বিশ্ব শ্রমবাজার এখন দক্ষ কর্মীর দিকে ঝুঁকছে। তবে বাংলাদেশ থেকে এখনো আধা দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকই বেশি বিদেশ যাচ্ছেন। আধুনিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে জনবল তৈরিতে দেশে সরকারি ১১০টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি) রয়েছে। তবে এগুলোর মান নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ প্রশিক্ষকের পাশাপাশি আধুনিক কারিকুলামও নেই। আধুনিক শ্রমবাজারের জন্য উপযোগী কারিকুলাম তৈরিতেও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডি) মিটিং হয়নি প্রায় ৪ বছর।
- টিটিসিগুলোর প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক মানের নয়, ফলে অনেক প্রশিক্ষণার্থী বিদেশে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পান না।
- বাংলাদেশ থেকে এখনো বেশি যাচ্ছে আধা দক্ষ ও অদক্ষ কর্মী, অথচ বিশ্ব শ্রমবাজার এখন দক্ষ জনশক্তি চায়।
- বিশেষজ্ঞরা আধুনিক কারিকুলাম, দক্ষ প্রশিক্ষক ও ভাষা শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) এসব কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে উন্নত মানের ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। পুরোনো সিলেবাস, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাবে প্রশিক্ষণার্থীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুত হতে পারছেন না। এমনকি নতুন স্থাপিত অনেক টিটিসিতে পর্যাপ্ত জনবল বা প্রশিক্ষকের অভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
টিটিসিগুলোতে সেকেলে কারিকুলাম ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যা বর্তমান গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হাতে-কলমে শেখার জন্য আধুনিক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। টিটিসিগুলো থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বিদেশে কর্মসংস্থান পাওয়ার হার প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ নিয়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পান না।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারি ১১০টি টিটিসির মান নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে। তাতে দেখা গেছে, এসব টিটিসিতে যে ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেগুলোর পাঠ্যক্রম বাংলাদেশের স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদার কথা মাথায় রেখে করা হয়। কিন্তু বিদেশে কর্মী পাঠিয়ে বেশি রেমিট্যান্স আনতে হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দিয়ে জনবল তৈরি করতে হবে। এ জন্য আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষকও তৈরি করতে হবে। কোন দেশের জন্য কী ধরনের জনবল দরকার সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভাষাও শেখাতে হবে।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর খবরের কাগজকে বলেন, আইএলওর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারি ১১০টি টিটিসি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়। প্রতিবেদনটি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকেও অবহিত করা হয়েছে। বর্তমানে টিটিসিগুলোতে যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তা স্থানীয় শ্রমবাজারের চাহিদার জন্য করা হয়েছে। এখানে প্রশিক্ষকরাও যথেষ্ট প্রশিক্ষণ পাননি এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আধুনিক না হয়ে বক্তৃতাভিত্তিক হয়ে থাকে। এখানে দক্ষতার পাশাপাশি গন্তব্য দেশের ভাষাগত কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় না। এতে বিদেশগামী কর্মীরা প্রশিক্ষণ নিয়েও দক্ষতা অনুযায়ী কাজ পান না।
তিনি আরও বলেন, ‘গত সরকারের শেষ কয়েক বছরে আমরা কাঠামোগত উন্নয়ন, বিশেষ করে দৃশ্যমান উন্নয়নের একটা প্রবণতা দেখেছি। অভিবাসন খাতেও তার প্রতিফলন পাচ্ছি। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে, এটা ভালো। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ দরকার।’ তিনি বলেন, ‘যারা দেশের বাইরে যেতে চান, তাদের অনেকেই জানেন না, কী ধরনের প্রশিক্ষণ তাদের প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় সংকট হলো, আধুনিকমনস্ক প্রশিক্ষক নেই। যারা আছেন, তারা যে পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেন, যে কারিকুলাম অনুসরণ করেন, তা যুগোপযোগী নয়। মনে রাখতে হবে, এ প্রশিক্ষণ বিদেশের শ্রমবাজারের উপযোগী নয়। কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা ও এনজিও প্রশিক্ষণের ম্যানুয়াল তৈরি করে দিলেও সেগুলোর জন্য দক্ষ প্রশিক্ষক নেই। প্রযুক্তির জায়গা থেকেও প্রশিক্ষকরা দক্ষ নন।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী সরকারি টিটিসিগুলোর বর্তমান অবস্থাকে উদ্বেগজনক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, অনেক টিটিসিতে এখনো মৌলিক অবকাঠামো, আধুনিক সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক নেই। কিছু জায়গায় সাপোর্ট স্টাফ না থাকায় প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হয়। এটা দক্ষতা উন্নয়ন হতে পারে না।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, বিশ্ব এখন দক্ষতা নির্ভর নিয়োগের দিকে যাচ্ছে। তাই দক্ষ জনশক্তি তৈরি এখন সময়ের দাবি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘দেশের সব টিটিসির বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছি। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানির বাজার উপসাগরীয় দেশগুলো। সেখানে এখন দক্ষ কর্মী নিয়োগে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনো আধা দক্ষ ও অদক্ষ কর্মীই বেশি যাচ্ছেন। রামরুর তথ্যমতে, অভিবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের মাত্র ২০-২২ শতাংশ দক্ষ, আর ৭০-৭৪ শতাংশই আধা দক্ষ বা অদক্ষ। এই অসামঞ্জস্যের কারণে একদিকে বিদেশের মাটিতে তাদের আয় কম হচ্ছে, অন্যদিকে দেশে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।
বিএমইটির প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ টিটিসিগুলোর জন্য যে পাঠ্যক্রম আমাদের দেয়, সেটাই আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। স্বল্প লোকবল নিয়ে আমরা সফলভাবে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতিবছর ১১০টি টিটিসিতে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। বর্তমানে ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এবং ৬টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি চালু রয়েছে। এখানে মোট ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’