যুক্তরাষ্ট্র একটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। সব সময় তারা নিজের স্বার্থটাই দেখে চলে। তারা পৃথিবীব্যাপী লুটতরাজকারী একটি দেশ হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্পের আমলে কিছুটা হলেও নতুন করে তেল উত্তোলন শুরু করার চেষ্টা করেছে, যা অন্যান্য সরকার পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছিল। মোট কথা, তারা নিজেদের তেলের ব্যবহার না করে অন্যের তেল লুট করতে পারলে খুশি হয়। একই সঙ্গে যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা পূর্ববর্তী অন্যান্য দেশের সম্পদ তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারছে ততক্ষণ পর্যন্ত ঠিক আছে।...

যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে এসেছে, সেটাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করে ব্যাপারটিকে হালকা করার কোনো উপায় নেই। এ ধরনের অপরাধ সব রকমের আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র বলেই তারা এ কাজ করতে পেরেছে। কারণ অন্য কোনো দেশ এ কাজ করবে না। নিঃসন্দেহে এ ধরনের কাজ একেবারেই অনুচিত এবং অনভিপ্রেত।
যুক্তরাষ্ট্র এর আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাদের সব সময়ই একটা অন্য রকম নজর থাকে। এর আগে পানামার প্রেসিডেন্টকে ধরে নিয়ে এসেছিল। এখন ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে ব্যস্ত হচ্ছে। এখানে মূল কারণটা কী, সেটা নিয়ে অনেকেই অনেকভাবে মতামত দিতে পারেন। আসল কথা হলো, লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা সবচেয়ে তেলসমৃদ্ধ দেশ। আমেরিকা সব সময় ভেনেজুয়েলাসহ সব দেশকে নিজেদের আওতায় এবং নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। তাই এই অঞ্চলের কোনো দেশেই মার্কিনবিরোধী সরকার টিকে থাকতে পারে না। এখনো আমরা তেমনি একটা ঘটনা ঘটতে দেখছি। এরপর তারা সম্ভবত কলম্বিয়ার দিকে হাত বাড়াবে। আইনকানুন ও রীতিনীতির প্রতি তাদের কোনো রকম শ্রদ্ধাভক্তি নেই। অন্য কেউ কিছু করলে তাদের খুব আইন দেখাতে পারে। নিজেদের বেলায় আইন মানার কোনো বালাই তাদের নেই। এটাই হলো যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারী আগ্রাসী আচরণ। যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের আগ্রাসী আচরণের অত্যন্ত জোরালো নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। যদিও কিছু কিছু দেশ কঠোর ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নিন্দা করেছে। কিন্তু অনেকেই আছেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না ভেবে চুপচাপ রয়েছেন। যদিও আমি নিশ্চিত কেউ ব্যাপারটিকে আসলে পছন্দ করছেন না।
সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে যত বলা যায় ততই কম বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্র একটি ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। সব সময় তারা নিজের স্বার্থটাই দেখে চলে। তারা পৃথিবীব্যাপী লুটতরাজকারী একটি দেশ হিসেবে পরিচিত। ট্রাম্পের আমলে কিছুটা হলেও নতুন করে তেল উত্তোলন শুরু করার চেষ্টা করেছে, যা অন্যান্য সরকার পুরোপুরি বন্ধ করে রেখেছিল। মোট কথা, তারা নিজেদের তেলের ব্যবহার না করে অন্যের তেল লুট করতে পারলে খুশি হয়। একই সঙ্গে যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা পূর্ববর্তী অন্যান্য দেশের সম্পদ তাদের নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারছে ততক্ষণ পর্যন্ত ঠিক আছে। আর যতক্ষণ তাদের স্বার্থে লাগবে না, তখন তারা সেটাকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করে।
যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করেনি। কিন্তু তারা অনেক দিন ধরে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং ইতোমধ্যেই জাহাজে আক্রমণ করে তেলবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে বা দখল করেছে। সবশেষে তাদের প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে ধরে নিয়ে গেছে। এগুলো একমাত্র নাটক সিনেমাতেই হয়।
এ ধরনের ন্যায়নীতিহীন বিবেকবিবর্জিত কাজগুলো করে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তারা ধাক্কা খেয়েছে। আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, আফগানিস্তান থেকে তারা পালিয়ে চলে এসেছিল। আফগানিস্তানে গণ্ডগোল লাগানোর পেছনে তারা দায়ী ছিল। তারা যুদ্ধ লাগায়, কিন্তু যুদ্ধের ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে চলে আসে। কোরিয়ান যুদ্ধের পর থেকে যদি আমরা হিসাব করা শুরু করি, তারা অসংখ্য যুদ্ধ বাধিয়েছে অথবা অন্যদের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এ ধরনের যুদ্ধে জয়ের উদাহরণ ইতিহাসে খুবই কম। যেখানেই গণ্ডগোল শুরু হয় সেখানেই তারা যুক্ত হয়। সেখানে তারা সমস্যা আরও জটিল করে মার খেয়ে চলে আসে। এর আগে তারা ভিয়েতনামেও সমস্যা করেছিল। সেই ভিয়েতনাম থেকে তারা পালিয়ে আসার পরে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন হামলা এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটকের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জঘন্যতম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনে চরম নিন্দনীয় অপরাধ। তারা পৃথিবীব্যাপী এই জোর খাটিয়ে বেড়ায়। কিন্তু তাদের সত্যিকারের জোর অনেক কমে এসেছে। কারণ আসল জোর হচ্ছে অর্থনৈতিক জোর। সেটা এখন আর আমেরিকার সেভাবে নেই। কিন্তু তারপরও তারা এগুলো করে বেড়াচ্ছে। কারণ, তাদের অস্ত্রের জোর আছে। সেটা তারা দেখিয়ে বেড়ায়। হুমকি দেয়। ভয় দেখায়! তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডের পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য থাকে। তা হলো অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামের বাণিজ্য বিস্তার করা।
যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। কিন্তু আমরা দেখে এসেছি যে, যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই বিভিন্ন দুর্বল রাষ্ট্রের প্রতি একটা প্রভুত্ব বিস্তারের মনোভাব নিয়ে কাজ করে। এটা তাদের কূটনৈতিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবীর সব দেশ পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে সৌহার্দ্যমূলক আচরণ করবে, সে ব্যাপারে আন্তর্জাতিক আইনকানুন ও রীতিনীতি আছে। একটা সময় ছিল বাধ্য না হলেও আরেকটি দেশের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধে জড়াতে বাধ্য করা হতো। এখন সেদিন চলে গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আচরণে আবার বর্বর যুগে ফেরত যাওয়ার একটা আলামত দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনকানুন ও রীতিনীতির তোয়াক্কা করে না। কিন্তু এ ধরনের আচরণের ফলে তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে এবং তাদের নাগরিকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সেটাও তারা বুঝতে চাইছে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে। তাদের অন্যের ওপর কর্তৃত্ব চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাটা বাড়ছে, বরং উল্টোটা হওয়া উচিত ছিল। যেসব দেশে তারা এ ধরনের হস্তক্ষেপ করছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ সব দেশ যদি মিলেমিশে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে যদি কাজ করত, তাহলে পৃথিবীটা বসবাসের জন্য আরেকটু ভালো জায়গা হতো মনে হয়। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইতিবাচক ও গঠনশীল পদ্ধতির বিপরীতে গেছে। ভেনেজুয়েলার প্রতি তারা যে অন্যায় ও কর্তৃত্বমূলক আচরণ দেখিয়েছে, তা নীতিবিবর্জিত, বেআইনি এবং এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সমর্থনের সুযোগ নেই।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত
.jpg)
.jpg)
