ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ভয়ভীতি দেখিয়ে নারী-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বিএসএফ: ভারতের মানবাধিকার সংগঠন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভূমিকম্প অনুভূত ভারত আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করে পুশইন করছে: জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি হবিগঞ্জে বজ্রপাতে ৩ জনের মৃত্যু, আহত ৩ নিয়মের তোয়াক্কা নেই, সড়কে বেপরোয়া ডিএসসিসির ডাম্পট্রাক চার দিনের সফরে বেইজিং গেছেন তথ্যমন্ত্রী কক্সবাজারে মানবপাচার চক্রের মূলহোতা ছৈয়দুল হক আটক ডিক্যাব ও বাংলাদেশ চীন আপন মিডিয়া ক্লাবের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই শরীয়তপুরে মব করে প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলা এনসিটিবিসহ চার শিক্ষা বোর্ডে নতুন নেতৃত্ব স্বপ্নে গান শোনা আসলে কীসের ইঙ্গিত? ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে ছিনতাই, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জেট ফুয়েলের দাম লিটারে কমল ১৫ টাকা চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স চালক-এনসিপি কর্মীদের মারামারি গ্রীন চট্টগ্রাম গড়তে লাগানো হচ্ছে ১০ লাখ গাছ চসিকের সড়ক ও ফুটপাত থেকে দেড় শতাধিক ভাসমান দোকান উচ্ছেদ মনপুরায় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান লেখা নিয়ে উত্তেজনা জ্বালানির মজুদ সম্প্রসারণ, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণসহ ১২ দফা সুপারিশ সংসদীয় কমিটির ঢামেক ও চমেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতি, ৬ দফা দাবি ভোলায় মিতু হত্যাকাণ্ডে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক, ওসিকে তলব বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল কুমিল্লায়  ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল থেকে ৪৫ জন আটক; ৫ বাস-মাইক্রো জব্দ গোয়েন্দারা কেন প্রকাশ্যে আসছেন? শিশুদের নাটক ‘ডাকাত হালুম চিৎপটাং’ মেট্রো স্টেশনগুলোর নিচে দুরবস্থা জন্মদিনে এল লাকী আখান্দের অপ্রকাশিত গান নূরজাহান ট্র্যাজেডির সমাজতাত্ত্বিক পাঠ কিয়ামতের ময়দানে রাসুল (সা.)-এর পাশে থাকার উপায় সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন: টিআইবি
Nagad desktop

বিচার বিভাগের মর্যাদা ফেরাতে ব্যাপক উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৪, ০৩:২০ পিএম
বিচার বিভাগের মর্যাদা ফেরাতে ব্যাপক উদ্যোগ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হচ্ছে শনিবার (১৬ নভেম্বর)। এ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর যেসব সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে তার মধ্যে বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে সফলতা অনেক বেশি। গত ১০০ দিনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুর শীর্ষেও ছিল বিচার বিভাগ। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, এমনকি নিম্ন আদালতেও ব্যাপক কর্মতৎপরতা দেখা গেছে। 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকারের সার্বিক সহযোগিতা এবং নতুন প্রধান বিচারপতির উদ্যোগের কারণে সংস্কারের পথ অনেকটা সহজ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। প্রধান বিচারপতির পরামর্শে নিম্ন আদালতের বিচারকদের ব্যাপক রদবদল করে সরকার। এ ছাড়া বিগত সরকারের দোসর বিবেচনায় হাইকোর্টের বিতর্কিত বিচারপতিদের বিচারিক কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেওয়া, নিম্ন আদালতে বিচারক বদলির নীতিমালা প্রণয়ন এবং বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে ফেরাতে সংশ্লিষ্ট মামলা নিষ্পত্তি, কুইক রেন্টালের দায়মুক্তি অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেওয়াসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের অনেকটা সফলতাও এসেছে।

বিগত সরকারের প্রভাবিত বিচার বিভাগ নিয়ে বিতর্ক ছিল সব মহলে। ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর সেই বিতর্ক কাটিয়ে বিচার বিভাগের মর্যাদা ফেরাতে প্রথম উদ্যোগ নেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা। তারা বিতর্কিত বিচারপতিদের সরিয়ে সেখানে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বিচারপতিদের দায়িত্ব দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হয়। 

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে যেতে বাধ্য হন। সেই সময়ে প্রধান বিচারপতির নির্দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। সরকার পতনের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান সরকারি বাসভবন ছেড়ে আত্মগোপনে যান।

৬ আগস্ট কয়েকজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগ করেন। ৭ আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেলের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এ এম আমিন উদ্দিন। পর দিন ৮ আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদুজ্জামান। ওই দিন সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৭ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদের নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। ওই দিনই নতুন সরকারের বৈধতা প্রশ্নে ভার্চ্যুয়ালি শুনানির মাধ্যমে বিশেষ মতামত (স্পেশাল রেফারেন্স) দেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের ৭ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ।

এর পর ১০ আগস্ট সকালে ফুল কোর্ট সভা ডাকেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি। বিষয়টি ৯ আগস্ট রাতের মধ্যেই ব্যাপকভাবে জানাজানি হয়। ‘জুডিশিয়াল ক্যু’র পরিকল্পনায় এই সভা ডাকা হয়েছে অভিযোগ করে পর দিন সকালে বিক্ষোভে উত্তাল হয় সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণসহ আশপাশের এলাকা। বৈষম্যবিরোধী হাজারও ছাত্র সকাল ৯টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের দোসর উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের সব বিচারপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিতর্কিত বিচারপতিদের দুপুরের মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেন। অবশেষে আন্দোলনের মুখে বিকেলে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের ৬ বিচারপতি পদত্যাগে বাধ্য হন। 

নাটকীয় ঘটনার দিন: ১০ আগস্ট সকাল ৯টা থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ঘিরে দিনভর নাটকীয় ঘটনার সংবাদ আসতে থাকে। প্রধান বিচারপতি সকালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে ফুলকোর্ট সভা আহ্বান করলেও আন্দোলনকারীরা ঘেরাওয়ের ডাক দেওয়ার পর তা স্থগিত করা হয়। কিন্তু তাতেও শান্ত হননি বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা। তারা আপিল বিভাগের সব বিচারপতির পদত্যাগের দাবিতে সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করেন। দাবি মানা না হলে প্রধান বিচারপতির বাসভবন ঘেরাওয়েরও হুঁশিয়ারি দেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ। আন্দোলন চলাকালে দুপুরের পর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান পদত্যাগ করেছেন বলে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় খবর দেন অন্তর্বতী সরকারের আইন ও বিচার উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এরপর বেলা আড়াইটার দিকে আন্দোলনকারীরা সুপ্রিম কোর্ট এলাকা ছেড়ে চলে যান। সন্ধ্যার পর আপিল বিভাগের আরও পাঁচ বিচারপতি পদত্যাগ করেন। রাতেই প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। দেশে হাইকোর্টের কোনো বিচারপতি আপিল বিভাগে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে সরাসরি প্রধান বিচারপতি হওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম। আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকলেও আগে এমনটা ঘটেনি। সাধারণত আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। তবে এক দিন পর আপিল বিভাগে আরও চার বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

আগের সব আইন কর্মকর্তা বাদ: যারা পদত্যাগ করেননি, সেসব ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি), সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের (এএজি) নিয়োগ বাতিল করে সবশেষ ২৮ আগস্ট এক প্রজ্ঞাপনে আরও ৬৬ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ও ১৬১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল (এএজি) নিয়োগ দেয় সরকার। এর আগে অ্যাটর্নি জেনারেল, ৩ জন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও ৯ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলসহ মোট ২৪০ জনকে আইন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

বিচারক রদবদল: অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর আগস্ট মাসে বিচার বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের মধ্যে কয়েকজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তবে ৯ সেপ্টেম্বর ব্যাপক রদবদল করা হয়। ওই এক দিনেই অধস্তন আদালতের ২৫২ জন বিচারককে বদলি করা হয়। একই দিন আইন সচিব মো. গোলাম সারওয়ারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এ ছাড়া যুগ্ম সচিব (প্রশাসন-১) মো. গোলাম রব্বানীকে আইন সচিবের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুনদের পদায়ন করা হয়। 

২৩ অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগ: হাইকোর্টের বিতর্কিত বিচারপতিদের সরিয়ে দিতে একদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের দাবি অব্যাহত ছিল, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের বিক্ষোভ চলছিল। এর একপর্যায়ে গত ৯ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে ২৩ জনকে নিয়োগ দেয় সরকার। 

১২ বিচারপতি বিচারিক দায়িত্বের বাইরে: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে গত ১৭ অক্টোবর হাইকোর্টের ১২ জন বিচারপতিকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। আগের দিন ১৬ অক্টোবর বিকেলে হাইকোর্টের বর্ধিত ভবনের সামনে বিক্ষোভের স্থানে উপস্থিত সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল আজিজ আহমদ ভূঞা ছাত্রদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের যে দাবি, আপনাদের যে লিডার, তারা আমার চেম্বারে বসেছিলেন। আমরা দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেছি। পরবর্তী পর্যায়ে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে কথা বলেছি। সঙ্গে দুজন সহকর্মী ছিলেন। আপনারা জানেন, বিচারপতির পদত্যাগ বা অপসারণ- এটার একটা প্রক্রিয়া আছে। বর্তমানে দেশে এ-সংক্রান্ত কোনো আইন বিদ্যমান নেই। বিগত সরকার সংসদের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছিল। একটা সংশোধনী হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট সেটা বাতিল করে দিয়েছেন। সেটা আবার সরকার রিভিউ আকারে পেশ করেছে। রবিবার (২০ অক্টোবর) সেটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগে শুনানির ১ নম্বর আইটেমে রাখা হয় সেটি।’ এ ঘোষণায় আশ্বস্ত আন্দোলনকারীরা হাইকোর্ট এলাকা ছাড়েন।

এই ঘোষণার আগে প্রধান বিচারপতি ওই ১২ বিচারপতিকে চায়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন। তারা হলেন- বিচারপতি আতাউর রহমান খান, বিচারপতি নাইমা হায়দার, বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ, বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার, বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস, বিচারপতি খিজির হায়াত, বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান, বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান, বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন, বিচারপতি মো. আখতারুজ্জামান, বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসাইন দোলন।

সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ মতামতে যা আছে: গত ২১ অক্টোবর একটি জাতীয় পত্রিকায় শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাওয়া যাচ্ছে না মর্মে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এ নিয়ে সারা দেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কোথাও কোথাও অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে ওই দিনই রাষ্ট্রপতির প্রেস উইং থেকে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শেখ হাসিনার পদত্যাগ, দেশত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক বৈধতার ওপর যত ধরনের প্রশ্ন জনমনে উদ্রেক হয়েছে সেগুলোর যাবতীয় উত্তর স্পেশাল রেফারেন্স নং-০১/২০২৪-এ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের গত ৮ আগস্ট-২০২৪-এর আদেশে প্রতিফলিত হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত চাওয়া হয় রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পক্ষে মতামত দিয়ে স্পেশাল রেফারেন্স প্রদান করেন। স্পেশাল রেফারেন্সে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতি বলেন, দেশের বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিগত ৬ আগস্ট ২০২৪ তারিখে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভেঙে দিয়েছেন, সেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৮ (৩) অনুসারে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করা সম্ভবপর নয়।

সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করার বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ থেকে ৮ আগস্ট ১০.০০.০০০০.১২৭,৯৯.০০৭.২০.৪৭৫ নম্বর স্মারকে প্রেরিত পত্রে বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জনগুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত যাচাই করা হয়েছে।

এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের কোনো বিধান না থাকায় উল্লিখিত প্রশ্নের বিষয়ে “বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ‘উপদেশমূলক’ এখতিয়ার প্রয়োগ করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই মতামত প্রদান করছে যে, রাষ্ট্রের সাংবিধানিক শূন্যতা পূরণে জরুরি প্রয়োজনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্য পরিচালনার নিমিত্ত অন্তর্বর্তীব্যবস্থা হিসেবে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টা নিযুক্ত করতে পারবেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি উক্ত রূপে নিযুক্ত প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টাকে শপথবাক্য পাঠ করাতে পারবেন।”

ভালোবাসা বটমূলে

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২২ পিএম
ভালোবাসা বটমূলে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ভোর ৫টায় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই শমীকের ঘুম ভেঙে গেল। ডানপাশে টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখে স্ক্রিনে তার বন্ধু চন্দন রায়ের নাম।
‘কীরে শমীক, ঘুম ভেঙেছে? আজ পয়লা বৈশাখ, মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। আমি ৬টার আগেই বটমূলে পৌঁছাতে চাই। তুই সময়মতো রমনা পার্কের প্রধান গেটে গিয়ে অপেক্ষা করবি, আমরা একসঙ্গে ভেতরে যাব।’
‘ঠিক আছে দোস্ত, আজ সারা দিন আমরা একসঙ্গে কাটাব। বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখব, গান শুনব। তার পর যাব চারুকলায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখব, ওদের সঙ্গে হাঁটব।’
‘তার পর আমরা যাব ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, ওখানে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান হয়। খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও থাকে। আজ দুপুরের খাওয়া ওখানেই হবে।’
‘সবই ঠিক আছে, সবই হবে। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড চৈতি আজকের দিনে আমাদের সঙ্গে থাকবে না, এটা ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে। আগে প্রতিটি পয়লা বৈশাখে আমরা তিনজন একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম, কত আনন্দ করতাম। হঠাৎ তোদের কী হলো? তোরা আড়ি দিলি কেন?’
‘আমি তো আড়ি দিইনি, ওই দিয়েছে। মেয়েটা বড় সেনসিটিভ, ওর আঁকা পেইন্টিং নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতেই ও রেগে গেল, কথা বন্ধ করে দিল। তিন মাস হয়ে গেল আমাকে ফোন করে না, ফোন ধরে না। দেখা হলে কথাও বলে না।’
‘ঠিক আছে, আজ যদি চৈতিকে বটমূলে পাই, আমি কথা বলব ওর সঙ্গে। আড়ি ভাঙিয়ে তোদের ভাব করিয়ে দেব। চিন্তা করিস না। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা। ৬টার মধ্যেই বটমূলে পৌঁছতে হবে।’ 

২.
শমীক মাহমুদ ও চন্দন রায় দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র। তৃতীয় বর্ষ অনার্সে ওরা পড়ছে। শমীক থাকে শহীদুল্লাহ হলে, জগন্নাথ হলে থাকে চন্দন। ওরা এইচএসসি পাস করেছে একই সঙ্গে ঢাকা কলেজ থেকে। সেখানে হোস্টেলে থেকেছে একই রুমে। শুরু থেকেই ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। শমীক কবিতা লেখে স্কুলজীবন থেকেই। এখন তার কবিতা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বন্ধু চন্দন কবিতা না লিখলেও শমীককে কাব্যচর্চায় উৎসাহ দেয়। 
শমীক ও চন্দন দুজনেই চিত্রশিল্পের অনুরাগী। চারুকলা ইনস্টিটিউটে কোনো প্রদর্শনী থাকলে ওরা যাবেই। এ কারণেই চারুকলায় তাদের যাতায়াত ছিল। এমনি এক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে ওদের পরিচয় হয়ে গেল ফাইন আর্টস বিভাগের ছাত্রী চৈতি রহমানের সঙ্গে। চারুকলা চিত্রশিল্প নিয়ে কথা বলতে বলতে ওদের সম্পর্ক, আরও ঘনিষ্ঠ হলো। শমীক কবিতা লেখে জেনে চৈতি খুশি হলো। সেও কবিতা পছন্দ করে, মাঝেমধ্যে লিখেও ফেলে। 
ওদের প্রায়ই দেখা যায় টিএসসি অথবা মধুর রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। কখনো ওরা বেইলি রোডের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে। শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানেও যায়, নাটক দেখে। এভাবে দিন গড়িয়ে যায়, ওদের লেখাপড়াও এগিয়ে চলে। 
চন্দন একদিন বুঝতে পারে শমীক ও চৈতির সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায় ছেড়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে। চৈতির প্রতি চন্দনের দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সে বাস্তববাদী। বাস্তবকেই মেনে নেয় চন্দন। নিজেকে সে গুটিয়ে নিতে থাকে ওদের কাছ থেকে। মনে মনে বলে, ‘সত্য যে বড়ই কঠিন/ সে কখনো করে না বঞ্চনা/ তাই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ 
কিন্তু শমীকের কাছে ধরা পড়ে যায় চন্দন। শমীক তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে তোর? তুই আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকিস কেন?’
‘দূরে কোথায়, তোদের কাছেই তো থাকি। আমাকে ডাকলেই পাওয়া যায়।’
‘তা পাওয়া যায়, কিন্তু ডাকতে হবে কেন? আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম, এক সঙ্গেই থাকতে চাই। কিন্তু তুই একটু দূরে সরে গেছিস। কেন বুঝতে পারছি না। তাই জানতে চেয়েছি কী হয়েছে।’
এবার চন্দন হেসে ফেলে। শমীকের পিঠে হাত রেখে বলে, ‘কিছুই হয়নি দোস্ত, সব ঠিক আছে। আমি তোকে খুব ভালোবাসি, সব সময় তোর ভালোটাই আমি চাই। তাই তোর পথ থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম। তোরা দুজন এগিয়ে যা। আমি তোদের পাশে না হলেও ঠিক পেছনে আছি।’ 
‘না, আমি তোকে আমার পাশেই চাই। আমরা তিনজন আগের মতোই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একজনকে পাওয়ার জন্য তোকে আমি হারাতে চাই না চন্দন।’
‘বোকার মতো কথা বলছিস শমীক। আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না। তোদের সঙ্গেই থাকব। আমি শুধু তোদের দুজনকে স্থায়ীভাবে এক করে দিতে চাই। তোর আর চৈতির জুটিটা চমৎকার হবে। একজন কবি, আরেকজন শিল্পী, তোদের দুজনেরই কাজ অনেক সুন্দর হবে, সৃষ্টিশীলতা অনেক বাড়বে।’

৩.
সেদিন বাংলা নববর্ষ-পয়লা বৈশাখ। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। ভোর ৬টার মধ্যেই শমীক পৌঁছে যায় রমনা পার্কের প্রধান গেটে। গিয়ে দেখে চন্দন আগেই এসেছে সেখানে।
‘শুভ নববর্ষ শমীক। তোকে অনেক ধন্যবাদ, সময়মতো এসেছিস। হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরেছিস, তোকে খুব মানিয়েছে।’
‘শুভ নববর্ষ চন্দন। হ্যাঁ, এই পাঞ্জাবিটা আমার খুব পছন্দের। গত বছর নববর্ষে চৈতি উপহার দিয়েছিল। একবার ভাবলাম এটা আর পরব না। তার পরেই মনটা কেমন হয়ে গেল। এটাই পরে ফেললাম।’
‘খুব ভালো করেছিস। তোকে এই পাঞ্জাবি পরা দেখলে চৈতির মনটাও নরম হয়ে যাবে। তোদের মান-অভিমানের মীমাংসা আজই করে ফেলব। চল বটমূলের দিকে যাই। দেখি চৈতি এসেছে কি না।’
ওরা দুজন মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। তখন ঘড়িতে সোয়া ৬টা। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসে গেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী মানুষ আসছেন রমনায়, অনেক দম্পতির সঙ্গে তাদের শিশু সন্তানও আছে। 
রমনার প্রাঙ্গণে জনতার ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বেশির ভাগ পুরুষের পরনে পাঞ্জাবি-সাদা অথবা রঙিন। মেয়েরা প্রায় সবাই লালপাড় সাদা শাড়ি পরেছে। চুলে কানের পাশে অথবা খোঁপায় ফুল গুঁজেছে অনেকেই। অল্পবয়সী মেয়েরা ফুলের রিং মাথায় দিয়ে হাসি-উল্লাসে মেতেছে। তরুণ-তরুণীদের জটলা এখানে-ওখানে। সকালের নরম রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাস, আনন্দ-মুখর মানুষের সমাবেশ আর বর্ষবরণের গান, রমনার প্রাঙ্গণকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। 
‘এটাই বাঙালির বর্ষবরণ। এক সময় পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন হতো শুধু গ্রামাঞ্চলে, এখন এটা এসে গেছে শহরে, নগরে। ঢাকা মহানগরীতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বেশি হয়। তাই না শমীক?’
‘ঠিকই বলেছিস চন্দন। পাকিস্তানি শাসনামলে ওরা বলত পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উদ্‌যাপন এ দেশের সংস্কৃতি নয়, ওটা ভারতীয় সংস্কৃতি। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে দেওয়া হবে না। ফলটা কী হলো? বাঙালিরা খেপে গিয়ে আরও বেশি করে নববর্ষ উদ্‌যাপন করতে থাকে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতি পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান এখনো চলছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার বন্ধ ছিল।’
চন্দন লক্ষ করে শমীক যখন কথা বলছে, তার চোখ এদিকে-ওদিকে কাকে যেন খুঁজছে। বোঝা গেল শমীকের চোখ খুঁজছে চৈতিকে। চন্দন চুপ করে থাকে, কিছু বলার তো নেই। যে করেই হোক আজ চৈতিকে খুঁজে বের করতেই হবে। 
হঠাৎ চন্দনের সামনে এসে দাঁড়ায় ওদের সহপাঠী অপর্ণা বড়ুয়া। অপর্ণা হেসে বলে, ‘শুভ নববর্ষ। তা তোমরা দুজন কেন, আরেকজন কোথায়?’
‘কার কথা বলছ অপর্ণা?’ শমীক জানতে চায়।
‘ন্যাকা। কিছুই বোঝ না? চৈতি কোথায়? তোমাদের সঙ্গে নেই কেন?’
‘চৈতি এখনো আসেনি, আসবে।’
‘আসবে বলছ কেন? ও তো এসে গেছে। বটমূলে অনুষ্ঠানের ডানদিকে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। লালপাড়, সাদা শাড়ি, কপালে লালটিপ, ওকে কী সুন্দরই না লাগছে। বেচারা একা দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা ওর কাছে যাও।’
চন্দন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। শমীকের হাত ধরে বলে, ‘চলো দোস্ত বটমূলে যাই। চৈতি তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।’
‘তুই যা। ওকে আমার কাছে আসতে বল।’
‘ঢং করিস না তো। ওটা মেয়েদের মানায়, পুরুষদের নয়। চল আমার সঙ্গে।’ 
শমীকের হাত ধরে চন্দন এগিয়ে যায় বটমূলের দিকে। তখন সকাল ৮টা বাজতে কিছু সময় বাকি। বহু মানুষ বিশাল বটগাছের ছায়ায় বসে গান শুনছে-বর্ষবরণের গান। বটমূলে নিচ থেকে ওপরে, সারি সারি কাঠের বেঞ্চ দিয়ে তৈরি বিরাট মঞ্চে বসে ছায়ানটের শিল্পীরা গান গাইছে। শিল্পীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, সবাই আছে। এরা সবাই ছায়ানটের শিক্ষার্থী। একই রঙের পোশাক পরেছে। 
বটমূলে মঞ্চের ঠিক বিপরীত দিকে এসে দাঁড়ায় শমীক ও চন্দন। ওদের সামনেই বিপুল সংখ্যক শ্রোতা মাঠে বসে গান উপভোগ করছে। মাঠের একপাশে উঁচু প্লাটফর্মে বিটিভির ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার চলছে। 
চন্দনের চোখ হঠাৎ গেল ডানদিকে। সে দেখে চৈতি দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে। তাকিয়ে আছে এই দিকে। লালপাড় সাদা শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। 
‘শমীক, ওই দ্যাখ তোর চৈতি, এদিকেই তাকিয়ে আছে। যা ওর কাছে।’
শমীক যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ। একটি শক্তিশালী বোমা ফেটেছে বসে থাকা শ্রোতাদের মাঝখানে। ধোঁয়া, বারুদের গন্ধ, আহত মানুষের আর্তনাদ। শিল্পীদের গান থেমে গেছে। মানুষের হুড়োহুড়ি, সবাই ছুটে যাচ্ছে যে যেদিকে পারে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, সবাই যাচ্ছে আহতদের উদ্ধার করতে। 
কিছুক্ষণ পরেই আর একটি বোমা ফাটল একই জায়গায়। শমীক যখন কোনোদিকে যাবে ভাবছে, ঠিক তখনই তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল সামনের দিক থেকে। শমীক দেখে একজন নারী তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার চুলের গন্ধ আর দেহের স্পর্শে শমীক বুঝতে পারে এ তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়বান্ধবী চৈতি। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। শমীক ওকে শক্ত করে ধরে রাখে। 
‘ভয় নেই চৈতি। আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। চলো আমরা এখান থেকে অন্যদিকে যাই।’

নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর
ছবি: খবরের কাগজ

বাঙালির উৎসবের আয়োজনে সামর্থ্যের চেয়ে অতিশয়োক্তি থাকে বৈকি। জাতি হিসেবে এ ধারা আমাদের উৎসবমুখর বললে বাড়িয়ে বলা হবে না বোধকরি।

উৎসব মানেই আনন্দ, হইহুল্লোর, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো- কত কী। বাঙালির জীবনে ঈদ, পূজা ও বাংলা নববর্ষ বড় উৎসব। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলা নববর্ষ সব ধর্মের মানুষ উদ্‌যাপন করে এ জন্য এ উৎসব সর্বজনীন। একসময় গ্রাম বাংলায় নববর্ষকে ঘিরে গ্রামের মেলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানোসহ নানা আয়োজনে নববর্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দের ধুম পড়ে যেত। স্মৃতির খাতার পাতা উল্টিয়ে আজও উঁকি দেয় ছোটবেলার গ্রামের মেলার কাঁচাগোল্লা, গরমজিলিপি, খাজা, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ হরেক রকম জিনিস। নাগরদোলার দোল যেন আজও মনে দোলা দেয়। নববর্ষের মেলার মাটির খেলনা ছোটবেলায় যজ্ঞের ধন মনে হতো। সময় বদলে নববর্ষের উৎসব ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। সরকার বাংলা নববর্ষে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি একটি উৎসব ভাতা প্রদান করায় বাংলা নববর্ষের আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। 

প্রতি বর্ষের সমাপ্তে বাংলা নববর্ষ হাজির হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে বাঙালির জীবনে। বাংলা নববর্ষ দিনদিন পরিসর বৃদ্ধি করে রং ছড়াচ্ছে। মানুষের গায়ের জামা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাপেটের রং ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। উৎসবের আমেজে বাঙালি নববর্ষে সাজায় নিজেকে নতুন কাপড়ের মোড়কে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালিয়ানাকে ধারণ করে আমরা জীবনের চলার পথের নতুন আনন্দ খুঁজে পাই। যদিও সারা বছরে নববর্ষের বাঙালিয়ানার রক্ষক আমরা থাকি না। তবু নববর্ষ জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির মহামিলনের একটি উপলক্ষ। 

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস পাঠ মত-মতান্তরে ভরপুর। বাংলা নববর্ষের প্রচলন- এমনকি ছায়ানটের নববর্ষের উদ্‌যাপনের সূচনার ইতিহাস নিয়েও মত-মতান্তর রয়েছে। কবে, কোথায়, কে বা কারা করেছিলেন এরূপ প্রশ্ন ছুড়লে বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস তর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারা সমাধানে পৌঁছনোর চেয়ে নিজের শক্ত বা নরম-যুক্তি যাই হোক না কেন- সেই অবস্থানেই থিতু হয়ে থাকতে চান। বাংলা নববর্ষের প্রবর্তনের ইতিহাসে অনেকের নাম এলেও সবচেয়ে আলোচিত ও প্রচলিত নামটি হচ্ছে মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের। মুঘলরা মুসলিম হিসেবে রাজ্য শাসন অনুসরণ করত হিজরি সন অনুযায়ী। হিজরি সন চান্দ্র সন। সমস্যা হচ্ছে হিজরি সন সৌরবর্ষের চেয়ে ১০-১১ দিন ছোট। ফলে গাণিতিক হিসেবে তিন বছর অন্তর সৌর সনের চেয়ে হিজরি সন এক মাস এগিয়ে আসে, এভাবে আকবরের সিংহাসন আরহণের সময় ১৫৫৬ খ্রি. থেকে শুরু করে মোট ২৯ বছর রাজত্বকালে প্রচলিত শতাব্দের সঙ্গে হিজরি সনের সময় তারতম্য ঘটেছিল ৯ মাসের।

আরেকটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল খাজনা আদায় নিয়ে। কারণ মুঘলরা হিজরি সনের অনুসারী হয়ে রাজ্য পরিচালনা করলেও হিজরি সনের মাসগুলো মৌসুম ঋতুকেন্দ্রিক ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফসল কাটার সময় নির্দিষ্ট করে খজনা আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক। তখনকার জনজীবন মূলত কৃষির আবহে চলত। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য আকবর তারিখ-ই-ইলাহি সন বলে নতুন সন চালু করেছিলেন। মূলত আকবরের আদেশে দরবারের সেরা পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমির ফাতেহ উল্লাহ্ সিরাজি বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। ফাতেহ উল্লাহ সিরাজি আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রি.-কে ভিত্তি ধরে সন গণনা শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা সনের পথচলা। একটি বিষয় বলে রাখা উচিত আকবরের প্রচলিত সর্বজনীন নতুন ধর্ম ‘দ্বিন-ই-ইলাহি’ ও তারিখ-ই-ইলাহির সময়কাল অভিন্ন। কালের আবর্তে দীন-ই-ইলাহি পথ চলতে না পারলেও আকবরের নির্দেশে ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজি প্রবর্তিত বাংলা সনকে কার্যকর করেছিলেন আকবরের সজ্ঞা ও প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ অর্থ উপদেষ্টা টোডরমল। তিনি ১৫৮৫ খ্রি. ১০ মার্চ ইলাহি সনের কার্যকরণ ঘটান। এ সময় থেকে বাংলায় খাজনা আদায়ে বাংলা সন গণনা করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলা সন প্রবর্তনের আগে হিসাব সমন্বয়ের কাজটি জটিল ছিল। কারণ উপমহাদেশে শতাব্দসহ হিসাব ছিল সৌর বর্ষ। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চন্দ্র মাসের হিসাবে মান্য করা হতো। সৌরবর্ষ যেহেতু হিসাবের নিক্তিতে তিন বছর অন্তর এক মাস এগিয়ে যেত তাই হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাচীন আরবি রীতির মতো এক মাস নামমন্ত্র হিসাবে সংযোগ করে বাদ দেওয়া হতো। গোঁজামিলের এ পদ্ধতির নাম ছিল ‘সাবনমিতি’। 

চন্দ্রমাস ও সৌরবর্ষের ব্যবহারের প্রাচীন রীতির একটি সমন্বয় ও সরলীকরণের মানসেই আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেছিলেন। সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে বাংলা সন ও মাসে সৌর ও চন্দ্রের রেশ বয়ে যায়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের আদলে নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের আদলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া নক্ষত্রের আদলে আষাঢ়, শ্রবণা নক্ষত্রের আদলে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামের আদলে ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রের আদলে আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক, আমন থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্য নক্ষত্র থেকে পৌষ, মঘা নক্ষত্রের আদলে মাঘ, ফাগুনী নক্ষত্র থেকে ফাগুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ওপরের বর্ণনা তো গেল আকবর অখ্যান। কিন্তু বাংলা সনের ব্যুৎপত্তির উৎসে আকবরের নাম ছাড়া তো আরও কিছু নাম, স্থান ও সময়ের সংযোগ রয়েছে। বাংলা সনের হিসাবের সূত্রপাতে আকবরের পাশে পেরেক ঠুকে নাম আছে- রাজা শশাঙ্ক তিব্বতের রাজা রিস্প্রভ-সন, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্, মুর্শিদ কুলি খাঁসহ আরও অনেকের নাম। তবে বাংলা সন প্রবর্তক হিসেবে মহামতি আকবরের পাল্লাই ভারী। আকবর ছিলেন সুন্নি মুসলিম। তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য ছিল তুর্কি আতর মাখা। জাতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে মুঘলরা ছিল ইন্দো-পারসিক। শাসক হিসেবে আকবর বিচক্ষণ ছিলেন। তার আমলেই মুঘল রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সৌর ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয় করে প্রজাদের ফসল তোলার সময় বর্ষের গণনা শুরু করেছিলেন সুদূরপ্রসারী ধ্যান ও ধারণা থেকে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতার সময় খাজনা আদায় সুবিধাজনক। আকবরের বাংলা সনে প্রজাদের খাজনা নবায়নের পাশাপাশি বাংলায় বাংলা সনের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা প্রচলন ধীরে ধীরে রেওয়াজে পরিণত হয়। তবে বাঙালি সমাজে নববর্ষকে নাগরিক মোড়কে নানা রঙে উৎসবের ডামাডোলে গ্রহণের রেওয়াজ সাম্প্রতিক। বাঙালির জীবনের বিশেষত ঢাকার নাগরিক সমাজে নববর্ষ বরণের প্রসঙ্গ এলেই প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতের কথা আসে। ছায়ানটের বর্ষবরণে শুরুর সময়ে ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭ সালের দাবি আছে। তবে ড. সন্জিদা খাতুনের লেখার তথ্য হলো, ‘১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল শনিবার ছিল পয়লা বৈশাখ। অবজারভার ১৪ তারিখের কাগজে নতুন বছরকে আবাহন করেছে- welcome pahela Baishakh শিরোনামে। সে বছর দেশের নানা অঞ্চল থেকে বর্ষবরণের খবর আসে ঢাকায়। প্রত্যুষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, এ বছরেই প্রথম রমনার বটমূলে। 

অবজারভার পত্রিকা পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের ছবি ছাপে। এতে দেখা যায় হার্মোনিয়ামে আছে শাহীন আক্তার, তানপুরা বাজিয়ে গান গাইছেন মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (বেনু)। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৭ সালের নববর্ষে শহিদ মিনার থেকে প্রভাতফেরি শুরু করেছিল।’

পয়লা বৈশাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের আয়োজন নগরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নববর্ষে যে বাঙালিয়ানা পরিচয়ে প্রকাশিত- আমরা সারা বছর সেই ভাবনা ও চর্চা থেকে দূরে থাকি। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনায় মানুষের ঢল আমাকেও তাড়িত করে। কিন্তু প্রতিদিন আটপৌঢ়ে বাঙালি জীবনচর্চার মেলবন্ধন থেকে আমাদের সরে যাওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। মাঝে মাঝে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে সরকার কিছু নির্দেশনাও জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই দূরে থাকে। আমরা বাংলা দিন তারিখ এমনকি অনেক সময় মাসের নামও মনে রাখি না। 

শুধুই নববর্ষে বাঙালির হাজার বছরের লৌকিক আচারকে প্রতীকীরূপে ধারণ ও পালন করা নববর্ষের তাৎপর্য হতে পারে না। নববর্ষের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ধর্ম ও সংস্কৃতিভেদে আমাদের জাতিগত ইতিহাসের পথ পরিক্রমণের সমন্বয়সূত্র। নববর্ষের নব আভায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের শিকড়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাংলা নববর্ষের উৎসবের পরিবর্তনে আমাদের গ্রামবাংলার নববর্ষের মেলাগুলোর রূপান্তর সবচেয়ে বেশি। গ্রাম্য নববর্ষের মেলায় কিছুদিন আগেও বাতাসা, কদমা, চিনির সাজ, জিলাপি, তিলের খাজা, গজা, ঝুরি, ইত্যাদি ছিল অন্যতম উপকরণ। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ যেমন- চাষের লাঙল, জোঁয়াল, মই, ডালা, ঢেঁকি, চালুন, কুলা, শীতলপাটি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন গ্রাম্য মেলায় শহরের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। লোকজ বাংলার গ্রাম্য মেলার উপকরণগুলো আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

গ্রাম্য মেলাগুলোর চিরায়ত রূপ পরিবর্তন বৈশাখী নববর্ষের রূপের সঙ্গে বড়ই অপরিচিত। বাঙালির বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এখন শুধু চর্চা ও চেতনায় প্রয়োজন বাঙালিয়ানা ধারণ ও লালন করার বছরব্যাপী প্রত্যয়ের। তবেই আমাদের পথচলায় প্রকাশ পাবে নববর্ষের বাঙালির জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।

নববর্ষের উৎসবের শেকড়ের সন্ধান যেমন ছিল একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির নবায়ন ও নিরন্তর যাত্রার উপলক্ষ ছিল আজ নববর্ষের উৎসবের মোড়কি রূপ আরও ঝকমকে হয়েছে- কিন্তু কমেছে ভূমিজ সংস্কৃতির কর্ষণের উত্তাপ। তাই আজও মনোজমিনে হারিয়ে খুঁজি শৈশবের নববর্ষের ‘মদনার মার’ মেলার কাঁচাগোল্লা ও মাটির খেলনা।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

বাংলাদেশ অপূর্ব ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের প্রকৃতির রূপ-রসের বদল ঘটে। হাজার বছর ধরে চক্রাকারে এ বদল ঘটে আসছে। কীভাবে এবং কেমন করে এ বদল ঘটে- তার স্বরূপটি ধরা আছে আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ও সংগীতে। বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই তা জানেন। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির চালচিত্র ছিটাফোঁটা থাকলেও মধ্যযুগের সাহিত্যে বিধৃত হয়েছে। কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারোমাস্যায় সব ঋতুরই বিবরণ আছে। বৈষ্ণব-পদাবলিতে ঋতুবদলের সঙ্গে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রাধার প্রেমানুভূতির নানামাত্রিক প্রকাশও অনেকটা ঋতুসাপেক্ষ। বাংলা আধুনিক সাহিত্যে মানব জীবনের অনুষঙ্গে এ দেশের ঋতু ও প্রকৃতির উপস্থিতি কোনো কোনো সাহিত্যিক অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন; এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীম উদদীন, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এমনকি তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মুখ্যজন জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত ঋতুকে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার নানাবিধ সৃজনকর্মে- বিশেষত কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, সংগীত, চিঠিপত্র ইত্যাদি রচনায় বাংলার ঋতুভিত্তিক প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য চিত্রিত রেখেছেন। তিনি গীতবিতানের গানগুলোর বিষয়ভিত্তিক যে বিন্যাস করেছেন তাতে প্রকৃতি পর্যায়ের ২৮৩টি গান আছে। এ ছাড়া গীতবিতানের প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়ের গান এবং  গীতিনাট্যের কিছু গানেও প্রকৃতির প্রসঙ্গ লক্ষণীয়। 

রবীন্দ্রনাথ রচিত, আমাদের বাল্যকালে স্কুলপাঠ্য, সেই অবিস্মরণীয় (সহজপাঠ, প্রথম ভাগ, প্রকাশকাল: বৈশাখ ১৩৩৭) কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’। এর প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তি বাঙালি-পড়ুয়া মাত্রই স্মরণ করতে পারেন: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ কবিতাটির দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতেই ‘বৈশাখ’ মাসের উল্লেখ আছে। এ কবিতায় বৈশাখের প্রকৃতি-পরিবেশ কবি পঙ্‌ক্তিবদ্ধ করেছেন। বৈশাখের রুক্ষতা, দাবদাহ, প্রায় জলশূন্য হাঁটুজলের নদী এবং এরকম অনুষঙ্গে যে জঙ্গম মানবজীবন তারই চালচিত্র রয়েছে রচনাটিতে। বাঙালি কিশোর-কিশোরীর চিরকালীন দুরন্ত ছেলেবেলার চিত্র পাই বৈশাখের হাঁটুজলের নদীর বিবরণে: ‘তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে/ গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।/ সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে/ আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।’

বাংলা নববর্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘নববর্ষে’। কবিতাটি চিত্রা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রচনাকাল পয়লা বৈশাখ ১৩০১। প্রত্যক্ষভাবে বৈশাখের কথা উল্লেখ না করলেও মূলত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে (বৈশাখের প্রথম দিন) কবির উপলব্ধি কী তা অভিব্যক্ত হয়েছে এভাবে: ‘আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও,/ যেখানে যে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বর্ষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ কিন্তু নববর্ষের শুভলগ্নটি কবির কাছে আনন্দবেদনা মিশ্রিত: ‘এসো এসো নতুন দিবস/ ভরিলাম পুণ্য অশ্রুজলে/ আজিকার মঙ্গলকলস।’ 

রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘বৈশাখ’ শিরোনামের কবিতাটি বেশ জনপ্রিয়। রচনাকাল ১৩০৬। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এ কবিতাপাঠ ছাড়া যেন সম্পন্ন হয় না। বাংলা মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ মাসের যে স্বতন্ত্রতা রয়েছে তা এ কবিতা পাঠে সুস্পষ্ট হয়। বৈশাখ দিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা। এ মাসটির বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।/ ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/ তপ্তঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/ কারে দাও ডাক/ হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।’ বৈশাখ যে রুদ্র কালবৈশাখী নিয়ে আসে তার ভয়ংকর রুদ্ররূপ রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন: ‘কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে/ নিঃশব্দ প্রখর/ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!’ কেবল তো ঝড়ঝঞ্ঝা নয়, বৈশাখের তীব্র দাবদাহও রয়েছে। কবি বৈশাখের মধ্যে প্রবল শক্তির উন্মত্ততাও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাকে আবাহন করছেন: ‘দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ/ তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলা-সম উড়ুক গগনে...।’ বৈশাখের শুধু শক্তিমত্ততা প্রত্যক্ষণ নয়, কবির প্রত্যাশা: ‘হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ/ উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে,/... পূর্ণ করি মাঠ।/ হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ।’

বৈশাখ কেবল ‘ভৈরব’ ও ‘রুদ্র’ রূপের জন্য কবির কাছে আগ্রহের মাস নয়। এ মাসেই তার জন্মের শুভক্ষণ। তাই পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন কবিতা লিখেছেন তেমনি অবিস্মরণীয় গানও রচনা করেন। কবিতাটি পূরবী কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (রচনা ২৫ বৈশাখ ১৩২৯)। জন্মদিন নিয়ে কবির উচ্ছ্বাস-আনন্দ এবং কৌতূহল: ‘রাত্রি হল ভোর।/ আজি মোর/ জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আনি/ দ্বারে আসি দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’  কবি উপলব্ধি করেন তার জন্ম দিবসটি ‘নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর পরে’। তাই দিবসটির একটিমাত্র তাৎপর্য নয়। প্রতি বছর ফিরে আসা ‘পঁচিশে বৈশাখ’ চির এক নতুনকে নিয়ে এসে কবির জন্মদিনকে ভিন্নতর তাৎপর্য দেয়। তিনি লক্ষ করেন: ‘এই দিন এলো আজ প্রাতে/ যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,/ তাহার নির্ঘোষ বাজে/ ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।/ জন্ম-মরণের দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,/ সে আজি মিলাল।’ জন্ম-মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনকে রুদ্ধ করেছিল- তা নতুন জন্মদিনের কাছে পরাভূত হলো। আর তখন নতুন এক পঁচিশে বৈশাখ ‘শুভ্র আলো/ কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে/ শূন্য দিল ভরে।’ প্রতিবার পঁচিশে বৈশাখ কবির কাছে ফিরে এসে কেবল তার শূন্যতা দূর করে তা নয়, পূর্ণতাও দান করে ‘শুভ্র আলো’ দিয়ে। জন্মদিনে কবির উপলব্ধি: ‘আলোকের অসীম সঙ্গীতে/ চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।’

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু গানও রচনা করেছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’ বৈশাখকে আবাহন করে এ গান রচনা করেন ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ শান্তিনিকেতনে। মূলত শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কবি ঋতুভিত্তিক আনুষ্ঠানিক-সংগীত রচনা শুরু করেন। সারা বছরজুড়ে শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের সূচনা হয়। এর মধ্যে নববর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল, পৌষ মেলা ও উৎসব, শারদোৎসব এবং বসন্ত উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ উৎসব এবং কবির জন্মদিন উপলক্ষে পঁচিশে বৈশাখ উদ্‌যাপনও ছিল। ঋতু-অনুষ্ঠানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ নিয়ে কিছু গান রচনা করেন। ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে বৈশাখকে মঙ্গলসূচক বার্তা নিয়ে আসার আহ্বান কবির: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ বৈশাখের যে রুদ্রতা, রুক্ষতা এবং শক্তির উগ্রতা- তার মধ্যেও কবি কল্যাণ লক্ষ করেন: ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বৈশাখ প্রলয়ের শাঁখ বাজিয়ে জীবনের ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল’কে ছিন্ন করবে- তবেই তো আসবে জীবনে নতুন ও শুভ বার্তা।

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি গান যেমন: ‘ওই বুঝি কালবৈশাখী’, ‘বৈশাখ হে মৌনী তাপস কোন অতলের বাণী’, ‘নমো নমো হে বৈরাগী’, ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ’, ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বৈশাখ বা গ্রীষ্ম ঋতুর বিশেষত্ব নিয়ে কিছু গান রচিত হয়েছে; এতে বৈশাখের প্রখরতা, শুষ্কতা, ‘দুঃসহ তাপ বহ্নি’, ‘রুদ্রবাণী’ ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ গানটিতে কবি নিজেকে ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’-এর সঙ্গে উপমায়িত করেন। এরকম আরেকটি গান: ‘প্রখর তপনতাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে, বায়ু করে হাহাকার।’ প্রকৃতির মধ্যে আকাশের তৃষ্ণা, বায়ুর হাহাকার ইত্যাদি বিদ্যমান। কিন্তু এই তৃষ্ণা ও হাহাকার কবির নিজেরই- তা তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তবেই উপলব্ধি করতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি নিজের জন্মদিন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ উপলক্ষে কবিতা রচনা করেন, তেমনই নিজের জন্মদিনের গানও লিখেছেন। বিখ্যাত গানটি: ‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ কবির মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ২৩ বৈশাখ ১৩৪৮-এ গানটি রচিত। তার জীবদ্দশায় শেষ জন্মদিনে গানটি গাওয়া হয়। দেশ-বিদেশে উদ্‌যাপিত রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এ গান ছাড়া সম্পূর্ণতা পায় না। এ গানের অবিস্মরণীয় ভাবৈশ্বর্য লক্ষণীয়। নিজের জন্মদিনের প্রসঙ্গ গানটিতে উল্লেখ থাকলেও তা রচনাকৌশলের কারণে ব্যক্তি প্রসঙ্গ ছাপিয়ে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে: ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।... চির নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’ এ গানে প্রতিটি মানবশিশুর জন্মকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এভাবে সসীম জীবনের মধ্যে অসীমের প্রকাশঘটান কবি। নিজের জন্মদিনের শুভক্ষণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি মানবশিশুর জন্মের চির নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। 

রবীন্দ্রনাথ বাংলার ষড়ঋতু ও বারো মাসের অনুষঙ্গ নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছেন। সঙ্গত কারণেই বৈশাখ নিয়েও কবির সবিশেষ কৌতূহল ছিল। মানবচরিত্র এবং মানস গঠনে প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশ ও পরিবেশের যে পরিবর্তন ঘটে তার প্রভাব কোনো সংবেদনশীল মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও তা এড়াতে পারেননি। আমরা তার বিবিধ রচনায় প্রতিবেশ-পরিবেশের অনুষঙ্গে নানা তাৎপর্যে ঋতুকথন লক্ষ করি। তেমনি ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’ অথবা ‘বৈশাখ হে মৌন তাপস’ এমন শিল্পিত করে বৈশাখ-বন্দনা আমাদের প্রকৃতির আরও নৈকট্যে নিয়ে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

ফিরে আসে বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
ফিরে আসে বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

‘হ্যালো পুকি, তোমাকে তো সেই লাগতেছে। পুরাই মাথা নষ্ট! ঘটনা কী?’ বলে রিমেল লাফ দিয়ে উঠল।
আজ পযলা বৈশাখ। চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা বের হবে। রিমেল, নাইরা, নাহিয়ান, রুনটি, বিনি দাঁড়িয়ে আছে চারুকলার গেটে। তারা এই শোভাযাত্রা সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করবে।
মাথায় বেলিফুলের কুঁড়ির গাজরা একপাশে সরিয়ে নাইরা বলল, ‘নো ক্যাপ! ভুলভাল বলবে না। আমি ফ্লেক্স করতেছি না। অতিরিক্ত কিছুই করিনি। এইটা বৈশাখের ট্রাডিশনাল সাজ।’
বিনি কনুই দিয়ে রিমেলকে ধাক্কা দিয়ে নাইরাকে বলল, ‘বেসড। কুল ড্রিপ! কোত্থেকে কিনেছ এটা?’
বিনির কথার উত্তর দিতে না দিয়ে রিমেল নাইরার চারপাশে এক পাক ঘুরে এসে বলল, ‘তোমার গ্লো-আপে আমি মুগ্ধ! যত যাই বলো, তুমি হইতেছ গোট।’
হাতের ভিডিও ক্যামেরার লম্বা স্টিট এগিয়ে রিমেলকে গোঁতা দিয়ে নাইরা বলল, ‘পুরাই স্কিবিডি। কী সব বোকাবোকা কথা বলতেছিস!’
রিমেলের কাঁধে চাপড় দিয়ে নাহিয়ান বলল, ‘এইটা কী করলা, ব্রাহ! ব্যাপার বুঝতেছি না। তুই আজ নাইরার জন্য এত সিম্পিং দিতেছিস! নাইরা তো তোরে পাত্তাই দেয় না!’
বলে নাইরার দিকে ঘুরে বলল, ‘ইফ ইউ নো, ইউ নো, তোকে সাস লাগতেছে।’
নাইরা মনে হলো নাহিয়ানের কথায় খানিক লজ্জা পেয়েছে। চোখ সরিয়ে বলল, ‘সর সর। ওপাশে সরে দাঁড়া। শোভাযাত্রা আসতেছে।’
চারুকলা থেকে নববর্ষের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে। বাংলা সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে নানা প্রতীকী ফেস্টুন, সঙ্গে বিভিন্ন রঙের মুখোশ আর প্রাণীর প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ আনন্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে। ঢোল বাঁশি করতাল বাজিয়ে কেউ গান গাইছে, কেউ নাচছে। এ এক অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য!
ছোট্ট ভিডিও ক্যামেরা ওপরে তুলে নাইরা বলল, ‘হ্যাপি পয়লা বৈশাখ ফ্রম ঢাকা।’
নাইরার বয়স বাইশ বছর। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া স্টাডিজের স্টুডেন্ট। কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে বেশ নাম করেছে। বিশেষ করে বাংলা সংস্কৃতি, ঋতু, উৎসব নিয়ে তার রিল, শর্ট ভিডিও, লাইভ সবকিছুতে এক ধরনের কাব্যিক সততা আছে। বাহ্যিক আড়ম্বরের চেয়ে সে আবেগের আন্তরিকতা আর অকৃত্রিমতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যা গ্লোবাল ইয়াং অডিয়েন্সের কাছে দারুণ জনপ্রিয়।
ক্যামেরা ঘুরিয়ে নাইরা বিশাল শোভাযাত্রার বাঘের মুখোশ, রঙিন পেঁচা, মাছ, সূর্য, মুখে আলপনা আঁকা তরুণ-তরুণীদের দেখাতে দেখাতে বলল, ‘টুডে উই ডোন্ট জাস্ট সেলিব্রেট এ নিউইয়ার। উই ট্রাই টু রিমেম্বার হু উই আর।’
লাইভ শেষ হয়েছে। নাইরাকে বিস্মিত করে দিয়ে ঘণ্টাখানেকের ভেতর লাইভ ভাইরাল হয়ে গেল। লাইভ ভাইরাল হওয়ার বিশেষ কারণ আছে। লিও নাকামুরা লাইভে যুক্ত হয়ে মন্তব্য করেছে। লিও নাকামুরা হচ্ছে বিশ্বে আলোচিত তরুণ লেখক-সংগীতশিল্পী। বয়স সাতাশ বছর। তার মা জাপানি আর বাবা ব্রাজিলিয়ান। সে বড় হয়েছে লন্ডনে। লিও-র লেখা উপন্যাস আর ইন্ডি মিউজিক তরুণ প্রজন্মের কাছে নিঃসঙ্গতা আর কিছু না বলা প্রেমের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
নাইরার লাইভে মন্তব্য করে লিও লিখেছে, ‘হাউ ডু ইউ রিমেম্বার হু ইউ আর, ইফ দ্য ওয়ার্ল্ড কিপস টার্নিং ইউ ইনটু কনটেন্ট?’
অনেকখানি সময় নিয়ে নাইরা তাকিয়ে ছিল স্ক্রিনের দিকে। তার কাছে মনে হলো পুরো পৃথিবী যেন থমকে গেছে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। দীর্ঘ নিস্তব্ধতার ভেতর দিয়ে সে গহিন কুয়ায় নেমে যাচ্ছে। কেউ একজন তার একান্ত ভেতর থেকে কথাগুলো বলে উঠেছে। নাইরা উত্তরে লিখল, ‘মেবি বাই ফাইন্ডিং ওয়ান পারসন হু সিজ ইউ বিহাইন্ড দ্য স্ক্রিন।’
সেই শুরু। নাইরাকে অবাক করে দিয়ে লিও ইনবক্সে লিখল, ‘তোমাদের নববর্ষের শোভাযাত্রা নিয়ে তোমার কাছ থেকে আরও কিছু জানতে চাই।’
যতটুকু লিখবে ভেবেছিল নাইরা তার কিছুই সে লিখতে পারছে না। লিখতে গিয়ে তার হাত কাঁপছে। সে যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না বিশ্বখ্যাত একজন মানুষ লিও নাকামুরা তার সঙ্গে চ্যাট করছে। এটা লিও-র ভেরিফায়েড পেজ। তাছাড়া এর ভেতর সে দুবার ভিডিও কলে এসেছে নাইরার সঙ্গে কথা বলতে।

নাইরা তাকে লিখল, ‘আমাদের দেশ একসময় স্বৈরশাসকের কবলে আটকে ছিল। তখন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ স্বৈরশাসন হটানোর অঙ্গীকার নিয়ে আর শান্তির বিজয় প্রত্যাশায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বৈশাখের শোভাযাত্রা শুরু করে।’
লিও বলল, ‘তুমি শোভাযাত্রার কালারফুল দিক নিয়ে বলো। এই যে নানা ধরনের মুখোশ, সাজসজ্জা।’
নাইরা বুঝতে পারল লিও খুব সচেতনভাবে শোভাযাত্রার পলিটিক্যাল ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে চাইছে। নাইরা লিখল, ‘আমাদের বর্ষবরণের শোভাযাত্রায় ট্যাপা পুতুল, নকশি পাখি, হাতি, বাঘ, কুমির, লক্ষ্মী পেঁচা, ঘোড়াসহ অনেক ধরনের মুখোশ থাকে। এগুলো সবই অপশক্তির বিনাশ আর শুভকামনার প্রতীক।’

লিও লিখল, ‘অপশক্তির বিনাশ মানে তো অপদেবতা থেকে মুক্ত থাকা!’
নাইরা খুব স্পষ্টভাবে বলল, ‘আমাদের নববর্ষের শোভাযাত্রা হচ্ছে অগণতান্ত্রিক শক্তির বিনাশের প্রতিজ্ঞা।’
লিও খানিক থমকে গেছে। সে কথা ঘুরিয়ে বলল, ‘বাংলাদেশ অনেক সুন্দর শুনেছি। সবচেয়ে সুন্দর বাংলাদেশের মানুষ। তারা নরম মনের। নরম মাটি দিয়ে বানানো।’
নাইরার হাসি পাচ্ছে। কিশোর বয়সে প্রেমে পড়লে ছেলেরা যেভাবে প্রেমিকাকে ইমপ্রেস করতে চায়, লিও সেরকম কথা বলছে। নাইরা বলল, ‘তুমি বাংলাদেশে এসো। মুগ্ধ হয়ে যাবে। চারপাশে কেবল সবুজ। তাকালে চোখে আরাম লাগে। সবকিছু ন্যাচারাল। আর্টিফিশিয়াল কিছু নেই।’
লিও বলল, ‘যাব নিশ্চয়। তবে কি জানো, আমার কাছে পৃথিবীর সব শহর একইরকম লাগে। এয়ারপোর্ট, হোটেল, স্টেজ, ইন্টারভিউ। একটা দেশের সকাল, আরেকটা দেশের রাতের সঙ্গে মিশে যায়।’
নাইরা সতর্কভাবে লিও-র কথা বোঝার চেষ্টা করছে। দেশ নিয়ে কোনো কথা বলার সময় নাইরা বিশেষ সতর্ক থাকে। সে কখনো চায় না ভুলভাবে বাংলাদেশ কোথাও উপস্থাপিত হোক। নাইরা বলল, ‘তবে এখানে প্রতিদিনের সকাল কখনো একরকম হয় না। প্রত্যেকটা দিন, প্রত্যেক বছর আমাদের কাছে নতুন কোনো সম্ভাবনা নিয়ে আসে।’
তার পর নদীর ঢেউয়ের মতো কথার পিঠে কথা ভেসে আসতে থাকল। দেশ থেকে শহর। শহর থেকে ঘর। ঘর থেকে একে একে নিজেদের কথার ভেতরের কথা চলে এল। সেই সময় লিও লেখক মনের কল্পনা মিশিয়ে নাইরাকে বড় এক ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। লিও লিখেছে, ‘নাইরা, তোমাকে ঠিক কতটা পছন্দ করি জানো? বসন্তের এক সকালে চেরিফুলের বাগান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম, ঠিক তখন তোমাকে দেখলাম। মনে হলো, আমার বুকের ভেতর একটা ছোট ঘড়ি ছিল, যা এতকাল বন্ধ হয়ে পড়ে ছিল- আচমকা তোমার হাসির শব্দে সেই ঘড়ি আবার টিকটিক করে চলতে শুরু করেছে।
তুমি যখন আমার হাত ধরলে, তখন মনে হলো আমার চারপাশের বিশৃঙ্খল পৃথিবীটা অমনি ভীষণ শান্ত আর পরিপাটি হয়ে গেল। আমি হিমালয় জয়ের কথা বলছি না। আমি বলছি সেই সহজ আনন্দের কথা- যখন আমরা পাশাপাশি বসে কফি খাই আর কোনো কথা না বলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতে পারি।
ভালোবাসার সংজ্ঞা আবিষ্কার করেছি। আমার কাছে ভালোবাসা মানে হলো তোমার গভীর দুই চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারা, আমি ঘরে ফিরে এসেছি। তুমি আছ বলেই সকালের রোদ এত মিষ্টি লাগে, আর রাতের আকাশ এত বেশি রহস্যময় মনে হয়। তোমাকে ভালোবাসা মানে কোনো বড় উৎসব নয়, বরং প্রতিদিন একটু একটু করে তোমার মাঝে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়া।’
নাইরার মনে হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তার গলার ভেতর কিছু আটকে গেছে। সেখানে ব্যথা করছে। ঝুম ভালোবাসার স্পর্শে ভেসে যেতে যেতে নাইরা থমকে দাঁড়াল। এখন অনেক কাজ। লিও এক ইন্টারন্যাশনাল স্ট্রিমিং প্লাটফর্মের জন্য সিরিজ লিখছে। সেখানে সে দক্ষিণ-এশিয়ার উৎসব আর তরুণদের প্রেমকে মুখ্য করে এনেছে। নাইরার কাজ হচ্ছে বাংলার সংস্কৃতি, উৎসব, লোককথা মিলিয়ে ভিডিও ক্লিপস পাঠানো।
খুবই এক্সাইটেড নাইরা। তার মনে হচ্ছে বাংলা সংস্কৃতিকে সে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিচ্ছে ভীষণ যত্ন করে।
নাহিয়ান এসেছে। তাকেও ভীষণ অস্থির দেখাচ্ছে। সে খানিক রাগি গলায় বলল, ‘তুই কি জানিস নেট দুনিয়ায় তোকে কীভাবে পচানো হচ্ছে! লিও একজন গ্লোবাল সেলিব্রেটি। তার সঙ্গে তুই পেঁচিয়েছিস!’
নাইরা কিছু জানে না। লিও তাকে কিছু বলেনি। কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। নাহিয়ান বলল, ‘তোর ছবি দিয়ে লিখেছে, লিও’স নিউ গার্ল? হু ইজ দ্য বেঙ্গলি ক্রিয়েটর? ইজ শি ক্লাউট চেজিং? তুই কি সত্যি তোর সস্তা পাবলিসিটি পেতে এটা করছিস?’
নাহিয়ানের কথা পাত্তা দিল না নাইরা। জরুরি কাজ সব গুছিয়ে সময়মতো লিওকে পাঠিয়েছে। লিও বলল, ‘দেখো নাইরা, গ্লোবাল অডিয়েন্স বৈশাখের পলিটিক্যাল হিস্ট্রি, অসাম্প্রদায়িকতা বলো বা ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট ঠিক খাবে না। এগুলো বাদ দিয়ে ভিডিও বানাও।’
পুরোপুরি হতবাক হয়ে গেছে নাইরা। সে বলল, ‘নববর্ষের শোভাযাত্রা কোনো খাবার নয় যে পাবলিক খাবে। তাছাড়া নববর্ষের শোভাযাত্রা থাকবে, তাতে প্রতীকী প্রতিবাদ থাকবে না, রবীন্দ্রসংগীত থাকবে না, ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার থাকবে না, লাল-সাদার ইতিহাস থাকবে না। শোভাযাত্রা দেখানো হবে শুধু বৈশাখের কালারফুল এক্সোটিক ফেস্টিভ্যাল বানিয়ে- তা সম্ভব নয়। আমি সেটা করব না। তুমি বুঝতে পারছ, এটা শুধু আমাদের উৎসব নয়, আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস!’
লিও লিখল, ‘বুঝতে পারছি। কিন্তু এটাকে যদি সহজ না করি কেউ দেখবে না।’
নাইরা বুঝতে পারল সে ভুল মানুষকে পছন্দ করেছে। লিও-র সঙ্গে সব রকমের যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। অনেকদিন পর লিও-র এক ম্যাসেজের রিপ্লাই দিয়েছে নাইরা। লিও লিখেছে, ‘কখনো কখনো টিকে থাকতে সত্যকে বদলে ফেলতে হয়।’ 
নাইরা লিখল, ‘যে মানুষ সত্য বদলে টিকে থাকে, সে আর মানুষ থাকে না।’

সেদিন থেকে তাদের আর কখনো যোগাযোগ হয়নি।
অনেকদিন বাদে লিও ম্যাসেজ পাঠিয়েছিল, ‘তুমি বলেছিলে আমাদের একে অপরকে মনে রাখা উচিত। কথা দিচ্ছি, তোমাকে কখনো ভুলে যাব না। এমনকি পুরো পৃথিবী যদি আমাদের ভুলে যায়, তবুও তোমার হাত ধরে থাকব। নিজের খেয়াল রেখো। তোমার জন্য আমার ভালোবাসা সবসময় একইরকম থাকবে।’
নাইরা সে ম্যাসেজের কোনো উত্তর দেয়নি।
পরের বৈশাখের শোভাযাত্রায় নাইরা লাইভ করল না। সে বসে আছে চারুকলার পুকুরপাড়ে। তার মন প্রচণ্ড ভার হয়ে আছে। আজ কেন তার এত বেশি খারাপ লাগছে বুঝতে পারছে না। 
লিও বাংলাদেশে এসেছে। এই খবর নাইরা জানে না। লিও ঠিক নাইরাকে খুঁজে বের করেছে। চারুকলার পুকুরপাড়ে লিও-র সামনে নাইরা দাঁড়িয়ে আছে। কোনো কথা বলতে পারছে না। তার সব কথা যেন গলার ভেতর আটকে গেছে।
লিও বলল, ‘ভেবেছিলাম ভালোবাসা মানে তোমাকে না হারানো। পরে বুঝেছি ভালোবাসা মানে তোমার সেই ভাবনাগুলোকে হারিয়ে যেতে না দেওয়া, যা তোমাকে ‘তুমি’ করে গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কথা দিয়েই নতুন সিরিজ লিখেছি। সেটা স্ট্রিমিং হবে।’
কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে নাইরার ভেতর। কী বলবে বুঝতে পারছে না। তার সব এলোমেলো বোধ হচ্ছে। অস্পষ্ট গলায় বলল, ‘তুমি এসেছ!’
লিও বলল, ‘সব কাহিনি হাটে তোলার জন্য নয়, যে বিক্রি করব। কিছু ঘটনা কেবল সত্যভাবে বলার জন্য টিকে থাকে। বাংলাদেশের নববর্ষের শোভাযাত্রার মতো।’
বাতাস ছেড়েছে। তুমুল বাতাসে নাইরার লালপাড়ের সাদা শাড়ির আঁচল উড়ছে। সেই আঁচল ধরবে বলে লিও শিশুর মতো লাফিয়ে যাচ্ছে। বাতাসে শীতলভাব। কোথাও আকাশভাঙা বৃষ্টি নেমেছে।

শোভাযাত্রা

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
শোভাযাত্রা

ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায়, বৃক্ষের রঙ বদলায়
শোভাযাত্রার নাম বদলায় 
জীবন বদলায় না। অন্ধকারে পেঁচা ও বাঁদুরেরা 
ঢের বেশি উৎপাত করে। 
 
শোভাযাত্রার নাম কী হবে- মঙ্গল না আনন্দ, না বৈশাখী
এই অহেতুক বিতর্কে মাতেন
সংস্কৃতির স্বঘোষিত মহাজনেরা। কিন্তু তারা জানেন না 
সেদিন অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে হাতের তুলিকে হাতিয়ার করেছিলেন কারা। 
কারা কলম ও সংগীতকে বানিয়েছিলেন অব্যর্থ মারণাস্ত্র। 
আর রমনার বটমূলে বর্ষবরণের আয়োজন কাদের হাতে
খুনের দরিয়া হয়েছিল? 
যুগে যুগে মানুষ যখন স্বৈরশাসক আর 
অন্ধকারের জীবদের ভয়ে নির্বাক ও নিশ্চল থাকে
তখন মাটির হাতি-ঘোড়া, শালিখ-ময়না সদর্পে মিছিলে হাঁটে
কথা বলে, বজ্রমুষ্ঠিতে কাঁপিয়ে তোলে আকাশ।
 
ক্ষমতার রঙ বদলায়, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলায় 
জীবন বদলায় না।