ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
হেলিকপ্টার হারিয়ে ইরানে হামলা যুক্তরাষ্ট্রের, প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি তেহরানের আজকের মুদ্রার বাজার: ১০ জুন, ২০২৬ বগি লাইনচ্যুত, জামালপুর- ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ ভারতে সাজাভোগের পর তামাবিল দিয়ে ফিরলেন ৭ বাংলাদেশি কেমন ছিল নবিজি (সা.)-এর গায়ের বর্ণ? আবারও কমল সোনার দাম, নতুন দর কত? ক্লিন ইমেজের আলী রেজাও দুদকের জালে দেশে ৫০ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে: চট্টগ্রামের ডিসি বাবাকে খাবার দিতে গিয়ে নদীতে তলিয়ে গেল শিশু গজারিয়ায় আকস্মিক ঝড়ে অর্ধশত গাছ উপড়ে পড়েছে, মহাসড়কে তীব্র যানজট প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে এসে আত্মহত্যা প্রেমিকার শাবিপ্রবিতে ৩২৫ গবেষকের অংশগ্রহণে ওশেনোগ্রাফি বিভাগের সিম্পোজিয়াম আর্জেন্টিনার উত্তাপে গলে গেল আইসল্যান্ড ক্যাম্প থেকে পালিয়ে সীমান্তে মাছ ধরায় ১৯ রোহিঙ্গা আটক বাড়ছে না বিড়ির দাম সারাদেশে মাঝারি ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা চায়না-সাউথ এশিয়া এক্সপোতে অংশ নেবে বিসিসিসিআই ইসলামী ব্যাংকের সিআরআরে বড় ধরনের ঘাটতি আক্কেলপুরে একদিনে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার একদিনেই বদলে গেল চবির দুই উপ-উপাচার্য কক্সবাজারে মা-মেয়েকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, গ্রেপ্তার ৬ রাজশাহীতে বর্ষার আগেই ডেঙ্গুর অশনিসংকেত বিদেশি কোচদের চোখে নতুন ইতিহাস ল্যাবএইডে ডেঙ্গুবিষয়ক সেমিনার অনুষ্ঠিত আবেগের বিয়েতে ঝুঁকিতে পড়ছে মেয়েরা শখ থেকে স্বাবলম্বী গৃহবধূ, ঘরের ছাদ যেন ক্যাকটাস রাজ্য ইসরায়েলের সামরিক অভিযান: লেবাননে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত ইসরায়েলি কারাগারে বন্দিদের ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন বরিশাল বিভাগে ৫ বছরে নদীগর্ভে বিলীন ১২০ বর্গ কিমি ভুট্টা চাষে বিপর্যয়, চাষিদের স্বপ্ন এখন পচে-গলে পড়ে আছে মাঠে
Nagad desktop

অপরাধীরা বেপরোয়া, আতঙ্কে মানুষ

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৫, ০১:২৪ পিএম
আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৫, ০১:২৫ পিএম
অপরাধীরা বেপরোয়া, আতঙ্কে মানুষ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের সাত মাস পার হলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বরং পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। ছিনতাইকারীরা নানা কায়দায় নানা স্থানে অপতৎপরতা চালিয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণের খবরে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। উদ্বিগ্ন হচ্ছে অভিভাবক মহল।

এ ছাড়া শুক্রবার (৭ মার্চ) প্রকাশ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহরীর বিক্ষোভ মিছিল করায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষ করে উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে ‘জঙ্গিবাদ’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে কি না, এমন প্রশ্ন সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজরাও বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। 

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ধর্ষণের ঘটনা। মাগুরায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আট বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনাটি দেশে এ মুহূর্তে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা মানুষের মনোজগৎকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে কিছু মানুষের এই ‘মনোবৈকল্য’ কী এবং কেন হচ্ছে, তা নিয়ে সচেতন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা আলোচনা হচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটির তিন দিনেও জ্ঞান ফেরেনি। সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর সিএমএইচে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এ ঘটনার রেশ না কাটতেই গতকাল সীতাকুণ্ডে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক কলেজছাত্রী। সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী, কুমিল্লায় এক বাকপ্রতিবন্ধী তরুণী, ঠাকুরগাঁওয়ে এক শিক্ষার্থী এবং মুন্সীগঞ্জের দুই শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

গত ১৫ জানুয়ারি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় গণভবনের সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ছিনতাইকারীর ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি হয়ে সবকিছু খুইয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে নেশাগ্রস্ত ছিনতাইকারী জুয়েল রানা লোক জড়ো করে গাড়ি থামিয়ে এক ব্যক্তিকে রক্তাক্ত এবং গাড়ি ভাঙচুর করেছে। এ ছাড়া কোথাও কোথাও সাধারণ মানুষের ওপরও হামলা বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে।

এমন পরিস্থিতিতে গতকাল শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী ঈদের সময় গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার আগে বাসাবাড়ি, দোকানপাটসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিজ দায়িত্বে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ঘটনায় জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

ঢাকার ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো’ বলেও গতকাল দাবি করে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ‘মোবাইল টান দেওয়া, এর চেয়ে সহজভাবে কোনো অপরাধ করা যায় না। যারা এ কাজটি করছে তারা ১৫, ২০ বা ২২ বছর বয়সী। তারা মোবাইলটা নিয়ে দৌড় দেয়। এমনও মোবাইল আছে লাখ টাকা দাম। এ দেশে ব্যবহার করলে চেষ্টা করি ডিটেক্ট করে রিকভারি করতে। আনঅফিশিয়ালি খবর পাচ্ছি বান্ডিল অব মোবাইল বর্ডার এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে নিয়ে অন্যভাবে সেল করে।’

বর্তমানে বেড়ে যাওয়া অপরাধের বেশির ভাগই ‘স্ট্রিট-ক্রাইম’ দাবি করে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘ইদানীং কিছু স্ট্রিট অপরাধ হয় আপনারা জানেন। ৮০-৯০ ভাগ ক্ষেত্রে সেটি মোবাইল ছিনতাইয়ের ঘটনা। এটা করে উঠতি বয়সের ছেলেরা, আমরা যাদের কিশোর গ্যাং বলি। বাস, প্রাইভেট কার, মোটরবাইকের যাত্রী হয়তো কথায় মনোনিবেশ করেন, তখন পেছন থেকে এসে মোবাইলটা টান দিয়ে দৌড় মারে। এমন কিছু স্ট্রিট-ক্রাইম হয়।’

তবে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘খুব ভালো বেহেস্তখানায় আছি, বা খুব খারাপ আছি এমনটা বলা যাবে না। অপরাধ প্রবণতার ওয়েভ আসে, এ রকম হয় অনেক সময়। যদিও আমি মনে করি না বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট সন্তোষজনক। আবার এটাও মনে করি না যে আমরা একবারে গর্তে চলে গেছি।’ 

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সব সময়ই ভালো-খারাপ মিলিয়ে ছিল। কখনো ১৯, কখনো ২০, কখনো ১৮, এভাবেই তো চলছে ৫০ বছর ধরে। মাঝে মাঝে যে দু-একটি আলোচিত ঘটনা ঘটে, যেমন কিছুদিন আগে রাতে বনশ্রীতে ব্যবসায়ীকে গুলি করে দেড় শ ভরি সোনা লুট হলো, এরপর কিশোর গ্যাংয়ের চাপাতি দিয়ে কোপানোর ঘটনা, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ ঘটেছে। এই ওয়েভ অব ক্রাইম চলে আসে একটা সময়ে। এগুলোর পেছনে সামাজিক, আর্থিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কারণ থাকে। 

তিনি বলেন, ‘পুলিশ এখনো সম্পূর্ণ পেশাদার মনোভাব নিয়ে কাজ করছে, এমন মনে করি না। এখনো অনেক দ্বিধা, শঙ্কা ও অনিশ্চয়তা আছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশের ১২৫ জন কর্মকর্তা সংযুক্ত হয়ে গেল, ২০১৮ সালের নির্বাচনের জন্য আরও ৮২ জন ওএসডি হয়ে গেল। এভাবে যদি পুলিশের ওপরের দিকের লিডারের পতন হয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে বাহিনীতে একধরনের ভয় চলে আসে। এগুলো নিয়ে আমাদের যুদ্ধ করতে হচ্ছে। পুলিশ যে একবারে খুব খারাপ কাজ করছে এমনটাও নয়।’

সম্প্রতি উত্তরায় একটি বাস ট্রাফিক আইন ভাঙার জন্য মামলা দেওয়ায় রাস্তা অবরোধের বিষয়ে আইজিপি বলেন, ‘সামাজিকভাবেও দেখেন পুলিশকে আক্রমণ করা হচ্ছে। গাড়ি রংরুটে (উল্টা পথে) আসতে মানা করায় চিৎকার করে বলা হচ্ছে, কেন আপনি আমাকে জরিমানা করবেন, কেন মামলা দেবেন, আপনি আমাকে বোঝান। তাদের দাবি হচ্ছে, মাওলানার মতো ওয়াজ করতে হবে, জরিমানা করা যাবে না। সব মিলিয়ে আমি মনে করি না যে খুব ভালো আছি, আবার একদম খারাপ হয়ে গেছি। তবে পরিস্থিতি ভালো করার জন্য পুলিশ দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে।’ 

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। তবে ঢাকার বাইরে ধর্ষণসহ বেশ কিছু অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বলা যাবে না যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ নিয়ে কাজ করছে। অপরাধীদের কঠোর হস্তে দমন করা হবে।’ 

সরকারি ছুটির দিন হলেও গতকাল দিনভর আলোচনায় ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি। খবরের কাগজের কয়েকজন প্রতিবেদকও ছিনতাইকারীর কবলে পড়েছেন। সাধারণ মানুষ নিজের জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে একধরনের আতঙ্কে রয়েছেন। আসন্ন ঈদুল ফিতর সামনে থাকায় এই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তবে দেশের এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসী কতটা নিরাপদে বাড়ি পৌঁছাবেন অথবা বাসা খালি রেখে নিশ্চিন্ত মনে ঈদের আনন্দ কতটা উপভোগ করতে পারবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে জনমনে। 

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের গত সাত মাসে দেশে গণপিটুনির অন্তত ১১৪টি ঘটনায় ১১৯ জন নিহত ও ৭৪ জন আহত হয়েছেন। 

এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ২২৬টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৭০টি বড় ধরনের ঘটনা জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫১টি এবং চলতি বছরের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে ৭৫টি হামলার ঘটনা ঘটে। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ২৪টি, অক্টোবরে ৩৪, নভেম্বরে ৪৯, ডিসেম্বরে ৪৪, এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৩৮ এবং ফেব্রুয়ারিতে ৩৭টি হামলার ঘটনা ঘটে। তবে এই তথ্যের বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। 

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুসারে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ১৪৩টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ছিল ১৩৫টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি বেশি।

এদিকে সারা দেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চলমান রয়েছে। এরপরও দেশজুড়ে হত্যাকাণ্ড, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্ষণ, গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্স প্রায় সব স্থানেই চলছে। পাশাপাশি চলছে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান। তবুও যেন থেমে নেই অপরাধীরা। 

পুলিশের সহকারী কমিশনার (এএসপি) পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে অপরাধীরা কাউকেই তোয়াক্কা করছে না। বরং দিনে দিনে তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। 

এদিকে পুলিশ পরিদর্শক পদের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ‘অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমাদের অস্ত্র ব্যবহারের কোনো অনুমতি বর্তমানে নেই। শুধু লাঠিচার্জে পুলিশকে ভয় পায় না ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীরা। কারণ গণ-অভ্যুত্থানের সময় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় থানা থেকে অনেক অস্ত্র লুট হয়েছে।

সেগুলোর কিছু উদ্ধার করা গেলেও অনেক অস্ত্র এখনো অপরাধীদের কাছেই রয়ে গেছে। তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অপেশাদার আচরণ করছে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নগরীজুড়েই টহল জোরদার ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। এরপরও অপরাধীরা বিভিন্ন অপরাধ করছে। কারণ তাদের কাছে ওই লুটের অস্ত্রগুলো রয়ে গেছে।’

বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম
বড় বাজেট, বড় ঘাটতি, বড় চ্যালেঞ্জ
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এই সংকট বেড়ে মহাসংকটে রূপ নিয়েছে। নতুন সরকার সংকট উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট দিতে যাচ্ছে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব কষে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা করেছে।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। খরচের চাপে সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। শিল্প খাত বেহাল। দেশে বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে রেকর্ড করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় বাজেট দিয়ে অর্থায়নের যে পরিকল্পনা করেছেন তা অবাস্তব।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, বড় বাজেটে বড় ঘাটতি রাখা হয়েছে। এতে সমগ্র অর্থনীতিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে ফেলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি রয়েছে। এর পরও লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে আদায়ের ছক কষা হয়েছে; যা উচ্চাভিলাষী সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি, ঘাটতি, বৈদেশিক উৎস, ব্যাংকিং খাত, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না বলেও আশঙ্কা করেন এই অর্থনীতিবিদ।  

জাতীয় সংসদে আগামীকাল ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট ঘোষণা করবেন। এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড দেওয়াসহ একগুচ্ছ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকলেও সাধারণ মানুষের বহুদিনের অনেক দাবি পূরণ করা হবে না। 

বাজেটের আকার
আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয় ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে এবার বাজেটে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা, যা এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আসছে বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। 

করব্যবস্থা
চলতি অর্থবছরে রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতিতে আছে এনবিআর। গত ১১ মাসে ঘাটতি বেড়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও আসন্ন অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে আদায় করতে হবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ভ্যাট থেকে আদায়ের চাপ বাড়ানো হয়েছে সবচেয়ে বেশি। বর্তমানে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। আসছে অর্থবছরে ভ্যাটের আওতায় মোট ২০ লাখ প্রতিষ্ঠানকে আনতে হিসাব কষা হয়েছে। ছোট দোকানদারদেরও আগামীতে ছাড় দেওয়া হবে না। হিসাব কষে বছরে ১ হাজার টাকা করে এক অর্থবছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, আগামী বাজেটে কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছে। কারণ লক্ষ্যমাত্রা পূরণের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। 

তিনি আরও বলেন, ছোট দোকানদাররা বেশির ভাগ মফস্বল এলাকার, যেখানে কোনো ভ্যাট অফিস নেই। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে বড় মাপের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায়ে চাপ বাড়াতে হবে। কিন্তু সরকার সেদিকে না গিয়ে ছোটদের ভ্যাটের আওতায় আনছে। ভ্যাট পরিশোধে চাপ দওয়া হলে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যেতে পারে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কষ্টে আছেন সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর জোরালো চাপ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি এনবিআরকে ভেবে দেখতে বলেন। কিন্তু করদাতা হারানোর ভয়ে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে করমুক্ত আয়সীমা মূল্যস্ফীতির বাড়ার সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানো হলো না। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের দেখানো পথেই হাঁটছে তারেক রহমানের সরকার। চলতি বাজেট ঘোষণার সময়েই সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন বলেছিলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হবে। 

তবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৭-২৮ অর্থবছরের জন্যও ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ধার্য করছেন। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং ২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ধার্য করেন।  

১১ জুন ঘোষিত বাজেটে আরও জানানো হবে, আগামী দুই অর্থবছরের করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে (২০২৪) আহত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ টাকা। 

২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত ‘জুলাইযোদ্ধাদের’ জন্য ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা। 

২০৩০-৩১ অর্থবছরের জন্য করমুক্ত আয়সীমা নারী ও ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য ৫ লাখ টাকা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাইযোদ্ধাদের জন্য ৬ লাখ টাকা, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য ৫ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য বিদ্যমান হিসাব থেকে কোনো সন্তান বা পোষ্য সন্তান প্রতিবন্ধী হলে পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের ক্ষেত্রে করমুক্ত আয়সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বেশি হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতা ও মাতা উভয়েই করদাতা হলে যেকোনো একজন এই সুবিধা পাবেন। 

আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য প্রথম ধাপে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ, পরের ধাপে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ১৫ শতাংশ, পরে ধাপের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ২০ শতাংশ, পরের ধাপে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ২৫ শতাংশ এবং অবশিষ্ট টাকার ওপর ৩০ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। তবে ২০২৮-৩১ অর্থবছর অবশিষ্ট আয়ের ওপর ৩৫ শতাংশ হারে কর পরিশোধ করতে হবে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটে তারেক রহমানের সরকার সারচার্জ বহাল রাখছে। অতিরিক্ত সম্পদ থাকার কারণে ২০২৮-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত ৩ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে নিয়মিত করের বাইরে আরও ৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। আগামী অর্থবছরের জন্য করপোরেট করহার কমানো হচ্ছে না। আগামী বাজেটও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও কৃষিপণ্যে উৎসে কর বহাল থাকছে। 

করের জালের আওতা বাড়ানো হবে। তবে চ্যালেঞ্জের এ বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ছাড় দেওয়া হবে। বিশেষ কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানো হবে। সব স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার কেনার ক্ষেত্রে উৎসে করে ছাড় থাকবে।   

অর্থায়ন
সরকারের নতুন বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি উৎস থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ।

আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক থেকে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা ও সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ লাখ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য ছিল। সংশোধিত বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছর উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া কমাবে সরকার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। কিন্তু এখানে ঘাটতিও বড়। আবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাও উচ্চাভিলাষী। এসব হিসাব বাস্তবায়নের বাস্তবমুখী সূত্র নেই। 

প্রবৃদ্ধি ৬.৫, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ  
২০২৬-২৭ বাজেটের খসড়া নথির তথ্যানুযায়ী আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এমন প্রেক্ষাপটেও বাংলাদেশের নতুন সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন খবরের কাগজকে বলেন, এই লক্ষ্য অর্জন বড় চ্যালেঞ্জের হবে। গত মে মাসে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। আগেই জ্বালানির দামও বাড়ানো হয়। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি  হবে।

সিলেটে নামকরণ-নামহরণ চলছেই!

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৯:২০ এএম
সিলেটে নামকরণ-নামহরণ চলছেই!
সিলেট নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার চণ্ডীপুল গোল চত্বরের নতুন নাম। সোমবার (৮ জুন) বিকেলে তোলা ছবি: মামুন হোসেন

রাজনৈতিক পালাবদলে সিলেটে বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ ও নামহরণ চলছেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, পার্ক ও অডিটোরিয়ামের পর এবার বদল করা হয়েছে একটি গোলচত্বরের নাম। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের চণ্ডীপুল গোলচত্বর নগরীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। দক্ষিণ সুরমা এলাকায় অবস্থিত এই গোলচত্বরটির নাম ২০০৯ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় রাজনীতিবিদ প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদের নামে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি চত্বরটির নাম পরিবর্তন করে ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান চত্বর’ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান সিলেটের কৃতী সন্তান। তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের শ্বশুর এবং ডা. জুবাইদা রহমানের বাবা। ১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর তিনি নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৮০ সালের ১ জানুয়ারি রিয়ার অ্যাডমিরাল পদে অভিষিক্ত হন। জাতীয় বাস্তবায়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং পরে উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন মাহবুব আলী খান। ১৯৮২ সালের ১০ জুলাই থেকে ১৯৮৪ সালের ১ জুন পর্যন্ত যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। তার দায়িত্বকালে সিলেটের শাহজালাল সেতু, লামাকাজি সেতু ও শেওলা সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের সূচনা হয়। তার স্মরণে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের লামাকাজি সেতুর নামকরণ করা হয়েছে। বালাগঞ্জে রয়েছে তার নামে একটি অডিটোরিয়ামও।

অন্যদিকে, আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৯১ সালে তিনি জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা এবং ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ভুরাখালী গ্রামের এই নেতার নামে এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদে একটি অডিটোরিয়াম রয়েছে।

এর আগে দক্ষিণ সুরমার সিটি করপোরেশন পরিচালিত পার্কটি এম সাইফুর রহমানের নামে পুনর্বহাল করা হয়। সর্বশেষ গত ৩ মার্চ সিলেট নগরীর কবি নজরুল অডিটোরিয়ামের নাম পরিবর্তন করে এম সাইফুর রহমানের নামে পুনর্বহাল করা হয়েছে। তবে এ দুটি স্থাপনার নাম ওয়ান-ইলেভেনের সময় পরিবর্তন করা হয়েছিল।

নতুন নামকরণ, সংশোধন ও নাম পুনর্বহালের বড় চিত্র দেখা গেছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ দপ্তর জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ২ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়টি আবাসিক হলের নাম পরিবর্তন ও সংশোধন করা হয়। এ লক্ষ্যে গঠিত কমিটির সুপারিশ এবং ৪৮তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এম সাইফুর রহমান হল, শহিদ জিয়া হল ও দুররে সামাদ রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হল, সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী হল এবং সমাজসেবী সুহাসিনী দাসের নামে আবাসিক হলের নামকরণ করা হয়েছিল। পরে এসব নাম পুনর্বহাল করা হয়। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, আব্দুস সামাদ আজাদ হল ও শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তন করে যথাক্রমে হযরত শাহজালাল (রহ.) হল, জেনারেল এম এ জি ওসমানী হল এবং সুহাসিনী দাস হল রাখা হয়েছে।

সিলেট নগরীর কেন্দ্রস্থল রিকাবিবাজার এলাকার অডিটোরিয়ামটি সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী প্রয়াত এম সাইফুর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও উন্নয়ন করা হয়। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় জোট সরকারের সময় সংস্কার শেষে তাঁর নামেই অডিটোরিয়ামটির নামকরণ করা হয়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথমে এর নাম পরিবর্তন করে ‘সিলেট অডিটোরিয়াম’ এবং পরে ‘কবি নজরুল অডিটোরিয়াম’ রাখে। প্রায় দুই দশক পর আবারও নাম পরিবর্তন করে এম সাইফুর রহমানের নামে ফিরিয়ে আনা হয়।

নতুন নামকরণের পর চণ্ডীপুল এলাকায় গত সোমবার গিয়ে দেখা যায়, নতুন নামকরণ বাস্তবায়নের উদ্যোগে ‘এম এ খান চত্বর বাস্তবায়ন কমিটি’ নামে একটি সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত শনিবার বিকেলে পুরোনো নাম মুছে নতুন নামের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। এ সময় ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে কার্যক্রমটি সম্প্রচার করা হয়।

লাইভে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, চণ্ডীপুল থেকে জালালপুরমুখী সড়ক হয়ে রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের বাড়িতে (বিরাহিমপুর গ্রাম) যেতে হয়। এ পথের সঙ্গে তার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। তাই দীর্ঘদিন ধরে তার নামে চত্বরটির নামকরণের দাবি জানিয়ে আসছিলেন তাঁরা। তাদের দাবি, আগের নামকরণটি বিধি অনুযায়ী হয়নি।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনাও দেখা গেছে। ‘সিলেট’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একটি পোস্টে হুমায়ুন কবির লিটন নামের একজন মন্তব্য করেন, ‘মাইক হাতে থাকা সাংবাদিক যখন আব্দুস সামাদ আজাদ চত্বরের পক্ষে ছিলেন, তখনো তিনি ছিলেন; এখন মাহবুব আলী খান চত্বরের পক্ষেও আছেন। তিনি সব সময়ই আছেন!’

‘মাইক হাতে থাকা সাংবাদিক’ অভিহিত ব্যক্তি হচ্ছেন এম আহমদ আলী। তিনি ‘এম এ খান চত্বর বাস্তবায়ন কমিটি’র যুগ্ম আহ্বায়ক। সোমবার রাতে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, আগের নামকরণটি বিধিমোতাবেক হয়নি বলেই নতুন নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আহমদ আলী বলেন, ‘আমি নিজে দেখেছি, তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরোধিতার মধ্যেও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান চণ্ডীপুল গোলচত্বরের নাম আব্দুস সামাদ আজাদের নামে রেখেছিলেন।’

নতুন নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা এ বিষয়ে লিখিত স্মারকলিপি দিয়েছি। তারই ধারাবাহিকতায় নতুন নামের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।’

চণ্ডীপুল গোলচত্বরটি মহাসড়ক ও অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পিকআপ ও ড্রপ-অব পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মহাসড়কের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং সিটি বাইপাস সড়কের সংযোগস্থল হিসেবে এটি নগরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক। এ ছাড়া কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রয়াত স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নামে একটি চত্বর এবং পারাইরচক এলাকায় বাম রাজনীতিক পীর হবিবুর রহমানের নামে আরেকটি চত্বর রয়েছে। চণ্ডীপুলের পর এসব চত্বরের নামহরণে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অনেক বাসিন্দা।

চণ্ডীপুল গোলচত্বর থেকে আব্দুস সামাদ আজাদের নাম অপসারণের ঘটনায় সিলেটে তার নামে আর কোনো স্থাপনা অবশিষ্ট থাকল না বলে জানিয়েছেন জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মুক্তাদীর আহমদ। তিনি বলেন, ‘আব্দুস সামাদ আজাদ জীবদ্দশায় নিজের নামে কোনো কিছু করার পক্ষে ছিলেন না। তবে মৃত্যুর পর প্রথমে জগন্নাথপুরে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও অডিটোরিয়ামের নাম তার নামে রাখা হয় উপজেলা পরিষদ থেকে দেওয়া আমার প্রস্তাবে। পরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও চণ্ডীপুল গোলচত্বরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার নামে নামকরণ করা হয়েছিল। কৃতী সন্তানদের নামে নামকরণ সম্মানার্থে হলেও নামহরণ অসম্মানের। এই সংস্কৃতির ইতি ঘটানো দরকার।’

নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ এএম
নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার
খুলনা

সীমানা জটিলতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় খুলনার প্রবেশদ্বার গল্লামারী বাজারসংলগ্ন সড়কে বর্জ্য ও নোংরা পানিতে নিয়মিত ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। গল্লামারী কাঁচাবাজার ও মাছ বাজারের দুটি ড্রেন থেকে নোংরা পানি সরাসরি সড়কের ওপর চলে আসে। সেই পানি যানবাহনের চাকা ও মানুষের পায়ের চাপে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ছাড়া গল্লামারী মোড়ে বাজারের ময়লা স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা আশপাশের নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে না ফেলে প্রতিদিন এখানে ফেলা হয়। ফলে তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও খুলনা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

জানা যায়, গল্লামারী বাজারের ময়লা-আবর্জনা মূলত ময়ূর নদীর পশ্চিম পাড়ে ফেলা হয়। এই এলাকাটি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সিটি করপোরেশন সেখানে বর্জ্য অপসারণ করে না। অন্যদিকে বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসনও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় আবর্জনা ও ময়লা জমে পানি আটকে থাকছে। বাজারসংলগ্ন ব্রিজের নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে সড়কের ওপর নোংরা ও পচা পানি জমে থাকছে। দুর্গন্ধে পথচারীরা নাক চেপে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই নোংরা পরিবেশের কারণে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 গতকাল সোমবার (৮ জুন) খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাজারসংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এখানে সিটি করপোরেশন, সড়ক বিভাগ, বাজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা করেন। সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নির্মণাধীন গল্লামারী ব্রিজসংলগ্ন ড্রেনের জন্য ৩ কোটি টাকা বাজেট রয়েছে। সীমানা জটিলতা দূর হলে এই টাকা দিয়ে বাজারের নোংরা পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন করা সম্ভব।

জানা যায়, গল্লামারী বাজার হয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা ও বটিয়াঘাটা-দাকোপ রুটের যানবাহন যাতায়াত করায় প্রতিদিন হাজারও মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন। বাজারের নোংরা পানির কারণে ক্রেতারা আসতে চান না, ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ইজিবাইকচালক ও পথচারীদের অভিযোগ, খুলনা সিটি করপোরেশনসহ প্রশাসনের কাছে বিষয়টি জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা তাহেরা সিদ্দিকী বলেন, ‘সকাল-বিকেল আমাদের গল্লামারীতে বিভিন্ন কাজে যাওয়া লাগে। প্রতিদিন এই দুর্গন্ধ সহ্য করা অত্যন্ত কষ্টকর। রাস্তা পার হতে গেলে এই দুর্গন্ধযুক্ত পানির ওপর দিয়ে যেতে হয়'।

স্থানীয়রা জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সব সময় যানজট লেগে থাকে। গল্লামারী ব্রিজ পার হতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় লাগে। ওই সময় দুর্গন্ধের মধ্যে বসে থাকা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই ময়লা-দুর্গন্ধের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে অনেকবার লেখালেখি করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি'।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘গল্লামারীর বাজারসংলগ্ন এলাকার বর্জ্য দূষণ ও অপসারণের লক্ষ্যে ইতোপূর্বে আমাদের তরফ থেকে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জায়গাটি সিটি করপোরেশনের বাইরে, বিধায় ময়লা অপসারণের জটিলতা থেকেই গেছে'।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গন্ধ, ময়লা পানি পিচ্ছিল রাস্তার কারণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের চলাচলে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় বায়ু, পানি ও মাটিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘সব পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপাতত বাজারের পানি নিষ্কাশনের জন্য সড়ক বিভাগ একটি কাঁচা ড্রেন করে দেবে। যেন নোংরা পানি রাস্তায় আসতে না পারে। পরবর্তী সময়ে সেখানে পাকা ড্রেন করা হবে'।
 
সড়ক ও জনপথ বিভাগ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, ‘ব্রিজসংলগ্ন ড্রেন করার জন্য ৩ কোটি টাকার বাজেট রয়েছে। সে অনুযায়ী ডিজাইন করা হবে। কিন্তু ড্রেন করতে গেলে বাজারের কিছু জমি ছাড়তে হবে। কিন্তু তারা রাজি হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে সড়ক বিভাগ নিজেদের জমি কিছুটা হলেও ছেড়ে দেবে। সেই সঙ্গে বাজার সমিতিকে মাটি কেটে রাখার জন্য হলেও কিছুটা জমি ছাড়তে হবে। সীমানা জটিলতা দূর হলে দু-এক দিনের মধ্যেই সেখানে ড্রেন খননের কাজ শুরু করা যাবে'।

এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায় সরকার, সোচ্চার শ্রমিক-কর্মচারীরা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:১০ এএম
এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায় সরকার, সোচ্চার শ্রমিক-কর্মচারীরা
ছবি:খবরের কাগজ

চট্টগ্রাম বন্দরের ‍নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার কাজ দিতে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড এফজেডইর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তাই এনসিটি পরিচালনায় ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) নিয়োগের লক্ষ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা এগিয়ে নিতে মন্ত্রণালয়ের এক দাপ্তরিক চিঠিতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে বিষয়টি সামনে আসতেই আবারও সোচ্চার হয়েছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। তাদের অবস্থান আগের মতোই অপরিবর্তিত।

গত ৪ জুন এই বিষয়ে দুটি দাপ্তরিক চিঠি ইস্যু করে মন্ত্রণালয়। প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত লেখা চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে সে ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

সেদিন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনা করতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি ইস্যু হয়। ওই চিঠিতে বন্দর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলা হয়, পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যালোচনার লক্ষ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৪ জুনের সভায় আলোচনা মোতাবেক ওই প্রকল্পের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এনসিটি নিয়ে একই দিন মন্ত্রণালয়ের দুই ধরনের চিঠি ইস্যু হওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না বন্দরের শ্রমিকনেতা ও কর্মচারীরা। মন্ত্রণালয়ের এমন কাজে তাদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করেছে বলে জানান তারা। তাদের দাবি, তারা বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে নন। বে-টার্মিনালের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার উদ্যোগে কোনো শ্রমিকনেতা ও কর্মচারী আপত্তি জানাননি। পাশাপাশি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে দেওয়ার সময়ও কেউ বাধা দেননি। কিন্তু এনসিটি যন্ত্রপাতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। টার্মিনালটির অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল ও লাভজনক। এই টার্মিনালের সেবার মান নিয়ে বন্দরের কোনো স্টেকহোল্ডার কখনো কোনো অভিযোগ দেননি। তাহলে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসজ্জিত ও লাভজনক টার্মিনাল কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে হবে?

বন্দর কর্তৃপক্ষও বলছে, এনসিটি গতিশীল

গত বছরের ৭ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনালের অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। গত ২ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিডিডিএলের সদস্যরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করায় কনটেইনার খালাস ও লোডিং প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল হয়েছে। এনসিটিতে মে মাসে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। মাসটিতে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউএস কনটেইনার (আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ছিল ৫৯ হাজার ৮৫১ টিইইউস ও রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ছিল ৬৬ হাজার ৬৪৫ টিইইউস) হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

এর আগে এনসিটির ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড হয়েছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে। সে সময় এনসিটিতে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৩ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। তবে গত মে মাসে আরও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হওয়ায় আগের রেকর্ডটি ভেঙে গেল। তবে এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। 

ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে শ্রমিকনেতাদের প্রতিক্রিয়া

শ্রমিকনেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরের এনসিটির পাশাপাশি সিসিটি টার্মিনাল পরিচালনার আগ্রহ দেখায়। সে সময় চলমান প্রক্রিয়ায় সিসিটির বিষয়টি না থাকায় বিষয়টি নিয়ে আর এগোতে চাননি বন্দর কর্মকর্তারা। শেষমেশ শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে এনসিটি চুক্তিও করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বর্তমান সরকার যদি আবারও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে হাঁটে, তবে সেটি কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না। তারা বলছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা না দিয়ে সরকার টিকতে পারছে না। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দর দেওয়ার পর বাংলাদেশ কীভাবে টিকবে?

বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খোকন জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। কনসেশন চুক্তির আওতায় বন্দরের প্রধান টার্মিনাল এনসিটি ও সিসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া হলে বন্দর ও দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্দর তার কর্তৃত্ব হারাবে। বিদেশি আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, যার ফলে দেশ চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। পিসিটি, এনসিটি, সিসিটি–সবই যদি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাহলে যেকোনো সময় দেশি-বিদেশি যেকোনো ষড়যন্ত্রে দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, ‘বন্দর বিদেশিদের দেওয়ার চেষ্টা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজ অর্থাৎ চট্টগ্রাম চেম্বার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ কোনো স্টেকহোল্ডারকে এখনো বলতে শুনিনি যে চট্টগ্রাম বন্দর তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের চাহিদা পূরণ করেই বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে। সড়কের যানজটের ব্যবস্থাপনাসহ কাস্টম ব্যবস্থাপনায় কোনোরূপ উন্নতি না করে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যেকোনো চুক্তি দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ বলে আমরা মনে করি।’ 

এনসিটি ঘিরে আগেও হয়েছে আন্দোলন, ধর্মঘট

গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে, ফয়ারে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। সেখানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন ও হুমায়ুন কবীর এবং বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান। 

বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশিদের ইজারা না দিতে দফায় দফায় আন্দোলন চালিয়ে যায় চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশে জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন।

এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা না দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদে) পর্যন্ত সাত দিনের ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এই ধর্মঘটের কারণে পণ্য সরবরাহে ভাটা পড়ে। ইয়ার্ডে বাড়তে থাকে কনটেইনারের সারি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ৯ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আলোচনায় বসলেও আর কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি সংগঠনটির নেতারা।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেন সেটি সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। পাশাপাশি বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। যেকোনো ধরনেরর আন্দোলনে বন্দরের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। এটিও সবার মাথায় রাখতে হবে। 

চট্টগ্রামে শিক্ষকের ৮ হাজার পদ শূন্য

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:০০ এএম
চট্টগ্রামে শিক্ষকের ৮ হাজার পদ শূন্য
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এ সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বর্তমানে ১ হাজার ৭৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় আট হাজার শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সৃষ্ট পদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক পদই বর্তমানে শূন্য রয়েছে। দ্রুত নিয়োগ না দিলে এ সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে জুনিয়র স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কলেজ মিলে ১ হাজার ৭৩৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কলেজ ২১টি, বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজ ৭৯টি ও এমপিওবিহীন ২৪টি কলেজ রয়েছে। সরকারি স্কুল রয়েছে ২৫টি। বেসরকরি স্কুল রয়েছে এমপিওভুক্ত ৫৭৭টি, নন-এমপিও ২২৪টি। স্কুল অ্যান্ড কলেজ রয়েছে ৭৫টি। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৬৪টি ও জুনিয়র স্কুল রয়েছে ১৬৭টি। চট্টগ্রামে মাদরাসা রয়েছে ৪৮২টি। এর মধ্যে ৩৮১টি এমপিওভুক্ত।

সব মিলে ১ হাজার ৭৩৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, (প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ) সহকারী প্রধান (শিক্ষক বা উপাধ্যক্ষ) ও সহকারী শিক্ষকসহ ২৬ হাজার ১৪৮ শিক্ষক থাকার কথা। কলেজ পর্যায়ে গড়ে ২১ জন করে শিক্ষক থাকার কথা, স্কুল ও মাদরাসা পর্যায়ে ১৮ জন ও জুনিয়র স্কুলে থাকার কথা ১২ জন করে শিক্ষক। স্কুল ও মাদরাসা মিলে ১ হাজার ৩০৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে শিক্ষক থাকার কথা ২৩ হাজার ৫৪৪ জন। কিন্তু আছে ১৬ হাজার ৫৪৪ জন।

মাধ্যমিক ও মাদরাসায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও ২৫০ জন প্রধান শিক্ষকের পদ বা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদ খালি রয়েছে। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ খালি আছে ৩০০ জন। কলেজের ক্ষেত্রে অধ্যক্ষের পদ খালি রয়েছে ৪০টি। শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে ৪৫০ জনের। এ ছাড়া উপাধ্যক্ষ পদ খালি রয়েছে ৩০ জনের। সর্বমোট চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ হাজার ৩০টি পদ খালি রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকই নন, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের অনেক পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অনেক প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল আজিজ খবরের কাগজকে বলেন, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ক্লাস নিয়মিত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক সংকট সবচেয়ে বেশি। কারিগরি ও অনেক বিষয়ের কোনো শিক্ষকই নেই। তবে যা আছে তাই দিয়ে কোনোভাবে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষক নিয়োগে ধীরগতির কারণে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে সংকট তৈরি হতো না। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও ঝুলে রয়েছে। চাহিদার বিপরীতে কম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাই শিক্ষক স্বল্পতার তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। তবে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হলে সংকট চলে যাবে। 

সূত্র জানায়, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ সংকটে বেশি ভুগছে। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চট্টগ্রামের অংকুর সোসাইটি উচ্চবিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক সুলতানা কাজী খবরের কাগজকে বলেন, প্রধান শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকলে বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি, শিক্ষক মূল্যায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সরকারি নির্দেশনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। 

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ না করা, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত জটিলতা, নিয়োগ কার্যক্রমে প্রশাসনিক ধীরগতি, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সে অনুপাতে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
 
প্রবীণ শিক্ষক আবু তালেব বেলাল বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই শিক্ষক সংকট নিরসন করতে হবে। একটি অঞ্চলের শিক্ষার মান নির্ভর করে পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের উপস্থিতির ওপর। শিক্ষক ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা কমে যায়, যা ভবিষ্যতে জাতীয় উন্নয়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শূন্যপদ পূরণের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ, প্রশাসনিক পদে যোগ্য ব্যক্তিদের পদায়ন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখতে বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে।