প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ১২ পয়সা হারে ঢাকা থেকে পাবনার বাস ভাড়া হয় ৩৪১ টাকা ৩২ পয়সা। কিন্তু ঢাকা-পাবনা রুটের শ্যামলী পরিবহন ও বাংলা স্টার পরিবহনে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৬০০ টাকা। অনলাইন টিকিট বিক্রির প্ল্যাটফর্ম সহজডটকমের সাইটে ঢুকে এমন চিত্র দেখা গেছে। তবে গাবতলী, কল্যাণপুরের বাস কাউন্টারগুলোতে আরও বেশি টাকা চাইছেন কাউন্টারম্যান। প্রতি টিকিটে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি করে আদায় করার অভিযোগ আনেন যাত্রীরা।
শুধু বাড়তি ভাড়া নয়; অনলাইন টিকিট বিক্রির নানা প্ল্যাটফর্ম ঘুরে দেখা গেছে, বাসের টিকিট উধাও! নীলফামারীর যাত্রী মাসুদ পারভেজ একাধিকবার অনলাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে বিফল হয়েছেন গতকাল শুক্রবার।
আর যারা ট্রেনে বাড়ি যাবেন, তাদের অনেকেই গতকাল অনলাইনে টিকিট কাটতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফেসবুকভিত্তিক নানা গ্রুপে কালোবাজারি চক্র ট্রেনের টিকিট বিক্রির রমরমা ব্যবসা ফেঁদে বসেছেন।
ঈদযাত্রার আগে শুক্রবার (২১ মার্চ) থেকেই এমন বিপাকে পড়েছেন রাজধানীর যাত্রীরা। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ, বাংলাদেশ রেলওয়ে, কড়া নজরদারির কথা বললেও আদতে তা চোখে পড়েনি কোথাও।
আরাফাত সানি নামের এক যাত্রী শুক্রবার সৌদিয়া পরিবহনের টিকিট কাটেন মতিঝিল থেকে। চট্টগ্রাম রুটের এই ইকোনমি এসি বাসের ভাড়া জনপ্রতি ৯৫০ টাকা। তিনি কাউন্টারে ২০০০ টাকা দিলেও তাকে কোনো টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা করেও লাভ হয়নি। আরাফাত অভিযোগ করেন, ‘উল্টো আমাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়েছে, আমার সিট আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দেবে তারা।’ রাজশাহী রুটে হানিফ এন্টারপ্রাইজের কেটিসি হানিফের বিজনেস ক্লাস বাসের প্রতি আসনের ভাড়া ১১০০ টাকা। কিন্তু তাকে এই ঈদযাত্রায় টিকিট কিনতে অতিরিক্ত ৭০০ টাকা খরচ করতে হয়েছে।
টিকিট বিক্রির ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-রংপুর রুটে হানিফ এন্টারপ্রাইজের ভলভো এসি বাসের ভাড়া গত ১৯ মার্চ ছিল ১৫০০ টাকা। সেই একই রুটে, একই বাসে আগামী ২৯ মার্চে ভাড়া নিচ্ছে ২৫০০ টাকা। এখানে ১০০০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে।
ঢাকা-পঞ্চগড় রুটে শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের নন-এসি বাসে আগামী ২৯ মার্চের ভাড়া রাখা হচ্ছে ১২০০ টাকা। সেই একই রুটে, একই বাসে আগামী ৩ এপ্রিলের পর থেকে যেকোনো দিনের ভাড়া দেখাচ্ছে ১০৫০ টাকা। এখানে গাবতলী থেকে পঞ্চগড় রুটের সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১১৭৪ টাকা। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে গ্রিন সেন্ট মার্টিন স্লিপার এসি বাসে আগামী ২৯ মার্চের ভাড়া রাখা হচ্ছে ২০০০ টাকা। সেই একই রুটে, একই বাসে, আগামী ১৯ এপ্রিলের ভাড়া দেখাচ্ছে ১৫০০ টাকা। এখানে ৫০০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে।
ঢাকা-বগুড়া রুটে হেরিটেজ ট্রাভেলসের স্লিপার এসি বাসে আগামী ২৯ মার্চের ভাড়া রাখা হচ্ছে ৩০০০ টাকা। সেই একই রুটে, একই বাসে, আগামী ৫ এপ্রিলের ভাড়া দেখাচ্ছে ১৬০০ টাকা। এখানে ১৪০০ টাকা বেশি রাখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্যামলী এন আর ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক শুভঙ্কর ঘোষ রাকেশ বলেন, ‘বিআরটিএ সব সময় নন-এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয়। এসি বাসের জন্য সরকারকে ভ্যাট দিতে হয়, এ জন্য এটি মালিকদের দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে। এসির ভাড়া নন-এসির ক্যাটাগরিতে ফেলা যায় না। কারণ কেউ হুন্দাই বাস ব্যবহার করে, কেউ ওয়ান-জে ব্যবহার করে। কেউ ল্যা-লেন্ড ব্যবহার করে, কেউ স্লিপার দেয়, কেউ সেমি-স্লিপার দেয়। এত ক্যাটাগরির ভাড়া নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে একেক পরিবহনে একেক ধরনের ভাড়া রাখা হচ্ছে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি এম এ বাতেন বলেন, ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ মিথ্যা না। আমাদের কাছে অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন। আমরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের মালিকদের সতর্ক করে দিচ্ছি।’
পরে তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় ঢাকা থেকে যাওয়া বাসগুলো খালি ফিরে আসে। কিন্তু পথে কত জায়গায় টোল দিতে হয়। পরিবহন কর্মীদের বেতন আছে। হয়তো কাউন্টার কর্মীরা ২০-৩০ টাকা বেশি চাইছে। এটা তো প্রতি ঈদেই হয়। যাত্রীরা এ নিয়ে খুব অসন্তুষ্ট, এমন নয়। তবে ৫০০-৬০০ টাকা বেশি রাখা একদমই ঠিক না। আমরা খবর নেব।’
ট্রেনের টিকিটে কালোবাজারি রমরমা
শুক্রবার ২১ মার্চ ছিল ট্রেনের ঈদের আগাম টিকিট বিক্রির শেষ দিন। ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার মো. আনোয়ার হোসেন জানান, এদিন পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য আলাদাভাবে ৩১ হাজার টিকিট বরাদ্দ ছিল। সকাল ৮টায় শুরু হয় পশ্চিমাঞ্চল রুটের টিকিটি বিক্রি। মাত্র সাড়ে ৭ মিনিটের মধ্যে সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। প্রতি মিনিটে সাড়ে ৯ লাখ যাত্রী রেলসেবা অ্যাপে হিট করেছেন। বিকেল ২টায় পূর্বাঞ্চলের টিকিট বিক্রি শেষ হয়ে যায় ১০ মিনিটের মধ্যে।
এবার ঈদুল ফিতরের যাত্রায় একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ৪টি টিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছেন। রেলের নিয়মানুযায়ী, এবার যারা ট্রেনের টিকিট পেয়েছেন তাদের প্রত্যেককে স্টেশনে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। টিকিট কালোবাজারি বন্ধে রেলওয়ে এবার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার সফলতা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যেই শঙ্কা আছে।
এদিকে ফেসবুকে ‘টিকিট বায় অ্যান্ড সেল’ নামে একটি গ্রুপে রেলের টিকিট বিক্রি চলছে দেদার। অনেকে ঈদযাত্রা না করলেও ট্রেনের টিকিট কেটেছেন। তাদের একজন নাসির উদ্দিন। তিনি গতকাল টিকিট বিক্রির এই গ্রুপে লিখেছেন, ‘আমার টিকিটের কোনো প্রয়োজন ছিল না। শুধু দেখার জন্য টিকিট কাটার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। আল্লাহর রহমতে একতা এক্সপ্রেসের একটি টিকিট কাটতে সক্ষম হলাম- ঢাকা টু পার্বতীপুর। কারও লাগলে নিতে পারেন বিশ্বাস থাকলে।’ কমেন্ট সেকশনে আবদুল্লাহ আল ফাত্তাহ নামে এক যাত্রী তাতে সায় দেন। পরে নাসির ‘01784...’ নম্বর দিয়ে তাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠাতে বলেন।
এই গ্রুপে আরেকজন নাম-পরিচয় লুকিয়ে লালমনি এক্সপ্রেসের দুটি টিকিট বিক্রির বার্তা দেন। তার কমেন্ট সেকশনে আল আমিন লেখেন, আমার কাছে লালমনির ৩টি টিকিট আছে। শামসুল আলম সজীব জানান, তার কাছে ২৫ মার্চ রাতে ঢাকা থেকে সেতাবগঞ্জ রুটের দ্রুতযান এক্সপ্রেসের ৪টি টিকিট রয়েছে। টিকিটগুলো পেতে হলে লালমাটিয়া যাওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। সঙ্গে দিয়ে দেন একটি টেলিটক নম্বর।
কমলাপুরের স্টেশন মাস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘প্রতিবারই প্রতারক চক্র এমন ফাঁদ পেতে বসে থাকে। আমরা জানতে পেরেছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাজার, ২ হাজার টাকা বেশি দিয়েও সেসব টিকিট কিনে নিচ্ছেন যাত্রীরা। পরে যাত্রার সময় দেখা যায়, এসব টিকিট ভুয়া। তাই যাত্রীদের বারবার বলছি, রেলসেবা অ্যাপ থেকে টিকিট কাটতে কিংবা কাউন্টারে আসতে।’