (লিপিড), ভিটামিন, খনিজ এবং পানি। এগুলো বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে পাওয়া যায়। খাদ্য গ্রহণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি, যেখানে গণমাধ্যম জনসচেতনতা তৈরি করতে পারে। সঠিক ও পরিমিত খাদ্য শরীরকে শক্তি দেয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সাহায্য করে এবং সুস্থ জীবনযাপনে সহায়ক। বিশ্বে অপুষ্টি, খাদ্য অভাব ও অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েই চলেছে, বিশেষ করে শিশু ও নারীদের মধ্যে।
এদিকে অপুষ্টি হলো পর্যাপ্ত ও সঠিক পুষ্টি গ্রহণে ব্যর্থতা, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমায়, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত করে এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করে। শিশুদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে, অতিরিক্ত পুষ্টি ও ওজনাধিক্য উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই সঠিক খাদ্য গ্রহণ ও পুষ্টি জ্ঞান শরীরের সুস্থতা, মানসিক বিকাশ এবং কর্মক্ষমতার জন্য অপরিহার্য।
বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে খাদ্য সমস্যা শীর্ষে রয়েছে। দেশের ৩৬ জেলা ও রোহিঙ্গাশিবিরের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শেষ আট মাসে খাদ্যসংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ মানুষের, যাদের মধ্যে ১৬ লাখ শিশু চরম অপুষ্টির মুখে পড়তে পারে। যদিও দুর্ভিক্ষের ধাপ-৫ দেখা যায়নি, খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। মূল কারণ হলো জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, খাদ্য আমদানি কমে যাওয়া, রোহিঙ্গাদের চাহিদা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা। সমস্যার সমাধানে দরকার জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, সমন্বিত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য অপচয় রোধ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য আমরা আমদানি করছি প্রতি বছর। এর মধ্যে আছে চাল, গম, ভুট্টাসহ অন্যান্য পণ্য। এ ছাড়া বৃদ্ধি পাচ্ছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এটি দূর করতে হলে কৃষিপণ্যের উৎপাদন আরও দ্রুত বাড়াতে হবে। বাংলাদেশে চাষাধীন জমির পরিমাণ কম। মোট এক কোটি ৮৬ লাখ একর বা ৭৫ লাখ ৪২ হাজার হেক্টর। জনপ্রতি প্রাপ্যতা মাত্র ১১ শতক। দ্রুত এর পরিমাণ কমছে। সেই সঙ্গে বিতরণব্যবস্থার উন্নতি সাধন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ অনেক। তাই ভবিষ্যতে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য কৃষিজমি অন্য খাতে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করতে হবে। অন্যদিকে কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরেকটি বাধা হলো আবাদযোগ্য পতিত জমির আধিক্য।
খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির এই তথ্য কারও জন্যই স্বস্তিদায়ক নয়। সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি উদ্যোক্তা সবাইকেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টি কমাতে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্ব নিতে হবে। দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে ভাটা, মূল্যস্ফীতির চাপ- সব মিলিয়ে নাগরিকদের বিশাল একটি অংশকে কায়দা করেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক মন্দা, জলবায়ু বিপর্যয়, তহবিলের ঘাটতি, খাদ্যবৈচিত্র্যের অভাব- এই কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে ধরনের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা দরকার, নীতিনির্ধারণী জায়গায় তার বিস্তার ঘাটতি দেখা যায়। খাদ্য শুধু ক্ষুধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পূর্ণ পুষ্টি আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খাদ্যের অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশে যদি প্রতিনিয়ত খাদ্যপণ্যে দূষণ ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যায়, তবে মহামারি আকার ধারণ করবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি জাতীয় সংকট হয়ে দাঁড়াবে। দেশের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সূত্রমতে, আমাদের খাবারে ভারী ধাতু, কীটনাশক ও জীবনাশকের অবশিষ্টাংশ, তেজস্ক্রিয়তা এবং জৈবদূষক- এই চার ধরনের দূষকের উপস্থিতি লক্ষণীয়। সম্প্রতি ৮১৪টি নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় সিসা বা সিসা ক্রোমেট পাওয়া গিয়েছে। এসব ক্ষতিকারক উপাদান মানবদেহে প্রবেশ করিয়া মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি, হাড় ও দাঁতে জমা হয়। ফলে শিশুদের হাড় নরম হওয়ায় তা সরাসরি মস্তিষ্কে চলে যায়। এতে ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। মূলত খাদ্যদূষণ শুরু হয় খাবারের কাঁচামাল তৈরি থেকেই। কৃষকের চাষাবাদের সময় রাসায়নিক দ্রব্য মিশানো থেকেই এই দূষণের সূত্রপাত হয়। এরপর সেই কাঁচামাল সংরক্ষণ করার জন্য রাসায়নিক দ্রব্য মিশিয়ে বাজারজাত করা হয়। অতঃপর হোটেলগুলো যখন খাবার তৈরি করে, তখন তৃতীয় স্তরের খাদ্যদূষণ হয় ও মানুষ শ্রী খাদ্যগুলো কিনে থাকেন। অধিকাংশ জনগণ মনে করে না যে ভেজাল খাবার বা খাদ্যদূষণ একটি অপরাধ। সেসব মানুষের এই বিবেক টুকু নেই যে, দূষিত বা ভেজাল খাদ্য নীরবে জনগণকে হত্যা করছে।
অন্যদিকে বর্তমানে প্রতিনিয়ত শহরের অলিগলিতে বেড়ে উঠছে রাস্তার ধারের রেস্টুরেন্ট বা খাবারের দোকান। স্বল্প দামে খাবার খেতে ভিড়ও জমছে অনেক। এ ছাড়া ফুটপাতে তৈরি অস্বাস্থ্যকর খাবারের রেস্তোরাঁগুলো খাদ্য সুরক্ষা ও গুণমান নিয়ে উদ্বেগের কারণ। এই ধরনের রেস্তোরাঁগুলো প্রায়শই স্বাস্থ্যবিধি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মান বজায় রাখতে পারে না, ফলে খাবার দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে। মুখরোচক খাবার বলতেই মাথায় আসে ‘স্ট্রিট ফুড,’ যা সাধারণত রাস্তার পাশে তৈরি, বিক্রি ও খাওয়া হয়। নগরের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ (নারী ৬০ শতাংশ এবং পুরুষ ৪০ শতাংশ) দিনে অন্তত একবার স্ট্রিট ফুড খেয়ে থাকেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ৯০ শতাংশ স্ট্রিট ফুডই অনিরাপদ। ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে প্রতি বছর ৩ লাখ লোক ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় এবং ৫০ হাজার লোক ডায়াবেটিসে এবং আরও ২ লাখ লোক কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত হয়। ঢাকার ৯০ শতাংশ স্ট্রিট ফুড বা রাস্তার খাবারই অনিরাপদ। এসব খাবারে ই-কোলাই ও সালমোনেলার মতো মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া যায়। আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এই সংকট মোকাবিলায় কেবল সরকারের ভূমিকাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা অপরিহার্য। উৎপাদন পর্যায়ে কৃষকদের কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার, খামারিদের ওষুধ প্রয়োগের বিধিনিষেধ মানা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে নৈতিকতা বজায় রাখা আবশ্যক। সরবরাহ ও বাজারজাত করিবার সময় সরকারি সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি ও দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা আবশ্যক।
লেখক: কলাম লেখক ও সাবেক রেজিস্ট্রার, জাবিপ্রবি



