সাধারণত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ গৃহঋণের আবেদন প্রাথমিক স্ক্রুটিনিতে বাতিল হয়। যেসব ভুলের কারণে আবেদন বাতিল হয়- আয়ের অসঙ্গতি, মাসিক আয়ের তুলনায় ঋণের কিস্তি বহনের সক্ষমতা কম থাকা সত্ত্বেও ঋণের জন্য আবেদন করা, এনআইডি, টিআইএন, আয় প্রমাণপত্র, সম্পত্তির কাগজপত্র ইত্যাদি জমা না দেওয়া বা ভুল/ভেজাল কাগজ জমা দেওয়া, মালিকানার বিরোধ, অনুমোদিত নকশার অনুপস্থিতি, আগে নেওয়া ঋণে খেলাপি থাকা, আয়ের অতিরিক্ত হিসাব দেখানো, ভুয়া চাকরির সার্টিফিকেট দেওয়া। এলটিভি শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট দিতে না পারা এবং বৈধ টিআইএন ও সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন জমা না দেওয়া।
খবরের কাগজ: গৃহঋণ নিয়ে আপনার ব্যাংকের পরিকল্পনা কী? এগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করেন?
মতিউল হাসান: গৃহঋণকে দীর্ঘমেয়াদি, নিরাপদ ও গ্রাহকবান্ধব পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে আমাদের ব্যাংক। আমাদের লক্ষ্য হলো মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের আবাসন চাহিদা পূরণ করা এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আবাসন খাতের মাধ্যমে অবদান রাখা। গৃহঋণের আওতায় নতুন বা পুরাতন ফ্ল্যাট/বাড়ি ক্রয়, নির্মাণ, সংস্কার, সম্প্রসারণ এবং কটেজ লোনসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণ দেওয়া হয়।
খবরের কাগজ: গৃহঋণ খাতে সর্বোচ্চ বা সর্বনিম্ন কত টাকা ঋণ দেওয়া হয়?
মতিউল হাসান: গ্রাহকের আয়, বয়স, কর্মসংস্থানের ধরন ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ঋণ প্রার্থীর যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়। ন্যূনতম আয়সীমা চাকরিজীবীদের জন্য ৩০,০০০ টাকা এবং ব্যবসায়ী বা পেশাজীবীদের জন্য ৪০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ মেয়াদ ২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। ঋণের অনুপাত সর্বোচ্চ ৭০:৩০। অর্থাৎ জমি, বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মূল্যের ৭০ শতাংশই ব্যাংক দিবে আর বাতি ৩০ শতাংশ দিতে হবে গ্রাহককে। বর্তমানে এই খাতে সুদহার ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ (ভ্যারিয়েবল), তবে টেকওভার লোনের ক্ষেত্রে প্রসেসিং ফি মওকুফ করা হয়।
খবরের কাগজ: ঋণ আবেদনের সময় বাধ্যতামূলকভাবে কোন কাগজপত্র জমা দিতে হয়?
মতিউল হাসান: যে কাগজপত্র জমা দিতে হয় সেগুলো হলো;
১) জমির কাগজপত্র
২) ভবন বানানোর অনুমোদনপত্র
৩) আবেদনকারী ও সহ-আবেদনকারীদের এনআইডি, টিন সার্টিফিকেট
৪) আবেদনকারী ও সহ-আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত নেট ওয়ার্থ স্টেটমেন্ট
৫) গত এক বছরের ব্যাংক হিসাব বিবরণী।
৬) বৈধ ট্রেড লাইসেন্স (যদি আবেদনকারী ব্যবসায়ী হন)।
৭) বেতন সনদপত্র ও বেতন হিসাবের স্টেটমেন্ট (যদি আবেদনকারী চাকরিজীবী হন)।
৮) বৈধ ও যৌক্তিক আয়ের সহায়ক কাগজপত্র।
৯) টিআইএন সার্টিফিকেট ও সর্বশেষ ট্যাক্স রিটার্ন দাখিলের স্লিপ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক থাকলে ঋণ মঞ্জুর হতে সাধারণত ১২ দিন লেগে থাকে।
খবরের কাগজ: ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণগ্রহীতার যোগ্যতা কীভাবে ম্যূাল্যায়ন করা হয়?
মতিউল হাসান: ঋণ গ্রহীতার যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের নিজস্ব ক্রেডিট পলিসি আছে। সব ধরনের ঋণ ক্রেডিট পলিসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু করা সার্কুলার মোতাবেক বিবেচনা করা হয়।
খবরের কাগজ: আবেদনের সময় ঋণপ্রার্থী সাধারণত কী কী ভুল করে?
মতিউল হাসান: হোম লোন/ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে আবেদনকারীরা কয়েকটি সাধারণ ভুল করে থাকেন, যার ফলে অনেক আবেদন বাতিল হয়ে যায়। মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি বা বাংলাদেশের অন্য ব্যাংকের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো-
আবেদনকারীদের সাধারণ ভুলগুলো
আয়ের অসঙ্গতি- বেতন সনদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও ট্যাক্স রিটার্নে আয়ের অমিল থাকে।
অতিরিক্ত ঋণভার (হাই ডিবিআর)- মাসিক আয়ের তুলনায় ঋণের কিস্তি বহনের সক্ষমতা কম থাকা সত্ত্বেও ঋণের জন্য আবেদন করা।
অসম্পূর্ণ ডকুমেন্টস- এনআইডি, টিআইএন, আয় প্রমাণপত্র, সম্পত্তির কাগজপত্র ইত্যাদি জমা না দেওয়া বা ভুল/ভেজাল কাগজ জমা দেওয়া।
সম্পত্তির আইনি জটিলতা- মালিকানার বিরোধ, অনুমোদিত নকশার অনুপস্থিতি।
ক্রেডিট ইতিহাস খারাপ (সিআইবি রিপোর্ট নেগেটিভ)- আগে নেওয়া ঋণে ডিফল্ট থাকা বা খারাপ ঋণ থাকা।
ভুল বা অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া- আয়ের অতিরিক্ত হিসাব দেখানো, ভুয়া চাকরির সার্টিফিকেট দেওয়া।
অপর্যাপ্ত নিজস্ব ইক্যুইটি- এলটিভি শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ডাউনপেমেন্ট দিতে না পারা।
ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স না থাকা- বৈধ টিআইএন ও সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন জমা না দেওয়া।
খবরের কাগজ: সাধারণত কত শতাংশ আবেদন বাতিল হয়?
মতিউল হাসান: সাধারণত ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হোম লোন আবেদন প্রাথমিক স্ক্রুটিনিতে বাতিল হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক (প্রায় ১০-১৫%) শুধুমাত্র অসম্পূর্ণ বা অসত্য তথ্য ও ভেজাল ডকুমেন্টসের কারণে বাতিল হয়।
খবরের কাগজ: মানুষ এখন কেমন বাড়ি কিনছেন- দামি, না সাশ্রয়ী?
মতিউল হাসান: বাংলাদেশের আবাসন বাজারে বর্তমানে সাশ্রয়ী এবং প্রিমিয়াম- উভয় ধরনের বাড়ির প্রতি চাহিদা বিদ্যমান, তবে সাশ্রয়ী বাড়ির প্রতি আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেশি।
খবরের কাগজ: প্রথমবার গৃহঋণ নিতে যাওয়াদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
মতিউল হাসান: নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বুঝে, সুদের হার ও ব্যাংক শর্ত যাচাই করে, নিরাপদ সম্পত্তি নির্বাচন করুন।
খবরের কাগজ: রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় শহরে গৃহঋণদানে আপনাদের কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
মতিউল হাসান: মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি ঢাকা শহরের বাইরে বিভাগীয় শহরেও ব্যাংকিং সেবা প্রদান করছে। যেকোনো শাখা ও উপশাখা হতে গৃহঋণ সুবিধা পাওয়া যায়।
খবরের কাগজ: ঋণ পেতে ভোগান্তি এড়াতে গ্রাহকদের জন্য কী ধরনের সুবিধা দিচ্ছেন?
মতিউল হাসান: মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি গ্রাহকদের ঋণ পেতে ভোগান্তি এড়াতে বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে। প্রধান সুবিধাগুলো নিচে দেওয়া হলো।
সহজ প্রক্রিয়া: আমাদের ব্যাংকঋণ প্রক্রিয়ার সহজ ও দ্রুত নিষ্পত্তির নিশ্চয়তা দেয়। সঙ্গে আছে সহজ শর্তাবলি।
ফি এবং চার্জ: টেকওভার এবং অতিরিক্ত রি-ফাইন্যান্সিং-এর জন্য কোনো প্রসেসিং ফি নেই এবং কোনো লুকানো চার্জও নেই।
কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী ঋণ বিতরণ: গ্রাহকরা বাড়ি নির্মাণে তাদের কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী ঋণ গ্রহণের সুবিধা পান।
ডিজিটাল ব্যাংকিং: ব্যাংকের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘MBL Rainbow’ এর মাধ্যমে গ্রাহকরা শাখায় না গিয়েও অনেক আর্থিক সেবা পেতে পারেন, যা ঝামেলামুক্ত সেবা নিশ্চিত করে। এই অ্যাপটি ব্যবহার করে ডিজিটালভাবে সেভিংস অ্যাকাউন্ট খোলা যায়, যা কাগজপত্র ও শাখায় যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা দূর করে।
পণ্যের কাঠামো: ব্যাংকের একটি সুসংগঠিত ‘প্রোডাক্ট প্রোগ্রাম গাইড (PPG)’ রয়েছে, যা ঋণের শর্তাবলি, সুদের হার, বিতরণ পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়।