ঢাকা ৬ আষাঢ় ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০২৪

বাজারে আসছে টিএমএসএস এলপিজি

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৪, ১১:২৭ এএম
আপডেট: ১৮ মে ২০২৪, ১১:২৮ এএম
বাজারে আসছে টিএমএসএস এলপিজি
বাগেরহাটের মোংলা নৌ-বন্দর এলাকায় শেলাবুনিয়া গ্রামে নির্মিত টিএমএসএস এলপিজি প্লান্ট। শুক্রবার তোলা। ছবি : খবরের কাগজ

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বার্ক) থেকে ছাড়পত্র পেলেই বাজারে আসবে টিএমএসএস (ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ) এলপিজি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস)। তবে স্থায়ী ছাড়পত্র নিতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে। এর জন্য আবেদন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 

বাগেরহাটের মোংলা নৌ-বন্দর এলাকার শেলাবুনিয়া গ্রামে ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ একর জমির ওপর ৯০০ কোটি টাকায় টিএমএসএস এলপিজি প্লান্টের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্প এলাকায় সিলিন্ডার তৈরির জন্য নেওয়া হয়েছে ১০০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প। 

প্লান্ট ম্যানেজার মো. ইমরান মল্লিক বলেন, ‘চায়নিজ জিংমে হন্টু স্পেশার এয়ারক্রাফট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড ও মালয়েশিয়ার প্রতিষ্ঠান কোসেল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এলপিজি প্লান্টে সব ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপন করেছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে ১২, ৩৫ ও ৪৫ কিলোগ্রাম (কেজি) এলপিজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সিলিন্ডার রিফিলিং করা হয়েছে। ২০১৮ সালে এ প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে করোনাসহ বিভিন্ন কারণে নির্মাণকাজ শেষ হতে প্রায় দুই বছর সময় বেশি লেগেছে। প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সিলিন্ডার কিনে বাজারজাত করা হবে টিএমএসএস এলপিজি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে টিএমএসএস এলপিজি প্লান্টেই তৈরি হবে সিলিন্ডার।’  

তিনি আরও জানান, এ কোম্পানিতে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান হবে। প্রতিষ্ঠানের ডলফিন জেটিতে একসঙ্গে ৯ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি খালাসের সক্ষমতা থাকলেও চ্যানেলে গভীরতা কম থাকায় এখন জাহাজ থেকে এলপিজি খালাস করা সম্ভব হবে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেট্রিক টন। ২৪ ঘণ্টা উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন এ প্লান্টে আট ঘণ্টায় ১২ কেজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ৯ হাজার ৬০০টি সিলিন্ডার রিফিলিং করা সম্ভব হবে। তবে ৩৫ কেজি এলপিজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সিলিন্ডার রিফিলিং করা সম্ভব ৯৬০টি আর ৪৫ কেজি সিলিন্ডার রিফিল করা সম্ভব ৭২০টি। 

ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে জাহাজে এলপিজি আমদানি করা হবে। তিনটি স্টোরেজ ট্যাংকে ছয় হাজার মেট্রিক টন এলপিজি রাখার ব্যবস্থা থাকলেও আরও দুই হাজার টন ক্ষমতাসম্পন্ন স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণের সুযোগ রাখা হয়েছে। প্লান্টে জাহাজ থেকে এলপিজি নামানোর যেমন সুযোগ আছে, তেমনি লাইটার জাহাজে এলপিজি লোড করারও সুযোগ রয়েছে। বছরে উৎপাদনের গড় ক্ষমতা ১ লাখ ৩৬ হাজার ২৮১ মেট্রিক টনের বেশি।

বিক্রয় বিভাগের প্রধান মো. শাহরিয়ার চৌধুরী জানান, বগুড়ার এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের এলপিজি খাতে ৩১তম প্লান্ট। খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি গোপালগঞ্জসহ দেশের ১১টি জেলায় প্রাথমিকভাবে গৃহস্থালি ও শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে বিক্রির জন্য ডিলার ও এজেন্ট নিয়োগ করা হবে। প্রথম দিন চার লাখ সিলিন্ডার দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বাজারে এলেও প্রতিদিনই চাহিদা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সিলিন্ডারের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

গৃহস্থালি কাজের জন্য সাধারণত যে ধরনের সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, তার দাম কেমন হবে- এ প্রশ্নের জবাবে মো. শাহরিয়ার চৌধুরী বলেন, ‘সরকারনির্ধারিত দরের চেয়ে কোনোভাবেই বেশি দামে খুচরা বাজারে কেনাবেচা হবে না। এখন দেশের বাজারে এলপিজির মাসে গড় চাহিদা দেড় লাখ মেট্রিক টনের বেশি। নতুন প্রতিষ্ঠান হলেও চাহিদা আনুযায়ী বিভিন্ন জেলায় ধীরে ধীরে এজেন্ট ও ডিলারদের সংখ্যা বাড়ানো হবে।’ 

বিসিএল গ্রুপের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অপারেশন) মো. মেজবাউল বারী শুভ্র বলেন, ‘টিএমএসএস এলপিজি প্লান্টের চাহিদা অনুযায়ী প্রকল্প এলাকার ভেতরেই তৈরি করা হবে ১২ কেজি, ৩৫ কেজি ও ৪৫ কেজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন সিলিন্ডার। আট ঘণ্টায় প্রায় ১ হাজার ১২ কেজির সিলিন্ডার তৈরি হবে। একই সঙ্গে চাহিদা অনুযায়ী তৈরি হবে ৩৫ কেজি ও ৪৫ কেজির সিলিন্ডার। সিলিন্ডার তৈরির কারখানা নির্মাণে আরও অন্তত ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কারখানাটির নির্মাণকাজ শেষ হলে সিলিন্ডার খাতে ব্যয় অনেকাংশে কমবে। 

মো. মেজবাউল বারী শুভ্র দাবি করেন, ডিলার ও এজেন্টদের চাহিদা অনুযায়ী পর্যাক্রমে ১ কোটি সিলিন্ডার বাজারে দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে তাদের। জেলা ও উপজেলার সদরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পরিবেশবান্ধব এ জ্বালানি সাধারণ ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নিয়েছে টিএমএসএস এলপিজি কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক মাপের নিশ্চয়তা রয়েছে শতভাগ।

তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে রোড ট্যাংকার ও বক টেইলের মাধ্যমেও টিএমএসএস এলপিজি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছে কর্তৃপক্ষ। প্রথম দিন বিভিন্ন স্থানে পণ্য নিতে প্রস্তুত করা হয়েছে ১০টি রোড ট্যাংকার ও বক টেইলার। বড় বড় শিল্পকারখানা ও ফিলিং স্টেশনে এলপিজি পৌঁছানোর জন্য রোড ট্যাংকার ও বক টেইলার তৈরি করবে টিএমএমএস এলপিজি কর্তৃপক্ষ। টিএমএসএস এলপিজি বাজারে আসার আগেই শুধু খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে এজেন্ট ও ডিলারশিপ পাওয়ার জন্য প্রায় ৭০টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করেছে।

সরকারি দামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাল চামড়া সিন্ডিকেট

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ১২:২৫ পিএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৪, ১২:৩৪ পিএম
সরকারি দামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাল চামড়া সিন্ডিকেট
রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় চামড়ায় লবণ দিয়ে সংরক্ষণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন শ্রমিকরা। ছবি: খবরের কাগজ

এবারেও সরকারি দরকে পাত্তা দিল না চামড়া সিন্ডিকেট। চামড়া সংগ্রহকারীরা কোরবানির পশুর চামড়া কেনার পর আড়তদার ও ট্যানারির মালিকদের কাছে বিক্রি করতে গিয়েই বিপাকে পড়েন। অনেকে কেনা দর দিতেও রাজি হননি। বিক্রি করতে না পেরে অনেকে মনের কষ্টে চামড়া ফেলে দিয়েছেন। অনেকে মাটিচাপা দিয়েছেন।  

রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে খবরের কাগজের নিজস্ব প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির এ চিত্র পাওয়া যায়।   

জানা যায়, প্রতিবছরের মতো এবারও পাড়া-মহল্লা ঘুরে এতিমখানা, মাদ্রাসার প্রতিনিধিরা কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছেন। এদের পাশাপাশি কিছু মৌসুমি ও স্থায়ী চামড়া সংগ্রহকারীও কোরবানির পশুর চামড়া কিনেছেন। চামড়া সংগ্রহকারীদের অনেকে নিয়মমতো লবণ মাখাতে পারেননি বলেও অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এবারে গরম ছিল। সব মিলিয়ে দুপুরের পর থেকে চামড়ার মান কমতে থাকে। গন্ধ ছড়াতে থাকে। চামড়া সংগ্রহকারীরা বিভিন্ন আড়তে ঘুরে এবং ট্যানারির মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রির জন্য যোগাযোগ করতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন হয় যে, কেনা দরও অনেক ট্যানারির মালিক, আড়তদার দিতে চান না। 

অর্থনীতির বিশ্লেষক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মো. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে যা পাওয়া যায় এতিমদের পিছনেই খরচ করা হয়। প্রতিবছর কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বড় ধরনের সিন্ডিকেট মাঠে থাকে। তারা একজোট হয়ে কম দামে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রিতে বাধ্য করে। এটা পরোক্ষভাবে এতিমদের ঠকানো। 

তিনি আরও বলেন, চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় কোরবানির পশুর চামড়া ‌‘সময় নিয়ে’ দরদাম করে বিক্রি করার সুযোগ থাকে না। সরকার বিসিক শিল্পনগরীতে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারে। এতে সিন্ডিকেটের কবল থেকে কোরবানির পশুর চামড়া মুক্তি পাবে।

আরেক অর্থনীতিবিদ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের মৌসুমে অনেক চামড়া একসঙ্গে পাওয়া যায়। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে ধীরে ধীরে দরদাম করে বিক্রি করার সুযোগ পেত। এতে ভালো দাম পেত। চামড়া সিন্ডিকেট প্রতিবছরই এ কাজ করে চামড়া খাতের চরম ক্ষতি করছে।

ট্যানারির মালিকরা দাবি করেছেন, ডলারসংকটের কারণে অনেক দিন থেকেই চামড়ার ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে কোরবানির পশুর চামড়া কিনলে লোকসান হবে। 

গতকাল বেড়িবাঁধ হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি মোড় থানা রোডসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে খবরের কাগজ। কোরবানির চামড়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া কওমি মাদ্রাসার মাওলানা মিজানুর রহমান কাশেমী বলেন, ‘বহু ট্যানারির সঙ্গে দর-কষাকষি করে শেষ পর্যন্ত হেমায়েতপুরের মিতালী ট্যানারির কাছে সর্বোচ্চ ৮২০ টাকা পিস গরুর চামড়া বিক্রি করা হয়েছে, যা সরকারের বেঁধে দেওয়া দরের চেয়ে অনেক কম। গতবার এই চামড়া ৮৩০ টাকা পিস বিক্রি করা হয়েছিল। সরকার বেশি দামের কথা বললেও তা কার্যকর হয়নি। বিক্রেতারা ন্যায্য দাম পাননি। শুধু তাই নয়, ছাগলের চামড়া কিনতে অনীহা দেখিয়েছেন আড়তদাররা। একেকটি ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১০ টাকায়।’

পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তা কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের অন্যতম বড় জায়গা যাকে আড়ত বলা হয়। সেখানেও বড় ও মাঝারি আকারের গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ৮০০-৯০০ টাকা পিস বিক্রি হয়েছে। কম দামে চামড়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি আফতাব খান বলেন, ‘ট্যানারি মালিক অর্থাৎ ক্রেতাদের কাছে সরকার ১২০০ টাকা লবণযুক্ত চামড়া বিক্রির কথা বলেছে। আমরাও সেভাবে পাব আশা করি। তবে বিক্রেতাদের কাছে আমরা ৪৫০-৭০০ টাকা পিস বেশি চামড়া কিনেছি। ৭০০-৯০০ টাকা পিসও কিনেছি। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এবং হেমায়েতপুরেও আড়তদাররা চামড়া কিনছেন। তাই পোস্তায় আড়ত ৬৭টি থেকে ৪১টিতে নেমেছে। পোস্তায় এ মৌসুমে ১ লাখ কাঁচা চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় প্রতিবছর অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কোরবানির চামড়া নষ্ট হয়। এবারও প্রচণ্ড গরমে চামড়া নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

এতো কম দাম কেন? এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. শাহিন আহমেদ বলেন, ‘ঈদের দিন ৮ লাখ পিস চামড়া কেনা হয়েছে। ১ হাজার টাকা পর্যন্ত কেনা হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘৮২০ টাকা পিস কম না। এটা অনেক বেশি দাম বলা যায়। কারণ এর সঙ্গে লবণ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন খরচ যুক্ত হবে। তাতে সরকারের নির্ধারিত দামের কাছে চলে যাবে।’   

বরিশাল জেলায় কোরবানি হওয়া গরুর চামড়া ফেলে দেওয়া কিংবা নষ্ট হওয়ার মতো ঘটনা না ঘটলেও ছাগলের চামড়া কেউ কেনেননি। বরিশাল হাইড অ্যান্ড স্কিন অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি বাচ্চু মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেশির ভাগ ছাগল ও বকরি চামড়া বিক্রেতারা দোকানের সামনেই ফেলে রাখে। পরে সেগুলো আমাদের শ্রমিক দিয়ে কোরবানির দিন রাতে মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছি।’  

চট্টগ্রামের আতুরার ডিপোর আড়তে আড়াই লাখ এবং উপজেলায় দেড় লাখ চামড়া লবণজাত করা হয়েছে। তবে লবণজাত করতে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় ৮ থেকে ১০ হাজার পিস নষ্ট হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, চট্টগ্রাম নগরের আড়তদাররা আড়াই লাখ চামড়া সংরক্ষণ করেছেন। উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন মাদ্রাসা ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা প্রায় দেড় লাখ কাঁচা চামড়া লবণজাত করে সংরক্ষণ করেছেন। আড়তে ব্যবসায়ীরা ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যেই কিনছেন কাঁচা চামড়া। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা তেমন লাভ করতে পারেননি চামড়া ব্যবসা করে।  নগরের আগ্রাবাদ ও সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকায় কিছু চামড়া নষ্ট হয়েছে বলে জানা গেছে। 

খুলনায় এবার কোরবানির ঈদে চামড়ার বাজার সিন্ডিকেটের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মূল ব্যবসায়ীরা কেউ চামড়া কিনতে আগ্রহী না হওয়ায় অনেকেই গরু-ছাগলের চামড়া আশপাশের মসজিদ মাদ্রাসায় দিয়ে দিয়েছেন। মসজিদ ও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এই চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তারা প্রতিটি গরুর চামড়া ৫০০-৬০০ টাকা দরে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেছেন। ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ৫০-১০০ টাকায়। 

খুলনা জেলা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুস সালাম ঢালী জানান. এবার ঈদে প্রায় ৫০ হাজার গরু ও ৩০ হাজার ছাগলের চামড়া কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু মূল ব্যবসায়ীরা তা সংগ্রহ করতে পারেননি। যে যার মতো সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে বিক্ষিপ্তভাবে চামড়া কিনেছেন। এখন তা-ও বিক্রি হচ্ছে না। ট্যানারি মালিকদের কাছে খুলনার ব্যবসায়ীদের কোটি কোটি টাকা বকেয়া পাওনা থাকায় এই ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধের ভয়ে চামড়া কিনছেন না। আবার স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটে চামড়া তুলনামূলক কম দামে বাইরে পাচার হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে প্রতি বর্গফুট চামড়া ৫০-৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হলেও কোথাও সেই দামে বিক্রি হয়নি। ১ থেকে ২ লাখ টাকায় গরু কিনেও চামড়া ২০০-৫০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
 
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় চামড়ার হাট শহরতলির শম্ভুগঞ্জে। কোরবানির পর এ হাটে বিভাগের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা জেলা ছাড়াও সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার কিছু এলাকা থেকেও চামড়া নিয়ে আসেন ব্যবসায়ীরা। গত বছর সিন্ডিকেটের কারণে কম দাম পেয়ে হতাশ হন ব্যবসায়ীরা। এবারও এখন পর্যন্ত আশানুরূপ চামড়া বিক্রি হয়নি। 

এবার লোকসান হলে চামড়ার ব্যবসা ছেড়ে দিবেন জানিয়ে মজিন্দ্র মনি ঋষি বলেন, ‘অন্তত ৪৫ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করছি। কয়েক বছর ধরে লোকসান গুনছি। এবার কয়েকজন ট্যানারি মালিকদের প্রতিনিধি চামড়া কিনতে যোগাযোগ করেছেন। তবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম বলেছেন। ন্যায্য দাম পাওয়ার আশায় এখনো বিক্রি করিনি। এবার চামড়া ব্যবসায় লাভ করতে না পারলে এ ব্যবসা ছেড়ে দেব।’

রাজশাহীতে এবার ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৭৯০টি পশু কোরবানি হয়েছে। তবে বেশির ভাগ চামড়াই চলে গেছে নাটোরের আড়তে। রাজশাহীতেও সংগ্রহ করা হয়েছে। এবার জেলায় কোন পশুর চামড়া ফেলে দেওয়া বা বিক্রি হয়নি এমন ঘটনা ঘটেনি।  রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতর সভাপতি  মো.  আসাদুজ্জামান বলেন,  আমরা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে এবার সব চামড়া কেনার চেষ্টা করছি। এবার রাজশাহী জেলাতে গরুর চামড়া কেনা হয়েছে ৬০ হাজার। 

গত কয়েক বছর ধরে রংপুরে চামড়া সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো খুচরা ব্যবসায়ী সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়ার দাম পাননি। মাঝখান থেকে লাভবান হয়েছে মধ্যসত্ত্বভোগীরা ও বড় বড় ব্যবসায়ীরা। এবারে চামড়ার ভালো দাম না পাওয়ার কারণ জানতে কথা হয় প্রবীণ আড়ত মালিক এনামুল হকের সাথে। তিনি জানান, ট্যানারি মালিকদের কাছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অনেকে পুঁজি হারিয়ে পথে বসে গেছে। তিনি আরো বলেন, চামড়ার শিল্পে অতি দ্রুত ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থা চালু করাসহ সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। 

সিলেট লেদার অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি শাহিন আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা এবার সারা জেলায় প্রায় ১ লাখ চামড়া সংগ্রহ করেছি। কিন্তু যেখানে চামড়া সংরক্ষণ করে রেখেছি সেখানেও পানি উঠে গেছে। তাই আমরা অনেক চামড়াই ঢাকায় বিক্রি করতে পারবো না। আবার এই নষ্ট চামড়াগুলো ফেলতেও আমাদের অনেক খরচ হয়ে যাবে। তাই এবার চামড়া সংগ্রহ করে আমাদের লোকসান হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ছাগলের চামড়া আমরা বেশি কিনতে চাই না। কারণে একটা আমরা কিনে সংগ্রহ পর্যন্ত আমাদের প্রায় ৩০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ঢাকায় বিক্রি করতে হয় ৪০ টাকা করে। তাই লাভ হয় না। তাছাড়া ছাগলের চামড়া বেশিরভাগ সময়ই বেশি কাটা ছেড়া থাকে। তাই দাম পাওয়া যায় না বলে ব্যবসায়ীরা কিনেন না।’

বেপরোয়া গতি: ৮ দিনে সড়কে ঝড়ল ১২৮ প্রাণ

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ১১:২৩ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৪, ১১:২৩ এএম
বেপরোয়া গতি: ৮ দিনে সড়কে ঝড়ল ১২৮ প্রাণ
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

ঈদুল আজহায় সড়কপথে প্রাণহানির কারণ হিসেবে এবার অতিরিক্ত গতির সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ সড়ক কাঠামোর কথা উঠে এসেছে সবিস্তারে। এ ছাড়া বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে বেপরোয়া গতির বাস, মোটরসাইকেল, ইজিবাইকের কথা বলা হয়েছে।

গত ১১ জুন থেকে ঈদুল আজহার ঘরযাত্রা শুরু হয়। সেদিন থেকে ঈদ-পরবর্তী দুদিনে যেসব দুর্ঘটনা ঘটেছে সারা দেশে তা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সড়ক-মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন। এ ছাড়া বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেল তো রয়েছেই। 

গত মঙ্গলবার (১৮ জুন) গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে বরিশাল-ঢাকা রুটের বাস মাদারীপুর পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে প্রাইভেট কারের সংঘর্ষ হয়। হাইওয়ে পুলিশ জানায়, একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইককে সাইড দিতে গিয়ে প্রাইভেট কারটি বাসের সামনে চলে আসে। এ ঘটনায় নিহত হন দুজন। মারাত্মকভাবে আহত হন আরও ১০ জন। এর আগে পবিত্র ঈদুল আজহার দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে মোটরসাইকেলে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন দুই ভাই হুমায়ূন খান ও রবিউল। পথে আশুগঞ্জের কাছাকাছি সোহাগপুর এলাকায় এসে নিয়ন্ত্রণ হারায় তাদের মোটরসাইকেল, ধাক্কা দেয় রোড ডিভাইডারে। গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে পাঠালে চিকিৎসক দুজনকেই মৃত ঘোষণা করেন। ঈদের দিন সকালে কুয়াকাটা-ঢাকা রুটের ব্যাপারী পরিবহন দুর্ঘটনায় পড়ে বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারের সামনে। বাসটি একটি ট্রাককে পেছন থেকে জোরে ধাক্কা দেয়। এতে বাসের সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। সেই সঙ্গে ট্রাকটি মহাসড়কের পাশের পুকুরে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই বাসের সুপারভাইজার নিহত হন। কুষ্টিয়ায় গত তিন দিনে ৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুজন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন ১২ জন। হতাহতরা অধিকাংশই মোটরসাইকেলের আরোহী। বেপরোয়া গতির কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি হাইওয়ে পুলিশের। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএর হিসাবে গত ১১ জুন থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত ১২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১২৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১৭১ জন। তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, প্রকৃতপক্ষে ঈদুল আজহায় সড়কে প্রাণহানির ঘটনা আরও বেশি। 

দ্রুতগতির পাশাপাশি সড়ক-মহাসড়কে সার্ভিস লেন না থাকা, জাতীয় আঞ্চলিক মহাসড়কের নানা স্থানে অপরিকল্পিতভাবে গ্রামীণ সড়কের সংযুক্তিকে দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। 

বুধবার (১৯ জুন) সকালে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ঈদ-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কথা বলছি। কিন্তু সেখানে আগে সার্ভিস লেন দিতে হবে যেন ধীরগতির যানবাহনগুলো সেখানে চলতে পারে।

মোটরসাইকেল, ইজিবাইক নীতিমালা করার নির্দেশনা
সড়ক-মহাসড়কে চলাচলের সময় গতিসীমা নীতিমালার তোয়াক্কা না করে একের পর এক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠা মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকগুলোকে এবার নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। ঈদ-পরবর্তী শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরে মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরীকে নির্দেশনা দেন মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক নীতিমালা প্রণয়নের জন্য।  

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ইদানিং অ্যাক্সিডেন্টের যে প্রবণতা তাতে দেখা যাচ্ছে, মোটরসাইকেলে অ্যাক্সিডেন্ট বেশি। ইজিবাইকগুলোও অ্যাক্সিডেন্টের মূল কারণ। দেখা যাচ্ছে এ পর্যন্ত যত অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে তার মধ্যে মোটরসাইকেলে সবচেয়ে বেশি; এরপরে ইজিবাইক। সচিব সাহেবকে বলব, নীতিমালা করা প্রয়োজন। সারা দেশে লাখ লাখ তিনচাকার গাড়ি (ইজিবাইক), মোটরসাইকেল। এগুলো রাস্তার শৃঙ্খলাকে নিদারুণভাবে বিঘ্নিত করছে। কাজেই এখানে একটা সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।’
রোড সেফটি প্রজেক্ট দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশনা

২০২২ সালের মার্চে জানানো হয়, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ মহাসড়ক এবং জেলা পর্যায়ের সড়কগুলো নিরাপদ করতে বাংলাদেশকে ৩৫৮ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। বিশ্বব্যাংক জানায়, বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ) থেকে ৩০ বছর মেয়াদি এই অর্থায়ন করা হবে। বিশ্বব্যাংক তখন জানিয়েছিল, পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে গাজীপুর-এলেঙ্গা মহাসড়ক এবং নাটোর-নবাবগঞ্জ মহাসড়ককে বেছে নেওয়া হবে। এই দুই সড়কের নকশা, সড়কে নির্দেশনামূলক চিহ্ন, জরুরি সেবা, পথচারীদের সুবিধা, গতি নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সেবা সুবিধা নিয়ে কাজ করা হবে। সমস্যা চিহ্নিত করে সড়কের উন্নয়ন ঘটানো হলে এই দুই মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার ৩০ ভাগ কমে যাবে। এই দুটি জাতীয় সড়কের পাশে টোল ফ্রি জরুরি নাম্বারে অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস চালু করা হবে। নির্বাচিত জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জরুরি সেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে। এ ছাড়া কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা চিহ্নিত করা হবে এবং পথচারীদের সচেতনতা বাড়াতে ও আচরণগত পরিবর্তনের জন্য প্রচারণাও চালানো হবে।

বিশ্বব্যাংক জানায়, এই প্রকল্পের অধীনে জেলা পর্যায়ের সড়ক উন্নয়ন, ট্রাফিক পুলিশের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে, যেখানে পেশাদার চালকদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।

বুধবারের সভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিশ্বব্যাংকের এই প্রকল্প দ্রুত যুক্তিযুক্ত করে কার্যকর করতে হবে। বিশ্বব্যাংকের নানা প্রকল্প প্রলম্বিত হয়। কথা শুনতে হয়, এত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হচ্ছে, কিন্তু সড়কে শৃঙ্খলা ফিরছে না। এ কাজটা যেন তাড়াতাড়ি হয়, সেজন্য আমাদের আরও নজরদারি বাড়াতে হবে।’

পরে এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী খবরের কাগজকে জানান, রোড সেফটি প্রজেক্টের আওতায় গত মঙ্গলবার ৩০০ কোটি ডলার বরাদ্দ পেয়েছে মন্ত্রণালয়। এই অর্থায়নে রোড সেফটি প্রকল্পের জন্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ সড়কের বিষয়ে সচেতনতা, অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের কাজটি সম্পন্ন করা হবে। 

গণপরিবহন সংকট ও নীতি বাস্তবায়নে গলদ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা
প্রতিবছর ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র একই রকম থাকছে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সড়কযাত্রা নিরাপদ রাখতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করলেও সেসব বাস্তবায়নে গলদ থেকে যাচ্ছে। 

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম হাদিউজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদযাত্রায় গণপরিবহন সংকট প্রতিবছরই থাকছে। এই সংকট থাকছে বলে মানুষ মোটরসাইকেলে দূর গন্তব্যে যেতে চাইছে। ঈদযাত্রায় সংকটের আরেকটি কারণ হলো বাসের অতিরিক্ত ভাড়া। নিম্নআয়ের মানুষ উপায়ান্তর না দেখে খোলা ট্রাকে, ভ্যানে করে বাড়ি যান, যেগুলো প্রায় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠছে। ইজিবাইক কেন মহাসড়কে উঠে আসছে- এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন! কিন্তু এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাতায়াতের জন্য কী নিরাপদ গণপরিবহন আছে?’

অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সড়ক থেকে দ্রুত ইজিবাইক তুলে নেওয়া যাবে না। ইজিবাইকের কাঠামোগত পরিবর্তন এনে সেগুলো স্বল্প দূরত্বের সড়কের জন্য যেন নিরাপদ পরিবহন হিসেবে ব্যবহার করা যায় তা চিন্তা করতে হবে। ইজিবাইক কোন সড়কে চলবে, কোন সড়কে চলবে না, সেটিও নির্ধারিত করে দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন তা হাইওয়ে কানেক্টিং রোডে উঠে না যায় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। তেমনিভাবে কম সিসির মোটরসাইকেল যেন হাইওয়ে বা এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে না পারে সেজন্য নীতিমালা করতে হবে। মোটরসাইকেল চালকদের অভিজ্ঞতা ও বয়সসীমাও নির্ধারণ করা উচিত।’

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আরমানা সাবিহা হক বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য সরকার যেসব পলিসি নেয়, তা কতটা জোরালভাবে বাস্তবায়ন করা হয় এ নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয় তা আরও বিশ্লেষণ করতে হবে। সড়ক অবকাঠামো, যানবাহন সক্ষমতা সব মিলিয়ে কারা কোন পলিসি বাস্তবায়ন করবে এগুলো আরও সুস্পষ্ট করতে হবে।’

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আঞ্চলিক সড়কের সঙ্গে মহাসড়কের যে কাঠামো তাতে গলদ আছে। আঞ্চলিক সড়ক হুট করে উঠিয়ে দেওয়া হয় মহাসড়কে। সেক্ষেত্রে গতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়ে উঠে না। অন্তত ৫০ মিটার আগে থেকে ঢাল বানিয়ে দিলে আঞ্চলিক সড়কের যানবাহনগুলো গতি কমিয়ে মহাসড়কে উঠতে পারবে।’

ব্রিকসের সদস্যপদ: সম্ভাবনা সত্ত্বেও আরও অপেক্ষা বাংলাদেশের

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ০৯:৫১ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৪, ০৯:৫২ এএম
ব্রিকসের সদস্যপদ: সম্ভাবনা সত্ত্বেও আরও অপেক্ষা বাংলাদেশের
ছবি : সংগৃহীত

ব্রিকস হলো বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর একটি জোট। এই জোটে বাংলাদেশ যোগ দিতে চায়। এ জন্য কূটনৈতিক তৎপরতাও চালাচ্ছে ঢাকা। সদস্য দেশগুলোও বাংলাদেশকে জোটে নিতে আগ্রহী। রাশিয়ায় চলতি মাসে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বাংলাদেশকেও। 

তবে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে আপাতত নতুন সদস্য নেওয়া হবে না। ‘অংশীদার রাষ্ট্র’ মডেলে দেশগুলোকে ব্রিকসে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে বাংলাদেশসহ আগ্রহী দেশগুলো এই মডেলে ব্রিকসের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ পেতে করতে হবে অপেক্ষা। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে টানাপোড়েনের কারণে আপাতত এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে। 

ব্রিকস হলো উদীয়মান অর্থনীতির পাঁচটি দেশ– ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং সাউথ আফ্রিকার একটি জোট। দেশগুলোর প্রথম অক্ষর দিয়ে এর নামকরণ করা হয়েছে। গত বছর সদস্য হয়েছে সৌদি আরব, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর্জেন্টিনা, মিসর ও ইথিওপিয়া। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে জোটের একটি ব্যাংক আছে। সদস্য দেশগুলো অনেক আগে থেকেই নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন, ব্রিকস মুদ্রা প্রবর্তন এবং নিজস্ব রিজার্ভের কথা বলছে। 

গতবছরও দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ব্রিকসের ১৫তম বৈঠকে যোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ। ব্রিকসের পক্ষ থেকেই বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তখন মনে করা হয়েছিল বাংলাদেশ সদস্যপদ পেয়ে যাবে। কিন্তু সেবার যে ছয়টি সদস্য দেশকে নতুন সদস্য করা হয়েছিল সেই তালিকায় বাংলাদেশ ছিল না। 

এর কারণ হিসেবে সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলছেন, বাংলাদেশ আগ্রহ দেখিয়েছিল পরে। আগ্রহ দেখানো এবং তার জন্য যে মোবিলাইজেশন দরকার সেটা কতটুকু হয়েছিল সেটা ব্যাপার। সেকারণেই হয়তো বিষয়টি বিবেচনায় আসেনি। এটা একটা কারণ হতে পারে। 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারপর থেকে বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক হলেই বাংলাদেশ সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে সহায়তা চাইছে। সদস্য দেশগুলোও আশ্বাস দিচ্ছে জোটে নেওয়ার।

গত ৫ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ব্রিকসের সদস্য হতে বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে বেইজিং। ব্রাজিলও সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। মস্কোর দিক থেকেও বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন আছে। 

ব্রিকসে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা সবার সঙ্গে আছি। কিন্তু সামরিক কাঠামোর মধ্যে আমরা নেই। আর ব্রিকস অর্থনৈতিক জোট। তবে অপেক্ষা যে করতে হচ্ছে সেটা সদস্যদের নিজেদের ব্যাপার। এখানে বাংলাদেশের কিছু করার নেই।’ 

১২ জুন রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে যোগ দেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ডা. দীপু মনি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ হজে যাওয়ায় দীপু মনি সম্মেলনে যোগ দেন। এর আগে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ড. হাছান মাহমুদকে আমন্ত্রণপত্র পাঠান। 

সম্মেলনে ডা. দীপু মনি বলেন, ‘বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেলে বাংলাদেশ অনেক কিছু দেওয়ার সক্ষমতা রাখবে। এ জোটে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ সহযোগিতার একটি নতুন যুগের সূচনা করবে।’

সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতবিরোধ
ব্রিকসের দেশগুলোর মধ্যে নানা কারণে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ব্রিকসের সম্প্রসারণ নয়, সংস্কার চাইছে ভারত। কিন্তু চীন-রাশিয়া নতুন সদস্য নেওয়ার ব্যাপারে একমত। আবার চীনা প্রভাবের সম্ভাব্য ‘ঝুঁকি’র কারণে ভারতের অবস্থানের প্রতি সম্মতি আছে ব্রাজিলের। 

ব্রাজিল ও ভারত চায় ব্রিকস যেন একটা পশ্চিমাবিরোধী জোট না হয়। এ জন্যই মূলত নতুন সদস্যপদ দেওয়া স্থগিত করে আপাতত ‘অংশীদার রাষ্ট্র’ মডেল প্রণয়ন করা হয়েছে।

ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম বন্দর সচল থাকলেও সুফল নেই

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ০৬:৩০ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৪, ০৬:৩০ এএম
ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম বন্দর সচল থাকলেও সুফল নেই
চট্টগ্রাম বন্দর। ছবি : খবরের কাগজ

ঈদুল আজহা উপলক্ষে টানা পাঁচ দিন সরকারি ছুটি শেষে গতকাল বুধবার (১৯ জুন) অফিস খোলা হলেও চট্টগ্রাম কাস্টমসের অনেক কর্মকর্তাকে কর্মস্থলে পাওয়া যায়নি। গতকাল দুপুর ১২টায় কাস্টমস কমিশনার ফাইজুর রহমান কর্মস্থলে উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন শাখা পরিদর্শন করেন। 

এদিকে সরকারি ছুটিতে চালু রাখা হয়েছিল চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম। কিন্তু খুব সুফল মেলেনি কনটেইনার ওঠানামার কার্যক্রমে। বন্দর চালু থাকলেও ব্যাংক, কাস্টমসের সেবা পুরোপুরি চালু ছিল না। বন্ধ ছিল শিল্পকারখানা ও গুদাম। সড়কে পণ্যবাহী যান চলাচলেও ছিল নিষেধাজ্ঞা।

বন্দর সূত্র মতে, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঈদের দিন ও পরের দিন কনটেইনার ডেলিভারি হয়নি। তার আগের দিন মাত্র ৩০০ কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছিল। 

টানা বন্ধের কারণে ঈদের দিন ও পরের দিন কনটেইনার ডেলিভারি নেমে আসে শূন্যের কোঠায়। যদিও স্বাভাবিক সময়ে দিনে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার কনটেইনার ডেলিভারি হয় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে।

তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানান, বন্দর থেকে পণ্য ডেলিভারি নিতে ছুটির দিনে সব ধরনের সেবা চালু থাকে। কিন্তু আমদানিকারকরা ডেলিভারি না নেওয়ায় বন্দর চালু রাখার সুফল পাওয়া যায় না। ঈদের দিন কয়েক ঘণ্টা ছাড়া বাকি সব সময় বন্দর খোলা ছিল।

আমদানিকারক এবং বন্দর ব্যবহারকারীরা জানান, কাস্টমস বন্ধ থাকায় পণ্যের শুল্কায়ন সম্ভব হয় না। ব্যাংক বন্ধ থাকায় শুল্ক ও বন্দরের চার্জ পরিশোধ করা যায় না। ছুটি থাকায় কারখানার গুদামের শ্রমিক পাওয়া যায় না পণ্য খালাসে। এ ছাড়া মহাসড়কে পণ্যবাহী যান চলাচলে থাকে নিষেধাজ্ঞা। মূলত এসব কারণেই বন্দর চালু থাকলেও এর সুফল মেলে না কনটেইনার ডেলিভারি কার্যক্রমে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ডেলিভারির হিসাব ধরা হয় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা, অর্থাৎ সকাল ৮টা থেকে পর দিন সকাল ৮টা পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ১৭ জুন ও ১৮ জুন বন্দরে কনটেইনার ডেলিভারি হয় শূন্য টিইইউ (টুয়েন্টি ফুট ইকুয়েভিলেন্ট ইউনিট)। ঈদের আগের দিন ১৬ জুন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছিল ৩৮৯টি। সেদিন জাহাজ থেকে রিসিভ করা হয়েছিল ৩৪৭টি কনটেইনার। একই দিন চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে থাকা কটেইনার সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ২১টি। 

এর আগের দিন ১৫জুন ২২৩৯টি কনটেইনার ডেলিভারি হয়। জাহাজে উঠানামা হয় ৪৬৩০টি। আমদানি কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরের গ্রহণ করা হয় ২ হাজার ৭৬৮টি, জাহাজে তোলা হয় ১ হাজার ৮৬২টি। বন্দরের মোট কনটেইনার সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৮৯৮টি। 

ছুটির দিনে কনটেইনার ডেলিভারি না হলেও কনটেনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ হয়ে থাকে।  এতে জাহাজ থেকে নামানো কনটেইনার ডেলিভারি না হয়ে ইয়ার্ডে জমা থেকে যায়। ফলে ইয়ার্ডে জমা কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে যায়। 

চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার রাখার সক্ষমতা ৫৩৫১৮ টিইইউ। বন্দরের কার্যক্রম সচল রাখতে সক্ষমতার ১৫ শতাংশ খালি রাখতে হয়। সেই হিসাবে বন্দর ইয়ার্ডে প্রায় ৪৫৫০০ টিইইউ কনটেইনার থাকলে সেটি স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচিত হয়। এদিকে ১৩ জুন বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে মোট কনটেইনার ছিল ৩১ হাজার ১২৪টি। ১৮ জুন পর্যন্ত মোট কনটেইনার জমা হয় ৩৬ হাজার ৩৬২ টি।  প্রায় ৫ হাজার কনটেইনার বেড়ে যায় চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ডে। 

এদিকে ১৯ জুন থেকে সরকারি ছুটি শেষ হয়ে সব কিছু খোলা থাকলেও এখনো স্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছায়নি ডেলিভারি পরিস্থিতি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বন্দর খোলা থাকলে হবে না, সব স্টেকহোল্ডারকে নিয়ে সরকারের উচ্চমহলের সমন্বিত সিদ্ধান্ত দরকার।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ খবরের কাগজকে বলেন, সব ঈদকে কেন্দ্র করে বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার জমা থেকে যায়। 

ঈদের আগে এবং চার-পাঁচ দিন পরে কনটেইনার ডেলিভারি অনেকটাই কমে যায়। এ কারণে বন্দর এবং ডিপোগুলোতে কিছুটা জট সৃষ্টি হয়। এটি প্রতিবছরের ঘটনা। এবার কোরবানির ঈদেও তাই হয়েছে। 

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সহসভাপতি রকিবুল আলম চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘পোশাক কারখানার পণ্য রপ্তানি স্বাভাবিক রাখার কথা বিবেচনা করে বেসরকারি ডিপোগুলো সচল রাখার কথা বলেছিলাম। কিন্তু সে হিসেবে সেবা আমরা পায়নি।’

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম সচল রেখেছি। কিন্তু ব্যবহারকারীরা না এলে আমাদের করার কিছুই থাকে না। এর পরও আমরা সব স্টেকহোল্ডারদের চিঠি দিয়েছি সরকারি ছুটির সময়ে সেবা গ্রহণের জন্য। তবে ডেলিভারি না হলেও জাহাজে কনটেইনার উঠানামা অনেকটা স্বাভাবিক ছিল।’

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার ফাইজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘কাস্টম হাউসের অনেক কর্মকর্তা ছুটিতে রয়েছেন। ঈদের ছুটি ছাড়াও কয়েক দিন ছুটি নিয়েছেন কর্মকর্তারা। তাই অনেক কর্মকর্তা আসেননি। আগামী সপ্তাহে বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

কেন ঢল নামলেই জলতল সিলেট?

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৪, ০৪:০০ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৪, ০৪:০০ এএম
কেন ঢল নামলেই জলতল সিলেট?
সিলেটে বন্যার পানি ঢুকছে বাড়িঘরে। ছবি : খবরের কাগজ

টিলাভূমি আর জলাভূমি নিয়ে সিলেট। এই জেলার উত্তরপূর্বে রয়েছে ভারত সীমান্ত। ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্যের বেষ্টনী। একদিকে পাহাড় আরেকদিকে নদী। পাহাড় আছে মেঘালয়, খাসিয়া ও জয়ন্তিয়ায়। সুউচ্চ এই তিন পাহাড় একদিকের সীমান্ত। ভারত থেকে বরাক নদী নেমে এসে বাংলাদেশের সুরমা-কুশিয়ারার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। কুশিয়ারা সিলেটের প্রান্তসীমার উপজেলা জকিগঞ্জের সীমারেখা। টিলাভূমি আর জলাভূমির সিলেট কেন ঢল নামলেই জলতল হচ্ছে? এ প্রশ্নটি ২০২২ সালের বন্যার পর থেকে প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। 

বলা হচ্ছে, পৃথিবীর বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল ভারতের শিলংয়ের চেরাপুঞ্জি থেকে সরাসরি পানি আসছে ভাটির পথে। এতকাল এই পানিকে বলা হতো উজানের পানি। এখন সরাসরি বলা হচ্ছে ‘ভারতের ঢল’ বা ভারতের ছেড়ে দেওয়া পানি। দোষারোপের গণ্ডি সীমানা পেরিয়েছে।

স্থানীয় ইতিহাস ঘেঁটে জানা গেছে, সিলেট অঞ্চলকে একসময় ‘জলতল্লাট’ বলা হতো। আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেটে যখন প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা হয়, তখন কালেক্টরেট উঁচু একটি টিলা এলাকা বাছাই করেছিলেন। বর্তমানে এমসি কলেজের অধ্যক্ষের ভবনের স্থানটি ছিল সেই টিলা। কালেক্টরেট কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করায় সেই থেকে টিলাটির নাম হয়েছে ‘থ্যাকারের টিলা’। মাইকেল থ্যাকার ছিলেন প্রথম কালেক্টরেট। উইলিয়াম মাইকপিস থ্যাকারের ‘ভারতজীবন’ গ্রন্থে এ বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এখানে বছরের ৯ মাস পানি থাকে। নৌকার কারিগর পাঠানোর তাগাদা দিয়ে ব্রিটিশ সরকারের মাধ্যমে নৌ-কারিগর প্রতিষ্ঠান গড়ার কথাও বলা হয়েছে। অপরদিকে থ্যাকার কেন কালেক্টরেট কার্যালয় টিলার ওপর করলেন? এ নিয়েও তার জবাবদিহিতে জলতল্লাট কথাটি প্রকাশ পেয়েছে।

ব্রিটিশ শাসকদের স্মৃতিচারণ গ্রন্থ ও নথিপত্র থেকে প্রাপ্ত এসব তথ্য-উপাত্ত বলছে, সিলেট অঞ্চল জলাভূমি। একাংশ টিলাভূমি হওয়ায় ভৌগোলিক দুটো চিত্রই দৃশ্যমান রয়েছে। অপেক্ষাকৃত নিচু টিলাভূমি এলাকায় ঢলের পানি নামলে দ্রুত গড়িয়ে যায়। পর্যবেক্ষক ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, এই গড়িয়ে পড়ার ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে বিগত কয়েক বছর ধরে।

২০০৪ ও ২০২২ সালের বন্যা এবং এবারকার পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেছেন সিলেট কোম্পানীগঞ্জের ধলাই নদ অববাহিকা ইসলামপুর (পশ্চিম) ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। 

তিনি বলেন, ‘ভারতের চেরাপুঞ্জি থেকে সরাসরি ঢলের পানি ধলাই নদে নামে। এ সময় সদরসহ নদতীরের জনবসতিতে পানি এলেও স্থায়িত্ব ছিল কম। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে এখানে ঢলের পানির বন্যার স্থায়িত্ব বেশি হচ্ছে। অর্থ্যাৎ পানি আগের মতো গড়াচ্ছে না। কেন গড়াচ্ছে না, এটা দেশীয় বিষয়। আর ঢল কেন সরাসরি আসছে, সেটা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বিষয়। এই দুই বিষয়ের সমাধান ছাড়া নিস্তার নেই।’ 

ধলাই ছাড়াও সিলেটের অন্যতম সীমান্ত নদী সারী। এ নদী এক যুগ আগে ও পরের পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন মৃতপ্রায়। নদীটিকে বাঁচাতে গঠন করা হয়েছে একটি কমিটি। ‘সারী বাঁচাও আন্দোলন’ নামের এ কমিটির সভাপতি আবদুল হাই আল হাদী ‘পৃথিবীর পাঠশালা’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করছেন। 

জানতে চাইলে এই নদী অধিকারকর্মী বলেন, ‘এতকাল আমরা জেনেছি বরাক থেকে সুরমার পানি প্রবাহিত হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, জকিগঞ্জের কাছের বরাক মোহনা এখন ভরাট। সুরমার পানি প্রবাহের প্রাণ এখন লোভা নদী। এই যে নদীর গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হচ্ছে, এসবের মূলে রয়েছে ভারতে যত্রতত্র নদী শাসন।’

আবদুল হাই আল হাদী সিলেট অঞ্চলের নদনদীর উৎস অবস্থা সরেজমিনে দেখতে ভারতের মেঘালয়ে একাধিকবার গিয়েছেন। ব্যক্তিগত সফর থেকে ফিরে এসে প্রতিবার তিনি একই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তার মতে, ‘পাহাড়ি ঢল বা উজানের পানি বলা হতো সেই ১৯৪৭ সালে। যখন সিলেট অঞ্চল আসামের ছিল। এরপর থেকে এভাবে বলা এক ধরনের আঞ্চলিকতা। বরং ভারত থেকে আসা ঢল বললেই সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিপাত হবে।’

উপদ্রুত এলাকার মানুষের কথা থেকে বন্যার কারণ হিসেবে তিনটি বিষয় সামনে এসেছে। একটি ভারতের পানি, দ্বিতীয়ত দেশের অভ্যন্তরে পানিপ্রবাহে বাধা আর নদনদীর খনন না হওয়া। কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন সড়কটিকে অনেকে ‘টিকটক সড়ক’ বলে অভিহিত করছেন। ঢলের পানি দ্রুত না নামার জন্য এ সড়কটি কতটা দায়ী? এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন? 

জানতে চাইলে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মুশতাক আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। এ পরিবর্তনে আগের অনেক হিসেব-নিকেশ কিন্তু এখন পালটে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কিছুই ঢালাওভাবে প্রকাশ হয়। কেবল ইটনা-মিঠামইন সড়ক নয়, দায়ী আরও অনেক কিছু। পানি কেন সহজে নামছে না, এ জন্য একটি ডিজিটাল সার্ভে দরকার। এই সার্ভের পর সমন্বিত গবেষণা করে চিহ্নিত করতে হবে বন্যার কারণ। এক কথায় ২০২২ সালের বন্যা থেকে আমরা কোনো শিক্ষা নিইনি, এ কারণে ২০২৪ সালে এ পরিস্থিতির মুখে পড়েছি।’ 

সার্বিক পরিস্থিতি মোকবিলায় সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) মঙ্গলবার রাতে নগরভবনে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছে। এই সংবাদ সম্মেলনে সিলেট অঞ্চলে বন্যার তিনটি কারণ উপস্থাপন করেছেন সিলেট অনলাইন প্রেস ক্লাবের সভাপতি মুহিত চৌধুরী। 

তিনি বলেন, ‘কিশোরগঞ্জের হাওরে ইটনা-মিঠামইন সড়ক, সুরমা নদী ভরাট ও সীমান্ত এলাকার পাথর কোয়ারিতে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা পাথর আহরণ না করা।’ 

মুহিত চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘২০২২ সালের বন্যার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইটনা-মিঠামইন সড়কের বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পানি প্রবাহে সড়কটি বাধা হয়ে দাঁড়ানোয় ঢলের পানি নামছে না, বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। আর পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় সীমান্ত নদনদীগুলোর উৎসমুখ বন্ধ হয়ে পানি চলাচলে বাধা দিচ্ছে। সুরমার নাব্য কমায় সিলেট শহরে এক মৌসুমে আট থেকে দশবার জলাবদ্ধতা হচ্ছে। দেশীয় এই তিন সমস্যার সমাধান করে আন্তর্জাতিক দিকে নজর দিতে হবে।’ 

সংবাদ সম্মেলনে সিসিক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, তিনি এবারকার পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টিতে দেবেন। প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি অবহিত করে প্রতিকার চাইবেন।