প্রকৃতির নিয়ম মেনে পৃথিবী তার কক্ষপথে অগ্রগামী, তার কাছে সময়ের হিসাব নেই! তার গতিবেগ অনুযায়ী আমরা একটি সময়ের নিয়ম বানিয়েছি। ক্যালেন্ডারের হিসাব অনুযায়ী শেষ হয়ে যাচ্ছে দিন, মাস, বছর। একই সঙ্গে অতিবাহিত হচ্ছে আমাদের মূল্যবান হায়াত। তাই বছর শেষের গোধূলিলগ্নে আমাদের বেশকিছু ভাবার বিষয় আছে। সারা বছরে আমি কী কী অর্জন করেছি? অবহেলায় কাটিয়েছি কতটুকু সময়? বিগত কোন কাজের জন্য আগামী কয়েক বছর পর আমি আফসোস করব?
বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, আপনার বর্তমান অবস্থান বিগত কয়েক বছর আগের প্রচেষ্টার ফসল! আপাতদৃষ্টিতে সফল হলে সেটি বিগত কয়েক বছরের প্রচেষ্টা, আর ব্যর্থ হলে বিগত কয়েক বছরের অলসতা। তাই বছর শেষে হিসাব কষা জরুরি! তার সঙ্গে সঙ্গে আগত বছরের প্ল্যান কী, সেটা করাও জরুরি।
বিদায়ী বছরের হিসাব
১. সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যয় করা সময়ের হিসাব
আমাদের অর্ধেকের বেশি প্রোডাক্টিভিটি নষ্ট করে সোশ্যাল মিডিয়া। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণায় পাওয়া গেছে— টিনএজারদের মধ্যে প্রায় ৬০% ১৬-১৮ বছর বয়সীরা দিনে ২-৪ ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় ব্যয় করে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা উদ্বেগ বাড়ছে এই ব্যবহারের সঙ্গে। তাই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে বিগত বছরের কত সময় অতিবাহিত হয়েছে, সেটি হিসাব করে আগামী বছরের প্ল্যান তৈরি করতে হবে।
২. অপূরণীয় টার্গেট ফাইন্ড আউট
কোনো কিছু করার টার্গেট নেওয়ার পরও যেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি, সেগুলো ফাইন্ড আউট করে কী কারণে সেটির ব্যত্যয় ঘটেছে সেগুলো লিখতে হবে। এবং কারণগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো উত্তরণের উপায় প্ল্যান করতে হবে।
৩. অন্যের অধিকারের হিসাব
সবচেয়ে বড় অন্যায় হচ্ছে অন্যের অধিকার হরণ করা- সেটা সম্পদ, সম্মান ও বিভিন্ন দিক দিয়ে হতে পারে। কারও মাধ্যমে যদি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকে, তার মানে সে অধিকার হরণ করেছে! তাই কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে, কিংবা অধিকার নষ্ট করলে, তারও তালিকা রাখা উচিত। যাতে বছর শেষে তার থেকে ক্ষমা চাওয়া যায়। এ ছাড়াও ব্যক্তিভেদে বিগত বছরের হিসাবের পয়েন্ট আরও বৃদ্ধি হতে পারে।
আগত বছরের প্ল্যান
১. স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান
নিজেকে প্রোডাক্টিভ রাখার জন্য নতুন স্কিল ডেভেলপমেন্ট করা অপরিহার্য। অগ্রগামী পৃথিবীতে যদি নিয়মিত স্কুল ডেভেলপমেন্ট করা না হয়, তা হলে বাস্তবতা থেকে অনেক পিছিয়ে পড়তে হয়। সে কারণে প্রতিবছরে কয়েকটি ডেভেলপমেন্টের টার্গেট নেওয়া উচিত।
২. টাইম ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান
টাইম ম্যানেজমেন্টের প্ল্যান ছাড়া টার্গেট অ্যাচিভ করা যায় না। তাই ২৪ ঘণ্টার প্ল্যান করা জরুরি। বিকালে পার্কে যাওয়ার মতো ছোট কাজগুলোও প্ল্যানের আওতাভুক্ত হতে হবে। তা হলে সময়ের অপচয় দৃষ্টিগোচর হবে।
৩. পার্সোনাল টাইম ভ্যালু নির্ধারণ করা
প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত টাইম ভ্যালু থাকে। যেমন একজন মানুষ যদি ৫০ হাজার টাকা ইনকাম করে আর তার কর্মঘণ্টা যদি ৮ ঘণ্টা হয়, তা হলে ৫০০০০-কে প্রথমে মাসিক কর্মদিবস দিয়ে ভাগ করতে হবে। এর পর পর্যায়ক্রমে প্রতি কর্মঘণ্টার ভ্যালু বের করতে হবে। এর পর যেকোনো কাজ করার আগে সেই সময়টার কর্মঘণ্টা থেকে বেশি মূল্যবান কি না তা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করতে হবে। তা হলে প্রোডাক্টিভিটি কমবে না।
৪. অধ্যয়নের প্ল্যান করা
ফ্রান্সিস বেকন বলেন, ‘Reading makes a full man.’ নিয়মিত পড়া মানুষকে অসম্পূর্ণতা থেকে পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। নিয়মিত অধ্যয়নের মাধ্যমে মেধা বিকাশসহ কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি পায়। এ জন্য নিয়মিতভাবে একটি রুটিন করা উচিত- যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণে প্রতিদিন কিছুসংখ্যক ধর্মীয় বই, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, সমসাময়িক এবং অন্যান্য বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হয়।
৫. দৈহিক সুস্থতা ও নিয়মিত ব্যায়াম
ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ‘বিশ্বের প্রায় ১.৯ বিলিয়ন বয়স্ক মানুষ স্থূল বা ওজন বেশি। অর্থাৎ বিশ্ববয়সীদের ৩০%-এরও বেশি স্থূলতার সমস্যায় ভুগছে।’
তাই সপ্তাহে পাঁচ দিন হলেও শারীরিক ব্যায়ামের পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া উচিত। বিগত বছরের সমস্ত ত্রুটি চিহ্নিত করে আগামী বছরের প্ল্যানগুলো নিজের মতো করে কাস্টমাইজেশন করলে, প্রতিবছর শেষে নিজের কিছু অর্জনের তালিকা সমৃদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক: যুগ্ম মহাসচিব
শানে সাহাবা জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশন