ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: ইসরায়েলের হাতে বিকল্প কী লতাপাতায় ঢাকা ২ কোটি টাকার সেতু, পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি প্রকল্প গরমে কমেছে কাজের গতি নিজেই নিজেকে গড়ছে এআই, শঙ্কা অ্যানথ্রোপিকের বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দিনাজপুরের: সুই-সুতো আর কি-বোর্ডে নির্যাতিত নারীদের নতুন স্বপ্ন পুতিনকে আলোচনায় বসতে জেলেনস্কির খোলাচিঠি রাজশাহী অঞ্চলে তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতাপার্টির’ বিক্ষোভ আজ ইসলামী ব্যাংকের কারণেই আরেকটি ৫ আগস্ট ঘটে যেতে পারে বায়ুদূষণে বদলে যাচ্ছে ভ্রূণের জিন জলাবদ্ধতা ও দুর্গন্ধে নাকাল ঘিওর বাজার ছায়ানটে শুরু হলো দুই দিনের নজরুল উৎসব রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে ৬ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ৬ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল মে মাসে মব হামলায় নিহত ৩২: এমএসএফ ‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’
Nagad desktop

বসারও শক্তি নেই আনোয়ারের

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০১:০০ পিএম
আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০১:০৮ পিএম
বসারও শক্তি নেই আনোয়ারের

আনোয়ার যখন গুলিতে আহত হন, তখন তার স্ত্রী তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দেখতে দেখতে চলে গেল সাত মাস। আর দুই থেকে আড়াই মাস পর ভূমিষ্ঠ হবে তাদের কাঙ্ক্ষিত সন্তান। এসে দেখবে নতুন পৃথিবী। নতুন দেশ। কিন্তু এমন খুশির সময় স্ত্রী-সন্তানের পাশে থাকা হবে না আনোয়ার হোসেনের! ভূমিষ্ঠের পর কোলেও নিতে পারবেন না নিজের সন্তানকে। কারণ আনোয়ারের শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গেছে। হাঁটাচলা তো দূরের কথা, বসারও শক্তি নেই তার। এমনকি প্রস্রাব বা টয়লেটের বেগ এলে তা বলতেও পারেন না।

জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে গুলিতে আহত হন আনোয়ার। এখন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে চিকিৎসাধীন।

সম্প্রতি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, আনোয়ারের মাথায় পানি দিচ্ছেন তার মা। আর তার স্ত্রী কাপড় ভিজিয়ে গা মুছে দিচ্ছেন। অন্য রোগীরা জানান- ওই ওয়ার্ডে ভর্তি গুরুতর তিনজনের মধ্যে আনোয়ারের অবস্থা বেশি খারাপ। 

আনোয়ার হোসেন রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার কলিমোহর গ্রামের মৃত মকবুল হোসাইনের ছেলে। থাকেন ঢাকায় গুলশানের শাহজাদপুর এলাকায়। দুই বছর আগে বিয়ে করেছেন। স্ত্রী এখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তিনি মানিকগঞ্জ নার্সিং কলেজে বিএসসি করছেন। সেখানেই হোস্টেলে থাকতেন। কিন্তু স্বামী আহত হওয়ার পর থেকে হাসপাতালেই দিন কাটছে তার। আনোয়াররা দুই ভাই-বোন। বোন বিবাহিত। বাবা নেই, মা থাকেন গ্রামে। আহত হওয়ার পর তিনিও চলে এসেছেন ছেলের কাছে।

আনোয়ার সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটিতে বিএসসি ইন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে লেখাপড়া করেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন চাকরি করতেন। জুলাই মাসের মাঝামাঝিতে আন্দোলনে যুক্ত হন। গত ১৯ জুলাই শাহজাদপুর কনফিডেন্স টাওয়ারের সামনে তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

ওই দিন বেলা ২টার দিকে আন্দোলন শুরু করেন। সেখানে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতা ছিলেন। আনোয়ার জানান, পুলিশ-বিজিবি গুলি চালাচ্ছিল। মাথার ওপর ঘুরছিল হেলিকপ্টার। আবার বিভিন্ন দিকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। আমেরিকান দূতাবাসের সামনে থেকে গুলি চালাচ্ছিল পুলিশ-বিজিবি। আনোয়ার ছিলেন কনফিডেন্স টাওয়ারের সামনে। পুলিশকে লক্ষ করে ইট মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে রওনা দেন বাসার দিকে। আর ঠিক তখনই এসে গুলি লাগে তার বুকে। বেলা তখন সাড়ে ৩টা। বুকের বামপাশে গুলি ঢুকে পিঠের ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।

গুলি লাগার পর জ্ঞান ছিল আনোয়ারের। সঙ্গে যারা ছিলেন, তারা তাকে ধরে নিয়ে যান এমডেজ হাসপাতালে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ভর্তি করা হয়। সিট না থাকায় শুইয়ে রাখে ফ্লোরে। ডাক্তার আসছিলেন না। চিকিৎসা হচ্ছিল না। পরে ওই রাতেই আনোয়ারকে তার মামা-মামি আর মামাত নিয়ে যান এভারকেয়ার হাসপাতালে। 

এভারকেয়ারে ১৮ দিন থাকার পর ব্যয় বহন করতে না পারায় আনোয়ারকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। এভারকেয়ারে চিকিৎসায় ব্যয় হয় ৬ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। সেখানে অপারেশন করে তার ফুসফুসে জমা পানি বের করা হয়। এভারকেয়ার থেকে আসার সময় সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে ব্যায়াম করার পরামর্শ দেন। কিন্তু আনোয়ারের কোনো অনুভূতিই নেই। ব্যায়াম করবেন কীভাবে!

বাসায় ৫ দিন থাকার পর গত ১১ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফিজিওথেরাপি নেওয়ার জন্য ভর্তি হন। কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। এরই মধ্যে শুয়ে থাকতে থাকতে পিঠে একটি ঘা হয়। ঘার চিকিৎসার জন্য গত ৫ সেপ্টেম্বর বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগে রেফার করা হয়। সেই থেকেই তিনি সেখানে ভর্তি আছেন। পিঠেও অপারেশন করা হয়েছে।

আনোয়ার বলেন, ‘আমরা ভাবছি সিএমএইচএ যাব। কিন্তু ডাক্তাররা সেখানে রেফার করছেন না। গেলে ছুটি নিয়ে যেতে হবে। এভাবে আর কতদিন পড়ে থাকব! এখন ডাক্তাররা খুব একটা খোঁজখবর নিচ্ছেন না। প্রতি মাসে মা-স্ত্রী এবং আমার খাওয়াসহ সব মিলে প্রায় ৩০ হাজার খরচ হচ্ছে। দিন দিন সবকিছু সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সরকারের কাছে সুস্থ হওয়া ছাড়া আর কোনো চাওয়া নেই আনোয়ারের। তিনি শুধু সুস্থ হতে চান। ফিরতে চান স্বাভাবিক জীবনে। 

আনোয়ারের বিষয়ে ঢামেকের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, স্পাইনাল কর্ডে ইনজুরি হয়েছে। যে কারণে তার শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে গেছে। চলাচল করতে পারছেন না। তার পিঠের ঘা প্লাস্টিক সার্জারি করে ঠিক করা হয়েছে। কিন্তু নিচের অংশ ঠিক হয়নি। 

তাকে বিদেশ পাঠানোর সুপারিশ করার কথা জানিয়ে ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, এটা খুবই জটিল। সারা পৃথিবীতে এর চিকিৎসা যেমন ব্যয়বহুল। তেমনি কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। আমাদের নিউরো সার্জন যারা আছেন, তারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলছেন।

রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে
এভাবেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীরা। ছবি: খবরের কাগজ

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল সকাল থেকে। তা উপেক্ষা করেই শহরতলির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা কাউসার। কারওয়ান বাজার মোড়ে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে বাসের দেখা পান। কিন্তু সেই বাসে ওঠার জো নেই, বাদুরঝোলা হয়ে গন্তব্যে ছুটছেন অনেক যাত্রী। সাভারের রেডিও কলোনি যেতে ফাতেমাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

এই চিত্র গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার। ফাতেমার মতো আরও অনেক যাত্রীকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে সাভার-নবীনগর, উত্তরা, টঙ্গী-কামারপাড়া, গাজীপুরসহ শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় যেতে যাত্রীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, প্রগতি সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর রোড, বিমানবন্দর সড়ক ঘুরে খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা দুর্ভোগের চিত্র দেখেছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ থাকায় রাজধানীবাসীর ‘বড় অংশ’ রয়ে গেছে ঢাকার বাইরে। ৭ জুন থেকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে। তাই আজ শনিবার রাজধানীমুখী যাত্রীদের ঢল দেখা যাবে। তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে সিটি বাসগুলোও বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।

খবরের কাগজের একজন প্রতিবেদক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে সাভারগামী ওয়েলকাম পরিবহনের বাসে উঠেন। সেই বাসে পা ফেলার জায়গাও ছিল না। পথে যেতে যেতে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব একজন যাত্রীর সঙ্গে।

তিনি জানান, নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে তিনি গুলিস্তান এসে পৌঁছান। সাভারগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। আরেকজন নারী যাত্রী বলেন, ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে অনেকটা জোর করে বাসে উঠেছি। বাসে সিট ছিল না বলে নারী যাত্রীদের উঠাতে চাইছিল না হেল্পার।’

ওই বাসে আসন না পেয়ে নারী যাত্রী দাঁড়িয়েই যাচ্ছিলেন হেমায়েতপুরে। বাসটির হেল্পার মিল্টন বলেন, ‘ঈদের পরে অনেক যাত্রীই তো রইয়া গেছে বাড়ি। তারা তো ফিরে নাই। আজকের (শুক্রবার) রাতের পরে তারা সবাই ফিরতে শুরু করবে। তাদের আনতে টাউন সার্ভিসের বাসগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।’

রাজশাহীর আলোকচিত্রী রায়হান বিশ্বাস গতকাল ঢাকায় এসেছেন জরুরি কাজে। তিনি জানান, সিরাজগঞ্জের এলেঙ্গার মোড়ে তিনি ঢাকার সিটি সার্ভিসের বেশ কয়েকটি মিনিবাসে ঢাকামুখী যাত্রী দেখেছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ঢাকার ‘টাউন সার্ভিস’ বাস দেখার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল রহমান। পথে-পথে সেসব বাস বিকল হয়ে থাকার কথাও জানান তিনি।

তাদের কথার সত্যতা পাওয়া যায় শুক্রবার বেলা ২টার দিকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও টাউন সার্ভিসগুলো গেটলক হয়ে রাজধানীর দিকে ফিরছিল। সাভার পরিবহন, সেলফি, মিরপুর লিঙ্ক, রাজধানী, নীলাচল নামের বেসরকারি বাসগুলো তো বটেই;  এমনকি শহরতলি রুটে চলাচল করা বিআরটিসির এসি বাসও দূরপাল্লায় যাত্রী পরিবহন করছে।

এসব বাসে ঢাকায় ফিরতে যাত্রীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ঈদের ফিরতি যাত্রার দ্বিতীয় পর্বে এসব অনিয়ম দেখার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা হাইওয়ে পুলিশের কোনো অভিযান নজরে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং ঢাকা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সদস্য সচিব শহিদুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বার্তা পেয়েও সাড়া দেননি হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে এখনো যারা বাড়ি রয়ে গেছেন, তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে দূরপাল্লার বাস পর্যাপ্ত নয়। তাই ঢাকার ভেতরে চলাচল করা অনেক বাস সুযোগ বুঝে দূরপাল্লার রুটে গেছে।

আরটিসির নিয়ম অনুযায়ী এসব বাস দূরপাল্লার রুটে চলাচলের অনুমতি পায় না। কিন্তু প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে অনেক মালিক বাস দূরের জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন স্থানীয় প্রশাসনও নীরব। কারণ, বাসগুলো তো যাত্রী পরিষেবা দিচ্ছে। আমরাও সমিতিতে আলোচনা করেছি, এসব বাস দূরপাল্লার রুটের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।’

রাজধানীর ভেতরে বা শহরতলিতে চলাচল করা অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই, চালকদেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ঈদযাত্রা বা ফিরতি যাত্রায় ঢাকার এসব টাউন বাসই দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণ।

পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আসিফ রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যদিও দুই চালকেরই ভারী যান পরিচালনার লাইসেন্স থাকে, কিন্তু ইন্টারসিটি চালক হুট করে মহাসড়কে নেমে এলে সেই সড়কের চরিত্র বুঝতে পারবেন না। দুই ধরনের সড়কের চরিত্র ভিন্ন। হুট করে চালকের যানবাহনের ধরন (ট্রান্সপোর্ট মুড) পরিবর্তন হলে বিপদের সমূহ শঙ্কা থাকে।’

প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী
আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিইআরসি

সরকার গত বুধবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম নির্ধারণের এক দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী (লাইফলাইন) প্রান্তিক গ্রাহক এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম আগের হারেই থাকছে। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্ন আয়ের বা বসতিতে বসবাস করা গ্রাহকরাও এই সুবিধা পাবেন না। কারণ তারা পরিবার নিয়ে কমপক্ষে দুটি ঘরে বসবাস করেন। অন্ধকার এড়াতে ও একটু স্বস্তি পেতে দুটি ফ্যান, দুটি লাইট, একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ ব্যবহার করেন। এতে মাসে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের ব্যবহার হয়, যা কমপক্ষে ১৯২ ইউনিটে গিয়ে দাঁড়াবে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

ডিপিডিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষ অনেক বিলাসী হয়ে গেছেন। কাজেই যে মানুষটি বসতিতে থাকেন বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন তিনিও দুটি রুম নিয়ে থাকেন। পরিবারের একটু স্বস্তির জন্য দুটি ফ্যান ব্যবহার করেন। ফ্রিজ ব্যবহার করেন। অধিকাংশ পরিবার সারা দিন টিভি দেখে। কাজেই পুরো মাসে এসব পরিবারে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতেই পারে। এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিল আসবে। এ জন্য তাকে প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।’

বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা বহাল থাকবে। জুন থেকে এ হার কার্যকর হবে। এর আগে গত বুধবার বিইআরসি খুচরা বিদ্যুতের যে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছিল, সেখানে প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে প্রান্তিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৬৯ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৯২ পয়সা বেশি গুনতে হতো।

বিইআরসি জানায়, বুধবার জারি করা আদেশে নির্ধারিত এ দুই শ্রেণির মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য ৪ জুন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো আবেদন করে। পরে শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ (খুচরা) ট্যারিফ প্রবিধানমালার বিধান অনুযায়ী বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না করে আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহারের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর আয় কমবে। সেই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করতে হবে। তবে বুধবার জারি করা খুচরা বিদ্যুতের নতুন দাম-সংক্রান্ত আদেশের অন্য সব অংশ অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। এর ফলে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ঘোষিত নতুন মূল্যহার বহাল থাকছে। শিল্প, বাণিজ্যিক, সেচ ও অন্যান্য গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রেও নতুন দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করে বিইআরসি। পরে বুধবার বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বেশি ইউনিট ব্যবহারকারীদের মতো আবাসিক গ্রাহকদের সব স্তরেই দাম বাড়ানো হয়েছিল। তবে প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এই দুই শ্রেণির বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। তার পরও নিম্ন আয়ের গ্রাহকরা সেই সুবিধা পাবেন না। কারণ সারা দেশে অধিকাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল আসে ৫০ থেকে ৭৫ ইউনিটের।

জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০১ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০২ পিএম
জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

আধুনিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ। ঘর-বাড়ি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয় ধ্বংস, গাছপালা নিধন, খাল-নদী-নালা ভরাট করে গড়ে ওঠা আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এর অপচয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এবং পরিকল্পনাহীন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এর আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে, যা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। বছর বছর বাড়ছে বিদ্যুতের দাম।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জনপ্রিয় ইংরেজি প্রবাদ ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’, এখনো যথেষ্ট পালনীয়। এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাও, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠো’। পাঠ্যবইয়ের এই শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, সব বয়সী মানুষের জন্যই এখন সমানভাবে প্রযোজ্য। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারা ও অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে মানুষ রাত জেগে থাকতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের জীবনেও। গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা বা অনলাইন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে তাদেরও সকাল শুরু হয় দেরিতে।

একসময় শিক্ষার্থীরা ভোরে উঠে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসে পড়াশোনা করত। কিন্তু এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর পড়তে বসে। ফলে ফ্যান, লাইট বা এসির ব্যবহার প্রয়োজন হয়। ফলে যে কাজ একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্পন্ন হতো, তা এখন অনেকটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে দিন-রাতে সমান তালে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।

এ ছাড়া বিদ্যুতের অপচয়ের আরেকটি বড় ক্ষেত্র সরকারি ও বেসরকারি অফিস। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা অফিসে পৌঁছানোর আগেই কক্ষের লাইট, ফ্যান এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালু করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অফিস শেষ হওয়ার পরও এসব যন্ত্র দীর্ঘ সময় চালু থাকে। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে লাখের বেশি অফিস রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য অপচয়ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একই চিত্র দেখা যায়– হাসপাতাল, ব্যাংক, মার্কেট, শপিং মল এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনেও। দিনের আলো পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম আলোর ব্যবহার অব্যাহত থাকে। অনেক ভবনে জানালা থাকা সত্ত্বেও ভারী পর্দা টেনে রাখা হয়, ফলে দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এতে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

নানা সংকটে ভবন নির্মাণের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। শহরাঞ্চলের নতুন অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে ক্রমেই কমে আসছে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এই দেশে শীতপ্রধান দেশের মতো ভবন নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বহু ভবন নির্মিত হচ্ছে শীতপ্রধান দেশের নকশার আদলে। ফলে পর্যাপ্ত বাতাস ও সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ থাকছে না সেসব ভবনে। এতে বাসিন্দাদের সারা বছর ফ্যান, এসি ও বৈদ্যুতিক আলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রবণতা কমে গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, উপাসনালয়ে মানুষের সংখ্যা কম থাকলেও একাধিক ফ্যান, এসি ও লাইট দীর্ঘ সময় ধরে চালু রাখা হয়। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের অপচয় উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। অনেক পরিবারে দিনে এবং রাতে অপ্রয়োজনীয় লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। ব্যবহারের পর টেলিভিশন, কম্পিউটার, চার্জার কিংবা অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করা হয় না। সবার মাঝে ধারণাটা এমন যে– ‘আমার বিল তো আমি দিই, সমস্যা কোথায়?’ প্রকৃত সত্য হলো, ভোক্তার এই বিল জমা দেওয়ার পরও রাষ্ট্রকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে জনগণের করের টাকা থেকে।

নগরবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে আহ্বান করা যেতে পারে। অযথা বিদ্যুৎ ব্যবহার থেকে সরে আসার জন্য সতর্কতামূলক প্রচারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ধনাঢ্যদের প্রতি বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির উৎসের সন্ধান করার আহ্বান জানানো যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার বাড়াতে এবং বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা দরকার। ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক করা, যাতে পাশের ভবন আলো-বাতাসে বাধা না দেয়। একই সঙ্গে ভবনের দেয়ালে জানালার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা, যা দিনের আলো ঘরের ভেতরে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। ভবনের উচ্চতা ও চারপাশের ফাঁকা জায়গার অনুপাত এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে ভবনের ভেতর, যা বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে দেবে।’

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা না গেলে সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয়। গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বৈঠকে জানানো হয়, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। 

প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও আর্থিক ক্ষতির সমাধান হচ্ছে না। গত বুধবারও নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। চলতি জুন মাস থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।

এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সময় পাইকারি পর্যায়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হবে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় কমানো গেলে জাতীয় পর্যায়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। 

সংকট সমাধান করতে লাভের চেয়ে গ্রাহককে গুরুত্ব দিতে বললেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে বড় সংকট রয়েছে। এ খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘চোরদের নিয়ন্ত্রণে’। এসব চোর ভোক্তাবিরোধী এবং গণবিরোধী। তাই সংকটের সমাধান হচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর জন্য বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু ঘাটতি কি কমেছে? উল্টো প্রতিবছর বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে কম খরচে উৎপাদন এবং সরকারকে মুনাফা অর্জনের চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। তারা দাম বাড়াতে চায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের হয়ে দাম কমানোর জন্যও আইন করা প্রয়োজন। আর যারা চুরি করে কাঠামোগতভাবে সংকট তৈরি করে রেখেছে সেই চোরদের ধরে ধরে বিচার করতে হবে, না হলে এই ঘাটতি থেকেই যাবে।’

খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়
ছবি: সংগৃহীত

ভূমি হস্তান্তরসংক্রান্ত নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অস্থায়ী নকলনবিশদের পদোন্নতি ঘিরে ঘুষ লেনদেনের তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়। গত ৭ এপ্রিল খবরের কাগজে ‘ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে পদোন্নতি-বাণিজ্য/টাকা দিলেই নাম ওপরের দিকে, না দিলে বাদ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ভবন পরিদর্শনে যান তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইন ও বিচার বিভাগের সহকারী সচিব (সিভিল জজ) মো. জিয়া উদ্দীন। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদোন্নতি পেতে ইচ্ছুক নকলনবিশদের কাছ থেকে দফায় দফায় ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা দিলেই তালিকার ওপরের দিকে নাম উঠে আসে, আবার টাকা না দিলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। গত দুই বছরে কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও দাপ্তরিকভাবে দুটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে ঘুষ লেনদেন বিষয়ে পদোন্নতির তালিকায় থাকা নকলনবিশদের তাদের বক্তব্য লিখে এনে সরেজমিনে হাজির থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দীন। যাতে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশরা নির্ভয়ে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারেন। নির্দেশনা অনুসারে অন্তত ১১ জন নকলনবিশ তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত হওয়ার আগেই ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে বক্তব্য দেওয়ার জন্য নকলনবিশদের মৌখিকভাবে জানানো হয়। ফলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে একই ধরনের বক্তব্য পেশ করেছেন ১১ জন নকলনবিশ। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে অস্থায়ী নকলনবিশরা রাজস্ব খাতে স্থায়ী নকলনবিশ হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি জেলায় জেলা রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে নিয়োগ পদোন্নতি ও বাছাই কমিটি রয়েছে। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সভাপতিত্বে ওই কমিটির বৈঠকে গত দুই বছরে পদোন্নতির যোগ্যদের কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও গত বছরের ১৬ মার্চ দাপ্তরিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবিত পদোন্নতির ওই তালিকায় ১০ জন অস্থায়ী নকলনবিশের নাম আনা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশদের ১০ বছরের কাজের বিবরণ ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। কাগজপত্র সরবরাহের জন্য তিন দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই তালিকায় নকলনবিশ মো. শামীম, মোসা. পারভীন আক্তার, মো. আতাউর রহমান, মোসা. কামরুন নাহার, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শফিকুর রহমান, মোসা. আনোয়ারা আক্তার, মো. আবু সাঈদ মিয়া, মোসা. মাসুদা আক্তার ও মো. মারুফ আহম্মদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো কারণ উল্লেখ ছাড়াই কয়েক মাস পদোন্নতির বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে আরও কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হয়। তবে দাপ্তরিকভাবে ওই তালিকাগুলো প্রকাশ করা হয়নি। পরে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দাপ্তরিকভাবে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবারও নকলনবিশদের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঁচ দিন সময় বেঁধে সাব-রেজিস্ট্রারদের চিঠি দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। এই তালিকায় ১১ জন নকলনবিশের নাম উল্লেখ করা হলেও আগের তালিকা থেকে মো. শামীম ও আতাউর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়। তালিকায় নতুন যুক্ত হন বেলাল হোসেন, মনির হোসেন ও পারুল আক্তার। এই তালিকা আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। 

সে সময় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ঘুষ লেনদেনের বিষয় অস্বীকার করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদোন্নতি নীতিমালার আলোকে নকলনবিশদের ১০ বছরের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু তালিকায় যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ সন্তোষজনক নয়।’

তারা (নকলনবিশ) কি কাজ করেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে জেলা রেজিস্ট্রার বলেন, নকলনবিশদের কাজই হলো ‘বালামে দলিল লিপিবদ্ধ করা, দলিলের অবিকল নকল (সার্টিফায়েড কপি) করা।’ কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে লোকবল কম থাকায় তাদের দিয়ে অন্য কাজও করা হয়। ফলে তাদের মূল কাজের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়। এখন মোহরার-টিসি মোহরারসহ অন্তত ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। নীতিমালা অনুসারে প্রকৃত যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য নতুন তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশে উল্টো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ফলে দেশে চলমান ৮ শতাংশের ওপর থাকা মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। 

বিদ্যুৎ খাতের অপচয় ও চুরি বন্ধ না করে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে সব শ্রেণির গ্রাহক পর্যায়ে এই দাম বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আপত্তি সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রস্তাবে প্রান্তিক গ্রাহক ও কৃষিতে দাম বাড়ানোর কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্রশিল্প বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শওকত আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে চলমান মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের ওপরে (বিগত মাসগুলোতে যা ছিল প্রায় ৮.২২ শতাংশ)। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘যুগোপযোগী নয়’ বলে আখ্যা দেন অধ্যাপক শওকত আলী। আগে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫ টাকা ২৬ পয়সা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সায়। এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতেও বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।

ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত সেবার জন্য মানুষ কিছুটা বাড়তি টাকা দিতেও রাজি থাকে। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামীণ গ্রাহকরা বাড়তি দাম দিয়েও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ গেলে আর আসার নাম থাকে না, সেবার মানও অত্যন্ত নাজুক। এই অবস্থায় যদি লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারে অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অধ্যাপক শওকত আলী বলেন, ‘কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কমলেও আমাদের দেশে সেই অনুপাতে দাম কমানো হয়নি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে কৃষি ও পরিবহন খাত রেহাই পাবে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর পাশাপাশি পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে তার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়বে সাধারণ পণ্যের ওপর, যার ফলে বাজারে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।’

দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশেও তেলের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে সরকার উল্টো অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করেছে।’ জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হলে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখা জরুরি ছিল।

অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এমনিতেই দেশের ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি ৮ ডিজিটের (৮ শতাংশ) ওপরে, গত মাসের আগের মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। এখন নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে বাজারে এবং ইনফ্লেশন আরও বাড়বে।’

খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে নতুন দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণের প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পিডিবির (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আরইবির (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) প্রস্তাবে এই দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘গ্রাহকরা ভালো সেবার জন্য বেশি টাকা দিতে রাজি থাকেন। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামের সাধারণ গ্রাহকরা এমনিতেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার। বিদ্যুৎ গেলে আর আসতে চায় না। এই অবস্থায় সেবার মান না বাড়িয়ে হুট করে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি যোগ করেন, যদি এই বাড়তি দাম দেওয়ার পরও লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে সাধারণ মানুষ তা মেনে নেবেন না।

কৃষি খাতে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ১১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অধ্যাপক। তার মতে, কৃষকরা ইরিগেশন বা সেচব্যবস্থার জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এই দুই খাতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এসএমই খাতের অবস্থা দেশের বাজারে এমনিতেই নাজুক, তার ওপর এই বাড়তি বিদ্যুতের বিল তাদের আরও বড় সংকটে ফেলবে।

বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহনসহ প্রতিটি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কাঠামোর সমালোচনা করে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবারের বিদ্যুতের দাম একদম নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত–সব পর্যায়েই বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে।’ তিনি সরকারের দ্বিমুখী নীতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একদিকে সরকার কৃষকদের ধান চাষ বা কৃষিকাজের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও টাকা দিচ্ছে, আর অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’