এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন ব্রুনাই দারুসসালামে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি অ্যাভিয়েশন এবং অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানিত বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত আছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর তিনি নিয়মিত সেমিনার, সিমপোজিয়াম এবং লেখালেখিতে অংশগ্রহণ করে থাকেন। তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহ-সম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হতে পারে এবং বিএনপির প্রত্যাশা কী?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হবে, তা নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রত্যাশা এবং দৃঢ়তার ওপর। যেহেতু আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না, সেহেতু নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে জড়িত সরকারি প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটা নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। বড় দল হিসেবে বিএনপির প্রত্যাশাও তাই হওয়া উচিত। গত নির্বাচনগুলোতে জনগণ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেনি। বাংলাদেশে ভোটের মানবিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি চালু করতে পারাটা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা সব রাজনৈতিক দলের জাতীয় অঙ্গীকার হওয়া অনস্বীকার্য। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা শুধু নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বান্তকরণে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করা উচিত।
খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। এ বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে আসিফ মাহমুদ এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ে কাজ করার আলোকে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তিনি তার ভালো দিকগুলো নিরপেক্ষভাবে কাজে লাগিয়ে দলের নির্বাচনি প্রচেষ্টাকে সঠিক পথে পরিচালনায় অবদান রাখবেন বলে আশা করা যায়। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার সবারই আছে। জুলাই-আগস্ট ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় তাদের একটা মুখ্য ভূমিকা ছিল। সেই আন্দোলনে জনগণের রাজনৈতিক মূলনীতি এবং দার্শনিক আদর্শকে ধারণ করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাটাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য।
খবরের কাগজ: নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেমন মনে হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কি না?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: নির্বাচনে প্রত্যেকটি দলই যে সমানভাবে শক্তিশালী হবে তা আশা করাটা ভুল। এটা কোনো রাষ্ট্রেই সম্ভব নয়। এ কারণেই নির্বাচনে কোনো একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে জয়ী হয় এবং অন্য দলগুলো বিজিত বলে গণ্য হয়। তবে যে জিনিসটি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নির্বাচন নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং প্রতিযোগিতামূলক হচ্ছে কি না তার প্রতি নজর দেওয়া। এবারের নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হবে বলে সাধারণ জনগণ প্রত্যাশা করছে। প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশন এ পর্যন্ত কোনো একটি দল দ্বারা যে প্রভাবিত হয়নি, তা নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণাকেই ইঙ্গিত করে। নির্বাচনের সময় মাঠে সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্ব পালন, দৃঢ় এবং সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার মধ্যদিয়ে প্রতিপালিত হলে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডকে আরও শক্তিশালী করবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
খবরের কাগজ: গণভোটের চারটি প্রশ্ন- একটি উত্তর, জনগণের কতটা সাড়া মিলবে?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: গণভোটের সঙ্গে জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর আন্দোলনের একটা নৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সে আন্দোলন ছিল কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। এ ব্যবস্থার পতনের বিরুদ্ধে জনগণের শক্ত অবস্থান না থাকলে গত সরকার তথা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হতো না। গণভোটের চারটি প্রশ্নের দার্শনিক প্রতিফলন কিন্তু একটি উত্তরের মধ্যদিয়ে জাতীয় ঐক্যবদ্ধতার স্বার্থকে সংহত করবে। অতএব, জনগণ যদি জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর চেতনাকে মনেপ্রাণে ধারণ করে তাহলে এ গণভোটের প্রতি তাদের সমর্থন অবশ্যই পাওয়া যাবে।
খবরের কাগজ: বিগত ১৫ বছর বিরোধী দলের ওপর হামলা-মামলা, জুলুম-নির্যাতন হয়েছে, আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিরোধী দলমতের প্রতি আচরণ কেমন হবে?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: বিএনপি গত ১৫ বছর সরকারি দলের নির্যাতনের কারণে পালিয়ে বেড়িয়েছে। তাদের বহু কর্মী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভয়ে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতে ভয় পেত। এই দুর্বিষহ যন্ত্রণা তাদের মূল্যবান জীবনের দীর্ঘকাল ধ্বংস করে দিয়েছে। অবশেষে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্যদিয়ে তারা জীবনে বেঁচে থাকার যে নতুন আলো ফিরে পেল, আশা করা যায় দল হিসেবে বিগত সরকারের আচরণকে অবশ্যই শিক্ষণীয় মনে করে নির্যাতনের পথকে পরিহার করবে। তা না হলে, ‘ইতিহাস স্বয়ং পুনরাবৃত্তি ঘটায়’ বলে যে কথা রয়েছে সেটা বিএনপির ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে ঘটবে না, তার দৃষ্টান্ত অস্বীকার করা যায় না।
খবরের কাগজ: এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন হতে যাচ্ছে, রাজনীতির এ নতুন ধারাকে কীভাবে দেখছেন?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: আওয়ামী লীগের পতনের জন্য দলটির নেতৃত্ব দায়ী। ক্ষমতা দখলের পর কর্তৃত্ববাদী রূপ ধারণ করাটাই তার মূল কারণ। তা না হলে, নির্বাচন থেকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত অন্তর্বর্তী সরকার অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনে গ্রহণ করতে পারত না। আওয়ামী লীগের অনেক নিরপেক্ষ সমর্থক আছেন, তারা এ নির্বাচনে ভোট দেবেন বলে আশা করা যায়। সেই ক্ষেত্রে তারা যোগ্য এবং সৎ প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার একটা সুযোগ পাবেন বলে ধারণা করা যেতে পারে।
খবরের কাগজ: আওয়ামী লীগের মিত্র শরিক জাতীয় পার্টিসহ অন্য দলগুলোর ক্লিন ইমেজের নেতাদের নির্বাচন করার ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: জাতীয় রাজনীতিতে ক্লিন ইমেজের নেতাদের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ক্লিন ইমেজের প্রার্থীরা রাজনীতিতে প্রবেশ করলে ভবিষ্যতে রাজনীতির একটি সুশীল সংস্কৃতির পরিবেশ সৃষ্টির সামাজিক ক্ষেত্রটি জনগণ নিজেই তৈরি করে ফেলে। এই দিকটা বিবেচনা করলে জাতীয় পার্টিসহ অন্য দলগুলোর সৎ, নিষ্ঠাবান এবং দায়িত্বশীল নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাটাকে পজিটিভভাবে দেখার মধ্যে কোনো ত্রুটি নেই।
খবরের কাগজ: বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী এবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী- বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: ২০০১-২০০৬ সালে জামায়াতে ইসলামী বিএনপির মিত্র ছিল এবং বিএনপির মন্ত্রিপরিষদে তাদের দুজন মন্ত্রী সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবং জাতীয় পার্টির পতনের পর, জামায়াতে ইসলামীই একমাত্র দল যে নাকি বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাচ্ছে। তবে জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গেলে মনে রাখতে হবে যে, এটা জামায়াতের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ। যদি জামায়াত সম্মানজনক আসনে জয়ী হয়ে সংসদে না থাকতে পারে, তবে ভবিষ্যতে তাদের জনপ্রিয়তা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেতে পারে। অতএব, নির্বাচনি প্রচারণা এবং জনসংযোগের কৌশল প্রণয়নে এমনভাবে যত্নশীল হতে হবে যাতে তাদের রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় বয়ান মানুষের সামাজিক আকাঙ্ক্ষার বিপরীতমুখী না হয়।
খবরের কাগজ: ৫ আগস্টের পর ইসলামপন্থিদের হঠাৎ উত্থান কেন হয়েছে?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: ৫ আগস্টের পর ইসলামপন্থিদের হঠাৎ উত্থান হয়েছে- এ বক্তব্যটি সঠিক নয়। বাংলাদেশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। এ দেশের মানুষ সব সময় ধর্মভীরু ছিল এবং আছে। ধর্মের মানবিক দিকটিই সমাজে স্ত্রী-পুরুষনির্বিশেষে প্রভাব ফেলেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারেনি। আমাদের বুদ্ধিজীবী মহলে যে নেরেটিভ সৃষ্টি করা হয়, তা ইসলামের আদর্শের প্রচারকে ইসলামপন্থিদের উত্থানের সমকক্ষ হিসেবে দেখানোর ব্যর্থ চেষ্টায় রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, সেখানে হয়তোবা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, কিন্তু এ ব্যাপারটি সাময়িক, তাতে সন্দেহ নেই।
খবরের কাগজ: আগামী দিনে নেতা-কর্মীদের কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে বিএনপি? কারণ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত কিছু কর্মকাণ্ডে বিএনপি বিতর্কের মুখে পড়েছিল।
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর বিএনপির হাই কমান্ডের নেতারাই দিতে পারবেন। বিএনপি সংসদে যদি ভালো ও যোগ্য প্রার্থীদের বসাতে পারে, তবে অধস্তন নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে বলে আশা করা যায়। তাদের নিজেদের দলের ভেতরে গণতন্ত্র অনুশীলনের সংস্কৃতি অনুসরণ করলে দলে শৃঙ্খলা এবং আইনের শাসন ফিরিয়ে আনা অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়।
খবরের কাগজ: শরিকরা এবার ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না, ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলবে?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হওয়া প্রয়োজন। সাধারণ মানুষ যোগ্য এবং সৎ প্রার্থীকেই জয়ী দেখতে চায়।
খবরের কাগজ: আসন্ন নির্বাচনে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে কি না?
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: যেকোনো নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ থাকাটা স্বাভাবিক। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো প্রশাসন নিরপেক্ষ কি না? দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো জনসাধারণ নির্ভয়ে তাদের ভোট দিতে পারছে কি না? তৃতীয় চ্যালেঞ্জ নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো ভোট কেন্দ্রে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিজেদের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করতে পারে কি না? চতুর্থ চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রার্থীরা প্রতিপক্ষের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব বজায় রাখেন কি না? আসন্ন নির্বাচনে সম্মিলিতভাবে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনসাধারণ তথা সমগ্র জাতিকে এই মূল চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর দৃষ্টি রাখতে হবে।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।


