আজকের যুগে আমাদের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন শুধু একটি যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি জ্ঞান, বিনোদন ও তথ্যের এক বিশাল ভাণ্ডার। এই যন্ত্রটি আমাদের জীবনকে করেছে অনেক সহজ ও দ্রুত। কিন্তু একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের নিজেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা উচিত—এই প্রযুক্তি কি আমাদের দ্বীনের পথে আলোকিত করছে, নাকি ধীরে ধীরে আমাদের ঈমানকে দুর্বল করে দিচ্ছে? স্মার্টফোনকে বলা যেতে পারে একটি ধারালো তরবারি। এর সদ্ব্যবহার করলে এটি যেমন আমাদের জীবনের অনেক উপকার করতে পারে, তেমনি এর অপব্যবহার আমাদের জন্য ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ বিপদ। এ বিপদ হতে পারে পরকালীন জীবনের কিংবা ইহজীবনের।
আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না তারা কি সমান? বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা যুমার, আয়াত ৯)। এই আয়াতটি থেকেই আমরা বুঝতে পারি, ইসলামে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা এও জানি যে, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ করা হয়েছে। অতীতে জ্ঞান অর্জনের জন্য মাসের পর মাস কঠিন পথ পাড়ি দিতে হতো। অথচ এখন একটিমাত্র ক্লিকেই ইসলামের মৌলিক বিষয় থেকে শুরু করে গভীর আকিদা, ফিকহ, হাদিস, তাফসির—সবকিছুই আমাদের হাতের নাগালে।
স্মার্টফোন আমাদের জন্য এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এখন আমরা ঘরে বসেই বিশ্বের সেরা আলেমদের আলোচনা শুনতে পারি, নির্ভরযোগ্য ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনলাইন কোর্স করতে পারি এবং কোরআনের তাফসির ও হাদিসের ব্যাখ্যা শিখতে পারি। এ ছাড়াও বিভিন্ন ইসলামিক অ্যাপ আমাদের প্রতিদিনের ইবাদতকে সহজ করে তুলেছে। যেমন- নামাজের সঠিক সময়, কিবলার দিক নির্ণয়, কোরআন তেলাওয়াত, হাদিস সংগ্রহ, জিকির গণনা এবং জাকাতের হিসাব করার মতো অনেক কাজ এখন এই অ্যাপগুলোর মাধ্যমে সহজেই করা সম্ভব।
রাসুলুল্লাহ (সা) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো পথে জ্ঞান অন্বেষণে বের হয়, আল্লাহতায়ালা তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন’ (মুসলিম)। বর্তমান যুগে আমাদের এই পথ হতে পারে একটি বিশ্বস্ত ইসলামিক ভিডিও, একটি শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম বা একটি শিক্ষামূলক অডিও ক্লিপ। তবে প্রযুক্তির এই অফুরন্ত সুযোগের পাশাপাশি রয়েছে মারাত্মক কিছু ঝুঁকিও। ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিপুল তথ্যের ভিড়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন। অনেক সময় দেখা যায়, সঠিক জ্ঞানের অভাবে মানুষ ভুল ফতোয়া, অসত্য হাদিস বা বিকৃত মতাদর্শের শিকার হয়। কখনো কখনো কুচক্রী মহল ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বীন সম্পর্কে ভুল তথ্য সরবরাহ করে এবং লোকেদের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করে তুলতে চেষ্টা করে। এর ফলে সমাজে সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি এবং বিভেদ। সমাজে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে হীনস্বার্থ চরিতার্থ করাই এদের উদ্দেশ্য।
এ ছাড়াও রয়েছে—অবাঞ্ছিত বিনোদন, অশ্লীলতা আর সময়ের অপচয়। মোবাইল গেমে আসক্তি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রল করা এবং অহেতুক চ্যাট ও ভিডিওতে সময় নষ্ট করা আমাদের মূল্যবান সময় ও মনোযোগ কেড়ে নেয়। এ জাতীয় অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করা ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। এগুলো আমাদের ইবাদত ও দ্বীনি কাজ থেকে দূরে ঠেলে দেয়।
প্রযুক্তিকে তাই আমাদের বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করতে হবে। আমরা যদি সঠিক নিয়ত ও সচেতনতার সঙ্গে স্মার্টফোন ব্যবহার করি, তা হলে এটি আমাদের জন্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মাধ্যম হতে পারে। প্রতিদিন যদি আমরা অল্প কিছু সময় কোরআনের কয়েকটি আয়াত অর্থসহ বোঝার জন্য ব্যয় করি, একটি ভালো ইসলামি লেকচার শুনি বা কোনো ইসলামিক অ্যাপের মাধ্যমে দ্বীনি জ্ঞান অর্জন করি, তবে এটি আমাদের ঈমান ও জীবনকে ইতিবাচকভাবে পরিবর্তন করতে পারে।
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটকে দূরে ঠেলে না দিয়ে বরং এর সঠিক ব্যবহার করে এটিকে আমাদের ইসলামিক জীবনযাপনের একটি সহযোগী হিসেবে গড়ে তোলা উচিত। আমরা যেন প্রযুক্তির আলোয় নিজেকে হারিয়ে না ফেলি, বরং এই আলোয় খুঁজে নিই সেই পথ, যা আমাদের জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়, বরং এর ভালো-মন্দ নির্ভর করে আমাদের নিয়ত ও ব্যবহারের ওপর। একজন মুমিন ব্যক্তি চাইলে এই প্রযুক্তির মাধ্যমেই নিজের জন্য জান্নাতের পথ প্রশস্ত করতে পারেন।