নানামুখী অনিশ্চয়তার মধ্যেই আজ কক্সবাজারে শুরু হচ্ছে রোহিঙ্গাবিষয়ক তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য এখন আরাকান আর্মির দখলে। এ অবস্থায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা ও তাদের অধিকারের নিশ্চয়তা- প্রধানত এই তিন ইস্যু সামনে রেখে এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিভিন্ন দাতা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থ না দেওয়ায় শিবিরগুলোতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, নিরাপত্তার মতো ইস্যুগুলো অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সহায়তামূলক অনেক সেবা শিবির বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সেখানকার মানবিক পরিস্থিতি এখন অনেকটাই ঝুঁকিতে।
মায়ানমারের রাখাইনে জান্তা সরকারের গণহত্যা ও নির্যাতনে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সুখবর নেই। এরই মধ্যে কেটে গেছে আট বছর। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গার ঢল শুরু হয়। রাখাইনে এখন চলছে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সশস্ত্র সংঘাত। সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পরিবেশ নেই। ফলে এ ধরনের সম্মেলন থেকে কতটা ফল পাওয়া যাবে, তা নিয়ে রয়েছে বিস্তর সংশয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার আয়োজিত এই সম্মেলনে ২৩টি দেশের প্রতিনিধিসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রায় ৮০ জন বিদেশি প্রতিনিধি যোগ দিচ্ছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আগামীকাল সোমবার এই সম্মেলনের প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য- রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি করা এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু রাখাইনে জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে জান্তা বাহিনীর চলমান সংঘাতের কবলে পড়ে গত এক বছরে নতুন করে এসেছে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশে ঢোকার অপেক্ষায় সীমান্তে প্রতিদিনই অপেক্ষা করে চার থেকে পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা। এর মধ্যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত, জাতিসংঘের প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ বলে আসছে, রাখাইনে একজন রোহিঙ্গাকেও ফেরত পাঠানোর পরিবেশ নেই। এই পরিস্থিতিতে কক্সবাজারে আয়োজিত সম্মেলনের ভবিষ্যৎ কতটা সফল হবে, তা নিয়ে চিন্তিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও।
ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের বেদনাবিধূর জীবনের কথা। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের কাছের একটি গ্রাম সুদাপাড়া। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট জান্তা বাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে সেই গ্রাম থেকে স্ত্রীসহ চার সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে বাংলাদেশ এসেছিলেন আবদুল মালেক। তখন থেকে আট বছর ধরে উখিয়ার বালুখালীর ১০ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি ঘরে বসবাস করে আসছেন।
আবদুল মালেক জানান, এখন রাখাইনে তাদের ফেরত যাওয়া অসম্ভব। তিনি প্রশ্ন করেন, কোথায় ফিরব? ওখানে ফেরার পরিবেশ আছে কি? তার দেওয়া তথ্য মতে, মায়ানমারের জান্তা বাহিনীর নির্যাতনে পালিয়ে আসার পর অনেক আত্মীয়স্বজন গ্রামে ছিলেন। কিন্তু এখন আরাকান আর্মির দখলে যাওয়ার পর ওই গ্রামটি আর নেই। সেখানে এখন আর কোনো রোহিঙ্গা নেই। যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই পালিয়ে এসেছেন। শুধু আবদুল মালেক নয়, অন্য রোহিঙ্গারাও বলছেন, রোহিঙ্গা-সংকটের আট বছরে এসে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত রাখাইন রাজ্যে প্রত্যাবাসন সম্ভব না।
উখিয়ার লম্বাশিয়া ক্যাম্পের হোসেন আলী বলেন, ‘আমরা নিরাপত্তা চাই, মর্যাদাসম্পন্ন প্রত্যাবাসন চাই। এখন রাখাইন তো আরাকান আর্মির দখলে, সেখানে কীভাবে নিরাপত্তা পাব?’
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব নেবে কে? জান্তা সরকার স্পষ্ট করে বলেনি। নিরাপদ জোন ছাড়া প্রত্যাবাসন টেকসই সমাধান নয়। তাহলে প্রত্যাবাসন আসলেই সম্ভব কি না, তা নিয়ে রয়ে গেছে অনেক প্রশ্ন।
ক্যাম্পের বাসিন্দা বদরুল ইসলামের মতে, ‘জান্তা সরকার যদি ফেরত নেয়ও, রাখাইনে পাঠাবে। অথচ ওখানে এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ। কাদের কাছে যাব।’
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে রাখাইনের ৯০ শতাংশের বেশি এলাকা বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মায়ানমার সরকারের হাতে নেই এসব অঞ্চলের ক্ষমতা। গত বছর থাইল্যান্ডের বিমসটেক সম্মেলনের পাশাপাশি বাংলাদেশ-মায়ানমারের বৈঠকে নতুন সম্ভাবনা দেখা যায়। তালিকাভুক্ত আট লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজারকে ফেরত নেওয়ার যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করে মায়ানমারের জান্তা সরকার। অথচ রাখাইনে জান্তা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। এরপর হয়নি রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টিতে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত রমজানে রোহিঙ্গাদের এক সমাবেশে বলেছিলেন, এই ঈদ না হোক, আগামী ঈদে রোহিঙ্গারা নিজেদের দেশে ঈদ করতে পারবেন। চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও যেকোনো মূল্যে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রধান উপদেষ্টার আশ্বাসে আপাতত স্বস্তি মিলছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে। তবে রাখাইনের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি এবং আলোচনায় কার্যত কোনো অগ্রগতি না থাকায় ভরসা পাচ্ছেন না তারা। মায়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘাত বেড়ে যাওয়ায় সীমান্তে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জড়ো হয়েছে। পরিস্থিতি বুঝে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, প্রত্যাবাসন কোথায় হবে, কীভাবে হবে, এটা তো পরিষ্কার না। রাখাইন এখন আরাকান আর্মির দখলে। মায়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে রয়েছে আরাকান আর্মির বিরোধ। নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ হচ্ছে। ফলে প্রত্যাবাসন আলোর মুখ দেখবে কবে বলা যাচ্ছে না।
মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এখন ১৩ লাখ। বছরে আরও প্রায় ৪০ হাজার করে নতুন রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে। এ ছাড়া নতুন করে প্রতিদিনই ঢুকছে রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নতুন রোহিঙ্গাদের জায়গার সংকুলান না হলেও উপায় নেই। এ অবস্থায় রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দাতাগোষ্ঠীর দেওয়া মানবিক সহায়তাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এতে রোহিঙ্গাদের নিয়ে নতুন করে সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ।