আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের এক দিন আগে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। তখন তিনি ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র। ঢাকার মেয়র হওয়ায় তার ছিল কূটনৈতিক পাসপোর্ট (লাল পাসপোর্ট)। পরিস্থিতি প্রতিকূল টের পেয়ে ব্যারিস্টার তাপস সরকার পতনের ঠিক আগের দিন শাহাজালাল বিমানবন্দরে গিয়ে হাজির হন। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার জন্য তার জিও (সরকারি আদেশ) ছিল না। এ অবস্থায় নিকটাত্মীয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ফজলে নূর তাপসের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র খবরের কাগজের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছে।
শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে ফজলে নূর তাপস বিদেশে পালিয়ে যেতে পারলেও আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অনেকেই পালাতে পারেননি। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার এক দিন আগে অর্থাৎ ৪ আগস্ট কোনো কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী পতনের আঁচ পেয়েছিলেন। আবার ঘটনার দিন ৫ আগস্ট সকালে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেষ হয়ে এসেছে। তা সত্ত্বেও তারা বিদেশে পালাতে পারেননি। কারণ তাদের জিও ছিল না। এ অবস্থায় দেশেই আত্মগোপন করেন তারা। এ রকম কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়রা খবরের কাগজের কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক একজন প্রতিমন্ত্রী গতকাল বুধবার খবরের কাগজকে বলেন, ‘মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বিদেশে যাওয়ার জন্য জিও নিতে হয়। এটা সরকারের অনুমতিপত্র।’
তিনি বলেন, ‘বিদেশ সফরটি সরকারি কিংবা ব্যক্তিগত যে উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, জিওর প্রয়োজন রয়েছে, যদি তিনি কূটনৈতিক (লাল) পাসপোর্ট ব্যবহার করেন।’ অবশ্য সবুজ পাসপোর্টের ক্ষেত্রে জিওর প্রয়োজন হয় না বলেই জানান সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী। সবুজ পাসপোর্ট ব্যবহারে ভিসার প্রয়োজন হয়।
লাল পাসপোর্টকে বলা হয় ডিপ্লোম্যাটিক বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট। এই পাসপোর্ট পান রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং তাদের স্পাউস অর্থাৎ স্বামী বা স্ত্রী। সেই সঙ্গে উচ্চ আদালতের বিচারপতি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, পাবলিক সার্ভিস কমিশনের প্রধান, মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিদেশে বাংলাদেশি মিশনের কর্মকর্তারা পান লাল পাসপোর্ট। এই পাসপোর্ট যাদের আছে, তাদের বিদেশ ভ্রমণের জন্য কোনো ভিসার প্রয়োজন হয় না। তারা সংশ্লিষ্ট দেশে অবতরণের পর অন অ্যারাইভাল ভিসা পান। লাল পাসপোর্ট তথা ডিপ্লোম্যাটিক বা কূটনৈতিক পাসপোর্ট সব দেশেই লাল রঙের হয়ে থাকে।
জানা গেছে, মন্ত্রী-এমপিরা সংসদের মেয়াদকাল অর্থাৎ পাঁচ বছরের জন্য কূটনৈতিক পাসপোর্ট (লাল পাসপোর্ট) পেয়ে থাকেন। সংসদের মেয়াদ শেষ হলে পাসপোর্টের বৈধতা শেষ হয়ে যায়। তবে মন্ত্রী-এমপিদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট (লাল পাসপোর্ট) বাতিলের আদেশ এলে সাধারণত বাতিল করা হয়। এরপর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে যে কেউ সাধারণ পাসপোর্ট (সবুজ রঙের) পাওয়ার অধিকার রাখেন। কারও নামে যদি ফৌজদারি মামলা থাকে, তবে তিনি সাধারণ পাসপোর্ট পাবেন না। সে ক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশনা থাকলেই কেবল তিনি সাধারণ পাসপোর্ট পাবেন। সবুজ পাসপোর্ট জমা দিয়ে লাল (কূটনৈতিক) পাসপোর্ট নিতে হয়।
এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক বলেন, সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বা সংসদ ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক পাসপোর্টের বৈধতা শেষ হয়ে যায়। কূটনৈতিক বা লাল পাসপোর্টধারীরা মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেই পাসপোর্ট সারেন্ডার করে সাধারণ বা সবুজ পাসপোর্ট নিয়ে থাকেন।
জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলার সময় গত ১৪ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ২৭ দিনে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ৯০ জন সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও রাজনৈতিক নেতা। এ ছাড়া বিমানবন্দরে আটক করা হয় অন্তত ১০ জন মন্ত্রী-এমপি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিকে। বিমানবন্দরে এসেও পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ফিরে যান কমপক্ষে ২৫ জন মন্ত্রী-এমপি, রাজনৈতিক নেতা ও দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা।
সরকার পতনের এক দিন পর ৬ আগস্ট থেকে শাহজালালসহ দেশের সব বিমানবন্দরে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। শেখ হাসিনা সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য, ওই সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি এবং প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা দলবাজ কর্মকর্তাদের নাম দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালানোর সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হন সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদসহ আরও কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে আটক হয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান ৫ আগস্ট সোমবার দুপুরে। তার আগে যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান সেসব মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী সবুজ পাসপোর্ট ব্যবহার করে দেশ ছেড়েছেন বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাদের সহায়তা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।