পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলার স্বরূপকাঠি পৌরসভার দুবারের নির্বাচিত মেয়র ছিলেন মো. গোলাম কবির। ২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে প্রথমবার মেয়র হন। এর পরই নিয়ন্ত্রণে নেন কাঠমহাল, হাটবাজার, খেয়াঘাট, নদীর চর, বাসস্ট্যান্ডসহ প্রায় সব অর্থের উৎসস্থল। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১০ বছর ক্ষমতায় থেকে বিভিন্ন আর্থিক উৎসসহ ঠিকাদারি কাজে কমিশন ও ব্যবসায়ী অংশীদারি থেকে কামিয়েছেন শতকোটি টাকার বেশি। সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এড়াতে তিনি নিজ এলাকায় তেমন কোনো সম্পদ গড়েননি। তবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট, গাড়ি-বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে রয়েছে বিশাল স’মিলসহ কাঠের কারখানা ।
কাঠ ও চারা গাছের জন্য দেশের বিখ্যাত বাণিজ্যিক বন্দর স্বরূপকাঠি। স্থানীয়রা জানান, এখানকার কাঠমহাল, হাটবাজার, লঞ্চঘাট, খেয়াঘাট ও বাস টার্মিনালের ইজারা নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। এমনকি পৌর এলাকায় থাকা বিভিন্ন গণশৌচাগার থেকেও তাকে কমিশন দিতে হতো। তবে সুচতুর গোলাম কবির নিজের ব্যাংক হিসাবে লেনদেন না করে ছেলে, মেয়ে, মেয়ের জামাই, ভাগিনাসহ আত্মীয়দের হিসাবে নিয়মিত লেনদেন করতেন। তাদের নামে কোটি কোটি টাকা আমানত রেখেছেন। তার দুর্নীতির বিষয়ে একাধিকবার দুদকে অভিযোগ করা হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
মামলার সুযোগে নদীর চর দখল
দেশে গাছ ও কাঠের সবচেয়ে বড় বাজার স্বরূপকাঠি বন্দরের নদীর চরে। এই বাজারে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার বেচাকেনা হয়। ওই চর ইজারা দিত জেলা প্রশাসন। কিন্তু গোলাম কবির মেয়র হওয়ার পর ইজারা দিতে বাধা দেন। পরে চরটি কাঠমহালের একটি অংশ দাবি করে স্বরূপকাঠি পৌরসভার পক্ষ থেকে উচ্চ আদালতে একটি আবেদন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইজারা বন্ধ থাকার সুযোগে গোলাম কবির নিজের লোকজন দিয়ে কাঠমহাল থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করতেন। যদিও গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ওই চর থেকে উপজেলা পরিষদ নিয়মিত খাজনা আদায় করছে।
ঠিকাদারি কাজে যুক্ত থেকে ১০ শতাংশ কমিশন
গত ১০ বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে ‘ক’ শ্রেণির এই পৌরসভায়। নামে-বেনামে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন সাবেক পৌর মেয়র গোলাম কবির। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরূপকাঠি পৌরসভার প্রথম শ্রেণির একাধিক ঠিকাদার বলেন, পৌরসভাটি প্রতিষ্ঠার পর ৩২টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। গত ১০ বছরে মেয়রের ঘনিষ্ঠ মাহাবুব সালেকের মালিকানাধীন মেসার্স মাহাবুব ট্রেডার্স, বড় ভাইয়ের নামে মেসার্স হোচেন অ্যান্ড ব্রাদার্স, মেসার্স তিষা এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স সঞ্জয় কনস্ট্রাকশন ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান ঠিকাদারি কাজ পায়নি। বাস্তবায়িত প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ ঠিকাদারি কাজ পেয়েছে গোলাম কবিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাহাবুব ট্রেডার্স ও বড় ভাইয়ের মেসার্স হোচেন অ্যান্ড ব্রাদার্স প্রতিষ্ঠান। বাকি কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করলেও লাভের অংশীদারি থাকত পৌর মেয়রের। এ ছাড়া কমিশনবাবদ ১০ পারসেন্ট ছিল নির্ধারিত।
সুন্দরী কাঠের অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ
সুন্দরবনের সুন্দরী কাঠের চোরাচালানি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে গোলাম কবির হোসেনের বিরুদ্ধে। স্বরূপকাঠি ছাড়াও বানারীপাড়া, উজিরপুর, কোটালীপাড়া উপজেলার নৌরুট নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। তার ছত্রচ্ছায়ায় এসব রুটে নিরাপদে সুন্দরী কাঠ পাচার হতো বলে কাঠ ব্যবসায়ীরা জানান। তারা বলেন, এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ এখনো তার হাতে রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান, সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে আনা সুন্দরী কাঠ জব্দ করায় বন কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেনকে পৌরসভা ভবনে আটকে রেখে মারধর করেছিলেন মেয়র ও তার ক্যাডাররা। ওই ঘটনায় ২০১৭ সালের ৮ মে মেয়রসহ চারজনের বিরুদ্ধে পিরোজপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছিলেন ওই বন কর্মকর্তা। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেন তিনি।
জমি কেনার নামে ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য জমি কেনায় সাবেক মেয়র গোলাম কবিরের বিরুদ্ধে ৫০ লাখ টাকা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। জমির প্রকৃত সরকারি মূল্য না দিয়ে জমির দাতাকে মাত্র ১০ লাখ টাকা দিয়ে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয় বলে জানা গেছে।
জমির দাতা রোজিনা বেগম বলেন, ‘জলাবাড়ী নদীর পাশের ওই জমির পরিমাণ ৩ একর ১৪ শতাংশ। স্বরূপকাঠি পৌরসভার কাছে ১৪ লাখ টাকায় জমিটি বিক্রি করার কথা হয়। জমিবাবদ ১০ লাখ টাকা দিয়েছেন মেয়র গোলাম কবির। দলিল দেওয়ার আগে বায়নাবাবদ ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। পরে স্বরূপকাঠি ইসলামী ব্যাংকে একটি অ্যাকাউন্টে ৫৯ লাখ ৩৮ হাজার টাকা জমা দেয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষ। টাকা জমা হওয়ার পর আমার চেক বইয়ে দুটি স্বাক্ষর নিয়ে অ্যাকাউন্টে ৫ লাখ টাকা রেখে বাকি টাকা তুলে নেন।’
এ ব্যাপারে পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুর রহমান খান বলেন, ‘জমি কেনার সব টাকা লেনদেন চেকের মাধ্যমে হয়েছে। জমি কেনার সব কাজ গোলাম কবির এবং মধ্যস্থতাকারী মজিবুর রহমান করেছেন। লেনদেনের অনেক বিষয়ে আমার জানা নেই।’
রাজনৈতিক উত্থান
একসময়ে সর্বহারা পার্টির স্বরূপকাঠি উপজেলা শাখার সভাপতি ছিলেন গোলাম কবির। নব্বইয়ের দশকে সর্বহারা পার্টির শীর্ষ নেতা কামরুল ও জিয়া উদ্দিনের মধ্যে বিভাজন তৈরি হলে এলাকা ছেড়ে চলে যান গোলাম কবির। পরে তিনি যোগ দেন ফ্রিডম পার্টিতে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সেই থেকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।
২০১৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়র পদে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন বাগিয়ে নেন। জনশ্রুতি রয়েছে, প্রথমবার নৌকার টিকিট নিশ্চিত করতে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ উপজেলা ও জেলার শীর্ষ নেতাদের পেছনে কোটি টাকা ব্যয় করেছিলেন। নির্বাচনের সময়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলানোর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হলেও নিজের ভাগ্য বদলিয়েছেন তিনি।
দলের সঙ্গে প্রতারণা
নিজে আওয়ামী লীগের হয়ে ভোটে পাস করলেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যারা নির্বাচন করতেন তাদের পক্ষে অবস্থান নিতেন। অর্থলোভী গোলাম কবির বিভিন্ন সময়ে পিরোজপুরের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে পল্টিবাজি করেছেন বলে উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা দাবি করেছেন। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর পক্ষে না থেকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে মহিউদ্দীন মহারাজের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী মহারাজের পক্ষে থেকে সব নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নেন।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গোলাম কবির আত্মগোপনে রয়েছেন। এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।