ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিলেও তা মানছেন না খুচরা ব্যবসায়ীরা। এমনিতেই পণ্যটিতে মিলারদের বাড়ানো দরে নাকাল সাধারণ মানুষ। তার ওপর ওই দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে আগের মতো ভোজ্যতেলে ফায়দা লুটছেন খুচরা বিক্রেতারা। এমন পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে খুচরা পর্যায়ে কঠোর তদারকি চান ভোক্তা ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) নেতারা।
সরকার ও মিলমালিকদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিনে ১৪ টাকা বেড়ে ১৮৯ টাকা এবং খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েলে লিটারে ১২ টাকা বেড়ে ১৬৯ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু চট্টগ্রামের কোথাও এই দরে মিলছে না ভোজ্যতেল।
রবিবার (২০ এপ্রিল) চট্টগ্রাম মহানগরের হালিশহরের নয়াবাজার, আগ্রাবাদ, কাজীর দেউড়ি, নাসিরাবাদ, ২ নম্বর গেট, চকবাজার ও মুরাদপুর এলাকার বিভিন্ন অলিগলি এবং সড়কের পাশে খুচরা দোকানগুলোতে সরেজমিনে দেখা যায় উল্টো চিত্র। কোনো দোকানেই নির্ধারিত দরে পাওয়া যাচ্ছে না নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি। এসব জায়গার দোকানগুলোতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০০ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৮০ টাকা ও পাম অয়েল ১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম বেঁধে দেওয়ার বাইরে অতিরিক্ত দাম চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সদুত্তর দিতে পারেননি কেউই। দেখালেন পুরোনো অজুহাত।
নগরের আগ্রাবাদ এলাকার আল মক্কা স্টোরের মালিক মো. শোয়েব বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ালেও মিল থেকে সরবরাহ কম। তাই দামটা বাড়তি। তবে খুচরা বিক্রেতাদের এ দাবি মানতে নারাজ মিলমালিকরা। মেঘনা গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (ট্রেডিং) নাছির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘খুচরা ব্যবসায়ীরা মিথ্যা বলছেন। আমরা যথাসময়ে তেল পরিশোধন ও বাজারজাত করছি। বাজারে ভোজ্যতেল সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি থাকার কারণ নেই। তাদের যা চাহিদা, আমরা শতভাগ পূরণ করতে প্রস্তুত।’
এদিকে চট্টগ্রামের বড় বাজার খাতুনগঞ্জে সয়াবিন তেলের দাম একটু বাড়লেও কমতে শুরু করেছে পাম অয়েলের দাম। বাজারটিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি লিটার সয়াবিন তেলে ২ টাকা ৪১ পয়সা বেড়ে ১৫৫ টাকা ৫৪ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে। তবে সপ্তাহের ব্যবধানে পাম অয়েল লিটারপ্রতি ৩ টাকা ১৪ পয়সা কমে ১৪১ টাকা ৭ পয়সায় বিক্রি হচ্ছে।
খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘পাইকারি বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমতে শুরু করেছে। মিলাররা সরবরাহ বাড়াচ্ছেন। আশা করছি, পাইকারি পর্যায়ে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকবে।’
চট্টগ্রাম মহানগরের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী মো. শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘আগের মতোই মজা লুটছেন খুচরা বিক্রেতারা। প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ২০০ টাকা চান। খোলা কিনতে চাইলাম, বিক্রেতা লিটারপ্রতি ১৮০ টাকা চাইলেন। মগের মুলুক অবস্থা।’
ভোজ্যতেলে খুচরা ব্যবসায়ীদের কারসাজি নতুন নয়। গত ৪ মার্চ দুপুরে ভোজ্যতেল এবং নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সার্কিট হাউসে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৬০ টাকা দাম নির্ধারণ করলেও তা মানেননি খুচরা ব্যবসায়ীরা। সেই সময় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকারের কর্মকর্তারা দফায় দফায় অভিযান চালালেও টনক নড়েনি তাদের।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘দুই-তিন মাস ধরে দেশের বাজারে ভোজ্যতেলে একটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। বর্তমানে বিশ্ববাজারের দাম পর্যালোচনা করে দেশীয় বাজারে দাম বাড়ানো প্রয়োজন আছে কি না, এগুলো কি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানে না? ভোজ্যতেলের দাম অস্থির হওয়ার পেছনে কারণটা হলো, দেশে ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ৫-৬টি কোম্পানি রয়েছে। তাদের সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকা উচিত। আমার মনে হয়, এ জায়গায় একটা গ্যাপ আছে। সমন্বয়ের অভাব আছে। তাই জরুরি ভিত্তিতে সরকারের ওপরের মহলের উচিত এ বিষয়ে নজর দেওয়া।’
ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সরকারের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত আসার আগেই মিলাররা ভোজ্যতেলের দাম বাড়িয়ে ফেলেছেন। তারা সবাইকে জিম্মি করে ফেলেছেন। এখন খুচরা ব্যবসায়ীরাও ফায়দা লুটছেন। বাজারে কোনো কঠোর তদারকি ব্যবস্থা নেই। আমরা যত যাই-ই বলি, কোনো কথায় কাজ হচ্ছে না। সব মিলিয়ে আমরাও খুব হতাশ। অন্তত ভোক্তার স্বার্থে বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা দরকার।’
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভোজ্যতেলে বাড়তি দর আদায়ের বিষয়ে আমাদের কাছে এখনো কেউ অভিযোগ দেয়নি। কেউ নির্ধারিত দরের বাইরে বাড়তি অর্থ আদায় করলে আমরা কঠোরভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’