সড়কের কোথাও বড় গর্ত, কোথাও ছোট, কোথাও পিচ উঠে গেছে। বিভিন্ন সড়কে সৃষ্ট খানাখন্দে চরম ভোগান্তির শিকার রাজধানীর বাসিন্দারা। কোথাও সড়ক কিংবা সড়কের পাশ খুঁড়ে রাখা হয়েছে। সারা বছরই সড়কে নাগরিকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। স্থায়ীভাবে সমাধান হচ্ছে না। এর জন্য নিম্নমানের কাজকে দুষলেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিগত সরকারের সময়ে লুটপাটের চিন্তা নিয়ে যে রকম নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে, আগামীতে সে রকম না হলেই কমবে নাগরিক দুর্ভোগ। এদিকে দুর্ভোগ কমাতে আগামী ৯ দিনে ঢাকা দক্ষিণ সিটির খানাখন্দ ভরাটের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। প্রতিনিয়ত উত্তর সিটির বিভিন্ন সড়কে পটহোলস মেরামত করা হচ্ছে। এ ছাড়া নেওয়া হয়েছে ৩৫৪ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন কার্যক্রম।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) দাবি করেছে, অতিবৃষ্টির কারণে এবার সড়কের বেশি ক্ষতি হয়েছে। ডিএসসিসির আওতাধীন ৭৫টি ওয়ার্ডে সড়ক আছে ১ হাজার ৬৫৬ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার। ফুটপাত ২৩১ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার। এর মধ্যে বৃষ্টিতে ২১৪ কিলোমিটার সড়ক এবং ২৭ কিলোমিটার ফুটপাতের ক্ষতি হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) থেকে জানা গেছে, তাদের আওতাধীন ৫৪টি ওয়ার্ডে ১৯৬ দশমিক ২২ বর্গকিলোামিটার এলাকায় ১ হাজার ৫৭৭ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার সড়ক এবং ৪৯৯ দশমিক ২৯২ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। এর মধ্যে ১৫০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুই সিটি মিলে ক্ষতিগ্রস্ত ৩৬৪ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষ। ডিএসসির ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২ জানুয়ারির মধ্যে খানাখন্দ সংস্কার শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে অক্টোবরের মধ্যে সংস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তার বাস্তবায়ন নভেম্বরেও দেখা যায়নি। গতকাল ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্তও সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি।
গত ১৮ ডিসেম্বর মিট দ্য প্রেসে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ১৫ দিনের মধ্যে এগুলো সংস্কারের ঘোষণা দেন, যার ৬ দিন ইতোমধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। আগামী ৯ দিনে প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ২২-২৩ ডিসেম্বর ঘুরে জানা গেছে, মিজানুর রহমান ছুটিতে আছেন। তার মুঠোফোনে ফোন দিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মিট দ্য প্রেসে তিনি বলেছিলেন, অতিমাত্রায় বৃষ্টির কারণে এ বছর রাস্তা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছোট ছোট খানাখন্দ হয়েছে। সেগুলো আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংস্কারকাজ সম্পন্ন করা হবে। বড় বড় রাস্তার কাজের দরপত্র আহ্বান প্রক্রিয়াও দ্রুত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সভাপতি এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘বিগত সময়ে রাজধানীর সড়কে যে কাজগুলো হয়েছে তা খুবই নিম্নমানের। কাজগুলো এমনভাবে করা হতো যেন অল্প সময়ের মধ্যে আবার নষ্ট হয়ে যায়। আবার কাজ করা যায়। যতবার কাজ করতে পারবেন, তারা ততবেশি লাভবান হবেন। তখন কাজ করতেন সরকারদলীয় ঠিকাদাররা। ছিল না জবাবদিহি। ই-টেন্ডার করা হতো। কিন্তু তাও ছিল তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বর্ষা এলে খোঁড়াখুঁড়ি হতো, কারণ ওই একটাই। নিম্নমানের কাজ করা। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। ওই বিষয়গুলোর যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই দিকে লক্ষ রাখতে হবে। আশা করি যারা এখন দায়িত্ব থাকবেন, তারা এ বিষয়গুলো নজরে রাখবেন।’
তিনি বলেন, ছোট ছোট রাস্তায় মানুষের যে দুর্ভোগ হচ্ছে তা নিয়ে বিগত সরকার চিন্তাই করেনি। তাদের চিন্তাই ছিল নিম্নমানের কাজ করতে পারলেই বেশি লাভ। তারা মেগা প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এটা উদ্বোধন, ওটা উদ্বোধন। এসব জনদুর্ভোগের বিষয় নিয়ে সরকারের কেউ কোনো কথা বলেননি। ম্যানহোলে পড়ে মানুষের প্রাণহানিও হয়েছে। কিন্তু টনক নড়েনি।
সরেজমিন চিত্র
রাজধানীর জুরাইন থেকে দয়াগঞ্জ পর্যন্ত সড়কের এক পাশ দিয়ে দুই দিকের যানবাহন চলাচল করে। ওই সড়কে প্রবেশমুখে বড় এক গর্ত। বেশির ভাগ সময়েই সেখানে পানি জমে থাকে। আরেকটু সামনে এগিয়ে কিছু দূর পরপর সড়কে গর্ত। আরেকটু সামনে এগোলেই সড়কের অবস্থা আরও বেহাল। নেই পিচ। বালি-মাটি-খোয়া আর ইট। খোয়া আর ইটের কোনো কোনোটা জেগে আছে। কোথাও উঁচু, কোথাও বেশ নিচু। সড়কের এই খানাখন্দ অংশে এক জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনাও নেই।
এখন শীত মৌসুমেও চলাচলের অনেকটা অনুপযোগী এই সড়ক। তবু ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁকি সহ্য করে চলতে হয় জুরাইন-পোস্তগোলাসহ এই পাশের বাসিন্দাদের। বৃষ্টি পড়লেই পানি জমে যায়। ধান চাষের জমির মতো কাদা হয়ে যায়। তার মধ্য দিয়েই চলে যানবাহন। কখনো কখনো পানি-কাদায় গর্তে লেগুনার চাকা আটকে যায়। আরেক লেগুনা দিয়ে ঠেলে তুলতে না পারলে তখন কাদায় নেমে জুতা খুলে অন্য লেগুনা কিংবা রিকশায় যেতে হয়। কখনো কখনো রিকশাও উল্টে দুর্ঘটনার শিকার হন যাত্রীরা।
২৩ ডিসেম্বর কথা হলে লেগুনাচালক ইমন বলেন, ‘এক বছর ধরে এই লাইনে গাড়ি চালাই। এক বছর ধরেই রোডের এই অবস্থা। ভাঙাচোরা সড়কের কারণে দুই দিন পরপর লেগুনার সাসপেনশন খোলা লাগে। গাড়ির যন্ত্রাংশ বেশি লাগে। কারণ বেশি নষ্ট হয়।’
একই চিত্র যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত ফ্লাইওভারের দুই পাশের সড়কেই। দয়াগঞ্জ থেকে ধোলাইপাড় যেতে ইবনে সিনার পরের মোড় পর্যন্ত, যাত্রাবাড়ী থেকে সায়েদাবাদ, ধলপুর, গোলাপবাগ, মানিকনগর, মুগদা পর্যন্ত খুবই খারাপ অবস্থা। খিলগাঁও তিতাস রোড, পলাশীর মোড়, মগবাজার পুরাতন রমনা থানার সামনেও একই অবস্থা। পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড, বাবুবাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে খানাখন্দের চিত্র।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘যাত্রাবাড়ীর দিকে সড়কের খুব খারাপ অবস্থা। আমি কয়েক দিন আগে ওদিক থেকে বাইকে আসছিলাম। সড়কে বেশ খানাখন্দ। বাইক চালানো ঝুঁকিপূর্ণ। একটু জোরে চালালে খানাখন্দে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে। সড়কের যেখানে খানাখন্দ রয়েছে, সেসব খানাখন্দ থেকে উঠে যাওয়া ছোট ছোট পাথরে চাকা পড়ে পিছলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই খুব ধীরে ধীরে চালিয়ে এসেছি।’
জুরাইন রেলগেট থেকে বিক্রমপুর প্লাজার পাশ থেকে চব্বিশ ফিটের সড়কে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের বাম পাশের কিছু অংশে পিচ নেই। মাটি জেগে আছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সড়কটি বেশ কয়েকবার কাটা হয়েছে। বৃষ্টির সময় একবার বড় করে খোঁড়া হয়। কয়েক দিন আগে আবার খোঁড়া হয়। কিছু অংশে আড়াআড়ি করে রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশ কাটা হয়। তখন রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
এক নারী বলেন, ‘আমার ছেলের পরীক্ষা ছিল। এই সড়কের মিষ্টির দোকান পর্যন্ত এসে দেখি রাস্তা বন্ধ। ছেলেরও পরীক্ষার সময় হয়ে গেছে। তখন একটি রিকশা করে অনেক দূর ঘুরে বিকল্প রাস্তায় স্কুলে যাই।’
বৃষ্টির সময় যখন এই খনন করছিল, তখনো এই এলাকার বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এই সড়কে রিকশা কিংবা বাইকে চলাচল করলে বেশি ঝাঁকি লাগে। ইজিবাইকের পেছনে বসলেই খুব ঝাঁকি লাগে। এ নিয়ে প্রায়ই ইজি-বাইকচালকদের সঙ্গে যাত্রীদের বাগবিতণ্ডা হয়। জানা গেছে, বর্ষা এলেই রাজধানীতে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয় বেশি। তখন আরও ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
বাড্ডা ও রামপুরে এলাকা ঘুরে দেখা গেছে সড়কের বেহাল চিত্র। ডিএনসিসি এলাকার সড়ক মেরামত প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) ফারুক হাসান মো. আল মাসুদ বলেন, অ্যাসফল্ট মিক্স ম্যাটেরিয়ালের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সড়কে পটহোলস মেরামত করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে সব পটহোলস মেরামত শেষ করা হবে। যেসব সড়কে বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক খননকাজ করা হচ্ছে, খননকাজ সমাপ্তির পর ডিএনসিসির নিয়োজিত প্যানেল ঠিকাদারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক মেরামত করা হবে।
ডিএনসিসির প্রকোশলী বিভাগ থেকে জানা গেছে, পুরাতন পাঁচটি অঞ্চলে ১৩৪০ দশমিক ২২ কিলোমিটার সড়ক এবং নতুন পাঁচটি অঞ্চলে ২৩৭ দশমিক ৬১ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। পুরাতন পাঁচটি অঞ্চলে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কার প্রয়োজন। বর্তমান অর্থবছরে ডিএনসিসির নিজস্ব অর্থে ৫০ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার এবং আইডিআরআইএসপি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০ কিলোমিটার উন্নয়নকাজ চলছে। এ ছাড়া বর্তমান অর্থবছরে ১০টি অঞ্চলে সর্বমোট ৩৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এই কার্যক্রমের এখন পর্যন্ত ওয়ার্ক অর্ডার হয়নি। অবশিষ্ট কাজ বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে পরবর্তী সময়ে গ্রহণ করা হবে। ফারুক হাসান মো. আল মাসুদ জানান, জুনের মধ্যে এসব কাজ শেষ করা হবে।