সনিয়া মেহনাজ চাকরি করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। অফিস থেকে ফেরার পর রাতে তার জ্বর আসে। সঙ্গে সর্দি। পর দিন সকালে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই তিনি নাপা কিনে খেয়েছেন। সর্দির জন্য মেনথল কিনে গরম পানিতে মিশিয়ে নাকে ভাপ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি সাত-আট দিনে সুস্থ হয়ে যাই।’
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহের আফরোজ। তিনি সম্প্রতি জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হন। তারপর পরিচিত একজনের কাছে শুনে ফার্মেসি থেকে নাপা আর ফেনাডিন-১২০ খেতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘তিন-চার দিনে জ্বর ঠাণ্ডা কমে আসে।’
সম্প্রতি যাত্রাবাড়ীর ধলপুর এলাকার আবু হানিফ জ্বরে আক্রান্ত হন। সঙ্গে শরীর ব্যথা, পেটব্যথা, বমি। তার জ্বর ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে। টানা চার দিন জ্বর থাকে। চার দিনেও না কমায় তাকে মুগদা মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হলে তাতে নেগেটিভ আসে। কিন্তু চিকিৎসকদের ধারণা, তার ডেঙ্গু হয়েছিল। দিন দিন তার রক্তের প্লাটিলেট কমছিল।
এখন দিনে গরম, শেষ রাতে ঠাণ্ডা। ভোরের আকাশে হালকা কুয়াশা। হচ্ছে মৌসুম পরিবর্তন। আসছে শীত। আবার অসময়ে চলছে ডেঙ্গুর ‘পিক সিজন’। তাই মৌসুম পরিবর্তন আর এডিস মশার কারণে শুধু সনিয়া মেহনাজ, মেহের আফরোজ আর আবু হানিফ নন, সম্প্রতি ঘরে ঘরে অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন জ্বর-সর্দি-কাশিতে। কারও কমছে নরমাল নাপায়, আবার কারও ভর্তি হতে হচ্ছে হাসপাতাল। কেউ কেউ হারাচ্ছেন প্রাণ। সে জন্য সতর্ক হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বর যা-ই হোক না কেন, এখন ডেঙ্গুর দিকেই গুরুত্ব দিতে হবে। জ্বর হলে কোনো ধরনের অবহেলা করা যাবে না। নিজে নিজে ওষুধ খেয়ে কমানোয় আশায় থাকা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে জ্বর হওয়ার তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গু এনএসওয়ান পরীক্ষা করাতে হবে। পজিটিভ এলে ডেঙ্গুর চিকিৎসা শুরু করতে হবে। পজিটিভ না এলে সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা।
তারা বলছেন, ডেঙ্গুর ধরন পরিবর্তন হয়ে যাওয়ায় পরীক্ষা ছাড়া ডেঙ্গু নাকি সাধারণ জ্বর তা বোঝার উপায় নেই। অনেকে টাইফয়েডেও আক্রান্ত হচ্ছেন।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, এখন যেহেতু ডেঙ্গুতে অনেক মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যু হচ্ছে, তাই জ্বর হলে কোনো প্রকার অবহেলা করা যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ফার্মেসি থেকে কিনে ওষুধ খাওয়া যাবে না। এতে অনেক সময় বিপদ ঘটতে পারে। কারণ তার যদি ডেঙ্গু হয়। আর তিনি যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ছাড়া বাসায় বসে ওষুধ খেয়ে সময় ক্ষেপণ করেন, তাহলে নিজেই নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন। ডেঙ্গুর ধরন বদলে যাওয়ায় এখন পরীক্ষা ছাড়া বোঝার কোনো উপায় নেই ডেঙ্গু নাকি সাধারণ জ্বর। কেউ কেউ টাইফয়েডে আক্রান্ত হচ্ছেন। কাজেই জ্বর এলেই তিন দিনের মধ্যে চিকিৎসক দেখিয়ে ডেঙ্গু এনএসওয়ান পরীক্ষা করাতে হবে। তিন দিনের পর পরীক্ষা করালে আর ধরা পড়বে না। তখন নেগেটিভ আসবে। সে জন্য পরামর্শ হচ্ছে, নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিয়ে কেউ যাতে ওষুধ না খান।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, এখন কয়েক ধরনের জ্বর হচ্ছে। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু জ্বর হচ্ছে। কারোনা ভাইরাসের কারণে জ্বর হচ্ছে। এ ছাড়া একধরনের ভাইরাসজনিত জ্বর হচ্ছে। শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ হচ্ছে। আরেকটা জ্বর হচ্ছে ঠাণ্ডা-গরমের তারতম্যে ব্যাকটেরিয়াজনিত কারণে। মাঝে যে বন্যা হয়ে গেল, তাতে পানি দূষিত হয়েছে। সেই দূষিত পানির মাধ্যমে টাইফয়েড আর জন্ডিস হচ্ছে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু জ্বর যাতে না হয় সে জন্য এডিস মশা মারতে হবে। মশার আবাসস্থল ধ্বংস করতে হবে। আর এখন শেষ রাতের দিকে ঠাণ্ডা পড়ে। রাতে যাতে ঠাণ্ডা না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাইরে থেকে এসেই ফ্রিজ থেকে বের করে বেশি ঠাণ্ডা পানি খাওয়া যাবে না। দূষিত পানি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পানি ফুটিয়ে খেয়ে হবে। এ ছাড়া পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে।
পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার বিষয়ে বায়োজিন কসমেসিউটিক্যালসের উত্তরা ব্রাঞ্চের সিনিয়র ফিটনেস পুষ্টিবিদ মুনিয়া মৌরিন মুমু বলেন, এই সময় প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কিছু খাবার রাখা জরুরি। যেমন: সাইট্রাস ফল বা ভিটামিন ‘সি’সমৃদ্ধ ফল, বিশেষ করে কমলা, লেবু, মালটা, বাতাবি লেবু, আমড়া ইত্যাদি, যা ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত ভিটামিন ‘সি’ গ্রহণ সর্দি-কাশির তীব্রতা এ সময়কালে কমাতে পারে। আদা এবং মধুতে রয়েছে প্রদাহ নাশক এবং ভাইরাসবিরোধী গুণ। গরম পানিতে আদা, মধু মিশিয়ে খেলে গলাব্যথা এবং নাক বন্ধ হওয়া কমাতে সাহায্য করে।
তিনি বলেন, প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত রসুন সর্দি-কাশিতে বেশ উপকারী। রসুনে রয়েছে অ্যালিসিন, যা ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করে। এ ছাড়া হলুদে থাকা কারকিউমিন প্রদাহনাশক এবং শক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে। সর্দি-জ্বরে উপকার পেতে রাতে দুধের সঙ্গে হলুদ মিশিয়েও খাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া হারবাল চায়ে তুলসী পাতা ব্যবহারে স্বাদের পাশাপাশি ভালো ঔষধি গুণ রয়েছে। তুলসী পাতা সর্দি-কাশিতে বিশেষ করে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং কাশি কমাতে সাহায্য করে।