জাদুঘরের বাইরের দেয়ালজুড়ে ভাষা শহিদদের কারুকার্জময় মুরাল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই মুরালেও আঘাত করেছে দুর্বৃত্তরা। ভেঙে বিকৃত করে দিয়েছে অনেক মুখ। কারও নাক ভেঙেছে, কারও মুখ বিকৃত করেছে, কারও মাথা ভেঙে নুইয়ে দিয়েছে। সেটা ছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতির জন্য অসহনীয় দৃশ্য। সেখানে একজন যুবতী মেয়ে ব্যঙ্গ করে ভাষা শহিদদের ভাঙা নাক টেনে আরও ভেঙে দিচ্ছে আর মজা করছে। এই অভাবনীয় কর্মটি একজন ভিডিও করছে আর যুবতী মেয়েটি ব্যঙ্গ করে নানা ধরনের মন্তব্য করছে। অপমানজনক নানা কথা বলছে। সেটা লাইভ সম্প্রচার করছে তাদের একজনের আইডি থেকে। দৃশ্যটি আমার কলেজপড়ুয়া মেয়ে সেতু আমাকে দেখাতে ছুটতে ছুটতে আসে আমার রুমে। আমি একটি নাটকের চিত্রনাট্য তৈরি করছিলাম মগ্ন হয়ে। মেয়ে হাঁপাচ্ছে। তার শ্বাস পড়ার শব্দ কানে আসে। হাঁপাতে হাঁপাতে মেয়ে বলল, ‘বাবা, আমি তোমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য দেখাতে এসেছি। আগে দেখ। দেখলে তোমার মাথা চক্কর দেবে।’
আমি মেয়ের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে মুখ নামিয়ে বললাম, ‘মাথা চক্কর দিলে আমার কাজের ভীষণ ক্ষতি হবে। তাহলে কাজটা আমার শেষ হবে না।’
মেয়ে অনুনয় করে বলল, ‘দৃশ্যটা তোমার দেখা দরকার বাবা। না দেখলে পরে আফসোস করবে। আমাকেও বকা দেবে।’
এবার আর না দেখে পারলাম না। দেখলাম একজন যুবতী মেয়ে ভাষা শহিদদের মুরাল নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ধারাবর্ণনা করছে আর অক্ষত অংশগুলো নতুন করে ভাঙছে। বললাম, ‘এসব আর দেখতে ইচ্ছে করে না মা। একটা অকৃতজ্ঞ জাতির জন্য ওরা জীবন দিয়ে গেছে। এসব দেখলে সহ্য হয় না।’
সেতু বলল, ‘বাবা, ওকে চিনতে পেরেছ?’
বললাম, ‘না তো।’
সেতু বলল, ‘ভালো করে দেখ।’
‘দেখেছি। আর দেখার ধৈর্য নেই।’
‘এটা তো তোমাকে খামখা দেখাতে আসিনি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে।’
আমি গভীরভাবে খেয়াল করে দেখি। কিন্তু তেমন কিছুই আমি আলাদা করতে পারি না।
বললাম, ‘মোবাইল নে। আমি একই দৃশ্য বারবার দেখছি।’
‘তুমি ভালো করে খেয়াল করোনি। ও আমাদের সীমা আপু।’
‘সীমা কে?’
সেতু বিস্ময়ে ফেটে পড়ে। ‘তুমি সীমা আপুকে চিনতে পারছ না? বড় চাচার মেয়ে। আমাদের সীমা আপু।’
আমি খেয়াল করে দেখে ভাবি, ‘তাই তো, ও তো আমাদের সীমাই।’ ও আজ কলাপাতা রঙের শাড়ি পরেছে। রং মিলিয়ে ব্লাউজ পরেছে। একদম অচেনা লাগছে সীমাকে। এই প্রথম ওকে আমি শাড়ি পরা দেখলাম। ‘ও ওখানে এটা কী করছে?’
সেতু বলল, ‘মন দিয়ে শোন, দেখ সীমা আপু কী বলছে?’
সীমার বর্ণনা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই। ও বলছে, ‘তোরা কারা? তোদের এভাবে নাক ভেঙে দিয়েছে কেন? তোদের তো পুরোটাই ভেঙে ফেলা উচিত। মুসলমান দেশে মূর্তি থাকবে কেন?’
সীমার এ কথাটায় আমার দম আটকে যায়। কী বলছে সীমা! ও কি ভেতরে ভেতরে এতটা রক্ষণশীল! এই দৃশ্য দেখে আমার লেখা বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের পরিবারে এমন মৌলবাদী চেতনার মানুষ আছে আমি ভেবে অস্থির হয়ে যাই। আমাকে গভীরভাবে ভাবনাকাতর দেখে সেতু মোবাইল নিয়ে চলে যেতে থাকে। আমি ডেকে বললাম, ‘সীমা এলে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস।’
সীমাকে নিয়ে সেতু এল সন্ধ্যার পর। সীমার পরনে শাড়ি নেই। স্বাভাবিক সেলোয়ার-কামিজ পরনে। আমি ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেই। ওর সেই লাইভ ভিডিও দেখার পর থেকে আমি অস্বাভাবিক এলামেলো হয়ে আছি। স্বাভাবিক কোনো কাজই করতে পারছি না। সীমাকে বললাম, ‘তুই এখন কোথায় কী পড়ছিস?’
সীমা আহ্লাদি কণ্ঠে বলে উঠল, ‘ছোট চাচ্চু, এটা তুমি কী বলছ! তুমি আমাকে ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি করে দিয়ে এলে। আর এখন বলছ আমি কোথায় কী পড়ছি?’
‘তুই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়িস, জীবনযাপনের লক্ষণ দেখে তো তা মনে হচ্ছে না।’
‘কেন চাচ্চু?’
‘তুই একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে কিছু জানিস?’ সীমা মাথা নামিয়ে থাকে। বললাম, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে তুই সত্যি কিছু জানিস না। তাহলে তোকে দোষ দিয়ে আর লাভ কী! আমার নিজের গালে নিজেই চড় মারতে ইচ্ছে করছে।’
‘কেন চাচ্চু, আমি কি ভুল কিছু করেছি?’ সীমার কণ্ঠে অপরাধীর ভয়ার্ত সুর। বললাম, ‘তোর এসএসসি পরীক্ষার পর তোকে আর সেতুকে ২০ ফেব্রুয়ারি মধ্য রাতে ‘শহিদ মিনার’ নিয়ে গিয়েছিলাম, মনে আছে তোর?’ সীমা তবু মাথা নামিয়ে থাকে। কথা বলে না। তার তো সেই রাতের স্মৃতি ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তবে কি ও বাঙালি সংস্কৃতি এবং সেই সংস্কৃতি চেতনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে? যারা না জেনে না বুঝে ভাষা শহিদ এবং বীরশ্রেষ্ঠদের মুরাল ভেঙেছে তাদের ক্ষমা করা যায় কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিবারের কেউ সে ইতিহাস ভুলে গিয়ে মুরাল নিয়ে ব্যঙ্গ করলে তাকে ক্ষমা করা যায় না।
সেতুকে বললাম, ‘তুই বলতে পারবি, ২১শে ফেব্রুয়ারি কী?’
সেতু মুখস্থ বলতে শুরু করল, ‘পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তানে এসে ঘোষণা করেন, ‘উর্দু- একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। তার সেই ঘোষণা শুনে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। তারা বুঝে ফেলে ওরা আমাদের সংস্কৃতির ওপর নগ্ন আঘাত করতে শুরু করেছে। ছাত্রদের আন্দোলনে সারা পূর্বপাকিস্তান উত্তাল হয়ে ওয়ে ওঠে। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের আন্দোলন স্তব্ধ করতে ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙতে ১০ জন ১০ জন করে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে। পুলিশ ছোট্ট মিছিলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশের গুলিতে রফিক, জব্বার, ছালাম, বরকত ও শফিকরা শহিদ হন। তাদের জীবন উৎসর্গের মাধ্যমে আমাদের মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়।’
‘অনেক ধন্যবাদ। তার পর?’
‘তার পর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ঘোষণা করে।’ সেতু বলে থামে। আমি সেতুকে পাল্টা প্রশ্ন করি, ‘আর কিছু?’
সেতু ভাবতে থাকে। আমি ওকে সাহায্য করতে বলি, ‘আমাদের রক্তদানের কারণে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে বাঙালি জাতিকে কতটা সম্মানিত করেছে আমরা কি সে মর্যাদার কথা মনে রাখি? সারা পৃথিবী জানে
বাঙালি একমাত্র জাতি যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে একই সঙ্গে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছে। এটা কম গৌরবের কথা!’
বলতে বলতে আমার চোখে পানি চলে আসে। সীমাকে বললাম, ‘শহিদের সন্তান হয়ে তুই কীভাবে এ কাজটি করতে পারলি? তুই কি ইতিহাস ভুলে গেছিস?’
সেতু অভিযোগ করে বলে, ‘সীমা আপু ইতিহাস মনে রাখে না বাবা।’
‘কেন? নিশ্চয়ই ওর মনে অন্য কোনো অভিমান জমে পুরো গাদ হয়ে আছে। বল সীমা, তোর মনের কষ্ট আমাকে খুলে বল, ‘তোর মনে এমন কী দুঃখ- যে কারণে তুই তোর শহিদ পিতার আত্মাকে কষ্ট দিচ্ছিস?’
সীমা ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করে। বলে, ‘আমার আব্বু মরল কেন?’
‘কে বলল তোর আব্বা মরেছে। দেশের জন্য সে জীবন উৎসর্গ করেছে। কয়জনের ভাগ্যে এমন দুর্লভ সুযোগ হয় যে দেশের জন্য সে জীবন দিতে পারে। আমরা আমাদের ভাইকে নিয়ে গর্ব করি। আমরা গর্ব করে বলি, এই দেশটা আমাদের। আমার ভাইয়ের রক্তে এই দেশটা আমরা পেয়েছি। সেই অহংকার পুরোটাই তোর। তোর পিতার রক্তে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে। এটা কম বড় কথা। তোর মতো ভাগ্যবতী কয়জন আছে যে তার পিতা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছে? সেই তুই ভাষা শহিদদের নিয়ে ব্যঙ্গ করিস! তুই কি জানিস, ভাষা শহিদদের পথ ধরেই এসেছে মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলন হলো আমাদের স্বাধীনতার আতুঁড় ঘর। ভাষা শহিদদের অপমান করার মানে বুঝিস? ভাষা শহিদদের অপমান করা মানে- আমাদের স্বাধীনতাকে অপমান করা। শহিদের সন্তান হয়ে তুই কি সেটা করতে পারিস? বল পারিস?’
আমি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। শব্দ করে কেঁদে উঠতেই সেতু এবং সীমা দুজনই আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সেতু এতক্ষণ স্থির হয়ে ছিল। দেশের জন্য তার বড় চাচার জীবন উৎসর্গের কথা শুনে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি। সীমার সঙ্গে সেও শব্দ করে কেঁদে ওঠে।