‘সয়াবিন তেল নেই। বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) এক কার্টন পেয়েছিলাম, শেষ হয়ে গেছে। ব্যবসা করব কীভাবে।’ তেল না থাকায় এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন কারওয়ান বাজারের রাব্বি স্টোরের আল আমিন। এই বাজারের আনছার স্টোরের আব্দুস সালামও একই তথ্য জানান। অন্য বাজারের চিত্রও একই। এবারের রমজানে সম্ভাব্য চাহিদা পূরণে তেল আমদানি বাড়ানো হয়েছে ৩৪ শতাংশ। তারপরও সরকারনির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম দিয়েও বাজারে মিলছে না ভোজ্যতেল।
রোজার আগে খেজুর, মাল্টার দামও বেড়ে গেছে। সবজির মধ্যে বেগুন, শসা, লেবুর দামও বেড়েছে। সরকার খেজুর, ভোজ্যতেল, চালে শুল্ক কমিয়েছে। তবে তার সুফল পেলেন না ভোক্তারা। নিরাশার মধ্যে আশার কথা হলো, বাড়েনি পেঁয়াজ, আলুর দাম। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রমজান উপলক্ষে এবার রেকর্ড পরিমাণ সয়াবিন তেলসহ ৯টি পণ্য আমদানি করা হয়েছে। অক্টোবর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত এসব পণ্য আমদানি করা হয়। গত বছরের এ সময়ে ৩ লাখ ৭৮ হাজার টন চিনি আমদানি করা হয়েছিল। এবার ৪ লাখ ৫৪ হাজার টন আমদানি করা হয়েছে। আমদানি বেড়েছে ২০ শতাংশ। একইভাবে বছরের ব্যবধানে সয়াবিন তেল আমদানি বেড়েছে ৩৪ শতাংশ। গত বছরে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৮২০ টন তেল আমাদনি করা হয়। এবার আমদানি করা হয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ২৫২ টন। ডালজাতীয় পণ্যের আমদানি বেড়েছে ৪৪ শতাংশ। গত বছরে ১ লাখ ৯ হাজার ৩৭৮ টনের বিপরীতে এবার ১ লাখ ৫৭ হাজার ৮৩৭ টন ডাল আমদানি করা হয়েছে। ছোলা আমদানি বেড়েছে ৬৪ শতাংশ। গত রোজায় আমদানি করা হয় ৫৯ হাজার ৩২৯ টন। এবার ৯৭ হাজার ৫৫৫ টন আমদানি হয়েছে ছোলা।
বছরের ব্যবধানে এবারে মটর ডালের আমদানি বেড়েছে ৮৫ শতাংশ। এবার ২ লাখ ২ হাজার ৮৪৫ টন আমদানি হয়েছে। দেশে প্রচুর পেঁয়াজ উৎপাদনের পরও ২ শতাংশ বেশি আমদানি হয়েছে। রসুনের আমদানিও ২০ শতাংশ বেড়েছে। গতবার ৫০ হাজার ৯৯৫ টন আমদানি হলেও এবার ৬১ হাজার ৩৮১ টন আমদানি হয়েছে। আদার আমদানি বেড়েছে ৫৬ শতাংশ। খেজুরের আমদানি বেড়েছে ২৩ শতাংশ। গতবার রমজান উপলক্ষে ১১ হাজার ৭১৪ টন খেজুর আমদানি করা হয়। এবার ১৪ হাজার ৪২০ টন আমদানি হয়েছে।
পণ্য আমদানি বাড়লেও বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। গত ৯ ডিসেম্বর প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৮ টাকা বাড়ানো হয়েছে। তবে এখনো সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের মো. বাবুল হোসেন, ইকবাল হোসেন স্টোরের মো. রাশেদ, মনির স্টোরের আব্দুর রহিমসহ অন্য খুচরা মুদি বিক্রেতারা বলেন, ‘১ ও ২ লিটারের ১ কার্টন সয়াবিন তেল এক দিন পাওয়া গেলেও ৫ থেকে ১০ দিন ধরে খবর থাকে না। খোলা সয়াবিন তেল ১৬৭ টাকা লিটার ঘোষণা করা হলেও তা বাজারে পাওয়া যায় না।
প্রায় তিন মাস থেকে সয়াবিন তেলের সংকট চলতে থাকলে ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোক্তা অধিদপ্তর মিলমালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে মিটিং করে।
১৬ ফেব্রুয়ারি ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে টিকে গ্রুপের পরিচালক তসলিম শাহরিয়ার আতাহার ভোক্তা অধিদপ্তর আয়োজিত এক বৈঠকে বলেছিলেন, ‘এবার রমজান উপলক্ষে প্রচুর ভোজ্যতেল আমদানি করা হয়েছে। আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি ২৪ ফেব্রুয়ারির পর আর কোনো সংকট হবে না। কেউ শঙ্কিত হবেন না।’ তবে বাস্তবতা হচ্ছে, বাজারে এখনো তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
সরবরাহ বাড়ছে না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘তারা কথা দিয়ে কথা রাখেননি। জনগণের জন্য ব্যবসা করেন, এটা ভুলে গেছেন। সরবরাহ করার সময় মিলগেটে বেশি দাম রাখায় তিনটি রিফাইনারি কোম্পানিকে কারণ দর্শাও নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এবার ৩৪ শতাংশ সয়াবিন তেল বেশি আমদানি করা হয়েছে। তার পরও সংকট থেকেই যাচ্ছে। এ বিষয়ে একটু অস্বস্তি রয়েছে। বাজারে অভিযান চলছে। কেউ ধরা পড়লে শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’ অন্য পণ্যের দাম বেড়েছে কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘রমজানে মানুষ যেন একটু স্বস্তি পায়, সে জন্য বাজারে অভিযান বাড়িয়েছি। বাজার মনিটরিং করছি।’
বেড়েছে বেগুন, শসা, লেবুর দাম
বেগুন ও শসা কেজিতে বেড়েছে ২০ টাকা। মাত্র তিন দিন আগে ৫০ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে বেগুন। গতকাল তা বেড়ে হয়েছে ৯০ টাকা। ৪০ থেকে ৮০ টাকার লেবুর হালি ৭০ থেকে ৮০ টাকা হয়েছে। ৫০ থেকে ৮০ টাকার শসা ৬০ থেকে ১০০ টাকা কেজি বিক্রি হতে দেখা গেছে। সবজি বিক্রেতারা বলেন, অন্য সবজির দামও কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। শিম ৪০ থেকে ৫০ টাকা, টমেটো ৩০ থেকে ৫০, পেঁপে ৪০ থেকে ৫০, গাজর ৩০ থেকে ৪০, বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৫০, লাউয়ের পিস ৭০ থেকে ৮০, কাঁচা মরিচ ৮০ থেকে ১২০ টাকা। তবে আগের মতোই আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০, দেশি আদা ১৩০ থেকে ১৬০, আমদানি করা আদা ২২০, দেশি রসুন ১৬০, আমদানি করা রসুন ২৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
রমজানে খেজুরের চাহিদাও দ্বিগুণ হয়। প্রয়োজন পড়ে ৫০ হাজার টন। সরকার শুল্কও কমিয়েছে। তার পরও দুই দিনের ব্যবধানে খেজুরের দাম কেজিতে ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া ফল বিতানের মনির হোসেনসহ অন্য ফল বিক্রেতারা বলেন, ‘৫ হাজার ৩০০ টাকার মেডজুল খেজুর ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাল্টা কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তবে আপেলের দাম বাড়েনি। আগের মতো ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে।’
কমেনি মুরগির দাম
বিভিন্ন উৎসব শেষ হলেও কমেনি মুরগির দাম। ব্রয়লার ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি, সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজি, দেশি মুরগি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি, ডিমের ডজন ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা বিক্রি করতে দেখা গেছে। আগের মতোই রুই, কাতলা আকারভেদে ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি, পাবদা ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, তেলাপিয়া, পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০ টাকা, ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে।