দেশীয় গ্রাহকদের পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আমরা চালু করেছি ‘এক্সপেট্রিয়েট হোম লোন’ যা তাদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স দিয়ে দেশে নিজেদের বাড়ি নির্মাণ বা কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে। এই পণ্যটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা দূরে থেকেও দেশে ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনতে পারেন এবং সরাসরি রেমিট্যান্স আয়ের মাধ্যমেই কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন। এই সেবায় রয়েছে দূতাবাস পর্যায়ে হস্তান্তরযোগ্য চুক্তির ব্যবস্থা, অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া এবং বিশেষ হেল্পডেস্ক সাপোর্ট।
খবরের কাগজ: গৃহঋণ নিয়ে আপনার প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কীভাবে করেন?
মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদ: নিজস্ব একটি বাড়ি প্রত্যেক মানুষের জীবনে শুধু একটি প্রয়োজন নয়- এটি একটি আবেগ, একটি স্বপ্ন, একটি নিরাপত্তার প্রতীক। যমুনা ব্যাংক সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গৃহঋণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। আমরা সর্বোচ্চ ২০ বছর মেয়াদি গৃহঋণ সুবিধা দিচ্ছি, যার সঙ্গে রয়েছে ১২ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ। সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন করা হয়, যা একজন গ্রাহকের জীবনযাত্রার ধরন, অবস্থান ও চাহিদার ভিত্তিতে কাস্টমাইজ করা যায়। আমাদের গৃহঋণ পণ্যগুলো শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়- গ্রাম, মফস্বল, উপশহর সব এলাকায় প্রযোজ্য।
আমাদের গৃহঋণ সেবার আওতায় রয়েছে- নতুন বাড়ি নির্মাণ, ফ্ল্যাট কেনা, সেমিপাকা ঘর নির্মাণ, বাড়ি সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ এবং পরিবেশবান্ধব গৃহ নির্মাণ। বিশেষভাবে আমরা পরিবেশবান্ধব গৃহ নির্মাণে উৎসাহ দিতে সহজশর্তে অর্থায়ন দিচ্ছি।
যারা বিদেশে কর্মরত, সেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আমরা চালু করেছি ‘এক্সপেট্রিয়েট হোম লোন’ যা তাদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স দিয়ে দেশে নিজেদের বাড়ি নির্মাণ বা কেনার সুযোগ করে দিচ্ছে। এই পণ্যটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা দূরে থেকেও দেশে ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনতে পারেন এবং সরাসরি রেমিট্যান্স আয়ের মাধ্যমেই কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন। এই সেবায় রয়েছে দূতাবাস পর্যায়ে হস্তান্তরযোগ্য চুক্তির ব্যবস্থা, অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া এবং বিশেষ হেল্পডেস্ক সাপোর্ট। দেশীয় গ্রাহকদের জন্য রয়েছে জনপ্রিয় ‘যমুনা হোম লোন, যা সহজ কিস্তি, দ্রুত প্রসেসিং এবং পেশাভিত্তিক নমনীয় কাঠামোতে দেওয়া হয়।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমরা বাজার বিশ্লেষণ, গ্রাহকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, রিস্ক প্রোফাইল, সম্পত্তির আইনগত অবস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক সংস্থার নির্দেশনা বিশ্লেষণ করে আমাদের গৃহঋণ পণ্যগুলোর কাঠামো তৈরি করি।
আমরা মনে করি, একটি সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং দ্রুত প্রক্রিয়াজাত ঋণব্যবস্থাই একজন গ্রাহকের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধান সহায়ক।
এ পর্যন্ত আমরা গ্রাম ও শহর মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ জন গ্রাহককে ৯১৫ কোটি টাকা গৃহঋণ সুবিধা দিয়েছি, যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব প্রমাণ।
খবরের কাগজ: যমুনা ব্যাংকের গৃহঋণ পণ্যের কাঠামো, সুদের হার এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলুন।
মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদ: যমুনা ব্যাংক গৃহঋণকে শুধু একটি আর্থিক সেবা হিসেবে দেখে না; বরং এটি দেখা হয় একজন গ্রাহকের জীবনমান উন্নয়নের, সামাজিক স্থিতিশীলতার এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অংশ হিসেবে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো- একজন মানুষ যখন একটি বাড়ির স্বপ্ন দেখে, সেটি তখন শুধু একটি নির্মাণ নয়, সেটি হয় তার পরিচয়, নিরাপত্তা এবং স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন। যমুনা ব্যাংক এই স্বপ্ন পূরণে একটি অংশীদার হিসেবে দায়িত্ব নেয়।
আমাদের গৃহঋণ কাঠামো সময়োপযোগী এবং বৈচিত্র্যময়। সর্বোচ্চ ২০ বছর মেয়াদি ঋণসীমার সঙ্গে রয়েছে গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা, নমনীয় কিস্তি কাঠামো, আগাম পরিশোধের সুবিধা এবং প্রয়োজনমাফিক পুনঃতফসিল করার ব্যবস্থা। সুদের হার বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আওতায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে নির্ধারিত হয়। বর্তমানে আমরা প্রধানত ভ্যারিয়েবল রেট পদ্ধতি অনুসরণ করি। তবে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ফিক্সড রেট অপশনও রাখা হয়েছে, যাতে গ্রাহকরা সুদের হার পরিবর্তনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত থাকতে পারেন।
গৃহঋণের প্রয়োগক্ষেত্রও আমাদের এখানে বহুমাত্রিক। আমরা ঋণ দিই নতুন ফ্ল্যাট বা বাড়ি ক্রয়, নিজস্ব জমিতে বাড়ি নির্মাণ, সেমিপাকা বাড়ি নির্মাণ, পুরোনো ঘর সংস্কার ও মেরামত, ইন্টেরিয়র উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব গৃহ নির্মাণের জন্য। বিশেষত, পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে আমরা কিছু ক্ষেত্রে রেট ডিসকাউন্ট এবং দ্রুত প্রসেসিং সেবা দিয়ে থাকি, যা আমাদের টেকসই ব্যাংকিং দৃষ্টিভঙ্গির অংশ।
প্রক্রিয়াগত দিক থেকেও আমরা গ্রাহকের ভোগান্তি কমিয়ে আনার জন্য একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছি। আবেদনের পরবর্তী ধাপগুলো- প্রাথমিক যাচাই, সিআইবি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ, সম্পত্তি যাচাই, অনুমোদন এবং চূড়ান্ত ডকুমেন্টেশন-সব কটিতেই রয়েছে স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত সময়সীমা। ডিজিটাল প্রসেস এবং একটি বিশেষায়িত গৃহঋণ টিমের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণ সময়কে কার্যকরভাবে ৫-৭ কার্যদিবসে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
একজন গ্রাহকের ঋণযোগ্যতা মূল্যায়নে আমরা তিনটি স্তরে যাচাই করি। প্রথমত, তার আর্থিক সামর্থ্য- মাসিক আয়-ব্যয়, অন্য ঋণ এবং কিস্তি বহনের ক্ষমতা বিশ্লেষণ করি। দ্বিতীয়ত, তার ক্রেডিট আচরণ-ব্যাংকিং রেকর্ড, সিআইবি রিপোর্ট এবং পূর্ববর্তী ঋণ পরিশোধের ইতিহাস আমরা গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করি। তৃতীয়ত, সম্পত্তির আইনগত বৈধতা- যেমন দলিল, মিউটেশন, অনুমোদিত নকশা, নিষেধাজ্ঞা বা জটিলতা আছে কি না, তা যাচাই করি। এই তিনটি স্তরের নির্ভুল বিশ্লেষণই আমাদের গৃহঋণ প্রক্রিয়াকে ঝুঁকিমুক্ত ও টেকসই করে তোলে।
গত কয়েক বছরে আমরা লক্ষ্য করেছি, গৃহঋণের প্রোফাইল ও চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কোভিড-পরবর্তী বাস্তবতায় মানুষ বাসস্থানের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শহরের বাইরের মধ্যবিত্ত, তরুণ চাকরিজীবী ও উদ্যোক্তারা এখন ফ্ল্যাট বা বাড়ি কেনার দিকে ঝুঁকছেন। আমাদের অভিজ্ঞতা বলছে, ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সী গ্রাহকগোষ্ঠীই এখন সবচেয়ে সক্রিয় হোম লোন মার্কেট সেগমেন্টে। অন্যদিকে প্রবাসীদের মধ্যেও বাড়ি কেনার প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে যারা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
খবরের কাগজ: বর্তমানে বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি, সুদহার ওঠানামা এবং বাজারে আমানত-ঋণ নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থাহীনতা- এই প্রেক্ষাপটে গৃহঋণ বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা মোকাবিলায় যমুনা ব্যাংক কী ধরনের প্রস্তুতি ও কৌশল গ্রহণ করছে?
মির্জা ইলিয়াস উদ্দীন আহম্মদ: বর্তমানে বৈশ্বিক ও স্থানীয় উভয় আর্থিক বাজারে যে ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে- বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি, সুদহারের ওঠানামা, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ এবং আস্থাহীনতাজনিত আমানত সংকোচন- এসব কেবল আমানত ও বিনিয়োগ বাজারেই নয়, গৃহঋণ খাতেও প্রভাব ফেলছে। যমুনা ব্যাংক এসব বাস্তবতাকে সামনে রেখেই ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি গ্রহণ করছে, যার ভিত্তি হলো ‘আস্থার পুনর্গঠন, ঝুঁকির সুনির্ধারিত ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিকেন্দ্রীকরণ সেবার বিস্তার।
প্রথমত, আমরা আমাদের গৃহঋণ পণ্যগুলোকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব করতে পর্যালোচনা করছি। সুদের কাঠামোতে নমনীয়তা, কিস্তির হিসাবরীতি সহজীকরণ এবং ফিক্সড ও ভ্যারিয়েবল রেটের মধ্যে গ্রাহক চাহিদা অনুযায়ী পছন্দের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, বাজার ঝুঁকি ও ক্রেডিট ঝুঁকি পর্যালোচনার জন্য আমাদের আর্থিক বিশ্লেষণ দল প্রান্তিক পর্যায়ে ঝুঁকি পর্যালোচনা করছে, যাতে ভবিষ্যৎ সুদহারের পরিবর্তন বা প্রবৃদ্ধির গতি কমলেও ঋণ পুনঃতফসিল, কিস্তি পুনর্বিন্যাস, বা গ্রেস পিরিয়ড বৃদ্ধির মতো ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রাহকের ওপর বোঝা না বাড়ে।
তৃতীয়ত, আমরা গৃহঋণের প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, কাগজবিহীন এবং সাশ্রয়ী করতে ‘ডিজিটাল হোম লোন’ চালু করেছি, যাতে প্রবাসী থেকে শুরু করে জেলা শহরের গ্রাহক পর্যন্ত সমানভাবে সেবা পান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আমরা গৃহঋণ পণ্যকে আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর, গ্রাহকবান্ধব এবং সময়োপযোগী করতে চাই। আমরা ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন, ট্র্যাকিং সিস্টেম, ইনস্ট্যান্ট অনুমোদন ও কাস্টমাইজড রিপেমেন্ট সলিউশন চালু করার মাধ্যমে গৃহঋণকে একটি ‘স্মার্ট হাউজিং ফাইন্যান্স সলিউশন’-এ রূপ দিতে কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই- সত্যিকারের প্রয়োজনে মানুষ যেন ঝামেলা ছাড়াই নিজের স্বপ্নের ঘর নির্মাণে যমুনা ব্যাংককে পাশে পান।