প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি এখন জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলটি নিষিদ্ধ হবে কি না, এ নিয়ে এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে তুমুল আলোচনা। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। তবে এ মুহূর্তে প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এ বিষয়ে নীরব থাকায় কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছে দলটি।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে গত রবিবার জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি দাবি জানিয়েছে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার। ওই বৈঠকে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে বিএনপি নেতারা কোনো কথা বলেননি। জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন নেতা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, জাপা ইস্যুতে বিএনপি নীরবতা অবলম্বন করায় তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।
এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এই মুহূর্তে অনেকেই জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন। জাতীয় পার্টি কখনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করেনি। তাই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা বা কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার আইনগত দাবি উঠতে পারে না। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী যেসব কাজ করলে একটি দলের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে, এমন কোনো কাজ জাতীয় পার্টি কখনোই করেনি।’ তিনি বলেন, ‘জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগও নেই। যারা জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবি তুলছে, তাদের এ দাবি অযৌক্তিক।’
জাপা মহাসচিব বলেন, ‘দল নিষিদ্ধ করার দাবিতে আমরা ভীতসন্ত্রস্ত নই। আমরা আশা করছি, সরকার ভ্রান্ত দাবিতে ভ্রান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না।’
দলের নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো আঘাত এলে জবাব দিতে হবে। আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে করব। প্রয়োজনে সবাইকে ঢাকায় আসতে হবে। জাতীয় পার্টি ব্যান করার চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে।’
১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। প্রায় চার বছর সামরিক শাসন জারি রাখার পর ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এরশাদ জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। সেই বছরের ৭ মে তিনি জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনে বিএনপি বাদে আওয়ামী লীগসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। জাতীয় পার্টির জন্য সেটিই ছিল প্রথম বিপর্যয়।
১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এরশাদকে বেশ কয়েকটি মামলায় আসামি হয়ে জেলে যেতে হয়। তবে কারাগারে থেকেও এরশাদ রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠনের পর এরশাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলা করা হয়। তবে ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসনে জয়লাভ করায় দলের নেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। এরশাদ জেলে বন্দি থাকেন ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত।
সেই বছর সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে জাতীয় পার্টির। এরশাদের দল ৩২টি আসনে জয় পায়। এরপর এরশাদ মুক্ত হন। টানা পাঁচ বছর জাতীয় পার্টিকে বড় কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি।
১৯৯৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠনের তোড়জোড় শুরু হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোটের পাশাপাশি জোটে জাতীয় পার্টিকেও টানার চেষ্টা চলে। জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম, শায়খুল হাদিস আজিজুল হকের সঙ্গে এরশাদও মিন্টো রোডে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তবে পরের বছর এরশাদ ওই জোট গঠনের প্রক্রিয়া থেকে সরে আসেন। কিন্তু জাপার তৎকালীন মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে সে সময় দলের একটি অংশ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামে চারদলীয় জোটে থেকে যায়। এ ঘটনায় জাপায় আরক দফা ভাঙনের সূত্রপাত হয়।
এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি আবারও ক্ষমতাসীন হলে জাতীয় পার্টি চাপে পড়ে যায়। তবে দল নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি দলটিকে। প্রথমদিকে কিছুটা চাপে পড়লেও সে সময় বিএনপির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে দলটি।
তবে ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে শরিক হয়। জাপা সে নির্বাচনে ২৭টি আসনে জয়লাভ করে। এরপর সাড়ে ১৫ বছর জাপাকে তেমন অসুবিধায় পড়তে হয়নি। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোতে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি করে নির্বাচনে এসেছে। এ তিনটি নির্বাচনের পরে জাপা প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসে।
২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নানা নাটকীয়তার জন্ম দেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তখন তিনি ও তার ভাই জি এম কাদের বিএনপিবিহীন একতরফা নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। কিন্তু এরশাদপত্নী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপার বড় অংশ নির্বাচনে শরিক হয়। প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসলেও মন্ত্রিসভার সদস্য হন জাপার শীর্ষ নেতারা। এরশাদকে পরে মন্ত্রী পদমর্যাদায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত হিসেবে জাতীয় সংসদে নিয়ে আসা হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির আসন ভাগাভাগির খবর এলেও তা অস্বীকার করেছেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ চাপের মুখে জাপাকে নির্বাচনে নিয়ে গেছে। এতে তার দলের শীর্ষ নেতারাও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
তবে ওই নির্বাচনের পর জাপায় বড় ভাঙন ধরান এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ। দেবর জি এম কাদেরের সঙ্গে অনেক বছরের দ্বন্দ্ব শেষে তিনি সর্বশেষে আরেকটি ব্র্যাকেটবন্দি জাতীয় পার্টির জন্ম দেন। এর কিছুদিন যেতে না যেতে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জোরদার করে তোলে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদসহ কয়েকটি দল।
এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৫ আগস্টের পর রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিন দফায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের, তার স্ত্রী ও প্রেসিডিয়াম সদস্য শেরীফা কাদেরসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে।
গত সপ্তাহে জাপা নিষিদ্ধের দাবি আরও জোরদার করে তুলেছে গণঅধিকার পরিষদ। কয়েক দিন আগে এই দাবিতে নুরুল হক নুরের দলটি জাতীয় পার্টির কার্যালয় অভিমুখে মিছিল নিয়ে গেলে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষ দমাতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, লাঠিচার্জ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় নুরুল হক মারাত্মক আহত হন। নুর গুরুতর অসুস্থ হয়ে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ওই ঘটনার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দিয়েছে নুরের দল গণঅধিকার পরিষদ। এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জাপা নিষিদ্ধ করার দাবি উঠলে দলটি বড় ধরনের চাপে পড়ে। প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছরে জাতীয় পার্টিকে এত কঠিন পরিস্থিতিতে আর পড়তে হয়নি।