মিল্ক ভিটার সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপুর বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে গত ১০ বছরে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে ওই অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। তার আমলে মিল্ক ভিটায় ১০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পাউডার প্ল্যান্টটি (গুঁড়া দুধ) চালুর দিনেই বন্ধ হয়ে যায়। কর্মচারীদের অভিযোগ নিম্নমানের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরির কারণেই প্ল্যান্টটি চালু করা যায়নি। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে আত্মগোপনে আছেন সাবেক চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু।
মিল্ক ভিটাকে আরও উন্নত করতে, দুগ্ধজাত পণ্যের প্রসার ঘটাতে এবং দিনে দুই লাখ লিটার তরল দুধকে গুঁড়া দুধে রূপান্তরের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ীতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মেগা প্রকল্প সুপার ইস্টার্ন পাউডার প্ল্যান্ট শুরু করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু। ১০৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্ল্যান্ট স্থাপনকাজের মেয়াদ ছিল দুই বছর। প্ল্যান্টটির অবকাঠামোগত কাজ ২০১৮ সালে শেষ হলেও এর যন্ত্রাংশ কেনা নিয়ে বাধে জটিলতা। অধিকাংশ যন্ত্রাংশ জার্মানি থেকে কেনার কথা থাকলেও শেখ নাদির হোসেন লিপুর নির্দেশে ভারত থেকে কেনা হয় নিম্নমানের যন্ত্রাংশ। ২০২৩ সালে প্রাথমিকভাবে ট্রায়ালে গেলে আগুন ধরে যায় মেশিনে। এর পর থেকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে প্ল্যান্টটি। মরিচা ধরে গেছে অধিকাংশ যন্ত্রপাতিতে। পরে যন্ত্রপাতির কেনাকাটায় ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বারবার মেয়াদ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ৮ বছরেও প্ল্যান্টটি চালু করতে পারেনি মিল্ক ভিটা। বর্তমানে এটি অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। একদিকে প্ল্যান্ট তো চালু হয়নি, তার ওপর কাজ শেষ করার আগে তুলে নেওয়া হয়েছে বরাদ্দ। ফলে ডুবেছে কোম্পানি। যদিও ক্রয় কমিটির সদস্যদের দাবি নীতিমালা অনুসরণ করেছেন তারা।

শেখ পরিবারের সদস্য হওয়ায় মিল্ক ভিটার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চেয়ারম্যান পদ দখল করে নেন শেখ নাদির হোসেন লিপু। তিনি ও তার সহযোগীদের লুটপাটের কারণে খাদের কিনারায় পৌঁছেছে মিল্ক ভিটা। অভিযোগ রয়েছে, নাদির হোসেন সিন্ডিকেটের দুর্নীতিতে ১০ বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। সদ্য সাবেক চেয়ারম্যানের মেয়াদকালে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুর্নীতিতে মিল্ক ভিটার ক্ষতি কত, তার হিসাব-নিকাশ চলছে। সব অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত চলছে। সমবায় সদস্যদের ভোট ছাড়াই ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেছেন নাদির হোসেন। এ কাজে যারা তাকে সহযোগিতা করেছেন তাদেরও কাঠগড়ায় তোলার দাবি তুলছেন মিল্ক ভিটার খামারি, কর্মচারী ও কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে স্থানীয় খামারিরা বলেন, বিভিন্ন সময় পরিকল্পিতভাবে অর্থ আত্মসাতের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মিল্ক ভিটাকে। যে টাকার দুর্নীতি হয়েছে এই টাকা মিল্ক ভিটার ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের ঋণ পরিশোধে খরচ করতে হবে। সেই সঙ্গে যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
মিল্ক ভিটার কর্মচারীরা বলেন, দুই দিনের ট্রায়ালেই মেশিনে আগুন ধরে যায়। বর্তমানে প্ল্যান্টটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। এর প্রতিটি যন্ত্রাংশ নিম্নমানের, যে কারণে প্ল্যান্টটি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সাবেক চেয়ারম্যান নাদির হোসেন লিপু ভারত থেকে কম মূল্যে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ কিনে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ফলে কখন বয়লার ফেটে যাবে, কখন মেশিন ফেটে বিস্ফোরণ ঘটবে বলা যায় না।

মেশিন ক্রয় কমিটির সভাপতি প্রিতম কুমার সাহা জানান, অনেক মেশিন এখনো পরে আছে বাইরে। আর কী কী মেশিন নষ্ট তা জানে না ক্রয় কমিটি।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, এই প্ল্যান্টটি এখন ভাঙারি হিসেবে বিক্রি করতে হবে। এর নির্মাণকাজে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। দুর্নীতিবাজরা ওই অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। এ কাজটি যারা করেছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
মিল্ক ভিটার প্রকল্প পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) শরিফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, বিদেশি প্রকৌশলীদের কিছু পেমেন্ট বাকি আছে। সেটা দেওয়ার পর এটি আবার কীভাবে চালু করা যায়, সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বসে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে মিল্ক ভিটা ইউনিয়নের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি কমান্ডার জাহিরুল আলিম বলেন, এখানে যেসব সমস্যা আছে তা আলোচনা করে সমাধান সম্ভব। আর দুর্নীতির বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পড়ুন প্রথম পর্ব-
> চেয়ারম্যানের নির্দেশে বন্ধ হয় কারখানা