যানজটের নগর ঢাকায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এবার বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকার চারটি মোড়ে পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে বসছে বুয়েটের তৈরি নতুন মডেলের ট্রাফিক সিগন্যাল। আগামী এক মাসের মধ্যে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের চার মোড়ে এসব ট্রাফিক সিগন্যাল লাগানো হবে।
ঢাকার যানজট নিরসনে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন ও ড. হাদিউজ্জামান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে ছয়টি সুপারিশ করেছেন। এই ছয়টি সুপারিশের পাঁচটির বাস্তবায়ন করতে ঢাকার রাস্তায় কাজ শুরু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ।
ড. হাদিউজ্জামান শুক্রবার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজধানীর হাইকোর্ট মোড় থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত রাস্তাকে পাইলট প্রকল্পের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। এই রাস্তার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অংশ ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনের মোড়, বাংলামোটর মোড় এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের অংশ কারওয়ান বাজার মোড় ও ফার্মগেট মোড়ে বসানো হবে ট্রাফিক সিগন্যাল। এই সিগন্যাল দুভাবে কাজ করবে।’
তিনি জানান, গত ১৬ অক্টোবর বুয়েটে এই ট্রাফিক সিগন্যাল টেস্ট করা হয়। এর আগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন ও ড. হাদিউজ্জামানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করে তাদের প্রজেক্ট তুলে ধরেন। ওই বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা দেশীয় প্রযুক্তিতে সিগন্যাল সিস্টেম তৈরি করতে দুই যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞকে অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প-কলকারখানার পরিত্যক্ত মালামাল থেকে সিগন্যাল সিস্টেম তৈরির কাজ শুরু করে বুয়েট।
হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এই সিগন্যাল ডুয়েল (দুই) মুডে কাজ করবে। এটি অনেকটা আইসোলেটেড জাংশন হিসেবে পরিচিত। ট্রাফিক পুলিশরা যে ধরনের কাজ করেন- সেই ধরনের সুবিধা এতে থাকবে। তাদের আর হাত দেখাতে হবে না। সিগন্যালের মাধ্যমে ট্রাফিক বাতি দেখানো হবে। চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো সিগন্যালের সময় নিয়ন্ত্রণ করা যাবে; সেখানে কিছু সতর্কতার ব্যবস্থা থাকবে। কোনো সিগন্যালে বেশি সময় লাগলে সেটি জানা যাবে। পথচারী পারাপারের জন্যও আলাদা সিগন্যাল থাকবে। এটা যেকোনো সময় আপডেট করা যাবে। এই পদ্ধতিকে সরাসরি সিগন্যাল বলা যাবে না। এটি হচ্ছে সেমি অটোমেটেড সিগন্যাল এইড। এখানে একটা বাটন থাকবে, যেটা একবার ম্যানুয়াল আবার অটোমেটেড (স্বয়ংক্রিয়) করা যাবে। কম ট্রাফিক থাকলে অটোমেটেড মুডে কাজ করবে। সময় নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে। আবার ট্রাফিক বেশি থাকলে ম্যানুয়ালি সময় পরিবর্তন করে নেওয়া যাবে।’
ট্রাফিক পুলিশরা এখন হাত দেখিয়ে সিগন্যাল সিস্টেম পরিচালনা করেন। বুয়েটের নতুন প্রযুক্তি চালু হলে সেটি আর করতে হবে না তাদের। এখন চারজন ট্রাফিক সদস্য একটি মোড়ে কাজ করছেন। আর এই সিগন্যাল লাগালে একজন অপারেট করবেন আর বাকিরা ফ্রি হয়ে যাবেন। তখন তারা এনফোর্সমেন্টে ভালো কাজ করতে পারবেন।
বুয়েট অধ্যাপকরা জানান, রাজধানী ঢাকার সড়ক সংযোগগুলোতে মোট ট্রাফিক সিগন্যাল আছে ১১০টি। তবে এগুলোর কোনোটিই আর কাজ করছে না।
এর বাইরে নগরীর বিভিন্ন জায়গায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সূত্র বলছে, ঢাকা শহরে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য গত ১৯ বছরে নানা উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ ও সিটি করপোরেশন। এগুলো বাস্তবায়ন করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১২-১৩ অর্থবছরে ‘ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট’ (কেস) প্রকল্পের আওতায় আবার ২৯টি ইন্টারসেকশনে বসানো হয় সিগন্যাল বাতি। এবার বরাদ্দ হয় ১১২ কোটি টাকা। ঢাকার চারটি ইন্টারসেকশনে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেম বসানোর আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছিল ডিটিসিএ। ২০১৬ সালের শুরুতে এর ব্যয় ছিল ৩৭ কোটি টাকা, পরে ব্যয় হয় ৫২ কোটি টাকা।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যালে আগে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো বিদেশ থেকে আনা, খরচ অনেক বেশি। আবার নষ্ট হলে সেগুলো ঠিক করতে অনেক অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এভাবে সিগন্যালগুলো অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। আর এখন যেগুলো বুয়েটে তৈরি হচ্ছে কম খরচে। যদিও এটির আয়ুষ্কাল হয়তো বাইরের মতো হবে না, তবে নষ্ট হলে দ্রুত ঠিক করা যাবে।’
নতুন মডেলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য ট্রাফিক পুলিশ সদস্যের আপাতত কোনো প্রশিক্ষণের দরকার নেই বলে জানিয়েছেন হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘শুরুতে কয়েক দিন ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে বুয়েটের একজন অপারেটর থাকবেন। যেসব মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হচ্ছে, সেখানে ট্রাফিক পুলিশ থেকে একজন থাকবেন ও বুয়েট থেকে একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে পাইলটিং সময়ে তারা এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে পারবেন। পুলিশ বক্সগুলোও নতুন করে করার চিন্তা চলছে। একটা আলাদা কক্ষ লাগবে এই ব্যবস্থাপনার জন্য। বুয়েট থেকেই সেটি ডিজাইন করে দেওয়া হবে।’
এই পাইলট প্রকল্পে ট্রাফিক সিগন্যাল তৈরির জন্য বুয়েট প্রতিটি সিগন্যাল বানানো ও ইনস্টল করার জন্য সাড়ে ১০ লাখ টাকা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে দেড় লাখ টাকা চেয়েছে।
এ বিষয়ে হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এটা প্রাথমিক একটা হিসাব। পরে এই সিগন্যালের সঙ্গে রিমোট যুক্ত হতে পারে। সিগন্যালের পাশে আলাদা কাউন্টার বসানো যেতে পারে। এতে খরচ বাড়বে। ট্রাফিক সিগন্যাল বানাতে যে ১০ লাখ টাকা খরচ হবে, এটা একদম প্রারম্ভিক।’
নতুন ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার খরচের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি জংশনে তিনজন করে ট্রাফিক পুলিশের সদস্য থাকবেন। তাদের একটা রেট আছে। সবকিছু মিলিয়ে দেড় লাখ টাকা। এটা স্বল্প খরচের। শুরুতেই যদি একটা সিগন্যালে ২ থেকে ৩ কোটি টাকা খরচ করা হয়, তাহলে পরে নষ্ট হলে এর যন্ত্রাংশ বিদেশে মেরামত করতে আরও ব্যয় করতে হয়। এর জন্য ভোগান্তিও পোহাতে হয়, মেরামত শেষ হতে ছয় মাস বসে থাকতে হয়। কারণ সেই টেকনোলজি দেশের না। এতে গত কয়েক বছরে ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা ভেস্তে গেছে।’