কর্মসংস্থানের কোনো ক্ষেত্র তৈরি হলো না বরং অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ এবং লাখ লাখ মানুষ বেকার হলো। এর মধ্যে মব সন্ত্রাস মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলল। এসব সন্ত্রাসে মানুষের জীবনহানিসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঐতিহ্য ধ্বংস করা হলো। সরকার শুধু নির্বিকার নয় অনেক ক্ষেত্রে সরকারের প্রশ্রয়ের বিষয়টিও মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তাই আজ প্রধান কাজ হলো সব মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনের গ্যারান্টি নিশ্চিত করা।...

আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। এরপর নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। আগামী দিনে যারা দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিচালকের আসনে বসবেন।
অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের নির্বাচন এবং আগামী দিনের সরকার নানা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সবার জানা আছে যে একটা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিছু বিতর্ক থাকলেও এটি গ্রহণযোগ্য ছিল। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪-এ গ্রহণযোগ্য কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং এ সময় দেশের মানুষ নির্বাচনে নতুন ধরনের কারসাজি দেখেছে। এ সময় পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। তারপরও ক্ষমতাসীনর নানাভাবে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চেয়ে, হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পারেনি। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এদের বিদায় নিতে হয়েছিল। এর মধ্য দিয়ে জনগণের মনে বিরাট আশার সঞ্চয় হয়েছিল। বিশেষত তরুণ সমাজ এই আন্দোলনে জীবন দিয়ে অংশ নিয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শ্রমজীবী মানুষ। আর রাজনৈতিক দলগুলো তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইও একই মোহনায় মিলিয়েছিল। তাই গণ-অভ্যুত্থান উত্তর দেশে নানা মানুষের নানা প্রত্যাশা থাকলেও অন্তত শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাটাই প্রধান ছিল। এ ছাড়া এ সময় নানা অংশের মানুষের নানা উদ্যোগ থাকলেও শেষ বেলায় নির্বাচনটাই প্রধান হয়ে উঠেছিল। অন্যতম আকাঙ্ক্ষা হয়েছিল পরিবর্তনের। এ সময় ক্ষমতার নানা ক্ষেত্রে উগ্র দক্ষিণপন্থিদের দাপট দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি দাপটে বিরাজ করছিল। মব সন্ত্রাস জনজীবনকে শুধু অস্থির করেই তোলেনি জনমনে এই অভ্যুত্থান নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি করেছিল। অভ্যুত্থানে উগ্র দক্ষিণপন্থি অপশক্তির অবস্থান, দেশি-বিদেশি অন্যান্য অপশক্তি তাদের স্বার্থে অভ্যুত্থানকে ব্যবহার করার অপচেষ্টাও চালিয়ে গেছে। এর মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিসমূহ ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে হাঁটতে প্রথম থেকেই জোর দিয়ে এসেছিল। সংস্কারের নানা আলোচনায় দেশের মানুষের আগ্রহ থাকলেও সংস্কারের নামে বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য সাধনের পক্ষে দেশের মানুষ যায়নি।
এসবের মধ্যেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন, নির্বাচনে কারসাজি নিয়ে নানা সংশয় থাকলেও ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন শেষ করা গেছে। নির্বাচিতদের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার আয়োজন চলছে।
এ সময় সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যে বিশেষত সংবিধান সংস্কার নিয়ে যে গণভোট আয়োজন করা হলো তা নিয়ে সব প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। আমাদের বিবেচনায় নতুন জাতীয় সংসদকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে এগিয়ে যেতে হবে এবং তা অবশ্যই সংবিধান বর্ণিত পথে। আমাদের যে সংবিধান আছে তার অসম্পূর্ণতা দূর করার বিষয়ে কারোর কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু কেউ যদি এই সুযোগে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং সংবিধান পুনঃ লিখনের জন্য ছলে বলে কৌশলে কোনো আয়োজন করতে চান তা দেশের মানুষ গ্রহণ করবে না। এতে নতুন সংকট তৈরি করতে হবে এবং এর কোনো আইনি ভিত্তিও পাবে না। এ বিষয়ে না হয় এ আলোচনাটা অন্য সময় করি। ফিরে আসি নির্বাচিত জাতীয় সংসদের দিকে।
নির্বাচন নিয়ে নানামুখী যে জল্পনা কল্পনা ছিল, তার মধ্যে অন্যতম হলো অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করবে কিনা। নির্বাচনে উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতার মসনদে বসবে কিনা। দেশি-বিদেশি আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি এই সুযোগে আধিপত্য বিস্তারকে নিরঙ্কুশ করবে কিনা। এর মধ্যে উপরের দুটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেল। দেশের ওপরে বেশি-বিদেশি আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তির ভূমিকা আগামী দিনের সরকার ও দেশবাসীর ওপর নির্ভর করবে। সে জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
এ সময় প্রধান যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসবে তা হলো নির্বাচিত জাতীয় সংসদ জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে কতটুকু অগ্রসর হবে। এটা ঠিক পাহাড় পরিমাণ সংকট এর মধ্যে জাতীয় সংসদ দায়িত্ব পালন করবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এই সংকট যতটুকু দূর করা যেত বা দূর করার রূপরেখা দেখানো যেত তা হয়নি। ঢাকঢোল পিটিয়ে দুর্নীতির যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হলো, তার কার্যক্রম এগুলো না।
দেশে দরিদ্রতা ও বেকারত্ব বাড়ল। কর্মসংস্থানের কোনো ক্ষেত্র তৈরি হলো না বরং অসংখ্য কলকারখানা বন্ধ এবং লাখ লাখ মানুষ বেকার হলো। এর মধ্যে মব সন্ত্রাস মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলল। এসব সন্ত্রাসে মানুষের জীবনহানিসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ঐতিহ্য ধ্বংস করা হলো। সরকার শুধু নির্বিকার নয় অনেক ক্ষেত্রে সরকারের প্রশ্রয়ের বিষয়টিও মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তাই আজ প্রধান কাজ হলো সব মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপনের গ্যারান্টি নিশ্চিত করা। কঠোর হাতে এসব মব সন্ত্রাসীদের দমন করা। জনগণের নিরাপত্তা বিধান ও আইনের শাসনের পথে দেশকে এগিয়ে নেওয়া। এই কাজটি করার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে সব সংকট উত্তরণের পথে এগিয়ে যাওয়া। সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসছে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী উগ্র সম্প্রদায়িক শক্তি। আগামী দিনে সংসদে এদের ভূমিকা কি হবে, তা দেখে দেশবাসীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নির্বাচনে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধকে সমন্বিত রাখার কথাই বলেছে। ফলাফল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। তবে এটা দৃশ্যমান হয়েছে যে যারা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে পরাজিত করতে চায় তারা নানা মত দ্বিমত সত্ত্বেও ভোট কিনতে গেলে বিএনপির বাক্সেই ভোট দিয়েছে। এ বিষয় বিএনপি কি দায়িত্বশীল আচরণ করে তাও জনগণকে দেখতে হবে। তা ছাড়া শাসন পরিচালনায় অতীত দিনে বিএনপির যেসব নেতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রশ্নের সম্মুখে রয়েছে সেসব কর্মকাণ্ড উত্তরণে বিএনপির সরকার কি ভূমিকা রাখে তাও দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে।
এবারের সংসদেও বহুমুখী রাজনৈতিক দলের, নানা মত পথের প্রতিনিধিরা নির্বাচিতের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও অধিকাংশই নির্বাচিত হতে পারেনি। তাদের মতামত কতটুকু আমলে নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হবে সে বিষয়েও নতুন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এবারে এই কথাটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসছে এই কারণে যে, পুরোনো ধারায় যদি কেউ রাষ্ট্র পরিচালনার নামে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চায়, বোধ করি তা মোটেই গ্রহণযোগ্য হবে না। এবং এটি করে বেশি দিন হয়তো ক্ষমতায়ও থাকা যাবে না। এবারের নতুন ভোটাররা যাদের সংখ্যা এক তৃতীয়াংশেরও বেশি তারা যে ভোটে অংশ নিলেন তারাও সব সময় পাহারাদারের ভূমিকায় থাকবেন বলে আমি ধারণা করি। এরাইতো আগামী দিনে নির্বাচনি ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখবেন। এদের বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে। এক্ষেত্রে আমি গুরুত্ব দিতে চাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর দেয়ালে দেয়ালে যেসব গ্রাফিতি আঁকা হয়েছিল এবং ওই সব জায়গায় যেসব স্লোগান উচ্চারিত হয়েছিল তার ওপর। এসব লিখনকে উপেক্ষা করার কোনো কারণ নেই।
সব মানুষের মর্যাদা সংরক্ষণ করতে গেলে গণতান্ত্রিক ধারাকেই অগ্রসর করতে হবে। আর আমরা মনে করি এই ধারাগুলো অগ্রসরের মধ্য দিয়ে দেশের উন্নয়ন ও সম্পদের সুষম বণ্টন ছাড়া মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। একই সঙ্গে মানুষের চিন্তা-চেতনা উন্নয়নের জন্য সব ধরনের অপসংস্কৃতির ধারা থেকে বেরিয়ে নিয়ে এসে মানুষকে উন্নততর সংস্কৃতির আবহাওয়া গড়ে তুলতে হবে। এ কাজের জন্য সরকারকেই পরিকল্পিত গ্রহণ করতে হবে। না হলে অন্ধকারের অপশক্তির ধারা শক্তিশালী হবে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংগঠন যার যার রাজনৈতিক মতাদর্শ বিকাশের জন্য কাজ করবেন এবং বর্তমান গণতান্ত্রিক পথে যে যাত্রা শুরু হলো সেই যাত্রায় যেকোনো প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করবেন। এ ছাড়া সমাজে বুদ্ধিজীবী বলে খ্যাত যারা আছেন বিগত দিনে দলীয়করণের কারণে তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। আগামী দিনেও তারা যেন তাদের সুবিধার জন্য এসব দলীয়করণের মধ্যে না আসে বা রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষত ক্ষমতাসীনরা যেন তাদেরকে দলবাজ হিসেবে তৈরি না করেন সে বিষয়েও প্রচেষ্টা রাখতে হবে।
মনে রাখতে হবে দীর্ঘ সংকটের মধ্য দিয়ে আমরা যে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করলাম এ পথে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। বিগত দিনের যার যার কর্মকাণ্ডের আত্ম সমালোচনা করে এবং দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনায় নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অতীত দিনে ক্ষমতা পাওয়ার পর পরই যেভাবে ব্যক্তি গোষ্ঠী স্বার্থ রক্ষা করা ও বিরোধী দলকে দমন করার পথ গ্রহণ করা হতো তার থেকে ফিরে আসতে হবে।
লেখক: বামপন্থি রাজনীতিক
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, সিপিবি
.jpg)

