ঢাকা ৬ আষাঢ় ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪

নিষিদ্ধ পলিথিনে ভরপুর সারা দেশ

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১১:২২ এএম
আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১১:২২ এএম
নিষিদ্ধ পলিথিনে ভরপুর সারা দেশ
ওসমান গনি

সরকাররিভাবে সারা দেশে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হলেও দেশের এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরকারের আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙুলি প্রদর্শন করে দেদার পলিথিন উৎপাদন ও বিক্রি করে কালো টাকার মালিক বনে যাচ্ছে। বেড়েই চলছে পলিথিনের ব্যবহার। বাড়ছে পরিবেশ দূষণ। হুমকিতে জীববৈচিত্র্য। বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। পরিবেশ রক্ষায় দেশে দুই দশক আগে আইন করেও বন্ধ করা যায়নি পলিথিনের ব্যবহার। বরঞ্চ এর তৈরি ব্যাগের ব্যবহার, উৎপাদন এবং বিপণন ও পরিবহন হচ্ছে প্রকাশ্যেই। পরিবেশবিদরা পুরোপুরি পলিথিন বন্ধের দাবি জানিয়ে এলেও তা আমলে নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর। আইনের বাস্তব ভিত্তিক প্রয়োগ না থাকায় সর্বত্র প্রতিটি কাজেই বাড়ছে পলিথিনের ব্যবহার। এই অসাধু ব্যক্তিদের নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন ও বিপণনের কারণে দেশের মানুষ ও পরিবেশ আজ হুমকির মুখে পড়েছে।

দেশে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। দুই বছর আগে পলিথিন এবং একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বন্ধে ব্যবস্থা নিতে এক বছর সময় বেঁধে দেন উচ্চ আদালত। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে পলিথিনের ব্যবহার ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে তাগিদ আছে। এত কিছুর পরও এবারের বাজেটে এসেছে উল্টো প্রস্তাব। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পলিথিন ব্যাগ, প্লাস্টিক ব্যাগ (ওভেন প্লাস্টিক ব্যাগসহ) ও মোড়কসামগ্রীর ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আদায় করা হয়। এটি বাড়ানোর পরিবর্তে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কাঁচাবাজার, মুদিদোকান, শপিং মল, চেইনশপ সর্বত্রই নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এ পণ্য নিয়ন্ত্রণে মাঝেমধ্যে অভিযান চালানো হলেও এর উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার এতটুকুও কমেনি। নির্ভরযোগ্য বিকল্পের অভাবে বাজার সয়লাব হয়ে আছে নিষিদ্ধ পলিথিনে।

রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট, শান্তিনগর বাজার, ফকিরাপুল ও মালিবাগ রেলগেট বাজারসহ সারা দেশের গ্রাম-গঞ্জের সর্বত্র নিষিদ্ধ পলিথিনে ভরপুর। পাটজাত মোড়কের বদলে প্লাস্টিক বা পলিথিনের বস্তায় আটা, ময়দা, চিনি, ডাল, আদা, রসুন বাজারজাত করা হচ্ছে। এমনকি ভারত থেকে যে চাল আমদানি করা হয়েছে সেটাও পলিথিনের বস্তায়। তবে কিছু চালের দোকানে বেশির ভাগই পাটের বস্তা রয়েছে।

আইনগতভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পরও উৎপাদন, বিপণন ও ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর পলিথিন। এতে ভেঙে পড়েছে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা। দূষিত হচ্ছে পানির তলদেশ, উর্বরতা হারাচ্ছে ফসলি জমির মাটি। ভরাট হচ্ছে নদীনালা, খালবিল। অতিমাত্রায় পলিথিন ও প্লাস্টিক ব্যবহারের কারণে মানবশরীরে বাসা বাঁধছে ক্যানসারসহ নানা রোগ। পরিবেশবাদীরা বলছেন, অনেক দেশ আইন করে প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে স্থলের পর এবার সাগর-মহাসাগরকে বিষিয়ে তুলছে বিষাক্ত পলিথিন ও প্লাস্টিক। তারপরও সচেতনতা বাড়ছে না আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে। মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশকে রক্ষা করতে পলিথিন ও ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পলিথিন নিষিদ্ধ হওয়ার পরও সারা দেশে চলছে এর রমরমা ব্যবহার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখের সামনেই রাজধানীসহ সারা দেশেই পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার চলছে। ছোট্ট পণ্য থেকে শুরু করে বড় পণ্য- সবকিছুই বিক্রেতারা পলিথিনের ব্যাগে ভরে ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পলিথিনে তৈরি সব ধরনের শপিং ব্যাগ উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রি ও বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুদ-বিতরণ নিষিদ্ধ। এর ব্যত্যয় হলে জেল-জরিমানার বিধান রয়েছে। অথচ এ আইন লঙ্ঘন করেই প্রশাসনের নাকের ডগায় বাজারগুলোতে অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে পলিথিন ব্যাগ।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সারা দেশে অবৈধ পলিথিন তৈরির কারখানা রয়েছে কমপক্ষে ১ হাজার ৫০০। এর মধ্যে পুরান ঢাকা এবং বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে রয়েছে কমপক্ষে ৭ শতাধিক কারখানা। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিদিন কোটি কোটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া হয়। ফেলে দেওয়া পলিথিন ব্যাগের একটা বিরাট অংশ কোনো না কোনোভাবে নদীতে গিয়ে পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীর তলদেশে পলিথিনের পুরু স্তর জমেছে। এতে নদী তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। 

পুরনো পলিথিন পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে নতুন পলিথিন। এতে মারাত্মকভাবে বায়ুদূষণ হচ্ছে। পলিথিন পোড়ালে কার্বন মনো-অক্সাইড তৈরি হয়ে বাতাস দূষিত করে। এদিকে পলিথিনের জন্য সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যেও পড়েছে ঝুঁকির মুখে। এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি বছর ৮৭ হাজার টন ওয়ানটাইম পলিথিন ও প্লাস্টিক বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিক স্ট্র, কটনবাড়, ফুড প্যাকেজিং, ফুড কনটেইনার, বোতল, প্লেট, প্লাস্টিক চামচ, কাপ, প্লাস্টিক ব্যাগ, পেস্ট, শ্যাম্পুর প্যাকেট ইত্যাদি। 

পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের মতে, নিষিদ্ধ এই পলিথিন একই সঙ্গে কৃষিজমি ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে। এটি একটি অপচনশীল প্লাস্টিকজাতীয় পদার্থ, যা দীর্ঘদিন পর্যন্ত অপরিবর্তিত, অবিকৃত থেকে মাটি ও পানি দূষিত করে। এতে মাটির উর্বরতা শক্তি ও গুণ নষ্ট হয়ে ফলন কমে যায়। এর বাইরে যত্রতত্র পলিথিন পড়ে থাকা, আগুনে পোড়ালে বাতাস দূষিত করা এবং পয়োনিষ্কাশনে বাধা তৈরিসহ নানাভাবে পরিবেশকে দূষিত করে।

পলিথিনের সংস্পর্শে এলে গাছ বা চারার শিকড় গজাতে পারে না। ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়ে সময়মতো ফলন হয় না বা হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না। পলিথিনের ক্ষতিকর রাসায়নিক গাছপালা, উদ্ভিদ ও মানবদেহের জন্যও ক্ষতিকর। পলিথিন বিক্রি বন্ধ করার ওপর প্রশাসনের কোনো নজরদারি দেখা যায়নি। 

এদিকে প্রশাসন থেকে পলিথিন বিক্রি ও উৎপাদন বন্ধের কথা বলা হলেও মাঠে-ময়দানে তেমন কোনো লক্ষ্যণ দেখা যায়নি। কিন্তু প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে, আমরা নিয়মিত তৈরির কারখানাগুলোতে অভিযান চালিয়ে পলিথিন জব্দ করছি, জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দিচ্ছি। আইনে পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও সারা দেশে ব্যাপকহারে ব্যবহার হচ্ছে। দেখার কেউ নেই। পলিথিনের কারণে পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে বড় প্রমাণ বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশে জমা ৬-১০ ফুট পলিথিনের স্তর। সাগরে মাছের তুলনায় পলিথিনের সংখ্যা বেশি। ঢাকাসহ সারা দেশের শহরের ড্রেনগুলো পলিথিন ও প্লাস্টিকদ্রব্যে ভরে গেছে। একটু বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বড় বাজেটের প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও এর সুরাহা করা সম্ভব হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পচনশীল দ্রব্যে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবহারের সাময়িক অনুমোদন নিয়ে এর ব্যবহার অব্যাহত রাখা হয়। পলিথিন বন্ধে অভিযান এক সময় চললেও এখন অজ্ঞাত কারণে বন্ধ আছে। এখন যেভাবে পলিথিন ব্যবহৃত হচ্ছে তা বেআইনি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email- [email protected]

ভাষা আন্দোলনের মহাপ্রাণ ব্যক্তিত্ব গাজীউল হক

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৪, ১২:১৪ পিএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৪, ১২:১৬ পিএম
ভাষা আন্দোলনের মহাপ্রাণ ব্যক্তিত্ব গাজীউল হক
আ ন ম গাজীউল হক

ভাষা সৈনিক আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক, যিনি আ ন ম গাজীউল হক নামে পরিচিত। আজ ১৭ জুন তার ১৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৯ সালের এই দিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ১৪৪ ধারা অমান্যকারীদের অন্যতম ছিলেন আ ন ম গাজীউল হক।

আ ন ম গাজীউল হক ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, গীতিকার এবং ভাষা সৈনিক। ভাষা আন্দোলনসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেন।

আজ ১৭ জুন। এই দিনটি আমার জন্য একটি কষ্টের দিন। এই দিনে ২০০৯ সালে হারিয়ে ফেলেছি, আমার অভিভাবককে। যিনি আমার পিতা। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক আমতলার জনসভায় সভাপতির আসনে থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের নির্দেশনা দিয়েছিলেন। যাঁর জীবনের অনেকটা বছর কেটেছে অন্ধকার কারাগারে। যিনি বাংলা ও বাংলা ভাষা নিয়ে তৃণমূল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা আন্দোলনে সরাসরি জড়িত থেকে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় অধিষ্ঠিত করেন এবং সুপ্রিম কোর্টে বাংলা ও বাঙালির মায়ের ভাষা চালু জন্য লড়াই করেন। 

লড়াকু ভাষাসৈনিক আ ন ম গাজীউল হক ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বগুড়ার হাইকমান্ড (সমর) নিযুক্ত হন। তিনি ১৯৪৭, ১৯৪৮ ,১৯৫২, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও পরবর্তীতে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দলনের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। 

৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ১৪৪ ধারা ভঙ্গকারীদের মধ্যে শুধু অন্যতমই নন বরং এই সিদ্ধান্ত আ ন ম গাজীউল হক ঘোষণা করেন। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রায় ১২টার দিকে ফজলুল হক হল ও ঢাকা হলের মাঝখানে যে পুকুর আছে তার পূর্ব ধারের সিঁড়িতে বিভিন্ন হলের নেতৃস্থানীয় ছাত্রদের নিয়ে ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য এবং ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসুচি স্থির করার জন্য যে ১১ জনের বৈঠক হয়, সেই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পরের দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলায় যে সভা অনুষ্ঠিত হবে তার সভাপতিত্ব করবেন আ ন ম গাজীউল হক।

যে ১১ জন ছাত্রনেতা সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন- আ ন ম গাজীউল হক, হাবিবুর রহমান শেলী, মোহাম্মদ সুলতান, জিল্লুর রহমান, আব্দুল মোমেন, এস এ বারী এটি, এম আর আক্তার মুকুল, কামরুদ্দিন শহুদ, আনোয়ারুল হক খান, আনোয়ার হোসেন ও মন্জুর আহমদ।

তার লেখা গান ‘ভুলব না ভুলব না ভুলব না এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গেয়ে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত প্রভাতফেরি করা হতো।

ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের জন্ম ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি (পহেলা ফাল্গুন) ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে। তার বাবা হযরত মওলানা সিরাজুল হক ছিলেন কংগ্রেস ও খেলাফত আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী এবং একজন সুফী সাধক। মায়ের নাম নূরজাহান বেগম। পড়াশুনা শুরু করেন মক্তবে। পরে কাশিপুর স্কুলে ভর্তি হন।

সে সময় চলছিল খেলাফত আন্দলন। তখন তিনি তৎকালীন স্থানীয় থানার জোকোভিচ পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর জন্য অবশ্য তাকে চার ঘন্টা জেল খাটতে হয়েছিল।

কাশিপুর স্কুল থেকে তিনি উচ্চ প্রাইমারি বৃত্তি লাভ করেন। এই স্কুলে পড়ার সময়েই তিনি শিক্ষক সুরেন বাবুর সান্নিধ্যে এসে দেশপ্রেমিক হয়ে ওঠেন। ১৯৪১ সালে তিনি বগুড়া জেলা স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেনিতে ভর্তি হন। ১৯৪৬ সালে এই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এরপরই তিনি বগুড়া আজিজুল হক কলেজে আইএ ভর্তি হন।

কলেজের অধ্যক্ষ ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্যারের সংস্পর্শে এসে বাম রাজনীতিতে আসেন। ১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ বগুড়া জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং ওই বছরই কুষ্টিয়ার নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের কনফারেন্সে যোগ দেন।

তিনি ছিলেন একাধারে সাহিত্যিক, গীতিকার এবং মহান ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় তিনি বগুড়ার হাই কমান্ড (সমর) নিযুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। এপ্রিল মাসের শেষ পর্যন্ত তিনি বগুড়াকে পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত রাখেন। ভাষা আন্দোলনসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেনের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে এসে গাজীউল হক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন এই ভাষাযোদ্ধা বহুবার কারাবরণ করেছেন।

ভাষার জন্য দেশ যখন উত্তাল তখন ছাত্রাবস্থায় তিনি নেতৃত্ব দেন বগুড়ায়। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা পালন এবং ৪ মার্চের সভায় সভাপতিত্ব করে ১৪৪ ধারা ভাঙার বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন তিনি।

গাজীউল হক ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমতলায় ঐতিহাসিক সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ঘোষণা করেন।

অধিকার আদায়ের দাবিতে শত শত বিদ্রোহী কণ্ঠে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” এই দাবিতে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ হয়। শ্লোগানে শ্লোগানে কেঁপে উঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের ছাত্র), রফিকউদ্দিন আহমদ, এবং আব্দুল জব্বার নামে তিন তরুণ মারা যায়। রফিক, জাব্বার, বরকত, শফিকসহ নাম না জানা আরও অনেকের সঙ্গে সালামও সেদিন গুলিবিদ্ধ হন।

২৩ ফেব্রুয়ারি গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল যে, গাজীউল হক পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। বগুড়ায় এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার আলতাফুন্নেছা মাঠে তার গায়েবানা জানাজাও পড়ানো হয়েছিল। ২১ ফেব্রুয়ারি ঘটনার আগেই এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

পরবর্তীতে আন্দোলনের কারণে গাজীউল হকের বিরুদ্ধে জারিকৃত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহার করা হলে তিনি এম এ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেন। ১৯৫৩ সালে ছাত্র আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি চার বছরের জন্য বহিষ্কার হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর এম এ ডিগ্রি কেড়ে নেয়। পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনে চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গাজীউল হকের এম এ ডিগ্রি ফেরত দিতে বাধ্য হয়।

শুধু ভাষা আন্দোলনে এই মহান সেনানী অবদান রাখেননি, পরবর্তী সব অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, সাংস্কৃতিক ও জাতীয় সংগ্রামে গাজীউল হক অংশ নিয়েছেন সাহসিকতার সঙ্গে।

১৯৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪’র সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯’র গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে সরাসরি অংশগ্রহন করেন।

তাঁকে পাওয়া গেছে ১৯৮০’র দশক জুড়ে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি অংশ নিয়ে বগুড়ার মুসলিম লীগকে শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত করেন এবং কাগমারী সম্মেলনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠনে আওয়ামী লীগের সর্বাঙ্গীন প্রতিকূলতা প্রতিরোধে মাওলানা ভাসানীর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে কাজ করেন।

তিনি এপ্রিল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত বগুড়াকে হানাদারমুক্ত রাখেন। হিলিতে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর কলকাতায় ফিরে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার বিক্রয় বিভাগের দায়িত্বসহ আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে রণাঙ্গনের সংবাদ প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৭ সালে আইনজ্ঞ সৈয়দ নওয়াব আলীর অধীনে বগুড়া বারে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৩ সালের মার্চ মাসে পূর্বপাকিস্তান ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসার সনদ লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে যোগদান করেন। সর্বোচ্চ আদালতে একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।

গাজীউল হক তাঁর সৃজনশীলতার অনেক স্বাক্ষর রেখেছেন। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯টি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের ওপর প্রথম লেখা বই ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ‘আমার দেখা আমার লেখা’ এবং বাংলাদেশ আনচেইনড যা এখন মালয়েশিয়ার মোনাস ও লন্ডনে অক্সর্ফোড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়। উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য গাজীউল হক ছিলেন আপোষহীন। ‘উচ্চ আদালতে বাংলা প্রচলন’ বইটিতে তিনি সে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন।

২০০৯ সালের ১৭ জুন বিকালে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাসত্যাগ করেন। পরে তাঁকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এই দিনটি আমার জন্য এতটাই কষ্টদায়ক যে আমি তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তান হয়েও আমার পিতার স্মৃতি রক্ষায় কোনো কিছুই করতে পারিনি। আমার এবং আমাদের পরিবারের একটাই আশা তাঁকে শুধু তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া হোক। আমার বাবার জন্য সবাই দোয়া করবেন। তাঁর জন্য আমাদের চির শ্রদ্ধা।

অমিয়/

পাহাড়ের কান্না থামানো যাচ্ছে না

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৪, ০৪:৩৮ পিএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৪, ০৪:৩৮ পিএম
পাহাড়ের কান্না থামানো যাচ্ছে না

প্রকৃতির নিয়তির কাছে পাহাড়ের মানুষগুলো বড় অসহায়। ফের পাহাড়ে একই পরিবারের তিনজন মাটিচাপা পড়ে মারা গেলেন। বড় ধরনের দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। চামেলীবাগে মাসাধিকাল ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছিল। দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাতের দরুন চামেলীবাগের টিলা ধসের অন্যতম কারণ বলে জানা গেছে। পাহাড় ধসের সময় ছিল না কোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তারপরও পাহাড় ধসে একই পরিবারের তিনজন চাপা পড়ে অকালে চলে গেলেন। 

প্রতি বছরই এরকম ঘটনার অবতারণা ঘটছে। তাহলে তা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না কেন? পাহাড়ের কোন অঞ্চল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ তা প্রশাসন চিহ্নিত করেছেন। তাহলে সেখানে বলিষ্ট এবং শক্ত ভূমিকা কেন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এ সরল প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না অনেক সময়। 

একটি ঘটনা পর আমাদের টনক নড়ে। কিছুদিন তা বহাল থাকে। আবার সবকিছু আগের নিয়মে চলতে থাকে। এভাবে আমরা পাহাড়ের অনেক বোবা কান্নার সাক্ষী হয়েছি। সামনের দিনগুলো আমাদের প্রকৃতির ভয়াবহ তাণ্ডব মোকাবিলা করেই পাহাড়ে জীবনযাপন করতে হবে। তাহলেই কি আমরা এভাবেই পাহাড় চাপা পড়ে মরব? 

পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ হলো পাহাড় কেটে আমরা নগ্ন করে ফেলেছি। ফলে সে এখন দাঁড়াতে পারছে না। পাহাড়ের অবকাঠামোগত আবরণ বিনষ্ট করায় প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে মাটি ধরে রাখা পাহাড়ের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। আমারা নির্বিচারে গাছ কেটে পাহাড় উজাড় করে ফেলেছি। গাছের শিকড় মাটি শক্ত করে ধরে রাখার কাজটি করে যেত। গাছ কেটে ফতুর করায় পাহাড় তার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। 

একেকটি পাহাড় ধরিত্রীর জন্য খিলান স্বরূপ। পাহাড়ের মাটি এবং গাছ কাটার ফলে বৃষ্টিপাত এবং ভূমিকম্পে মাটি নড়বড়ে হয়ে যাওয়ায় প্রবল ভূমি ধসে পাহাড়ের মাটি গলে নিচে দিকে নামতে থাকে। কিছু লোভী মানুষ পাহাড়ের পাদদেশের জায়গা দখল করে সেখানে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে ঘর ভাড়া দিয়ে থাকে। এভাবে একসময় খেটে খাওয়া মানুষগুলোর নীরব মৃত্যুর মুখে পতিত হয়।

২০০-৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতই ভূমি ধসের জন্য যথেষ্ট। সেখানে ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে ২০০৭ সালে ৯৫০ মিলিমিটার পর্যস্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। চামেলীবাগের টিলা ধসে একই পরিবারের চারজন চাপা পড়েছিল। একজনকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল। 

টিলা ধসের পেছনে রয়েছে এক নির্মম ও ভয়ানক তথ্য। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি টিলা দখল করে তা সমতল ভূমি বানানোর জন্য টিলার গায়ে সরু নালা কেটে রেখেছেন যাতে বৃষ্টিপাত হলে উপরের মাটি ধীরে ধীরে গলে পাদদেশে পড়ে। টিলা সরকারি সম্পদ হওয়ায় তা দখল করা একটু কষ্টসাধ্য। তার দরুন টিলার শ্রেণিই তারা মুছে দিতে চান। এভাবেই সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় টিলার মাটি ব্যাপকভাবে ধসে পড়ে। এতেই হতাহতের ঘটনা ঘটে। 

চাপা পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে সেনাবাহিনীর সদস্যদের ছয় ঘণ্টা লেগেছে। মানুষ এভাবে আরও ১১টি পাহাড় কেটে সমতল ভূমি বানানোর সব আয়োজন করে রেখেছেন। নগরীর ব্রাহ্মশাসন, দুসকি, হাওলাদারপাড়া, মেজরটিলা, খাদিমতলা, মালানীছড়া, বালুরচর, চন্দ্রসটিলাসহ অন্তত ৩০টি স্থানে টিলার পাদদেশে হাজার হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। তাছাড়া বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার টিলায়ও ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসের চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক স্থানে সতর্কবার্তা হিসেবে লাল নিশানা টাঙিয়ে রাখার পরও তাদের সচেতন করা সম্ভব হচ্ছে না। 

বাংলাদেশের উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চলের সিলেট এলাকা এবং দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবন, খাগড়াছড়ি কক্সবাজারে পাহাড় রয়েছে। তবে বৃহত্তম চট্টগ্রামে ১৫ হাজার ৮০৯ বর্গমাইল বিস্তৃত এলাকাই মূলত পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে থাকে। এসব পাহাড়ের যেসব অঞ্চলে ঘনবসতি এবং মানুষের বিচরণ বেশি সেসব পাহাড় টিলাতেই দুর্যোগ-দুর্বিপাক বেশি ঘটছে। এ এলাকার বান্দরবান ও আলীকদম উপজেলায় দুর্যোগপূর্ণ বেশি। এর মধ্যে লামা উপজেলার হরিণমারা, চিউসিমারা, ফাইতং, তেলুনিয়া, জামালিয়া, কামিয়াখালী ও রূপসী এলাকা। লামা পৌর এলাকার হাসপাতালপাড়া, লুনারবিল, কুড়ালিয়ার টেক, টিএনটি পাহাড় এবং আলী কদম উপজেলার ক্রপ পাতা, পোয়ামহরী, আমতলী ও বাবুপাড়া সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। 

তাছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীর ১৩টি পাহাড়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিতকরণ করা হয়েছে। তাছাড়া চট্টগ্রাম জেলার মহানগরীতেও ১৩টি পাহাড়কে ধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, জালালাবাদ পাহাড়, নবীনগর পাহাড়, হামজারবাগ, দেব পাহাড়, কুমবাগ পাহাড়, গোল পাহাড়, কৈবল্য পাহাড়, খুলশী পাহাড়, বার্মা কলোনী পাহাড়, হিলভিউ পাহাড়, জামতলা পাহাড়, এনায়েত বাজার পাহাড় ও বাটালী হিল পাহাড় অন্যতম। 

তাছাড়া কক্সবাজার শহরে পাহাড় কেটে কতগুলো অবৈধ বাড়ি তৈরি করা হয়েছে সরকারি দপ্তরে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। পরিবেশবাদী সংগঠন এ বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন। তাদের হিসাবে, জেলার ১১ কিলোমিটার আয়তনের ছোট-বড় ৫১টি সরকারি পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে ৬৬ হাজারের বেশি বাড়ি। কয়েকতলা বিশিষ্ট রয়েছে ৫ হাজারের বেশি। আধা পাকা রয়েছে ৮ হাজার এবং বাকিগুলো সব বাঁশের বেড়া, ত্রিপল দিয়ে তৈরি বাড়ি। এসব বাড়িতে ৩ লাখেরও বেশি মানুষ বসবাস করছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছে । 

এসব এলাকায় গত ১৫ বছরে শতাধিক পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। উচ্চ আদালতে নিষেধাজ্ঞা থাকার পর ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস থেকে মানুষকে সরানো সম্ভব হচ্ছে না। তার কারণ, খেটে খাওয়া গরিব মানুষ শহরের ভাড়া দিয়ে কুলাতে পারে না। অল্প আয়ের মানুষই মূলত পাহাড়ের পাদদেশের ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকছেন। 

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম নিয়ন্ত্রণ বন বিভাগে মেরং রেঞ্জের ৫ হাজার ৮৯৯ দশমিক ৬২ একর, হাজাছড়া রেঞ্জের ১২ হাজার ৩৫০ একর ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের নাড়াইছড়ি রেঞ্জের ৫৪ হাজার ১১২ একর বনাঞ্চলে গাছ নেই বললেই চলে। ১৯৮৬ সালে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে বনাঞ্চল থেকে রেঞ্জ কার্যালয় গুটিয়ে নেওয়ায় এসব বনের অধিকাংশ গাছ দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে যায়।

বাংলাদেশের পাহাড় ধসের সবেচেয় বড় কারণ বোধ করি পাহাড় কর্তন। গত তিন দশকে কেবল চট্টগ্রামে তিন শতাধিক পাহাড় কাটা পড়েছে। পাহাড় কাটা হচ্ছে পার্বত্য চটগ্রাম ও কক্সবাজারে। শুধু দুটি কারণে পাহাড় কাটা হচ্ছে। প্রথম মাটি কেটে ইটভাটায় ব্যবহার। দ্বিতীয় প্লট তৈরি করে বসত নির্মাণ। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে বড় বড় ডেভেলপার কোম্পানি জড়িত। আর এই প্লট ও ফ্ল্যাট ব্যবসায় নির্বিচারে অনুমোদন দিয়ে কর্তৃপক্ষ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। 

চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার এ মহোৎসব চলছে মূলত খুলশী লাল খান বাজার, পাচলইশ, বায়েজীদ বোস্তামী, ফয়সলেক, পাহাড়তলী, কাটলী ও ভাটিয়ারীকে ঘিরে থাকা পাহাড়ে। অপরিকল্পিতভাবে এসব পাহাড়ের পাদদেশ কেটে ফেলার কারণে তা দুর্বল হয়ে যায়। বর্ষার পানি উপরে আটকে যায়। এ সময় শো শো শব্দে প্রবলবেগে তাতে ধস নামে। ২০০৭ সালে পাহাড়ে মহাবিপর্যয়ের পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে ২৮টি কারণ এবং ৩৬ দফা সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছিল। তার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নেই। সেটি কার্যকর করা হলে পাহাড় ধসের পরিমাণ অনেক কমে যেত। 

পাহাড় ধসের ২৮টি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো- ভারী বর্ষণ, বালুর আধিক্য, পাহাড়ের উপরি ভাগে গাছ না থাকা। গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলা, পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকির্পূণ বসবাস, বৃষ্টিপাতের পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করা অপরদিকে ৩৬টি সুপারিশ বাস্তবায়নের মধ্যে ছিল জরুরি ভিত্তিতে বনায়ন করা, গাইডওয়াল নির্মাণ, নিষ্কাশন ও শক্ত করে সীমানা প্রাচীর তৈরি করা, পাহাড়ের পানি ও বালু অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা, বসতি স্থাপন টেকসই করা, যত্রতত্র পাহাড়ি বালু উত্তোলন না করা, পাহাড় এলাকার ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে ইটভাটা নিষিদ্ধ করা, পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে হাউজিং প্রকল্প করতে না দেওয়া, মতিঝর্না এবং বাটালী হিলের পাদদেশে বসতি স্থাপন উচ্ছেদ করে পর্যটন স্পট করা, পাহাড় কাটার জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি এ ক্ষেত্রে। আর তাতেই মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। গত কয়েক দশকে হাজারের মতো মানুষের প্রাণ গেছে পাহাড় ধসের ঘটনায়। এ মধ্যে ১৯৯৬ সাণে ৭ জন, ১৯৯৭ সালে ৭ জন, ১৯৯৯ সালে ৩ জন, ২০০৩ সালে ১০, ২০০৪ সালে ৫ জন, ২০০৫ সালে ৩ জন, ২০০৬ সালে ২ জন, ২০০৭ সালে ১২৭ জন, ২০০৮ সালে ১৩ জন, ২০০৯ এবং সালে ৩ জন, ২০১০ সালে ৫৬ জন, ২০১১ সালে ১৩ জন, ২০১২ সালে ৯০ জন, ২০১৫ সালে ১৯ জন, ২০১৭ সালে ১৮০ জন, ২০২৩ সালে মারা গেছে ৪ জন। 

এ পরিসংখ্যান বলছে পাহাড় ধস হবে আর তাতে মৃত্যুর মিছিল বাড়বে। প্রশাসনিক কোনো দায় ও দায়িত্ব যেন এখান যেন অচল। ক্ষমতাবানরা পাহাড় কেটে বাড়ি তৈরি করবে। তাতে নিম্ন শ্রেণির মানুষ বসবাস করবে। আর প্রকৃতিক ধসে তাদের সমাধি ঘটবে। 

অলিউর রহমান ফিরোজ: সাংবাদিক
[email protected]

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে পরিবেশ দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ০৯:০৮ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:৩৭ পিএম
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে পরিবেশ দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম
আলম শাইন

বিশ্ব পরিবেশ দিবস সাধারণত পালিত হচ্ছে প্রতি বছর জুন মাসের ৫ তারিখ। চলতি বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে বিশ্বের সঙ্গে সমতা বজায় রেখে দিবসটি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকারসহ দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। সংগঠনগুলো রাজধানীসহ দেশব্যাপী কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সভা-সেমিনারের পাশাপাশি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তারা। প্রতি বছরের মতো এবারও জনসচেতনা বৃদ্ধির প্রয়াসে এগিয়ে এসেছে সংগঠনগুলো। তাই আমাদের পক্ষ থেকে সংগঠনগুলোর জন্য রইল অজস্র সাধুবাদ।

প্রতি বছর বিশ্বে নানান ধরনের দিবস পালিত হচ্ছে। তার মধ্যে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ অন্যতম। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দিবসটি বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদা, আলোচনা বা সভা-সেমিনারের মাধ্যমে পালিত হয়ে আসছে। আর সরকারি-বেসরকারিভাবেও দিবসটির গুরুত্ব তুলে ধরা হচ্ছে জনসাধারণের মধ্যে। মূলত, জনসচেতনা বৃদ্ধির প্রয়াসই হচ্ছে এই দিবসের মূল উদ্দেশ; যা পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো তাৎপর্যের সঙ্গে তুলে ধরছে সর্ব সাধারণের কাছে। এতে করে আমাদের লাভ বৈ লোকসান হচ্ছে না; বরং যে মানুষটি পরিবেশ সম্পর্কে অসচেতন তিনিও বিষয়টি জেনে সতর্ক হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন; অর্থাৎ বিষয়টি অবগত হয়ে জনসাধারণ যথেষ্ট সজাগ হচ্ছে।

এবার আসা যাক, বিশ্ব পরিবেশ দিবসের গোড়ার দিকের আলোচনায়। বিশ্ব পরিবেশ দিবস সর্বপ্রথম পালিত হয় ১৯৭২ সালে। তবে তারও আগে এই দিবসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। ১৯৬৮ সালের ২০ মে সুইডেন সরকার প্রকৃতি ও পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে তাদের গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়ে জাতিসংঘের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিষদের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠির বিষয়বস্তু ছিল জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি সাধারণ অধিবেশনের আলোচ্য সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা। বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করে ১৯৬৯ সালে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং সমাধানের উপায় খুঁজতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতিতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মূলত সেই সম্মেলনটি বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম পরিবেশবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৩ সালে সম্মেলনের প্রথম দিন ৫ জুনকে জাতিসংঘ ‘বিশ্ব পরিবেশদিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতি বছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। যার ধারাবাহিকতায় দিবসটি বাংলাদেশেও যথাযথভাবে পালিত হচ্ছে। তবে প্রতি বছরই আলাদা আলাদা শহরে, ভিন্ন প্রতিপাদ্য বা বিষয় নিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪-এর স্লোগান হচ্ছে, ‘ভূমি পুনরুদ্ধার, মরুকরণ এবং খরা স্থিতিস্থাপকতা’। অপরদিকে এ বছরের থিম হচ্ছে, ‘ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার’। 

উল্লেখ্য, দিবসটির তারিখ নিয়ে আরেকটি কথা জানাতে হচ্ছে, উত্তর গোলার্ধে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে দিবসটি ভিন্ন সময়ে পালিত হয়। তাই দুই গোলার্ধে দিবসের দিন-ক্ষণেরও হেরফের রয়েছে। যা নিয়ে আমাদের মধ্যে যেন বিভ্রান্তি সৃষ্টি না হয়, এ লেখার মাধ্যমে সেটাই জানানোর চেষ্টা করা হলো।

আমরা আগেও বলেছি বিশ্ব পরিবেশ দিবস অন্যসব দিবস থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিবস। পরিবেশকে ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে সুরক্ষা দিতে অথবা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে জনসচেতনা বৃদ্ধির প্রয়াস এই দিবসের মূল বিষয়বস্তু। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি রোধে অথবা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস অনন্য একটি দিবস। কারণ পরিবেশের সঙ্গেই সম্পৃক্ত জলবায়ুর উপাদানগুলো। যে উপাদানগুলোর হেরফের ঘটেই পরিবেশের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে অথবা পরিবেশের বিপর্য ঘটে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বৃদ্ধি পায়। যেমন জলবায়ুর উপাদানগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে প্লাস্টিক বর্জ্য, ই-বর্জ্য, ইটভাটা, বৃক্ষনিধন, বর্জ্যের ভাগাড় ইত্যাদির অব্যবস্থাপনার কারণে। পরিবেশ দিবসের মাধ্যমে যদি এসব বিষয় মানুষের কাছে তুলে ধরা যায়, তাহলেই দিবসটি পালন সার্থক হবে বলে মনে করছি আমরা। সুতরাং বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের সঙ্গে আমাদের প্রথম জলবায়ু সম্পর্কে মানুষকে ধারণা দিতে হবে। জলবায়ুর উপাদান সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। শুধু বৃক্ষরোপণ, বন্যপ্রাণী নিধন কিংবা পরিবেশ সম্পর্কে আলোচনা অব্যাহত রাখলেই হবে না, অবশ্যই জলবায়ু সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা দিতে হবে। মুখে মুখে বললেও জনসাধারণ জলবায়ু সম্পর্কে এখনো তেমন কিছু জানে না। গণমাধ্যমে ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ শব্দটা প্রতিনিয়ত উচ্চারিত হওয়ায় অনেকের কানে বাজলেও বিষয়টার গুরুত্ব এবং ব্যাখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন বুঝতে পারেন। ফলে বেশির ভাগ মানুষের কাছে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে করণীয় কী কী তা অজ্ঞাত থেকে যাচ্ছে। এতে করে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে তার যে ভূমিকা সেটা অনুধাবন করতে পারছে না। ফলে তারা পরিবেশ বিপর্যয় ঘটে এমন কর্মকাণ্ড থেকেও বিরত থাকছে পারছে না। ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলছে। অথবা বৃক্ষনিধন, বন্যপ্রাণী নিধনসহ যাবতীয় অনিষ্ট করে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। এটা কিন্তু তাদের দোষ নয়, কারণ তারা জানেনই না পরিবেশের ভারসাম্য বিনাশের বিষয়টি। সেই দিক বিবেচনা করে হলেও আমাদের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, পরিবেশ অথবা জলবায়ু সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করা। কারণ ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালনের উদ্দেশ্য একটাই- পরিবেশ সম্পর্কে জনসাধারণকে সচেতন করা। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে যেন সবাই সম্পৃক্ত থাকে সেটি জানান দেওয়া। বিশেষ করে আমাদের দেশের তরুণসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, যাতে তারা ফেসবুকে বেশি সময় না কাটিয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে মনোযোগী হয়। এখানে আমাদের একটি কথা মনে রাখতে হবে, দিবস পালনের মাধ্যমেই যেন কর্মকাণ্ডের সমাপ্তি না ঘটে। মনে রাখতে হবে, সর্বশেষ উদ্দেশ্য হচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধ করা। যার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা। যে দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি নাগরিকের ঘাড়ে বর্তায়। যা আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই মোটেও। 

আমাদের মনে রাখতে হবে- সমস্ত সৌরজগতে আপাতত বাসযোগ্য গ্রহ মাত্র একটি। অদূর ভবিষ্যতে বাসযোগ্য গ্রহ আবিষ্কার হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। সেই বিষয় মাথায় না নিয়ে আমাদের এই একটা মাত্র পৃথিবী নিয়েই ভাবতে হবে। পৃথিবীটাকে ধ্বংসের হাত থেকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এই সচেতনতা জনসাধারণের মাঝে জাগ্রত করে দিতে পারলে ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস’ পালন সার্থক হবে। এবং জনসাধারণের ভেতর আগ্রহ সৃষ্টি হবে। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কলামিস্ট
[email protected]

মহাবিশ্বের চির বিস্ময়

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:৫১ পিএম
আপডেট: ২৪ মে ২০২৪, ১২:৫১ পিএম
মহাবিশ্বের চির বিস্ময়
কাজী নজরুল ইসলাম

শুকনো খটখটে, এবড়োথেবড়ো, উঁচুনিচু, ঢেউ খেলানো ভূমি। শুকনো রুক্ষ মাটি রোদে পুড়ে খাঁখাঁ করছে। কৃষিজমির সামান্য মাটিটুকুও পাথর, কাঁকর আর বালির মিশেলে কালচে হয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ ধু ধু মাঠে ঝাঁকড়া মাথায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিছু তালগাছ। একটা মাত্র নদী, নাম ‘অজয় নদ’ মৃতপ্রায় অবস্থায় বেঁচে আছে। গ্রীষ্মের সময় পানি শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে নদীর ওপর দিয়ে চলে ঘোড়ার গাড়ি। বর্ষার প্রারম্ভে এই নদীই দুকূল ছাপিয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। এদিকে-ওদিকে ছোট বড় পাহাড় জঙ্গল থাকলেও কয়লাখনির দূষিত বাতাসে চারদিক বিষণ্ন হয়ে থাকে সবসময়। এই স্থানের নামই চুরুলিয়া, যা বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমায় অবস্থিত।

প্রকৃতির এই বিরুদ্ধ পরিবেশের ছোঁয়ায় মানুষের চালচলন, মেজাজ-মর্জিও প্রকৃতির মতোই রুক্ষ-কর্কশ হয়ে যায়। এই বিরুদ্ধ পরিবেশেই ১৮৯৯ সালের ২৪ মে, বাংলা সন ১৩০৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ মঙ্গলবার কাজী আমিনউল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় পত্নী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। নবজাতকের নাম রাখা হয় কাজী নজরুল ইসলাম। কাজী আলী হোসেন নামে নজরুলের এক ভাই এবং উম্মে কুলসুম নামে এক বোন ছিল। এ ছাড়া কাজী ফকির আহমেদের ঔরসে প্রথম স্ত্রীর গর্ভে সাজেদুন্নেসা নামে একজন কন্যাসন্তান ছিল।

মুঘল সম্রাট শাহ্ আলমের শাসনকালে বিহারের রাজধানী পাটনার হাজিপুর থেকে নজরুল-পরিবার চুরুলিয়ায় আবাস গড়ে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সম্রাটের আদেশে স্থানীয়ভাবে আদালত স্থাপন করা হয়। সম্রাটের প্রতিনিধি সমস্যার সমাধান করতে পারছিলেন না। নতুন আসা পরিবারের একজন সদস্য সমস্যার সুন্দর সমাধান করে দেন। দুপক্ষই তার রায় মেনে নিলে সম্রাটের পক্ষ থেকে তাকে কাজী উপাধিতে ভূষিত করা হয়। সম্রাটের দরবার থেকে দান হিসেবে দেওয়া হয় বেশকিছু জায়গাজমি। তখন থেকে পরিবারটির উপাধি হয়ে যায় কাজী পরিবার। এই পরিবারেরই সদস্য ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।

নজরুলের বাড়ির পাশে ছিল নরোত্তম রাজার গড়। গড়ের উল্টো দিকে হাজি পালোয়ানের পুকুর। হাজি পালোয়ান নামে এক আধ্যাত্মিক ফকির রুক্ষ মাটির বুকে এই পুকুর খনন করেছিলেন। পুকুরপাড়ে ছিল হাজি পালোয়ানের মাজার। মাজারের পাশে ছিল একটি মসজিদ। এই মসজিদের খাদেম ছিলেন নজরুল। বাল্যকালে নজরুল এই মসজিদে আজান দেওয়া, নামাজ পড়ানো ছাড়াও ছোটদের হাদিস পড়াতেন। এখান থেকেই তিনি কোরআন-হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন। 

চাচা বজলে করিমের কাছ থেকে ফারসি ভাষা এবং কবিতার পাঠ নিয়ে আরবি-ফারসির সমন্বয়ে একদিন নজরুল লিখে ফেলেন একটি পদ্য। এটাই নজরুলের হাতে লেখা প্রথম কবিতা। 

মেরা দিল বেতার কিয়া তেরী আব্রুয়ে কামান;
জ্বলা যাতা হ্যায় ইশ্বক্ মে জান পেরেশান।
হেরে তোমার ধ্বনি
চন্দ্ৰ কলঙ্কিনী
মরি কী যে বদনের শোভা, মাতোয়ারা প্রাণ।
বুলবুল করতে এসেছে তাই মধু পান॥

এরপর চাষার সং, শকুনি বধ, মেঘনাদ বধ, দাতা কর্ণসহ আরও অসংখ্য পালা গান ও নাটক রচনা করেন। লেটো গানের দলে তাকে নিয়ে টানাটানি পড়ে যায়। বিখ্যাত কবিয়াল 'গোদা কবি' শেখ চকোর লেটো গানের দলে নজরুল প্রতিভা নিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলেন, এই ব্যাঙাচি বড়ো হয়ে সাপ হবে। নিজেকে নজরুলের অধীন বলে স্বীকার করে লেটো গানের দলে সুর ধরতেন এই বলে,

আমরা এই অধীন হয়েছি ওস্তাদহীন
ভাবি তাই নিশিদিন,
বিষাদ মনে।
নামেতে নজরুল ইসলাম,
কি দিব গুণের প্রমাণ।

কিন্তু নজরুল বাল্যকাল থেকেই ছিলেন বাঁধনহারা। কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম তাকে আটকে রাখতে পারেনি। লেটো গানের দলে তার কাব্যিক যাত্রা শুরু করলেও একদিন দলের ধরাবাঁধা নিয়মকানুন ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে, দল ছেড়ে যাত্রা করেন অজানার পথে। হাজির হন আসানসোলে। গ্রাম্য লেটো দলের ‘ব্যাঙাচি কবি’ নজরুল হয়ে উঠেছিলেন আসানসোলের বেকারি বয়। রুটির দোকানের পাঁচ টাকা মাইনের ভৃত্য হয়ে কাটালেন কিছুদিন। সেখান থেকে ময়মনসিংহ দরিরামপুর গ্রাম। ময়মনসিংহ থেকে পালিয়ে ছুটে গেলেন করাচিতে। নজরুলের জীবনই যেন একজন বাউন্ডুলে যাযাবরের আত্মকাহিনি। তার জীবনের বাঁধনহারা উল্লাসের রূপক হয়ে বারবার আবির্ভূত হয়েছেন আরবের বেদুইন, ভবঘুরে আর বাউন্ডুলেরা। আর তাই তো চেঙ্গিস, কালা পাহাড়, গজনি মামুদরা বারবার উঠে এসেছে তার কাব্যে ও কবিতায় বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে।

লেটোর দল ছেড়ে কাশিমবাজারের কাছে মাথরুন গ্রামে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউট, যা মাথরুন স্কুল নামে পরিচিত ছিল-সেখানে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুলেই বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কে। নজরুল, শৈলেন আর শৈলজা মুসলমান, খ্রিষ্টান আর ব্রাহ্মণ এই তিনজনের মধ্যে ছিল প্রগাঢ় সম্পর্ক। জ্ঞান অর্জনের পথে ভাষা কখনো তার কাছে বাধা হয়ে উঠতে পারেনি।

নজরুলের জীবন দুঃখে-কষ্টে ভরা ছিল বিধায় তিনি কারও দুঃখ সহ্য করতে পারতেন না। রুটির দোকানে কাজ করার সময় ঘুঙ্ঘুর বাঁধা লাঠি হাতে এক ফকির ঘুরে বেড়াত। সে কারও কাছে ভিক্ষা চাইত না। তার নাম ছিল মৌনি ফকির। নজরুল ফকিরকে দেখামাত্রই ছুটে যেতেন। ভিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গান শোনাতেন। একদিন মর্মান্তিকভাবে ঘোড়াগাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মৌনি ফকির মারা যান। ব্যথাতুর কবি সেদিনই অর্থাৎ ১৯১৬ সালের এপ্রিল মাসের এক রাতে মৌনি ফকিরকে নিয়ে একটি কবিতা লেখেন। কবিতার নাম ক্ষমা। বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য পত্রিকায় ১৩২৬ সালের শ্রাবণ সংখ্যায় (১৯১৯ সালের জুলাই-আগস্ট) ‘ক্ষমা’ কবিতাটিই ‘মুক্তি’ নামে প্রকাশিত হয়। মুক্তি নজরুলের প্রকাশিত প্রথম কবিতা। এ কবিতার ফল্গুধারা থেকেই তার কাব্যজীবনের সূচনা হয়। 

১৯১৭ সাল, নজরুল তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। প্রি-টেস্ট পরীক্ষা শেষ করেছেন। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। রানীগঞ্জের দেয়ালে পোস্টার পড়ল : কে বলে বাঙালি যোদ্ধা নয়? কে বলে বাঙালি ভীতু? জাতির কলঙ্ক মোচন করা একান্ত কর্তব্য, আর তা পারে একমাত্র বাংলার যুবশক্তি। ঝাঁপিয়ে পড় সিংহবিক্রমে। বাঙালি পল্টনে যোগ দাও।

মেট্রিক পরীক্ষার স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে চুরুলিয়াকে বিদায় জানিয়ে যোগ দেন বেঙ্গল রেজিমেন্টে। লাহোর থেকে পেশোয়ার, পেশোয়ার থেকে করাচি নৈশেরা শুরু হয় সৈনিক জীবন। সেনানিবাসে থাকাকালে তিনি দ্রুতই প্রমোশন পেয়ে হাবিলদার পদে উপনীত হন। সেখানে এক পাঞ্জাবি মৌলবির সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। 

রুবাইয়াৎ-ই হাফিজ মুখবন্ধে কবি বলেন, আমি তখন স্কুল পালিয়ে যুদ্ধে গেছি। ১৯১৭ সালের কথা। সেখানে আমার হাফিজের সঙ্গে পরিচয় হয়। আমাদের বাঙালি পল্টনে একজন মৌলবি থাকতেন। একদিন তিনি দ্বীওয়ান ই-হাফিজ থেকে কতগুলো কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। শুনে আমি এমন মুগ্ধ হয়ে যাই যে, সেদিন থেকে তার কাছে ফারসি শিখতে আরম্ভ করি। তারই কাছে ক্রমে ফারসি কবিদের প্রায় সমস্ত কাব্যই পড়ে ফেলি।

১৯২০ সালে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভেঙে দেওয়া হলে নজরুল কলকাতায় ফিরে ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে আসেন। নজরুল তার জীবনে সৈনিককালীন স্মৃতি বহন করতেন। গায়ে থাকত গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি, গেরুয়া রঙের চাদর, হাতে একখানা হাতপাখা, মাথায় একরাশ এলোচুল কাঁধ পর্যন্ত ঝোলানো। তার বিচিত্র পোশাকের সঙ্গে পায়ে থাকত মিলিটারি বুট। অদ্ভুত পোশাকে এক অনন্য ব্যতিক্রম হয়ে চলতেন তিনি। তাকে দেখে চমকে উঠত আকাশের মেঘ আর মাটির কানন। উচ্ছল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর নজরুল তার জীবনের রূপকথায় সত্যের পরশ পাথরের স্পর্শ পেয়ে দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারণ করেন বিদ্রোহের শব্দাবলি। 

বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সহকারী সম্পাদক মুজফফর আহমেদের সঙ্গে ছিল নজরুলের প্রগাঢ় সম্পর্ক। ১৯২০ সালের ১২ জুলাই দুজনে এক সঙ্গে মিলে ‘নবযুগ’ নামের সান্ধ্য পত্রিকা বের করেন। নজরুল বারবার প্রেমে পড়েছেন। কিন্তু কুমিল্লার পল্লিবালা নার্গিসের প্রেমের বারিধারায় সিক্ত হয়েছিল তার মনপ্রাণ। কিন্তু ঘরজামাই থাকার হীনশর্তের কারণে বাসর রাতে নার্গিসকে ছেড়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। নজরুলের বক্ষে পারিজাত মন্দারের মতো চির অম্লান হয়েছিলেন নার্গিস। নার্গিসের সঙ্গে বিচ্ছেদের ফলে বেদনার আগুনে দগ্ধ হয়ে সৃষ্টি হয়েছে অগ্নিবীণা আর ধূমকেতুর জ্বালা। কুমিল্লা থেকে ফিরে নজরুল কলকাতায় এসে মুজফফর আহমেদের ৩/৪-সি তালতলা লেনের বাসায় ওঠেন। এই বাড়িতেই ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের এক শীতের রাতে কবি রচনা করেন তার কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’।

১৯২২ সালে তার প্রকাশিত ধূমকেতু পত্রিকায় আনন্দময়ীর আগমনে কবিতা প্রকাশের কারণে রাজদ্রোহিতার অপরাধ এনে নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। যন্ত্রণার নীলবিষে দগ্ধ হয়ে বাংলা সাহিত্যের প্রথম কবি হিসেবে কবিতা লেখার জন্য কারাদণ্ড স্বীকার করে নেন। কারারুদ্ধ অবস্থায় বন্দিদের প্রতি অবিচারের প্রতিবাদে তিনি অনশন করেন। তাকে নাকে নল ঢুকিয়ে খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা হলো। তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কবি বদ্ধ ঘরে উচ্চারণ করেন ‘কারার ঐ লৌহ কপাট ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট’ অর্ফিয়াসের মতো তার হিরণ্ময় সুরে চারপাশ সাড়া পড়ে যায়। চিরবিদ্রোহী নজরুল ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অর্ফিয়াস। তার উদয়ে থেমে গিয়েছিল বাংলা কবিতার চিরন্তন ভাষা। ছন্দের অক্ষরে সূচিত হয়েছিল বিদ্রোহের প্রবল জোয়ার।

কারামুক্তির পর আশালতা সেনগুপ্তকে (প্রমীলা) বিয়ে করেন। ১৯২৪ সালের ১৬ আগস্ট নজরুলের প্রথম পুত্রের জন্ম হয়। ডিসেম্বরের এক রাতে চার মাস বয়সী আজাদ কামাল মারা যায়। একই সময়ে পরপর দুটি গ্রন্থ নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত হয়। একদিকে দারিদ্র্য, ঋণ, অভাব; অন্যদিকে পুত্রশোকে পর্যুদস্ত হয়েও তিনি বিদ্রোহের দামামা বাজিয়ে চলছিলেন নিত্যনিয়ত। 

নজরুল ছিলেন চিরদিনই সেরা। তার ভেতরে ছিল জাত নেতৃত্ব। তিনি যখন দুষ্টুমি করতেন, তখন ছিলেন দুষ্টু দলের সর্দার। মসজিদে কাজ করার সময় হয়েছিলেন সেখানকার ইমাম। লেটো দলে তাকে দেওয়া হয় ওস্তাদের আসন। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে তিনি ছিলেন হাবিলদার। আর কবিতা লিখতে গিয়ে তিনি হয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি। সমাজের বৈষম্য, অনাচার ও ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম একক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। সমাজের সর্বস্তরে ন্যায় ও সাম্য বিধান করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য। যখনই সমাজে অসাম্য এবং অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণের করাঘাতে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল’ দেখা দেবে, তখনই ধূমকেতুর দীপ্ত শিখা হয়ে নজরুল যুগে যগে ফিরে আসবে মানুষের অভয় বাণী হয়ে।

সিদ্ধার্থ গৌতম ও যশোধারার দিনগুলো

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৪, ০৪:৪০ পিএম
আপডেট: ২২ মে ২০২৪, ০৪:৪২ পিএম
সিদ্ধার্থ গৌতম ও যশোধারার দিনগুলো
সংঘানন্দ মহাথের

বহু দূরে উত্তর ভারতের প্রায় শেষান্তে ছিল কপিলাবস্তু- প্রাচীন রাজধানী নগরী। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, সেখানে নগর ও প্রাসাদ আনন্দে-উৎসবে মেতে উঠেছিল যখন রাজকুমার সিদ্ধার্থ জন্মগ্রহণ করেন। যারা রাজার নিকট সুসংবাদ নিয়ে এল, রাজা সেই খবরবাহকদের বহু দামি উপহার দিলেন, আরও যারা কাজ করেছিল তা যৎসামান্যই হোক, প্রত্যেকে বহু উপহার পেল। কারণ যে সন্তান জন্ম নিয়েছে তা রাজা এবং পুরো রাজ পরিবারের বহু প্রার্থনা ও সাধনার ফল ছিল। এ কারণেই যে, রাজা শুদ্ধোধন এবং রানি মহামায়া দুজনই দীর্ঘকাল নিঃসন্তান ছিলেন। এরপর রাজা বসলেন অন্দরের একটি কক্ষে, যেখানে একদল প্রাজ্ঞ ব্যক্তি কাগজ, বই এবং অপরিচিত যন্ত্রপাতির ওপর ঝুঁকে কিছু কাজ করছেন।

আপনি কি জানতে চান তারা কী করছিলেন? খুব অদ্ভুত ব্যাপার। শিশু রাজকুমার সিদ্ধার্থের সময়ের তারা-নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করছিলেন এবং তার থেকে কুমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছিলেন। অদ্ভুত শোনালেও এই ভারতবর্ষের অতি প্রাচীন রীতি যা আজও লোকে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছে। নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ দ্বারা এই ভবিষ্যদ্বাণী হলো একজন মানুষের ঠিকুজি কোষ্ঠী। আমি এমনও মানুষের কথা জানি, যার কাছে বেশ কয়েক পূর্বপুরুষের নাম ও কোষ্ঠী আছে। আমাদের দেশেও এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। কপিলাবস্তুর জ্ঞানী ব্যক্তিদের বহু সময় লেগেছিল রাজকুমারের কোষ্ঠী তৈরি করতে। কারণ তাতে যে ভবিষ্যৎ তারা দেখেছিলেন, তা এতই অসাধারণ ছিল যে, তারা ঘোষণা করার আগে সবার সহমত নিয়ে নিশ্চিত হতে চাইছিলেন যে কাজটি নির্ভুল হয়েছে কি না। তবুও পাঁচজন পণ্ডিত মহাশয় দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেলেন এবং দুটো মতামত জানিয়েছিলেন মহারাজকে। অবশেষে তারা এসে রাজার সামনে দাঁড়ালেন। ‘বেশ এবার বলুন’ রাজা উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শিশুপুত্র আমার বাঁচবে তো?’ সবচেয়ে প্রবীণ জ্যোতিষী জবাব দিলেন, ‘বাঁচবে, মহারাজ।’

‘আহ’ বললেন মহারাজ, ‘বেশ বেশ।’ এ সংবাদ জানার পর এবার ধৈর্যসহকারে বাকিগুলো শোনা যেতে পারে। ‘সে বাঁচবে’ পুনরুক্তি করলেন বৃদ্ধ জ্যোতিষী এবং তারপর নিজের বক্তব্য জানালেন, ‘কিন্তু যদি এ কোষ্ঠী ঠিক হয়ে থাকে, তা হলে আজ থেকে সপ্তম দিনে, শিশুর মা, মহিষী মহামায়া মৃত্যুবরণ করবেন। এবং সেটাই ইঙ্গিত দেবে মহারাজ যে, আপনার পুত্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম রাজা হবেন, না সাধারণ মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা দেখে বস্তু জগৎ পরিত্যাগ করে মহান ধার্মিক গুরু হবেন।’ এই বলে তিনি পিতাকে কাগজগুলো অর্পণ করে সঙ্গীদের নিয়ে স্থান ত্যাগ করলেন।

মহামায়া মারা যাবেন- মহান রাজা অথবা ধার্মিক গুরু, কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হতে লাগল মহারাজের কানে। তিনি একা বসে ভবিষ্যদ্বাণীর কথা ভাবতে লাগলেন। যে ভয়ানক ঘটনা ঘটতে চলেছে তা তার কাছে সেরকম সাংঘাতিক মনেই হলো না শেষ কথাগুলোর তুলনায়। ‘ধার্মিক গুরু’- ভিখারি- এই কথাগুলোর অর্থ একই? রাজা শিউরে ওঠেন। চিন্তার জগতে নিমগ্ন হতে থাকেন। কিন্তু দাঁড়াও! কথাগুলো ছিল ‘সাধারণ মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা দেখে, বস্তুজগৎ পরিত্যাগ’- ‘আমার পুত্র কোনোদিন সাধারণের দুঃখ-যন্ত্রণা দেখবে না।’ পিতা দৃঢ়ভাবে উচ্চারণ করলেন, ভাবলেন এভাবেই পুত্রকে তিনি তার পছন্দের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারবেন- এক পরাক্রমী মহারাজা।

সিদ্ধার্থ কুমারের জন্মের সাত দিনের মধ্যে মহারানি মহামায়া মৃত্যুবরণ করেন ঠিক যেমনটি সেই পণ্ডিতেররা বলেছিলেন। বিগত সাত দিনে তাকে প্রাণভরে সব রকমের যত্ন ও সেবা করা হলো। যত্নের কোনো ত্রটি ছিল না, বাঁচানোর সবরকম চেষ্টাই করলেন রাজা শুদ্ধোধন। কিন্তু লাভ হলো না। নির্ধারিত দিনে তিনি শিশুর মতো নিদ্রা গেলেন, আর উঠলেন না। রাজা শুদ্ধোধন এত শোকের মধ্যেও কিছুটা আশঙ্কিত, কারণ এখন তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে জ্যোতিষীরা সত্য কথা বলেছে। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে, তার সন্তানকে তিনি ভিখারি হওয়ার ভবিতব্য থেকে বাঁচাবেনই। পরিবর্তে তাকে করে তুলবেন এই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও প্রতিপত্তিশালী রাজা; একে বৌদ্ধ সাহিত্য চক্রবর্তী রাজা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

শিশু যখন ধীরে ধীরে বালক হলো এবং বড় হতে লাগল, তার আশপাশের লোকেরা মনে করতেন তার সামনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে আছে। তিনি এত বুদ্ধিমান, প্রাণচঞ্চল, লেখাপড়া ও খেলায় এত চমৎকার ছিলেন এবং সব থেকে বড়ো কথা- এত প্রেমে পরিপূর্ণ যে তার একটি কথায় বা একবার দৃষ্টিপাতে যে কেউ তার অনুরাগী হয়ে পড়ে। তার কোনো শত্রু নেই। সবাই তার সম্বন্ধে সর্বদা বলে, তিনি ‘করুণায়’ পরিপূর্ণ’। তিনি ডানাভাঙা পাখিকে অশেষ যত্নে সেবা করতেন; কোনোদিন পশুপাখিদের তীরধনুক দিয়ে শিকার করেননি। যেমন কপিলাবস্তুর অনেক বন্ধু অভিজাত তরুণরা করত। তিনি বলতেন, নিরীহ ও অবলা জীবদের হত্যা করা পুরুষোচিত কাজ বলে তিনি মনে করেন না। তাহলে তিনি তীরের আঘাতের বেদনার কথা জানতেন। কিন্তু অন্য কোনোরকম দুঃখ-যন্ত্রণার কথা তিনি কখনো শোনেননি। তার গৃহ এক রাজপ্রাসাদ। তার চারদিকে মনোরম বাগান, বাগানের পর উত্তরে মাইলের পর মাইল উন্মুক্ত ক্ষেত্র রাজধানীর চারধারে বিস্তৃত। এগুলোর বাইরে তিনি কখনো বালক বয়সে যাননি। এখানে তিনি ঘোড়ায় চড়তে পারতেন, তীর চালনা করতে পারতেন এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরে, দেখে, ভেবে, স্বপ্ন দেখতে পারতেন। এখানে কোনো দুঃখ ছিল না, দুঃখের কথা কেউ বলতও না। কারণ রাজা কর্তৃক দুঃখের কথা বলা নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই পরিবেষ্টিত জায়গাটি নিজেই এক রাজ্য ছিল। তিনি এর বাইরে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেনওনি। এবং তার বাবা সবাইকে বারণ করে দিয়েছিলেন তার সামনে যেন কোনো প্রকারের দুঃখ-যন্ত্রণার কথা না বলে। কারণ শুদ্ধোধনের সবসময় মনে হতো ‘সাধারণ মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা দেখে’ সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ করবেন। এই যন্ত্রণার জ্ঞান থেকে তিনি পুত্রকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন।

একজন ভারতীয় যুবকের অধ্যয়নকাল হওয়া উচিত তার ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত। তারপর সে স্বাধীন। যখন তরুণ গৌতম সে বয়সের কাছাকাছি পৌঁছলেন তখন তিনি নিজেই দেশ ছেড়ে অন্য দেশের উদ্দেশে পাড়ি দিতে পারতেন। কেউ বারণ করতে পারত না তাকে, নিজের পিতাও না- কারণ তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাধীন। তাই এই সময়ে তারা তাকে বাঁধতে চাইলেন, ফুলডোরে। তাকে প্রস্তাব দিলেন বিয়ে করে সংসারী হতে। তাদের মনে হলো, এ এখন শুধু সময়ের প্রশ্ন। তার কাছাকাছি যদি এক সুন্দরী সহধর্মিণী এবং ফুটফুটে আদরের সন্তান থাকে তা হলে তিনি আনন্দ ও ভালোবাসার বন্ধনে এমন বাঁধা পড়ে যাবেন যে বাড়ি ত্যাগ করতে পারবেন না। তিনি তাদের জন্য আরও ধন-সম্পদ সংগ্রহ করতে প্রয়াসী হবেন এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী ও ক্ষমতাশালী সম্রাট হয়ে উঠবেন। ঠিক যেমনটি তার জন্মের সময় জ্ঞানী পণ্ডিতরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। কিন্তু গৌতম একটা ব্যাপারে মনস্থির করেছিলেন। তিনি নিজে পাত্রী দেখবেন ও পছন্দ করবেন। তাই সমস্ত তরুণ সভাপদ যাদের বিবাহযোগ্য ভগিনী ছিল একসঙ্গে সাত দিনের জন্য সভায় নিমন্ত্রিত হলেন। প্রতিদিন সকালে নানারকম খেলাধুলা চলতে লাগল, হয় গদা খেলা, বা তলোয়াল খেলা বা অশ্বলায়ন। বিকেলে নানা ধরনের খেলার প্রদর্শনী যেমন লোফালুফির খেলা, সাপ খেলা ইত্যাদি এবং নাটকের আয়োজন হতো। এগুলো রাজপ্রাসাদের প্রদর্শনালাতেই হতো এবং সবাই একসঙ্গে বিনোদনের আনন্দ নিতেন।

রাজা নিজে, মন্ত্রীরা এমনকি সভাসদরাও সবাই একজন বিশেষ নারীর কথা ভাবছিলেন, যাকে গৌতম পছন্দ করবেন। তার সৌন্দর্য, গুণ ও কৌলীন্য অন্য সবার চেয়ে বিশিষ্ট ছিল। তার নাম যশোধারা। যেদিন শেষদিন এল, গৌতম দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে একে একে অতিথিদের কোনো না কোনো অসাধারণ বিদায় উপহার দিয়ে বিদায় জানালেন- কাউকে কল্কহার, কাউকে কঙ্কন, কাউকে বহুমূল্য রত্ন। যখন যশোধারার পালা এল তাকে দেওয়ার মতো একটি ফুল ছাড়া গৌতমের কাছে আর কিছু ছিল না। তিনি নিজের পোশাকের ভিতর থেকে একটি ফুল বের করে যশোধারার হাতে দিলেন। যারা দাঁড়িয়ে দেখছিলেন, মনে করলেন যশোধরাকে বুঝি তার পছন্দ নয়, তাই এই অবহেলা। যশোধরা নিজে ছাড়া আর সবাই খুব দুঃখিত হলেন। তার কাছে ওই একটি ফুল অন্য বান্ধবীদের মূল্যবান উপহারের চেয়েও আরও মূল্যবান বলে মনে হলো। পরদিন কপিলাবস্তুর রাজা যখন নিজে তার বাবার কাছে এসে ছেলের জন্য তাকে চাইলেন, তিনি একেবারেই  আশ্চর্য হলেন না। তার শুধুই এটাই অবাক লাগল যে সবকিছু যেন কী স্বাভাবিক ও সরল। তিনি মনে মনে হয়তো আবছাভাবে সচেতন ছিলেন যে, পূর্বতন বহু জীবনের শৃঙ্খলে তিনিই তো তার স্ত্রীর ছিলেন। কিন্তু যশোধারা এমনই একজন যার নামে বহু পাণিপ্রার্থী আকৃষ্ট হতো। এবং মর্যাদার রীতি অনুসারে গৌতমকে তার শৌর্য প্রমাণ করেই তাকে জয় করতে হবে। রাজবংশের এমনই ধারা ছিল। এই রীতি অনুযায়ী রাজপুত্রের প্রস্তাব কন্যার পিতা গ্রহণ করলেন।

গৌতম তার প্রস্তাব গ্রহণে উৎফুল্ল হলেন এবং সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্ধারিত দিনে প্রতিযোগিতার আহ্বান জানালেন। তার আত্মীয়রা বললেন, হায়! তুমি কী করবে? তুমি কোনোদিন উড়ন্ত পাখিকে বা পলায়মান হরিণকে নিশানা করোনি, কখনো দৌড়রত শূকর হত্যা করনি? তুমি কী করে বিশাল ধনুকে প্রসিদ্ধ তিরন্দাজদের পরাস্ত করবে? তিনি হাসি ছাড়া উত্তরে কিছু বললেন না। ভয় তার কাছে অজানা আর নিজের অন্তরে তিনি এক অদ্ভুত শক্তি অনুভব করছেন। নির্দিষ্ট সময়ে দেখা গেল তার আত্মবিশ্বাস সঠিক ছিল, কারণ তিনি সবার থেকে এগিয়ে সব পুরস্কার নিয়ে বিজয়ী হলেন।

রাজকুমার গৌতমের সঙ্গে যশোধারার বিয়ে হয়ে গেল। তাদের ভাবী বাসভবনকে পুরোনোটির চেয়েও বেশি সুন্দর করা হলো। নতুন রাজপ্রাসাদ একটি জলাধারের ওপর। প্রাসাদের খিলান সব গোলাপরাঙা পাথরের আর ঘন বাদামি রঙের কাঠের, বাগানের একপ্রান্তে শ্বেত পাথর নির্মিত এক দ্বীপ ঘিরে উচ্ছল একটি ঝরনা। সেই দ্বীপে গ্রীষ্মবাস- শ্বেত, শীতল, মর্মরকক্ষ তৈরি হলো। সারা প্রাসাদ ঘিরে নদীর বুকে গোপন ফোয়ারারা যখন ইচ্ছে তখন জল দান করে। জানালাগুলোতে হয় কাঠের জাফরি, নয় ছিদ্র করা মর্মরের ঝরোখা। যার ফলে আব্রু থাকবে, আলো থাকবে, ছায়া থাকবে। এই জানালা দিয়ে দেখা যাবে প্রসারিত ফুল গাছশোভিত বাগান, পুষ্পলতার বিভাজিকা। প্রতিটা বড় রাজকীয় হলঘরের কোনে ছাদের বর্গা থেকে লম্বা শিকলে ঝুলছে দুজনে বসে দোল খাওয়ার মতো দোলনা- তার তিন দিক ঘেরা, ভিতরে গদি, বালিশ।  গ্রীষ্মের দিনে এতে বসে দোল খাওয়া যায় ও শীতল বাতাসের স্পর্শ পাওয়া যায়, আবার মনে হলে অলসভাবে শুয়েও থাকা যায়। সেবিকারা ধীর লয়ে পাখা দুলিয়ে বাতাস করতে পারে। সিংহাসনে বসবেন যিনি সেই রাজকুমারকে ঘিরে যারা থাকবে, তাদের সযত্নে তাদের সুন্দর চেহারা বা প্রাণবন্ত দেখে নির্বাচন করলেন এক মন্ত্রী। রাজকুমারের কানে কোনো বিলাপ, কোনো অশ্রুমোচনের শব্দ যেন না পৌঁছায়। তিনি যেন কোনোভাবেই রোগ, জরা ক্ষয়ের সম্মুখীন না হন। তিনি যদি কখনো নগরীতে যেতে চান তাকে যেন তখনই নানা বিনোদন, আনন্দে অন্যমনস্ক করে দেওয়া হয়। এমনই ছিল রাজার কড়া হুকুম। কিন্তু অদৃষ্টের লিখন কে খণ্ডাবে? রাজা এই সত্যের কথা স্বপ্নেও ভাবেননি যে, তার সব প্রচেষ্টা নির্দিষ্ট সময়ে তার আশঙ্কাই আরও বাড়িয়ে দেবে। তিনি ছেলের জন্য যে জীবন সাজিয়েছেন, তা বাস্তব নয়- একটা স্বপ্ন, একটা নাটক। সত্য সর্বদাই মিথ্যার চেয়ে শ্রেয়, এবং কোনো না কোনো সময়ে কুমারের মনে সত্যের প্রতি আগ্রহ জাগবেই। ঠিক তাই হলো। একদিন গৌতম নিজের সারথীকে বললেন, প্রাসাদের পাঁচিলের বাইরে নিজের নগরী কপিলাবস্তুতে তাকে নিয়ে যেতে, তার ভবিষ্যৎ রাজ্যের রাজধানীতে। হতবাক সারথীর আদেশ পালন ছাড়া উপায় ছিল না। তার অমান্য করার কোনো সাধ্য নেই। কিন্তু রাজা জানতে পারলে কী হবে ভেবে রাজার ক্রোধকেও যেন ভয় পেল প্রচণ্ড।

তারা কপিলাবস্তু গেলেন এবং সেদিন প্রথমবারের জন্য গৌতম বাস্তব জীবনকে কাছ থেকে দেখলেন। ঘিঞ্জি রাস্তায় বাচ্চাদের খেলতে দেখলেন। বাজারে খোলা দোকানে ব্যবসায়ীরা বসে খদ্দেরদের সঙ্গে দরদাম করছে, সামনে পসরা সাজানো। সূচিশিল্পী, কুমোর, পিতলের কামার- সবাই নিজের নিজের পসরা সাজিয়ে বসে কাজে ব্যস্ত। তার সাগরেদ পাশে বসে হাঁপর টানছে, আগুন জ্বলে উঠে ধাতুকে গরম করছে। কুমারের সাগরেদ তার জন্য চাক ঘুরিয়ে চলেছে। মালবাহকরা মাল নিয়ে নিয়ে ক্লান্ত মুখে যাওয়া-আসা করছে। ছাইমাখা এক সাধু লম্বা লাঠি নিয়ে হেঁটে চলেছে। অর্ধভুক্ত কুকুরগুলো একে অন্যকে দেখে খাবার নিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে গজরাচ্ছে, গ্রাম থেকে আসা ফল, শস্য, তুলাভরা গরুর গাড়ি দেখেও সরছে না। খুব কম মহিলা চোখে পড়ল, তাও অল্পবয়সি নয়, কারণ দুপুর হয়ে এসেছে। সকালের স্নানের সময় শেষ হয়ে  গেছে অনেকক্ষণ, তবু এক-আধজন যুবতীকে দেখা যাচ্ছে- ঘোমটা টানা, মাথায় বড় পিতলের কলসি। বাড়িতে জল নিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও রাস্তাঘাট রঙিন। কারণ পুবের মানুষদের পোশাকের অঙ্গ উজ্জ্বল রঙের রেশম বা পশমের শাল বা চাদর, বাঁ কাঁধের ওপর দিয়ে ফেলে ডান হাতের নিচ দিয়ে টানা। তাই শহরের ভিড়ে মেয়েদের পায়ের নুপুরের রুনুঝুনু ধ্বনি শোনা না গেলেও, প্রচুর ফিকে সবুজ, গোলাপি, বেগুনি, হলুদ, তুঁতে নীলের সমাবেশ দেখতে পাওয়া যায়। জনবহুল রাস্তা উজ্জ্বল ও রঙিন দেখতে লাগে। গৌতম সারথির দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি এখানে দেখছি শ্রম, দারিদ্র্য, ক্ষুধা- তাও কত সৌন্দর্য, প্রেম, আনন্দের মধ্যে মিশে আছে- সত্যি জীবন এতসব সত্ত্বেও কী মধুর!

তিনি নিজের মনেই এই কথাগুলো বললেন এবং ধীরে ধীরে সেই তিন অমোঘ শব্দের কাছাকাছি উপনীত হলেন- মানুষের তিনটি দুঃখ- ক্লান্তি, ব্যাধি ও মৃত্যু। গৌতমের জীবনে সেই মহাক্ষণটি এসে গেল। প্রথমে এল ক্লান্তি। এক বৃদ্ধ, অতি বৃদ্ধ মানুষ, তার মাথায় চুল নেই, মুখ দন্তহীন, হাত কাঁপছে- এই রূপ ধরে এল ক্লান্তি। ক্লান্তি তাকে জীবন্মৃত করে রেখেছে। লাঠিতে ভর দিয়ে সে তার শীর্ণ রোগগ্রস্ত হাত বাড়াল ভিক্ষার জন্য। রাজকুমার ঝুঁকে পড়ে ভিক্ষা দান করলেন আগ্রহভরে- বৃদ্ধ যা আশা করতে পারত তার চেয়ে অনেক বেশি। তার মনে হলো, তার নিজের আত্মাই বোধহয় ডুবে যাচ্ছে। ‘ও ছন্দক’ তিনি সারথিকে ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী, এটা কী? এ কী? ওর কী হয়েছে?

ছন্দ সান্ত্বনার সুরে বলল, ‘না, সেরকম কিছু না। মানুষটি শুধু হয়েছে।’ ‘বৃদ্ধ!’ গৌতম বললেন, আর কল্পনা করতে লাগলেন পিতার পাকা চুল এবং রাজ্যের বৃদ্ধ মন্ত্রীদের কথা। ‘কিন্তু সব বৃদ্ধ তো এরকম হয় না।’ সারথি বলল, হ্যাঁ হয়, যদি যথেষ্ট বৃদ্ধ হয়। ‘আমার পিতা?’ কুমার বললেন, কিন্তু তার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে এল, ‘পিতা? যশোধারা? আমরা সবাই এরকম?’ সারথি গম্ভীর হয়ে বলল, ‘সবাই বৃদ্ধ হবেন, আর কেউ যদি অতি বৃদ্ধ হয়, তার এই দশাই হবে।’ গৌতম নীরব হয়ে গেলেন, ভয় এবং করুণা দুই-ই তাকে আচ্ছন্ন করল। কিন্তু মাত্র এক মুহূর্তের জন্য, কারণ ততক্ষণে রথের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এমন একজন ভয়ংকরদর্শন মানুষ যার শরীরের চামড়ায় গোলাপি ছোপ- এবং যে হাত সে মেলে ধরেছে, তার অনেক গাঁট নেই। আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষই দেখলে চোখ ঢেকে তাড়াতাড়ি সরে যেতাম। কিন্তু গৌতম সে ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখালেন না- মায়াভরা কণ্ঠে বললেন,  ‘আমার ভাই!’ এবং করুণায় উদ্বেলিত হয়ে শ্রদ্ধাভরে তাকে একটি মুদ্রা দান করলেন। ‘ও কুষ্ঠরোগী’ ছন্দক বলে উঠল, ‘ও কুষ্ঠরোগী, আমরা এগিয়ে যাই।’ ইতোমধ্যে লোকটি গৌতমের কণ্ঠস্বরের কোমলতায় চমকে উঠেছে। ‘এর মানে কী ছন্দক?’ গৌতম জিজ্ঞেস করলেন। ‘এর অর্থ রোগ ওকে গ্রাস করেছে, প্রভু।’ ‘রোগ! রোগ! সেটা কী?’ কুমার আবার প্রশ্ন করলেন। ‘প্রভু, এ এক যাতনা যা শরীরকে আক্রমণ করে। কেউ জানে না কেন বা কীভাবে। এ আরামকে নষ্ট করে দেয়। চরম গ্রীষ্মে অসুস্থ মানুষের শীত করে, পাহাড়ি বরফেও গরম অনুভব করে। এর প্রকোপে কেউ পাথরের মতো ঘুমায়, কেউ উত্তেজনায় পাগল হয়ে যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শরীর গলে গলে পড়ে আবার কোনো ক্ষেত্রে শরীর আকৃতি ঠিক রাখে কিন্তু এমন শীর্ণ হতে থাকে যে হাড় গোনা যায়। আবার কখনো এমন ফুলে উঠে বীভৎস আকার ধারণ করে। রোগ এমনই হয়। কেউ জানে না কোথা থেকে হয়, কী থেকে হয় বা কখন আমাদের আক্রমণ করবে।

‘এই হলো জীবন- যে জীবনকে আমি মধুর ভাবতাম’, বললেন গৌতম। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর চোখ তুলে চাইলেন, ‘মানুষ কীভাবে জীবন থেকে নিষ্কৃতি পায়?’ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘মানুষের কে এমন বন্ধু আছে যে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে?’

‘মৃত্যু’ বলল ছন্দক। ‘দেখুন, ওই আসছে শববাহীরা। নদীর ধারে নিয়ে যাবে শবদেহকে পোড়াতে।’

রাজকুমার তাকিয়ে দেখলেন চারজন বলশালী লোক, কাঁধে একটি নিচু চৌকি, তার ওপর শায়িত সাদা চাদরে ঢাকা একটি মনুষ্য আকৃতি। মানুষটি নড়ছে না, সে চাদরের তলায় স্থির এবং যদিও বাহকরা প্রত্যেক পদক্ষেপে বলে যাচ্ছে, ‘হরি বোল,’ যাকে তারা নিয়ে যাচ্ছে, সে এই প্রার্থনায় নিরুত্তর। সারথি বলল, ‘কিন্তু মানুষ মৃত্যু ভালোবাসে না। তাদের কাছে মৃত্যু বন্ধু নয়- বরং তারা আয়ু ও রোগের থেকেও মৃত্যুকে বড় শত্রু বলে মনে করে। মৃত্যু তাদের আচমকা হানা দেয় এবং তারা একে ঘৃণা করে ও প্রাণপণ এড়ানোর চেষ্টা করে।

গৌতম এবার শবযাত্রার মিছিলের দিকে ভালো করে তাকালেন। তার ভিতরে যেন অন্তর্দৃষ্টি খুলে গেল, তিনি বুঝতে পারলেন মানুষ কেন মৃত্যুকে ঘৃণা করে। মনে হলো যেন তার চোখের সামনে দিয়ে ছবির সারি চলমান। তিনি দেখতে পেলেন যে, মৃত ওই মানুষটির আগে বহুবার মৃত্যু হয়েছে এবং প্রতিবারই তার নবজন্ম হয়েছে। তিনিও এও দেখলেন যে, এই মৃত্যুর পরও ব্যক্তিটি নিশ্চিত এই পৃথিবীতে ফিরবেন। ‘যার জন্ম হয়, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, যার মৃত্যু হয় তার জন্ম অবশ্যম্ভাবী।’ তিনি বললেন, ‘এই জীবনচক্রের ঘূর্ণিতে কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই। ছন্দক, বাড়ি চলো।’

সারথি আদেশ পালন করল। রাজকুমার আর কোনো প্রশ্ন করলেন না, তিনি চিন্তার রাজ্যে হারিয়ে গেলেন। রাজপ্রাসাদে ফিরে- যা যা তার এতকাল মনোহর লাগত সব বিষময় মনে হতে লাগল। সবুজ মখমলি ঘাসের বাগিচা আর পুষ্পিত বৃক্ষ কীই-বা কাজের, এ সবই তো সত্য থেকে আড়াল করার খেলনা মাত্র। তিনি ও যশোধারা তো শিশুর মতো এসব খেলনা নিয়ে সেই বাগানে বসে খেলা করেন, যে বাগানের নিচে অগ্নিগর্ভ আগ্নেয়গিরি যে কোনো মুহূর্তে উদ্গিরণ করে তাদের ধ্বংস করবে। শুধু তারাই নন, অন্য সব মানুষই এই সত্য ভোলানো খেলা খেলে চলেছে, হয়তো-বা তাদের চেয়ে খেলা উপভোগ করার কিছু কম কারণ আছে তাদের। তার হৃদয় এক মহান উদ্বেলিত করুণার সাগরে পরিবর্তিত হয়েছে, শুধুমাত্র মানুষের জন্য নয়, সব জীবের জন্য ভালোবাসার ক্ষমতা আছে ও কষ্ট সহ্য করারও ক্ষমতা আছে। ‘জীবন ও মৃত্যু এক দুঃস্বপ্ন।’ তিনি নিজের মনে মনে বলছিলেন, ‘আমরা কী করে একে চূর্ণ করে জেগে উঠব?’

মানুষের জীবনের তিনটি মহান দুঃখ তাকে বিদ্ধ করল ঠিক যেমনটি তার জন্মের সময় সেই জ্ঞানী ব্যক্তিরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি খেতেও পারলেন না, বিশ্রাম নিতেও পারলেন না। প্রায় মাঝরাতে যখন পুরো রাজপ্রাসাদ ঘুমে মগ্ন, তিনি উঠে নিজের ঘরে পায়চারী করতে লাগলেন। একটি জানালা খুলে বাইরে ঘন অন্ধকার রাতের দিকে চেয়ে রইলেন। বাতাসের এক ঝটকা গাছের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গেল, মনে হলো মাটি যেন কেঁপে উঠল। এই বিশ্ব যেন তাকে বলল, ‘জাগো! তুমি যে জেগে উঠেছ, ওঠো, বিশ্বকে সাহায্য করো।’ কুমারের মন নিঃসন্দেহে এই অমোঘ ডাক শুনলেন এবং শব্দে উচ্চারিত না করেও এর মহাত্ম্য বুঝলেন। তিনি বাইরে রাতের তারার দিকে তাকিয়ে নিজের অন্তরে পথ খুঁজতে চাইলেন, কীভাবে এই জীবনের স্বপ্ন থেকে তিনি বেরিয়ে আসবেন ও তার নিয়তি নির্ধারিত স্থানে পৌঁছবেন। এভাবে ব্যাকুল মনে যখন তিনি দিশা হাতড়াচ্ছেন তখন তার হঠাৎ মনুষ্যজাতির প্রাচীন জ্ঞানী ঋষিদের কথা মনে এল। তিনি বলে উঠলেন, ‘এই খোঁজই তো সেই খোঁজ বা যুগে যুগে মানুষকে সংসার ত্যাগ করে গহন বনে, ভস্ম মেখে জীবনধারণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা নিশ্চয় কিছু জানতে পারেন। এই সেই উপায়। আমিও সেই রাস্তাতেই যাব। তারা তো অর্জিত জ্ঞান বিতরণ করার জন্য আর সংসারে ফেরেন না। তারা নিজেদের মধ্যেই সেই জ্ঞান সঞ্চিত রাখেন বা অন্য জ্ঞানীদের সঙ্গে বিনিময় করেন। আমি যখন এই গোপন রহস্যোদ্ধার করতে পারব, তখন আমি ফিরব, সব মানুষকে আমার জ্ঞানের কথা বলব। তখন নিম্ন থেকে নিম্নতম বর্গের যে সেও জানবে, উচ্চতম বর্গের যে সেও জানবে। মুক্তির উপায় গোটা বিশ্ব জানবে। এই কথা কয়টি নিজ মনে উচ্চারণ করে, জানালা বন্ধ করলেন এবং নিজের ঘুমন্ত পত্নীর শয্যাপাশে এলেন। ধীরে পর্দাগুলো সরিয়ে যশোধারার মুখপানে চাইলেন। এই সময়ই তার মনে প্রথম দ্বন্দ্ব শুরু হলো। তার কি যশোধারাকে পরিত্যাগ করার কোনো অধিকার আছে? তিনি আর কখনো নাও ফিরতে পারেন। একজন রমণীকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিধবা করা কি সাংঘাতিক ও নিষ্ঠুর কর্ম নয়? তার শিশু পুত্রকেও বড় হতে হবে পিতৃস্নেহ ছাড়া? জগতের জন্য আত্মত্যাগ ভালো কিন্তু অপরকে সেই ত্যাগে বাধ্য করা কি উচিত?

তিনি পর্দা আবার টানলেন এবং জানালার কাছে ফিরে গেলেন। তারপরই তার মধ্যে এক উপলব্ধি এল। মনে পড়ল যশোধারার মন সময়ে কত উচ্চ ও মহান মনে হয়েছে তার কাছে। তিনি বুঝতে পারলেন, তিনি যা করতে চলেছেন তার মধ্যে যশোধারারও অংশ থাকবে। তাকে হারানোর যে তীব্র বেদনা, তাতে গৌতমের ত্যাগের অর্ধেক যশোধারার হয়ে উঠবে, আবার তিনি যে জ্ঞান ও আলোকপ্রাপ্ত হবেন তারও অর্ধেক যশোধারার হবে। তিনি আর দ্বিধা করলেন না। আবার বিদায় জানাতে কাছে গেলেন। রেশমের পরদাগুলো সরিয়ে নিচের দিকে তাকালেন। তাকে জাগাতে চাইলেন না, তাই সামনে ঝুঁকে তার পায়ের পাতায় চুম্বন করলেন। ঘুমের মধ্যে যশোধারা একটু আওয়াজ করে পা গুটিয়ে নিলেন। 

নিচে নেমে তিনি ঘুমন্ত ছন্দককে কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে জাগালেন এবং বললেন, রথের সঙ্গে এক্ষুনি নিঃশব্দে ঘোড়া বাঁধতে। তারপর তারা চুপচাপ সিংহদ্বার থেকে বেরিয়ে বড়ো রাস্তায় পড়লেন এবং ঘোড়া দ্রুত ছুটতে লাগল। ধীরে ধীরে কুমার পিতৃগৃহ থেকে বহুদূর চলে গেলেন। ভোর হতে উনি থামলেন এবং রথ থেকে নামলেন। তারপর একের পর এক তার পোশাক ও আভরণ খুলতে লাগলেন। ছন্দকের হাত দিয়ে সব ফেরত পাঠালেন। সেগুলো প্রেমপূর্ণ উপহাররূপে একে-তাকে বার্তা দিয়ে পাঠালেন। তারপর নিজে ভিক্ষুকের পোশাক গোলাপি বস্ত্র পরলেন, গায়ে ভস্ম মাখলেন। হাতে নিলেন লাঠি আর ভিক্ষাপাত্র। ছন্দক অশ্রুপূর্ণ চোখে তার পায়ে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম জানালেন। গৌতম বললেন, ‘পিতাকে বলো, আমি ফিরে আসব।’ তারপর সংক্ষিপ্ত বিদায় জানিয়ে, জঙ্গলে মিলিয়ে গেলেন। ছন্দক সেই স্থানে রাজকুমার অদৃশ্য হওয়ার পরও অনকেক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ঝুঁকে শ্রদ্ধাবণত চিত্তে যেখানে কুমার দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখানকার ধুলো তুলে মাথায় ঠেকালেন, তারপর রথ ঘুরিয়ে খবর দিতে গেলেন রাজাকে।

একটানা ছয় বছর রাজকুমার গৌতম তার সন্ধানে নিমগ্ন রইলেন। অবশেষে এক রাত্রে ধ্যানস্থ অবস্থায়, বোধিবৃক্ষের নিচে তিনি গভীর সত্য উপলব্ধি করলেন এবং সব জ্ঞানের উন্মেষ ঘটল। তখন থেকে তার আর সব নাম হারিয়ে গেল এবং তিনি পরিচিত হলেন ‘বুদ্ধ’ নামে। সেই আলোকপ্রাপ্তীর চরম মুহূর্তে তিনি উপলব্ধি করলেন যে জীবনের প্রতি তৃষ্ণাই সব দুঃখের কারণ। বাসনা থেকে মুক্ত হলে মানুষ সত্যেই মুক্তিপ্রাপ্ত হয়। এবং তিনি এই মুক্তির নাম দিলেন, ‘নির্বাণ’ এবং নির্বাণের প্রতিকূলতা ভরা এই পথকে তিনি আ্যখ্যা দিলেন ‘শান্তির’ পথ।

এই সবই ঘটেছিল সেই বনে, যার নাম আজ বুদ্ধগয়া, এবং আজও যেখানে সেই মহান বোধিবৃক্ষের পাশে একটি সুপ্রাচীন মন্দির আছে, যার প্রাচীনতা ঠিক বোধিবৃক্ষের পরই। বুদ্ধ সেখানে কিছুদিন থাকলেন, অনেক কথা ভাবলেন, তারপর সেই বন ছেড়ে বারাণসীতে এলেন এবং সেখানে মৃগবনে পাঁচজন সন্ন্যাসীর কাছে প্রথম বাণী প্রচার করলেন। এই সময় থেকেই তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল এবং বহু সংখ্যক মানুষ তার অনুগামী হলেন। দুই ব্যবসায়ী কপিলাবস্তু যাাচ্ছিলেন, তাদের মাধ্যমে তিনি পিতা ও যশোধারাকে খবর পাঠালেন যে তিনি নিশ্চয় বাড়ি যাবেন। অবশেষে বুদ্ধের খবর পেয়ে তাদের আর আনন্দের সীমা রইল না। বৃদ্ধ রাজা চাইছিলেন পুত্রের জন্য রাজকীয় অভ্যর্থনার আয়োজন করতে কিন্তু তিনি দেখলেন বহু লোকের ভিড় জমেছে, রাজদ্বারে সেনারা প্রস্তুত, অস্থির ঘোড়ারা হ্রেষারব তুলছে আর সেখানে আগত আপাদমস্তক হলুদ রঙে আবৃত এক ভিক্ষু, তিনি মানুষের ভিক্ষা গ্রহণ করছেন। মহারাজের তাঁবুর পাশ দিয়ে তিনি যখন যাচ্ছিলেন, রাজা দেখলেন এ তো তারই পুত্র। যিনি সাত বছর আগে গহিন রাতে রাজ্যে ত্যাগ করেছিলেন আর আজ বুদ্ধ হয়ে ফিরে এসেছেন। কিন্তু ভিক্ষু বুদ্ধ কোথাও না থেমে সোজা এগিয়ে গেলেন নিজের প্রাসাদের দিকে এবং নিজের ঘরে স্ত্রী-পুত্রের সামনে এসে দাঁড়ালেন। যশোধারাও হলুদ বস্ত্র ধারণ করেছিলেন। যেদিন সকালে তিনি জেগে উঠে জেনেছিলেন তার স্বামী সংসার ত্যাগ করে বনে গেছেন, সেই দিন থেকে তিনি তার স্বামীর জীবনধারার অংশীদার হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি ফলমূল ছাড়া কিছু খাননি, ছাদ বা বারান্দার মেঝেতে ছাড়া আর কোথাও শয়ন করেননি। তিনি রাজকুমারীর সব আবরণ ও আভরণ দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। এখন তিনি শ্রদ্ধাভরে গৌতমের পায়ের কাছে বসলেন ও তার পরিহিত বস্ত্রের প্রান্তের বাঁ-দিকে চুম্বন করলেন। তারা প্রায় কোনো কথাই বললেন না। বুদ্ধ তাকে আশীর্বাদ করলেন ও চলে গেলেন। তখন যশোধারার মনে হলো তিনি স্বপ্ন থেকে জেগে উঠলেন। তাড়াতাড়ি পুত্রকে ডেকে বললেন, ‘যাও পিতার কাছে, গিয়ে চাও তোমার উত্তরাধিকার। ‘মা, আমার বাবা কে?’ বালকটি ভীতুস্বরে মুণ্ডিত মস্তক, হলুদ পরিহিত ভিড়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। কিন্তু যশোধারা কোনো বর্ণনা দিলেন না, ‘তোমার পিতা’ তিনি বললেন, ‘ওই পুরুষসিংহ যিনি তোরণের দিকে যাচ্ছেন।’ বালকটি সোজা পিতার কাছে গিয়ে বলল, ‘পিতা, আমাকে পৈতৃক উত্তরাধিকার দিয়ে যান।’ সে কথা তিনবার বলার পর, বুদ্ধের প্রধান শিষ্য আনন্দ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি দিতে পারি?’ বুদ্ধ বললেন, ‘দাও’ এবং সেই হলুদ বস্ত্র বালকের গায়ে ফেলে দেওয়া হলো। তারা ফিরে দেখলেন, পেছনে মা আসছেন, তার মাথায় ঘোমটা টানা। তিনি নিশ্চিত স্বামীর সঙ্গে থাকতে চাইছেন। কোমল হৃদয় আনন্দ আবার জিজ্ঞেস করল, ‘প্রভু, কোনো নারী কী আমাদের সংঘে আসতে পারেন না? তিনি কি আমাদের একজন হতে পারেন না?’ বুদ্ধ বললেন, ‘মানুষের জীবনের তিন যন্ত্রণা কি পুরুষদের মতো নারীদের জীবনেও ঘটে না? তা হলে শান্তির পত্রে তাদের চরণচিহ্ন পড়বে না কেন? আমার সত্য, আমার সংঘ সবার জন্য। তবু এই অনুরোধ তোমরই করা ভবিতব্য ছিল, আনন্দ।’ যশোধারাও সংঘে গৃহিত হলেন। তিনি বুদ্ধের কাছাকাছি একই কাননে বাস করতে লাগলেন ও সংঘের ধর্মপালন করতে শুরু করলেন। তার দীর্ঘ বৈধব্যের অবসান ঘটল এবং অবশেষে তিনিও শান্তির পথে পা বাড়ালেন।

জগতের সব প্রাণী সুখী হোক

লেখক: অধ্যক্ষ, সিলেট বৌদ্ধবিহার