বাংলাদেশের সামনে জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ কেবল বাহ্যিক সংকটের ফল নয়, এটি নীতিগত দূরদর্শিতার প্রশ্নও বটে। সীমিত সম্পদের দেশে সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে টিকে থাকা যায় না। সৌরশক্তির মতো সহজলভ্য ও টেকসই উৎসকে যদি আমরা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারি, তবে তা কেবল জ্বালানিসংকটই নয়, অর্থনৈতিক চাপও অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়- আমরা কি সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেব, নাকি সংকটকে আরও গভীর হতে দেব?...
একজন ব্যক্তির বিপুল সম্পদ থাকলেই যে তার জীবন সুখময় ও নিরাপদ হবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এ সত্য সমানভাবে প্রযোজ্য।
পৃথিবীতে বহু সম্পদশালী দেশ রয়েছে, যেখানে মানুষের জীবনমান এখনো অনিশ্চয়তা, সংকট ও মানবিক দুর্ভোগে ভরা। কোথাও খাদ্যসংকট, কোথাও যুদ্ধ, কোথাও জ্বালানি অস্থিরতা। আর এসবে প্রতিদিনই সম্পদশালী দেশের মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। কোথাও দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে। তাই রাষ্ট্রের জন্য সম্পদ কখনোই চূড়ান্ত নির্ধারক নয়। বরং সে সম্পদের সঠিক ব্যবহার, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ নেতৃত্বই একটি দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, জনবান্ধব নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণই মূল চালিকাশক্তি। সম্পদের প্রাচুর্য থাকলেও যদি তা অপব্যবহৃত হয়, তবে সে রাষ্ট্র উন্নতির বদলে সংকটের দিকেই ধাবিত হয়। অন্যদিকে সীমিত সম্পদ নিয়েও সুশাসন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ অনিশ্চয়তা সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের তেল রিজার্ভ তুলনামূলকভাবে কম, ফলে এ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে ফার্নেস অয়েল এবং ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ দ্রুত বিকল্প জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎসের দিকে না গেলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে কিছুদিন আগে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লাক্ষ্যে স্কুল-কলেজ আংশিকভাবে বন্ধ রাখা বা অনলাইন-অফলাইন মিলিয়ে ক্লাস নেওয়ার গুঞ্জন শোনা যায়। এ প্রস্তাবের একটি বাস্তবসম্মত সমালোচনা আসে এক কিশোর শিক্ষার্থীর কাছ থেকে। তার যুক্তি ছিল অত্যন্ত সহজ কিন্তু গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। তার মতে, একটি শ্রেণিকক্ষে ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থী একসঙ্গে পড়াশোনা করে, যেখানে মাত্র ৭-৮টি ফ্যান চলে। কিন্তু যদি শিক্ষার্থীরা স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে অবস্থান করে তবে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা ঘরে আলাদা ফ্যান চালাতে হবে। ফলে মোট বিদ্যুৎ খরচ কমার পরিবর্তে বরং বেড়ে যেতে পারে। কিশোর শিক্ষার্থীর এ যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ। তার এ সরল যুক্তি আমাদের নীতিনির্ধারণে বাস্তবতার গুরুত্বকে নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে তেল বা গ্যাসে সমৃদ্ধ না হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান একে এক বিশেষ সম্ভাবনার দেশে পরিণত করেছে। সারা বছর প্রায় পর্যাপ্ত সূর্যালোক প্রাপ্তি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশ যেখানে দীর্ঘ শীতকাল বা অল্প সূর্যালোকের কারণে সৌরশক্তির ওপর সীমিতভাবে নির্ভরশীল, সেখানে বাংলাদেশ এ খাতে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার এখনো আমরা করতে পারিনি। গ্রামাঞ্চলে কিছু সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প থাকলেও সেগুলোর পরিধি সীমিত এবং এর প্রভাব খুবই অল্প। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প কেবল একটি বা দুটি লাইট ও ছোট ফ্যান চালানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মধ্যবিত্ত বা শহুরে পরিবারের মধ্যে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার নেই বললেই চলে।
এ বাস্তবতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে একটি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক একটি মাঝারি মানের পাঁচতলা স্কুল, যেখানে প্রায় ২০টি কক্ষ রয়েছে। ধরা যাক এমন একটি স্কুলে মোট ১৬০টি ফ্যান ও ৫০টি বৈদ্যুতিক বাল্ব ব্যবহৃত হয়। পানি ওঠানোর জন্য একটি মোটর আর কম্পিউটার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সামগ্রির ব্যবহার করা হয়। এমন একটি স্কুলে দৈনিক প্রায় ১০০ ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ সৌরশক্তির মাধ্যমে উৎপাদন করতে আনুমানিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ বর্গফুট ছাদ প্রয়োজন। বাংলাদেশের অধিকাংশ স্কুলেই এমন পরিমাণ খালি ছাদ রয়েছে। স্কুলের ছাদগুলো অব্যবহৃতই থাকে। কাজেই খুব সহজেই এ ছাদগুলোতে সৌর প্যানেল বসানো যায়। এমন একটি স্কুলে সৌর প্যানেল বসাতে মোট খরচ হবে মাত্র ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। স্কুলগুলো যেহেতু দিনের বেলায়ই পরিচালিত হয়, কাজেই এ প্যানেলে ব্যাটারির প্রয়োজনীয়তা নেই বললেই চলে। কাজেই সরাসরি গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থা ব্যবহার করেই স্কুলের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব।
সরকারি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকি দিতে হয়। এ ব্যয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশও যদি পরিকল্পিতভাবে সৌরশক্তি খাতে বিনিয়োগ করা যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা দেশের জন্য বহু গুণ লাভজনক হবে।
এতে করে একদিকে স্কুলগুলো ধীরে ধীরে বিদ্যুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হবে এবং একই সঙ্গে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং স্কুলে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের বিদ্যুৎ সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিদ্যুৎ খাতে পররাষ্ট্রনির্ভরশীলতা কমবে এবং পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। আপাতত একটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে ১০০টি স্কুলে সৌর বিদ্যুৎ চালু করে স্বল্প সময়েই এর কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব। সফল হলে এটি জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা যেতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের সামনে জ্বালানি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ কেবল বাহ্যিক সংকটের ফল নয়, এটি নীতিগত দূরদর্শিতার প্রশ্নও বটে। সীমিত সম্পদের দেশে সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করে টিকে থাকা যায় না। সৌরশক্তির মতো সহজলভ্য ও টেকসই উৎসকে যদি আমরা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারি, তবে তা কেবল জ্বালানি সংকটই নয়, অর্থনৈতিক চাপও অনেকাংশে কমিয়ে দিতে পারে। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়- আমরা কি সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেব, নাকি সংকটকে আরও গভীর হতে দেব?
লেখক: অধ্যাপক ও লেখক
.jpg)
.jpg)
