শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সাত মাস পার হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বরং পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। ছিনতাইকারীরা নানা কায়দায় নানা স্থানে অপতৎপরতা চালিয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের খবরে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। উদ্বিগ্ন হচ্ছে অভিভাবক মহল।
এ ছাড়া শুক্রবার (৭ মার্চ) প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীর বিক্ষোভ মিছিল করায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষ করে উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে ‘জঙ্গিবাদ’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কি না, এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজরাও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ধর্ষণের ঘটনা। মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আট বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনাটি দেশে এ মুহূর্তে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা মানুষের মনোজগৎকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে কিছু মানুষের এই ‘মনোবৈকল্য’ কী এবং কেন হচ্ছে, তা নিয়ে সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা আলোচনা হচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির তিন দিনেও জ্ঞান ফেরেনি। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর সিএমএইচে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনার রেশ না কাটতেই গতকাল সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক কলেজছাত্রী। সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী, কুমিল্লায় এক বাকপ্রতিবন্ধী তরুণী, ঠাকুরগাঁওয়ে এক শিক্ষার্থী এবং মুন্সীগঞ্জের দুই শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গত ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় গণভবনের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ছিনতাইকারীর ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি হয়ে সবকিছু খুইয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে নেশাগ্রস্ত ছিনতাইকারী জুয়েল রানা লোক জড়ো করে গাড়ি থামিয়ে এক ব্যক্তিকে রক্তাক্ত এবং গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এ ছাড়া কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষের ওপরও হামলা বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী ঈদের সময় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগে বাসাবাড়ি, দোকানপাটসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিজ দায়িত্বে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ঘটনায় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
ঢাকার ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো’ বলেও গতকাল দাবি করে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ‘মোবাইল টান দেওয়া, এর চেয়ে সহজভাবে কোনো অপরাধ করা যায় না। যারা এ কাজটি করছে তারা ১৫, ২০ বা ২২ বছর বয়সী। তারা মোবাইলটা নিয়ে দৌড় দেয়। এমনও মোবাইল আছে লাখ টাকা দাম। এ দেশে ব্যবহার করলে চেষ্টা করি ডিটেক্ট করে রিকভারি করতে। আনঅফিশিয়ালি খবর পাচ্ছি বান্ডিল অব মোবাইল বর্ডার এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নিয়ে অন্যভাবে সেল করে।’
বর্তমানে বেড়ে যাওয়া অপরাধের বেশির ভাগই ‘স্ট্রিট-ক্রাইম’ দাবি করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ইদানীং কিছু স্ট্রিট অপরাধ হয় আপনারা জানেন। ৮০-৯০ ভাগ ক্ষেত্রে সেটি মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা। এটা করে উঠতি বয়সের ছেলেরা, আমরা যাদের কিশোর গ্যাং বলি। বাস, প্রাইভেট কার, মোটরবাইকের যাত্রী হয়তো কথায় মনোনিবেশ করেন, তখন পেছন থেকে এসে মোবাইলটা টান দিয়ে দৌড় মারে। এমন কিছু স্ট্রিট-ক্রাইম হয়।’
তবে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘খুব ভালো বেহেস্তখানায় আছি, বা খুব খারাপ আছি এমনটা বলা যাবে না। অপরাধ প্রবণতার ওয়েভ আসে, এ রকম হয় অনেক সময়। যদিও আমি মনে করি না বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট সন্তোষজনক। আবার এটাও মনে করি না যে আমরা একবারে গর্তে চলে গেছি।’
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব সময়ই ভালো-খারাপ মিলিয়ে ছিল। কখনো ১৯, কখনো ২০, কখনো ১৮, এভাবেই তো চলছে ৫০ বছর ধরে। মাঝে মাঝে যে দু-একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে, যেমন কিছুদিন আগে রাতে বনশ্রীতে ব্যবসায়ীকে গুলি করে দেড় শ ভরি সোনা লুট হলো, এরপর কিশোর গ্যাংয়ের চাপাতি দিয়ে কোপানোর ঘটনা, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ ঘটেছে। এই ওয়েভ অব ক্রাইম চলে আসে একটা সময়ে। এগুলোর পেছনে সামাজিক, আর্থিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণ থাকে।
তিনি বলেন, ‘পুলিশ এখনো সম্পূর্ণ পেশাদার মনোভাব নিয়ে কাজ করছে, এমন মনে করি না। এখনো অনেক দ্বিধা, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা আছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশের ১২৫ জন কর্মকর্তা সংযুক্ত হয়ে গেল, ২০১৮ সালের নির্বাচনের জন্য আরও ৮২ জন ওএসডি হয়ে গেল। এভাবে যদি পুলিশের ওপরের দিকের লিডারের পতন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে বাহিনীতে একধরনের ভয় চলে আসে। এগুলো নিয়ে আমাদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে। পুলিশ যে একবারে খুব খারাপ কাজ করছে এমনটাও নয়।’
সম্প্রতি উত্তরায় একটি বাস ট্রাফিক আইন ভাঙার জন্য মামলা দেওয়ায় রাস্তা অবরোধের বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘সামাজিকভাবেও দেখেন পুলিশকে আক্রমণ করা হচ্ছে। গাড়ি রংরুটে (উল্টা পথে) আসতে মানা করায় চিৎকার করে বলা হচ্ছে, কেন আপনি আমাকে জরিমানা করবেন, কেন মামলা দেবেন, আপনি আমাকে বোঝান। তাদের দাবি হচ্ছে, মাওলানার মতো ওয়াজ করতে হবে, জরিমানা করা যাবে না। সব মিলিয়ে আমি মনে করি না যে খুব ভালো আছি, আবার একদম খারাপ হয়ে গেছি। তবে পরিস্থিতি ভালো করার জন্য পুলিশ দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।’
সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে ঢাকার বাইরে ধর্ষণসহ বেশ কিছু অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বলা যাবে না যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ নিয়ে কাজ করছে। অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’
সরকারি ছুটির দিন হলেও গতকাল দিনভর আলোচনায় ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি। খবরের কাগজের কয়েকজন প্রতিবেদকও ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছেন। সাধারণ মানুষ নিজের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে একধরনের আতঙ্কে রয়েছেন। আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে থাকায় এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তবে দেশের এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসী কতটা নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাবেন অথবা বাসা খালি রেখে নিশ্চিন্ত মনে ঈদের আনন্দ কতটা উপভোগ করতে পারবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে জনমনে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের গত সাত মাসে দেশে গণপিটুনির অন্তত ১১৪টি ঘটনায় ১১৯ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ২২৬টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৭০টি বড় ধরনের ঘটনা জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫১টি এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৭৫টি হামলার ঘটনা ঘটে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৪টি, অক্টোবরে ৩৪, নভেম্বরে ৪৯, ডিসেম্বরে ৪৪, এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৮ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩৭টি হামলার ঘটনা ঘটে। তবে এই তথ্যের বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের পরিসংখ্যান অনুসারে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ১৪৩টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১৩৫টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি বেশি।
এদিকে সারা দেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চলমান রয়েছে। এরপরও দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ড, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স প্রায় সব স্থানেই চলছে। পাশাপাশি চলছে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। তবুও যেন থেমে নেই অপরাধীরা।
পুলিশের সহকারী কমিশনার (এএসপি) পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরাধীরা কাউকেই তোয়াক্কা করছে না। বরং দিনে দিনে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
এদিকে পুলিশ পরিদর্শক পদের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের অস্ত্র ব্যবহারের কোনো অনুমতি বর্তমানে নেই। শুধু লাঠিচার্জে পুলিশকে ভয় পায় না ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীরা। কারণ গণ-অভ্যুত্থানের সময় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় থানা থেকে অনেক অস্ত্র লুট হয়েছে।
সেগুলোর কিছু উদ্ধার করা গেলেও অনেক অস্ত্র এখনো অপরাধীদের কাছেই রয়ে গেছে। তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অপেশাদার আচরণ করছে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নগরীজুড়েই টহল জোরদার ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এরপরও অপরাধীরা বিভিন্ন অপরাধ করছে। কারণ তাদের কাছে ওই লুটের অস্ত্রগুলো রয়ে গেছে।’