ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
১০ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি পটিয়ায় যুবক খুন কাপ্তাই হ্রদে ডুবে চবি শিক্ষার্থীর  মৃত্যু জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁতীদলের আলোচনা সভা সরকারি বাঙলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা ১০ জুলাই জবিতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের প্রকাশ্যে মানববন্ধন পটিয়া প্রেসক্লাব দখলের চেষ্টা, থানায় অভিযোগ অনার্স কোর্স থেকে বাংলা ও ইতিহাস বাদ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই: শিক্ষামন্ত্রী ‘শর্ত সাপেক্ষে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা’ মানিকগঞ্জে পতাকা টাঙাতে গিয়ে ব্রাজিল সমর্থকের মৃত্যু সিংড়ায় তিন কুকুর টেনে তুলল মায়ের বস্তাবন্দি মরদেহ! কোথায় আমাদের সতর্ক থাকা উচিত? ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়, জামায়াত ইসলামও ইসলাম নয় শাহরাস্তিতে সরকারি গাছ কাটার ঘটনায় বিএনপি নেতার সাফাই নারায়ণগঞ্জে ময়লার গাড়িরচাপায় ছাত্রদল নেতাসহ নিহত ২ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারে ৫০ বিলিয়ন ইয়েন ঋণ সহায়তা দেবে জাপান ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে বৈশ্বিক যোগসূত্র স্থাপন করতে চায় বাংলাদেশ’ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয় পদ্মা সেতুতে সৌরবিদ্যুতের ইতিবাচক প্রভাব, এক মাসেই সাড়ে ৪ লাখ টাকা সাশ্রয় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে বয়স বৃদ্ধি ও বেসরকারি চিকিৎসকদের বেতন কাঠামোর সুপারিশ হেডফোন লাগিয়ে হাঁটার সময় ট্রেনের ধাক্কায় কিশোর নিহত গাজীপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে গ্রেপ্তার সিলেটে স্কুলছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু, মরদেহর ময়নাতদন্ত না করতে চিরকুট! রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত? ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ পাকিস্তানে টিটিপি’র হামলায় ৬ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য নিহত চমেক হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট, শৃঙ্খলা ফেরাতে ৬ নির্দেশনা জাতীয় পরিবেশ পদক পেলেন ঢাবি উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সালাম চীনের পরিবেশবান্ধব গাড়ি রপ্তানি দ্বিগুণ বেড়েছে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে ১৪৯৬ কোটি টাকা জরিমানা: অর্থমন্ত্রী
Nagad desktop

মিলেমিশে পাহাড় সাবাড়

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫, ০১:২৮ পিএম
আপডেট: ২৭ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৫৫ পিএম
মিলেমিশে পাহাড় সাবাড়
ছবি: মোহাম্মদ হানিফ, খবরের কাগজ

ব্যাপকহারে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর চট্টগ্রামে যে কয়টি পাহাড় এখনো টিকে আছে সেগুলো অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোনোটার চারপাশ ৯০ ডিগ্রি খাড়াভাবে কাটা হয়েছে। কোনোটার ওপর থেকে কাটা হয়েছে। এভাবে পাহাড় কাটায় ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে চট্টগ্রামের পরিবেশের ভারসাম্য। ভেঙে পড়ছে বাস্তুসংস্থান। তবে এই কাজটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একা করছে না। সম্মিলিতভাবে কাটা হচ্ছে পাহাড়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভূমিদস্যু, মাটিখেকো, শিল্পগ্রুপ এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাহাড় কাটায় ভূমিকা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এসব সংস্থা কোথাও কোথাও নিজেরাই পাহাড় কেটেছে। অর্থাৎ রক্ষক হয়েছে ভক্ষক। 

ডিসির পাহাড় যেন লুটের মাল
চট্টগ্রামের শহরতলি জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলায় পড়লেও তা শহরসংলগ্ন। অপরদিকে আলীনগরের কিছু অংশ শহরের মৌজায় পড়েছে। বিস্তীর্ণ এই এলাকা দুটি পাহাড়ি এলাকা। এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় এসব পাহাড়ের মালিক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। বর্তমানে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে এই দুটি এলাকায়। 

সলিমপুরে ছিন্নমূল আবাসনে অন্তত দেড় হাজার পরিবার বসবাস করে। তবে সেখানে দখলকারীর সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি। দখলকারীরা চট্টগ্রাম শহর এবং আশপাশে নানা পেশায় যুক্ত। তারা শহরে এবং আশপাশের এলাকায় থাকেন। তবে তারা দখলীয় প্লট কিনে এক একটি পরিবারকে পাহারাদার হিসেবে বসিয়েছেন। আবার কিছু ভাড়াটিয়াও আছে। একইভাবে আলীনগরেও হাজারখানেক ব্যক্তি সেখানে দখলস্বত্ব কিনে নিয়ে কাঁচা বসতঘর নির্মাণ করেছেন। তারা ছুটির দিনে গিয়ে সেখান থেকে শাক-সবজি নিয়ে আসেন। 

খোঁজ নিয়ে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এবং আলীনগরে প্রশাসন যতবার অভিযান চালাতে গিয়েছে ততবারই হামলার শিকার হয়েছে। এ যেন এক আলাদা রাজ্য। যেখানে পাহাড়খেকোদের রাজত্ব চলে। এই এলাকায় কোনো আগন্তুক প্রবেশ করতে পারেন না। প্রবেশপথেই আটকে দেওয়া হয়। সব শেষ গত বছরের ২৮ জানুয়ারি হামলার শিকার হন অভিযান চালাতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ। সেদিন সহকারী কমিশনার (কাট্টলী) মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদ, সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হন। অভিযানে দুই শতাধিক পুলিশ ও আনসার সদস্য নিয়েও হামলার শিকার হওয়ার পর সেখানে আর অভিযান চালানো হয়নি। তারও আগে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অভিযান চালাতে গিয়ে আহত হন সীতাকুণ্ড উপজেলার ইউএনও, ওসিসহ অন্তত ১০ জন। 

আলীনগরে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রবেশ করা যায় না। প্রবেশ করতে হলে যার কাছে যাবেন তাকে গেটে ঢেকে এনে কথা বলার পর তার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়। বিশাল এই পাহাড়ি এলাকায় দিনরাত চলছে পাহাড় কাটা। এখানে এক্সক্যাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে আশপাশে মাটি বিক্রি করা হয়। প্লট তৈরি করে দখলস্বত্ব বিক্রি করে। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অনিবন্ধিত দলিলমূলে পাহাড়গুলো কেটে প্লট হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। একেকটি প্লট আড়াই, তিন, পাঁচ কাঠাসহ বিভিন্ন আয়তনের। একেকটি প্লটের দাম পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় এই এলাকায় রাজত্ব করতেন বনপ্রহরী আক্কাস। তাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়। তারপরে আসেন রোকন উদ্দিন। তিনি বর্তমানে পলাতক। তারপরে আসেন শহীদুল ইসলাম। এখন রাজত্ব করছেন বিএনপিপন্থি ইয়াসিন। তাকে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় যুবদল নেতা রোকন। রোকন বিএনপির সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতার ঘনিষ্ঠ। 

রক্ষক যখন ভক্ষক
সম্প্রতি নগরীর জালালাবাদ এলাকায় বিএস ৭০৫ নম্বর দাগে পাহাড় কাটে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এনিয়ে সমালোচনা হলে চলতি বছরের ২০ মে পরিবেশ অধিদপ্তর নোটিশ দিয়ে সেই কাজ বন্ধ করে। ওই এলাকায় পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন। তার আবাসিকে যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণ করতেই সিটি করপোরেশন পাহাড় কাটে। একইভাবে সিটি করপোরেশনের লেকসিটি হাউজিং সোসাইটি গড়ে উঠেছে পাহাড় কেটে। পাহাড় কাটায় সিডিএও পিছিয়ে নেই। বায়েজিদ হতে ফৌজদারহাট পর্যন্ত লুপ রোড নির্মাণ করতে গিয়ে ১৮টি পাহাড় কাটে সিডিএ। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সিডিএকে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করে। পাহাড় কাটায় পিছিয়ে নেই পরিবেশ অধিদপ্তরও। বর্তমানে চট্টগ্রামে পরিবেশ অধিদপ্তরের যে অফিস রয়েছে সেটিও নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড় কেটে। রেলওয়ে, গৃহায়ণ গণপূর্তসহ সব সরকারি সংস্থার কোদালের কোপ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাহাড়ের ওপর পড়েছে। পাহাড় কেটেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও। ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য চমেক হাসপাতালসংলগ্ন গোয়াছিবাগানের পাহাড় কাটা হয়। 

পাহাড়ে বিদ্যুৎ বন্ধ করেনি পিডিবি 
চট্টগ্রামে বাসা-বাড়িতে কেউ বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে চাইলে তাকে জমির খতিয়ান, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অনেক কিছু জমা দিতে হয়, অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়। পাহাড়ে যারা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিচ্ছেন তারা এসব না দিয়েও পাচ্ছেন। দিলেও জাল কাগজপত্র দিচ্ছেন। এক ঠিকানায় আবেদন করে আরেক ঠিকানায় বিদ্যুৎ নিচ্ছেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব সংযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বৈধ মিটার থেকে সাব মিটারের মাধ্যমে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের সংযোগ দেওয়া হয়। 

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পিডিবির প্রতিনিধি অজুহাত দেখান যে, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে তাদের ওপর হামলা হয়। বাস্তবতা হলো অফিসে বসেও বিদ্যুৎ মিটার লক করার সুযোগ আছে। কিন্তু পিডিবির লোকজন সেই কাজটি করেন না। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এবং রাজনৈতিক লোকজন মিলেমিশে কাজটি করছেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রূপসী পাহাড় ও এর আশপাশের পাহাড়ে বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ রয়েছে। নাগিন পাহাড়, লালখান বাজার, আকবরশাহ এলাকার গ্যাসলাইন পাহাড়, গোলপাহাড়, বেলতলী ঘোনা, গাউছিয়া লেক সিটি, এক, দুই ও তিন নম্বর ঝিল, জিয়ানগর, বিজয়নগর, জসিম মার্কেটসংলগ্ন পাহাড়, সুপারি বাগান, সুপারি বাগান গ্যাস লাইন, সলিমপুর গ্যাসলাইন, কালীরছড়া দখল করে গড়ে তোলা বাড়িতেও বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ব কলোনি থানার পাশে কবরস্থানসংলগ্ন পাহাড়, মিরপুর শাপলা আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ রয়েছে। এসব পাহাড়ের বেশির ভাগ সরকারি। বায়েজিদ চৌধুরী নগর, জালালাবাদ এলাকা, বায়েজিদ লিংক রোডের আশপাশসহ অনেক সরকারি পাহাড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। 

পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মিনি ওয়াসা
চট্টগ্রামে নলকূপ বসাতে হলে ওয়াসা থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু সেখানকার প্রতিটি পাহাড়ের ওপরে কিংবা নিচে যে-যার সুবিধামতো জায়গায় অবৈধভাবে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানির ব্যবসা করছে। 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আকবরশাহ ১৫৩, ১৬১ ও ১৪৪ নম্বর দাগের সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়ে দুটি গভীর নলকূপ রয়েছে। জাহাঙ্গীরের ঘোনায় বসানো হয়েছে দুটি গভীর নলকূপ, যেখান থেকে পাশাপাশের ৮টি পাহাড় ও সমতল এলাকার দুই হাজারের বেশি পরিবারের কাছে এবং শতাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পানি বিক্রি করা হয়। এক একটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক বিল নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। এখানে যে মোটর ও বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহার করা হয় তার কোনোটিরই অনুমোদন নেই। নলকূপ দুটি পরিচালনা করেন ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক (সম্প্রতি তার পদ স্থগিত করা হয়) মোহাম্মদ রাসেল। টাকার মালা গলায় দিয়ে আনন্দ মিছিল করায় দল তার পদটি স্থগিত করে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

মসজিদের নামে পানি ও বিদ্যুৎ-বাণিজ্য
চসিকের লেকসিটি হাউজিংয়ের পাশে পাহাড়ের পাদদেশে একটি জামে মসজিদ রয়েছে। ওই মসজিদ থেকে বিজয়নগর ও জিয়ানগরের পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করেন মসজিদ নিয়ন্ত্রণকারীরা। এই মসজিদ থেকে টাকার বিনিময়ে কয়েকটি পাহাড়ের ছয় শতাধিক পরিবারকে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শুধু পানি থেকে প্রতি মাসে দুই লক্ষাধিক টাকা আয় করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা রেহান উদ্দিন প্রধান ও যুবদলের ইলিয়াস। মসজিদটি আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম। বর্তমানে তিনি জেলে আছেন। 
তিন নম্বর ঝিলেও একটি গভীর নলকূপ রয়েছে মসজিদের নাম দিয়ে। ওই নলকূপ থেকে ২৫০ পরিবার পানি পায়। প্রতি পরিবার থেকে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পানির বিল তোলা হয়। 

মসজিদের অন্য একটি মিটার থেকে প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফ্যান ও বাতি জ্বালানোর জন্য প্রতি ইউনিট ১৭ থেকে ১৮ টাকা করে আদায় করা হয়। যে পরিমাণ গ্রাহক মসজিদের নলকূপ থেকে পানি কিনেন, একই পরিমাণ গ্রাহক বিদ্যুৎও কিনেন।

জানতে চাইলে বিএনপি নেতা রেহান উদ্দিন প্রধান খবরের কাগজকে বলেন, তারা মসজিদের জমিতে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি সরবরাহ করলেও এর থেকে মসজিদ কিংবা তারা কেউই লাভবান হচ্ছেন না। যারা পানি পাচ্ছেন মাস শেষে তাদের কাছ থেকে শুধু বিদ্যুৎ বিল আদায় করা হয়। নলকূপটি ওয়াসার অনুমোদন করা কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ওয়াসা থেকে অনুমোদন নেননি।

এক নম্বর ঝিলে বেসরকারি সংস্থা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করে দেয় ৯০টি পরিবারের জন্য। কিন্তু সেটি ব্যবহার করে হাজারও পরিবার। ডিএসকে নলকূপটি দিয়েছিল শুধু বিদ্যুৎ খরচ দিয়ে বসবাসকারীদের পানি ব্যবহারের জন্য। কিন্তু স্থানীয় আনোয়ারসহ কয়েকজন মিলে এর পানি বিক্রি করেন। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত মতে, সম্প্রতি নলকূপটি বন্ধ করা হলেও সপ্তাহখানেক পর সেটি আবার সচল হয়।

এক নম্বর ঝিলে ৬০ পরিবারের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি সংযোগ রয়েছে, যা সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার ব্যবহার করছে। ৬০ পরিবারের টাকা ওয়াসায় গেলেও বাকি টাকা স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ারসহ কয়েকজন ভাগাভাগি করেন। এখানে ওয়াসার কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীও ভাগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে সুপারি বাগান গ্যাস লাইন এলাকায় সাত শতাধিক পরিবারের কাছে পানি বিক্রি করেন স্থানীয় প্রভাবশালী শুক্কুর আলী। 

লালখান বাজারের পাহাড়ে অবৈধ গভীর নলকূপ আছে প্রায় এক ডজন। চট্টগ্রাম ওয়াসাও এই এলাকার কিছু অংশে পানি সরবরাহ করে। 
অপরদিকে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি রয়েছে, সেসব এলাকার মধ্যে অনেক বাড়িতে গ্যাস সংযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এসবের মধ্যে বেশির ভাগই অবৈধ। এভাবে প্রতিটি পাহাড়ে অবৈধভাবে ইউটিলিটি সেবা পাওয়ায় মানুষ সেখানে বসবাস করছেন।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান খবরের কাগজকে বলেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি পিডিবি চট্টগ্রাম এবং কর্ণফুলী গ্যাসকে নির্দেশ দেবেন। পাহাড়ের অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পাহাড়ে বসবাসকারীরা আসলে কারা?
চট্টগ্রামে পাহাড়ের মূল দখলদারের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। কিন্তু এসব পাহাড়ে হাজার হাজার পরিবার বসবাস করে। এদের কেউ ভাড়ায় থাকেন অথবা পাহারাদার হিসেবে থাকেন। তারা এখানে পানি ও বিদ্যুৎ না পেলে ভাড়া নিয়ে অন্যত্র চলে যাবেন। 

এক নম্বর ঝিলে চার হাজার পরিবার, দুই নম্বর ঝিলে এক হাজার, বিজয়নগর ও জিয়ানগরে প্রায় ৬০০, গ্যাস লাইন পাহাড় ৮৮, রূপসী পাহাড়ের দুই পাশে প্রায় ২০০ পরিবার, লালখান বাজারের পাহাড়ে প্রায় ৮ হাজার পরিবার, ষোলশহর বন বিভাগের পাহাড়ে ৪৫০ পরিবার, বেলতলী ঘোনার গোলপাহাড়ে ৪৫০ পরিবার, জালালাবাদ এলাকার সাতটি পাহাড়ে দেড় শতাধিক পরিবার বসবাস করছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

পাহাড় কাটার অভিনব কৌশল
মিরপুর শাপলা এলাকায় প্রায় দেড় হাজার ঘর দেখা গেছে। যার অধিকাংশ খালি। মূলত পাহাড় কাটার জন্যই ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে লোক নিয়োগ দেওয়া হয় পাহাড় কাটতে। অনেক সময় তারা ঘরের ভেতর থেকে কাটতে শুরু করেন। কখনো ঘরকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাহাড় কাটেন। যাতে দূর থেকে কেউ দেখতে না পান। 

আরেকটি কৌশলও পাহাড়খেকোদের অবলম্বন করতে দেখা গেছে, যে পাহাড়টি কাটা হবে প্রথমে সেটি উঁচু বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। যাতে ভেতরে কী চলছে, বাইরে থেকে কেউ যেন বুঝতে না পারেন। এভাবে বেশ কিছুদিন রেখে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে কাটা শুরু করে। কয়েকটি উপায়ে তারা কাজটি করেন।

সবজি চাষ পাহাড় কাটার নতুন কৌশল
রূপসী পাহাড়ের চারপাশে চাষ করা হয়েছে নানাজাতের শাক-সবজি। দিনের বেলায় শাকসবজির জমিতে পাইপ দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ কিংবা প্রশাসনের ধারণা জন্মে কৃষক হয়তো শাক চাষের জন্য সেচ দিচ্ছেন। বাস্তবতা হলো তারা পানি দিয়ে পাহাড়ের মাটি নরম করেন। রাতের বেলা অল্প করে কাটেন। কয়েক দিন পর আবার নতুন করে শাক-সবজি চাষের প্রক্রিয়া শুরু করেন। এভাবে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করা হয় পাহাড়। 

ব্যবহার হয় ড্রেজার মেশিনও
প্রথমে পাহাড়ের ওপর গর্ত করা হয়। লম্বা পাইপের মাধ্যমে সেই গর্তে পানি ফেলা হয়। গর্তের ভেতর পানি জমা করে ওই গর্তে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে পাহাড়ের মাটি পাইপ দিয়ে নিচে নামিয়ে আনা হয়। চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড় যেহেতু বালুর পাহাড় তাই পাহাড়খেকোরা সহজেই কাজটি করতে পারেন। 
 
পরিবেশের শর্ত দিয়ে দায় এড়ায় সিডিএ
ভবনের নকশা অনুমোদনের আগে ভূমির মালিককে সিডিএ থেকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র (এলইউসি) নিতে হয়। ওই ভূমির শ্রেণি যদি পাহাড়, টিলা, জলাশয় হয় তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত দিয়ে এলইউসি দেয় সিডিএ। ভূমির মালিক পরিবেশ ছাড়পত্র না নিয়েই সিডিএর ইমারত নির্মাণ কমিটির কাছে ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন। ইমারত নির্মাণ কমিটি ছাড়পত্র ছাড়াই নকশা অনুমোদন করে দেয়। পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তটি কাগজেই থেকে যায়। বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ হয় না।

৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে পাহাড় মালিক
নগরের রূপসী পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ১২টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এই পাহাড়ের জমির ক্রেতারা মাত্র ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে আনরেজিস্ট্রার্ড চুক্তিমূলে পাহাড় কিনে তা কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা ও পরিদর্শকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ওই এলাকায় সিডিএর লোকজন কখনো যায়নি। এমনকি তারা এসব ভবনের বিষয়ে তথ্য নিতেও তেমন আগ্রহী নন। একইভাবে আকবরশাহ থানাধীন উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের উত্তর লেকসিটি চারটি ভবন, হারবাতলীতে সাতটি, মিতালী হাউজিংয়ে অন্তত ৬টি, গাউছিয়া লেকসিটিতে চারটি, বায়েজিদ থানাধীন নাগিন পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে অন্তত চারটি ভবন। দি নাগরিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটিতে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ১০ থেকে ১৫ তলা পর্যন্ত ভবন। এই পাহাড়ে ভবন নির্মাণের জন্য সিডিএ অনুমোদন দিয়েছে পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে। কিন্তু কেউ তা নেয়নি। 

সিডিএ চেয়ারম্যানের বক্তব্য 
সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, পাহাড় কাটায় বড় বড় মাফিয়া জড়িত। পাহাড় রক্ষার নেতৃত্ব দিয়ে থাকে পরিবেশ অধিদপ্তর। সিডিএ তথ্য দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে সহযোগিতা করে। তবে ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় যদি কোনো আবেদনকারীর জমি পাহাড়ে পড়ে তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত দিয়ে থাকি, যা কেউ মানতে চায় না। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েই সিডিএতে এলইউসির জন্য আবেদনের বাধ্যবাধকতা থাকত, তাহলে পাহাড় রক্ষা করা আরেকটু সহজ হতো। 

তিনি বলেন, দেশে পর্যটন পুলিশ আছে। পাহাড়সহ পরিবেশের অনুষঙ্গগুলো রক্ষায় পরিবেশ পুলিশ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। বায়েজিদ লুপ রোডে সিডিএর পাহাড় কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সেখানে পাহাড় কাটা হয়েছে। এখন সিডিএর নিজস্ব অর্থায়নে সেসব পাহাড় সুরক্ষায় প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। 

ছলিমপুর আলীনগর এলাকায় ব্যাপকহারে পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, পাহাড়গুলোর মালিক জেলা প্রশাসন। শহরের মধ্যে অবস্থিত সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ বন্ধে সিডিএর ভূমিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য পেলে তারা ব্যবস্থা নেন।

চসিকের বক্তব্য
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার অভাবে চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলো অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করতে হবে। চট্টগ্রামে যে হারে জমির দাম বাড়ছে, মামলা দিয়েও পাহাড়মালিকদের পাহাড় কাটা থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। এ কথা সত্য চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়ের চেয়ে সরকারি পাহাড় বেশি। বেশির ভাগ এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। আর কিছু পাহাড়ের মালিক বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। পাহাড়গুলোকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে বনায়ন করা যায়। নতুবা পর্যটন স্পট কিংবা পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা যায়। সবচেয়ে জরুরি হলো- নিম্ন আয়ের মানুষের শহরে আসা বন্ধ করতে- গ্রামে কর্মসংস্থান এবং সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা জরুরি।

পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির বক্তব্য
চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, বাস্তবে পাহাড় থাকলেও রেকর্ডিয় শ্রেণি নাল, ছনখোলা, আবাসিক, ভিটি বা অন্যকিছু থাকলেও তা পাহাড় হিসেবে গণ্য হবে। সিডিএ ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে এসব যাচাই করে অনুমোদন দেবে। এ বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাহাড়ে অবৈধ নলকূপ বসিয়ে পানি ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্নকরণের বিষয়ে আগে থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া আছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়ে খুব শিগগিরই একটি মিটিং করা হবে।

ছলিমপুর এবং আলীনগর এলাকায় বেপরোয়াভাবে পাহাড় কাটা প্রসঙ্গে বলেন, বিষয়টি তিনি জেলা প্রশাসনকে বলে দেবেন। আর কাউকে পাহাড় কাটার সুযোগ দেওয়া হবে না।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের মোবাইলে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ছলিমপুর এবং আলীনগরে বেপরোয়াভাবে পাহাড় কাটার বিষয়টি তারা জানতেন না। সেখানে পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হবে। 

চট্টগ্রাম ওয়াসার বক্তব্য
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা তাকে তথ্য জানালে তিনি তা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানান। ম্যাজিস্ট্রেট তখন অভিযান চালান। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মিনি ওয়াসার বিরুদ্ধে অভিযান না চালানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঠকর্মীরা এই তথ্য তাকে দেননি। তবে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাহাড়ে পানির সংযোগ না দেওয়া এবং অবৈধ নলকূপ ও সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিষয়টি তিনি অবগত বলে জানান। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের (মহানগর) পরিচালক সোনিয়া সুলতানা খবরের কাগজকে বলেন, যখনই পাহাড় কাটার খবর পাচ্ছি ছুটে গিয়ে বন্ধ করছি। চট্টগ্রামকে ৫টি জোনে ভাগ করে পাহাড় কাটা বন্ধে কাজ চলছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে কেউ পাহাড় কাটছে না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু পাহাড় কাটার চেষ্টা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ে যাদের জমি আছে তাদের অন্যত্র স্থানান্তর করা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে পুলিশ নেই। যারা পাহাড় কাটে তাদের কাছে পুলিশ ছাড়া যাওয়া কঠিন। রেলওয়ে, বন বিভাগের অনেক পাহাড় আছে। সেসব প্রতিষ্ঠান তাদের পাহাড়গুলো অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে পারছে না। সেসব পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীরাও পাহাড় কাটেন। এখানে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। জমির মালিক মামলার ভয়কে উপেক্ষা করে পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণ করছেন। পাহাড়ে কোনো ধরনের সেবা না দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি সেটা অনুসরণ করছে না। যে কারণে পাহাড় কাটা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যেসব পাহাড় অবশিষ্ট আছে, তা বন বিভাগের মাধ্যমে বনায়ন করে সংরক্ষিত বন এলাকা ঘোষণা করা যেতে পারে। অথবা যে সংস্থা পাহাড়ের মালিক তারা পাহাড়কে অক্ষত রেখে পার্ক বা পর্যটন স্থান করতে পারে। কিন্তু কেউ তো কোনো ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের একার পক্ষে পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব না।

বিশিষ্ট নগরবিদ ও সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামের সব পাহাড়ের মালিক আছে। সরকারি সংস্থাগুলোর পাহাড় দেখভাল করার জন্য তাদের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ আছে। জেলা প্রশাসনের পাহাড়গুলো তারা নিজেরাই দেখভাল করে। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলোর মালিক তো রয়েছেই। পাহাড়ের শহর চট্টগ্রামে এখন পাহাড় নেই বললেই চলে। পাহাড়গুলো কখন কাটা হয়, তা প্রশাসন দেখে না। কারণ তাদের চোখে টাকার পট্টি লাগানো থাকে। যে সংস্থার পাহাড় কাটা হয় সেই সংস্থা্র দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে মামলা করে গ্রেপ্তার করতে হবে। এমনকি জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন পাহাড় কাটা হলে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এভাবে কাজ না করলে যেটুকু পাহাড় অবশিষ্ট আছে তাও রক্ষা করা যাবে না। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সেবা সংস্থাগুলোর সেবা কীভাবে পৌঁছে যাচ্ছে? যারা এসব সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সিলেটে পাথর লুটের পর তা ফিরিয়ে আনার অন্তত চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু একটি পাহাড় একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের পরিবেশকর্মী মো. শফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে বলেন, পরিবেশ আইনের প্রয়োগ সব সংস্থার হাতে ন্যস্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা থাকলে আরও সুফল মিলত। তা ছাড়া পাহাড়-টিলা-জলাশয় শ্রেণির ভূমিতে ইমারত নির্মাণের অনুমোদন না দেওয়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ভূমি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া, সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়, টিলা, জলাশয় দখলমুক্ত করে সরকারিভাবে ব্যবহারের আওতায় আনতে হবে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের কারণে হওয়া মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। রেলওয়ে, গৃহায়ণ, বন বিভাগ, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভূমি নিয়ে মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি শাখাকে কার্যকর করলে সুফল মিলত। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের কেউ বা পরিবারের সদস্যরা যেন উত্তরাধিকার সূত্র ছাড়া চাকরিকালীন বা অবসরের পরও পাহাড়-টিলা-জলাশয় শ্রেণির ভূমি মালিকানায় আসতে না পারে, সে শর্ত চাকরি বিধিমালায় প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সিডিএ, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ, ওয়াসাসহ পাহাড় সুরক্ষায় যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পাহাড় কাটা প্রতিরোধ করতে গিয়ে পরিবেশখেকোদের দ্বারা প্রভাবিত হন ও অনৈতিক সুবিধা নেন। এটি চরম অপরাধ। এতে করে পাহাড় সাবাড় ত্বরান্বিত হয়।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না, যা অন্যগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভব। সম্প্রতি আমরা দেশের সব পাহাড়-টিলার দাগ-খতিয়ান অনলাইনে এনেছি। পাহাড় রক্ষায় দেশের বিভিন্ন জেলায় মিটিং করেছি। পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া আছে। তার পরও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি পাহাড় রক্ষা করতে না পারে, তাহলে স্থানীয় কমিউনিটিকে তারা সম্পৃক্ত করতে পারে। এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠন করে দিলে স্থানীয় লোকজন তখন প্রশাসনকে খবর দিতে পারবে। দ্রুত খবর পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। তিনি বলেন, পরিবেশ আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি এই আইন প্রয়োগ সব দপ্তর-বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে আনতে। এতে সমন্বয়হীনতা কমবে এবং যখন যে দপ্তরের কাছে তথ্য আসবে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাহাড়গুলোকে একটি সমন্বিত বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা এবং সুরক্ষিত করার ব্যাপারে নির্দেশনা জারি আছে। প্রশাসনের মধ্যে যদি পাহাড় ধ্বংসের হোতা বা সহযোগী থাকে তারও একজন সাধারণ মানুষের মতোই আইনের আওতায় আসার কথা। সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে এই বিষয়ে কাজ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিভাগীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ভূমি সার্কেলভিত্তিক পাহাড় সুরক্ষায় জোন কমিটি করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বিত এই জোন কমিটির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যেন পাহাড় কর্তন রোধসহ স্থায়ীভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেই লক্ষ্যেই কমিটিগুলো করা হয়েছে। আশা করছি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড়গুলো সুরক্ষিত থাকবে।

নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:২১ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ এএম
নোংরা পানিতে সয়লাব খুলনার প্রবেশদ্বার
খুলনা

সীমানা জটিলতা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় খুলনার প্রবেশদ্বার গল্লামারী বাজারসংলগ্ন সড়কে বর্জ্য ও নোংরা পানিতে নিয়মিত ভোগান্তির সৃষ্টি হয়। গল্লামারী কাঁচাবাজার ও মাছ বাজারের দুটি ড্রেন থেকে নোংরা পানি সরাসরি সড়কের ওপর চলে আসে। সেই পানি যানবাহনের চাকা ও মানুষের পায়ের চাপে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

এ ছাড়া গল্লামারী মোড়ে বাজারের ময়লা স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী বাসিন্দা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা আশপাশের নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে না ফেলে প্রতিদিন এখানে ফেলা হয়। ফলে তীব্র দুর্গন্ধে স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী ও খুলনা বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।

জানা যায়, গল্লামারী বাজারের ময়লা-আবর্জনা মূলত ময়ূর নদীর পশ্চিম পাড়ে ফেলা হয়। এই এলাকাটি বটিয়াঘাটা উপজেলার জলমা ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সিটি করপোরেশন সেখানে বর্জ্য অপসারণ করে না। অন্যদিকে বটিয়াঘাটা উপজেলা প্রশাসনও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় আবর্জনা ও ময়লা জমে পানি আটকে থাকছে। বাজারসংলগ্ন ব্রিজের নির্মাণকাজের ধীরগতির কারণে সড়কের ওপর নোংরা ও পচা পানি জমে থাকছে। দুর্গন্ধে পথচারীরা নাক চেপে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘস্থায়ী এই নোংরা পরিবেশের কারণে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 গতকাল সোমবার (৮ জুন) খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বাজারসংলগ্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এখানে সিটি করপোরেশন, সড়ক বিভাগ, বাজার কর্মকর্তাদের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা করেন। সড়ক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নির্মণাধীন গল্লামারী ব্রিজসংলগ্ন ড্রেনের জন্য ৩ কোটি টাকা বাজেট রয়েছে। সীমানা জটিলতা দূর হলে এই টাকা দিয়ে বাজারের নোংরা পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন করা সম্ভব।

জানা যায়, গল্লামারী বাজার হয়ে খুলনা-সাতক্ষীরা ও বটিয়াঘাটা-দাকোপ রুটের যানবাহন যাতায়াত করায় প্রতিদিন হাজারও মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হন। বাজারের নোংরা পানির কারণে ক্রেতারা আসতে চান না, ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ইজিবাইকচালক ও পথচারীদের অভিযোগ, খুলনা সিটি করপোরেশনসহ প্রশাসনের কাছে বিষয়টি জানিয়েও কোনো কাজ হয়নি।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসিন্দা তাহেরা সিদ্দিকী বলেন, ‘সকাল-বিকেল আমাদের গল্লামারীতে বিভিন্ন কাজে যাওয়া লাগে। প্রতিদিন এই দুর্গন্ধ সহ্য করা অত্যন্ত কষ্টকর। রাস্তা পার হতে গেলে এই দুর্গন্ধযুক্ত পানির ওপর দিয়ে যেতে হয়'।

স্থানীয়রা জানান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সব সময় যানজট লেগে থাকে। গল্লামারী ব্রিজ পার হতে অন্তত ৩০ মিনিট সময় লাগে। ওই সময় দুর্গন্ধের মধ্যে বসে থাকা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এই ময়লা-দুর্গন্ধের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে অনেকবার লেখালেখি করেছে। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি'।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘গল্লামারীর বাজারসংলগ্ন এলাকার বর্জ্য দূষণ ও অপসারণের লক্ষ্যে ইতোপূর্বে আমাদের তরফ থেকে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জায়গাটি সিটি করপোরেশনের বাইরে, বিধায় ময়লা অপসারণের জটিলতা থেকেই গেছে'।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গন্ধ, ময়লা পানি পিচ্ছিল রাস্তার কারণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের চলাচলে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় বায়ু, পানি ও মাটিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে; যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘সব পক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। আপাতত বাজারের পানি নিষ্কাশনের জন্য সড়ক বিভাগ একটি কাঁচা ড্রেন করে দেবে। যেন নোংরা পানি রাস্তায় আসতে না পারে। পরবর্তী সময়ে সেখানে পাকা ড্রেন করা হবে'।
 
সড়ক ও জনপথ বিভাগ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী তানিমুল হক বলেন, ‘ব্রিজসংলগ্ন ড্রেন করার জন্য ৩ কোটি টাকার বাজেট রয়েছে। সে অনুযায়ী ডিজাইন করা হবে। কিন্তু ড্রেন করতে গেলে বাজারের কিছু জমি ছাড়তে হবে। কিন্তু তারা রাজি হচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে সড়ক বিভাগ নিজেদের জমি কিছুটা হলেও ছেড়ে দেবে। সেই সঙ্গে বাজার সমিতিকে মাটি কেটে রাখার জন্য হলেও কিছুটা জমি ছাড়তে হবে। সীমানা জটিলতা দূর হলে দু-এক দিনের মধ্যেই সেখানে ড্রেন খননের কাজ শুরু করা যাবে'।

এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায় সরকার, সোচ্চার শ্রমিক-কর্মচারীরা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:০৩ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:১০ এএম
এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চায় সরকার, সোচ্চার শ্রমিক-কর্মচারীরা
ছবি:খবরের কাগজ

চট্টগ্রাম বন্দরের ‍নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার কাজ দিতে দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ড এফজেডইর সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিতে চায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। তাই এনসিটি পরিচালনায় ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) নিয়োগের লক্ষ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা এগিয়ে নিতে মন্ত্রণালয়ের এক দাপ্তরিক চিঠিতেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এদিকে বিষয়টি সামনে আসতেই আবারও সোচ্চার হয়েছেন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা। তাদের অবস্থান আগের মতোই অপরিবর্তিত।

গত ৪ জুন এই বিষয়ে দুটি দাপ্তরিক চিঠি ইস্যু করে মন্ত্রণালয়। প্রথম চিঠিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখার সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত লেখা চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে চলমান নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অথবা নেগোসিয়েশন এগিয়ে নিতে ইচ্ছুক না হলে সে ক্ষেত্রে এ প্রক্রিয়া বাতিল করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

সেদিন প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে পর্যালোচনা করতে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভা শেষে মন্ত্রণালয়ের একই কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত আরেকটি চিঠি ইস্যু হয়। ওই চিঠিতে বন্দর চেয়ারম্যানের উদ্দেশে বলা হয়, পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যালোচনার লক্ষ্যে নৌপরিবহনমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ৪ জুনের সভায় আলোচনা মোতাবেক ওই প্রকল্পের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লক্ষ্যে নেগোসিয়েশন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এনসিটি নিয়ে একই দিন মন্ত্রণালয়ের দুই ধরনের চিঠি ইস্যু হওয়ার বিষয়টিকে ভালোভাবে নিচ্ছেন না বন্দরের শ্রমিকনেতা ও কর্মচারীরা। মন্ত্রণালয়ের এমন কাজে তাদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করেছে বলে জানান তারা। তাদের দাবি, তারা বিদেশি বিনিয়োগের বিরুদ্ধে নন। বে-টার্মিনালের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে দেওয়ার উদ্যোগে কোনো শ্রমিকনেতা ও কর্মচারী আপত্তি জানাননি। পাশাপাশি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে দেওয়ার সময়ও কেউ বাধা দেননি। কিন্তু এনসিটি যন্ত্রপাতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ। টার্মিনালটির অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল ও লাভজনক। এই টার্মিনালের সেবার মান নিয়ে বন্দরের কোনো স্টেকহোল্ডার কখনো কোনো অভিযোগ দেননি। তাহলে একটি পূর্ণাঙ্গ, সুসজ্জিত ও লাভজনক টার্মিনাল কেন বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিতে হবে?

বন্দর কর্তৃপক্ষও বলছে, এনসিটি গতিশীল

গত বছরের ৭ জুলাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনালের অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। গত ২ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিডিডিএলের সদস্যরা যথাযথ দায়িত্ব পালন করায় কনটেইনার খালাস ও লোডিং প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি গতিশীল হয়েছে। এনসিটিতে মে মাসে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের মাইলফলক সৃষ্টি হয়েছে। মাসটিতে ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউএস কনটেইনার (আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ছিল ৫৯ হাজার ৮৫১ টিইইউস ও রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার ছিল ৬৬ হাজার ৬৪৫ টিইইউস) হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।

এর আগে এনসিটির ইতিহাসে একক মাসে সর্বোচ্চ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড হয়েছিল গত বছরের অক্টোবর মাসে। সে সময় এনসিটিতে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৩৩ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। তবে গত মে মাসে আরও বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হওয়ায় আগের রেকর্ডটি ভেঙে গেল। তবে এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মকর্তারা কথা বলতে রাজি হননি। কয়েকজন অর্থনীতিবিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। 

ইজারা প্রক্রিয়া নিয়ে শ্রমিকনেতাদের প্রতিক্রিয়া

শ্রমিকনেতারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরের এনসিটির পাশাপাশি সিসিটি টার্মিনাল পরিচালনার আগ্রহ দেখায়। সে সময় চলমান প্রক্রিয়ায় সিসিটির বিষয়টি না থাকায় বিষয়টি নিয়ে আর এগোতে চাননি বন্দর কর্মকর্তারা। শেষমেশ শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে এনসিটি চুক্তিও করতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। তবে বর্তমান সরকার যদি আবারও এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে হাঁটে, তবে সেটি কোনোভাবে মেনে নেওয়া হবে না। তারা বলছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা না দিয়ে সরকার টিকতে পারছে না। ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দর দেওয়ার পর বাংলাদেশ কীভাবে টিকবে?

বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খোকন জানান, চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। কনসেশন চুক্তির আওতায় বন্দরের প্রধান টার্মিনাল এনসিটি ও সিসিটি বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়া হলে বন্দর ও দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বন্দর তার কর্তৃত্ব হারাবে। বিদেশি আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। এর মাধ্যমে ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হবে, যার ফলে দেশ চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। পিসিটি, এনসিটি, সিসিটি–সবই যদি বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় তাহলে যেকোনো সময় দেশি-বিদেশি যেকোনো ষড়যন্ত্রে দেশ কার্যত অচল হয়ে পড়বে।

তিনি বলেন, ‘বন্দর বিদেশিদের দেওয়ার চেষ্টা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সমাজ অর্থাৎ চট্টগ্রাম চেম্বার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএসহ কোনো স্টেকহোল্ডারকে এখনো বলতে শুনিনি যে চট্টগ্রাম বন্দর তাদের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের চাহিদা পূরণ করেই বীরদর্পে এগিয়ে যাচ্ছে। সড়কের যানজটের ব্যবস্থাপনাসহ কাস্টম ব্যবস্থাপনায় কোনোরূপ উন্নতি না করে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যেকোনো চুক্তি দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ বলে আমরা মনে করি।’ 

এনসিটি ঘিরে আগেও হয়েছে আন্দোলন, ধর্মঘট

গত ২৯ জানুয়ারি দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেদিন বেলা সাড়ে ১১টায় ওই রায়কে কেন্দ্র করে অফিস চলাকালীন চট্টগ্রাম বন্দরের কিছু কর্মচারী বন্দর ভবনে, ফয়ারে এবং বন্দর ভবন এলাকায় মিছিলে অংশ নেন। সেখানে নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহীম খোকন ও হুমায়ুন কবীর এবং বন্দর শ্রমিক দলের সদস্য আনোয়ারুল আজীম ও ফরিদুর রহমান। 

বন্দরের কোনো টার্মিনাল বিদেশিদের ইজারা না দিতে দফায় দফায় আন্দোলন চালিয়ে যায় চট্টগ্রাম সুরক্ষা কমিটি, চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, চট্টগ্রাম বন্দর ইসলামী শ্রমিক সংঘ, গণ-অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশে জুয়েলারি সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশপ্রেমিক জনগণ প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টিসহ (সিপিবি) বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সংগঠন।

এনসিটি বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা না দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি (৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি বাদে) পর্যন্ত সাত দিনের ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এই ধর্মঘটের কারণে পণ্য সরবরাহে ভাটা পড়ে। ইয়ার্ডে বাড়তে থাকে কনটেইনারের সারি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রমজানের পণ্য খালাসের স্বার্থে ৯ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত রাখে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি আলোচনায় বসলেও আর কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করেনি সংগঠনটির নেতারা।

চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেন সেটি সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। পাশাপাশি বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। যেকোনো ধরনেরর আন্দোলনে বন্দরের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ে। এটিও সবার মাথায় রাখতে হবে। 

চট্টগ্রামে শিক্ষকের ৮ হাজার পদ শূন্য

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:০০ এএম
চট্টগ্রামে শিক্ষকের ৮ হাজার পদ শূন্য
ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষক সংকট দীর্ঘদিনের। দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এ সমস্যা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বর্তমানে ১ হাজার ৭৩৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় আট হাজার শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় পাঠদান, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং শিক্ষার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সৃষ্ট পদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষক পদই বর্তমানে শূন্য রয়েছে। দ্রুত নিয়োগ না দিলে এ সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে জুনিয়র স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও কলেজ মিলে ১ হাজার ৭৩৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি কলেজ ২১টি, বেসরকারি এমপিওভুক্ত কলেজ ৭৯টি ও এমপিওবিহীন ২৪টি কলেজ রয়েছে। সরকারি স্কুল রয়েছে ২৫টি। বেসরকরি স্কুল রয়েছে এমপিওভুক্ত ৫৭৭টি, নন-এমপিও ২২৪টি। স্কুল অ্যান্ড কলেজ রয়েছে ৭৫টি। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৬৪টি ও জুনিয়র স্কুল রয়েছে ১৬৭টি। চট্টগ্রামে মাদরাসা রয়েছে ৪৮২টি। এর মধ্যে ৩৮১টি এমপিওভুক্ত।

সব মিলে ১ হাজার ৭৩৮টি প্রতিষ্ঠানের প্রধান, (প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ) সহকারী প্রধান (শিক্ষক বা উপাধ্যক্ষ) ও সহকারী শিক্ষকসহ ২৬ হাজার ১৪৮ শিক্ষক থাকার কথা। কলেজ পর্যায়ে গড়ে ২১ জন করে শিক্ষক থাকার কথা, স্কুল ও মাদরাসা পর্যায়ে ১৮ জন ও জুনিয়র স্কুলে থাকার কথা ১২ জন করে শিক্ষক। স্কুল ও মাদরাসা মিলে ১ হাজার ৩০৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে শিক্ষক থাকার কথা ২৩ হাজার ৫৪৪ জন। কিন্তু আছে ১৬ হাজার ৫৪৪ জন।

মাধ্যমিক ও মাদরাসায় এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আরও ২৫০ জন প্রধান শিক্ষকের পদ বা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের পদ খালি রয়েছে। সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ খালি আছে ৩০০ জন। কলেজের ক্ষেত্রে অধ্যক্ষের পদ খালি রয়েছে ৪০টি। শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে ৪৫০ জনের। এ ছাড়া উপাধ্যক্ষ পদ খালি রয়েছে ৩০ জনের। সর্বমোট চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৮ হাজার ৩০টি পদ খালি রয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকই নন, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের অনেক পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। অনেক প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার বক্তব্য

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুল আজিজ খবরের কাগজকে বলেন, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ক্লাস নিয়মিত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক সংকট সবচেয়ে বেশি। কারিগরি ও অনেক বিষয়ের কোনো শিক্ষকই নেই। তবে যা আছে তাই দিয়ে কোনোভাবে চালিয়ে নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষক নিয়োগে ধীরগতির কারণে এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মিত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে সংকট তৈরি হতো না। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও ঝুলে রয়েছে। চাহিদার বিপরীতে কম নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাই শিক্ষক স্বল্পতার তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। তবে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া হলে সংকট চলে যাবে। 

সূত্র জানায়, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ সংকটে বেশি ভুগছে। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান কমে যাচ্ছে এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চট্টগ্রামের অংকুর সোসাইটি উচ্চবিদ্যালয়ের (ভারপ্রাপ্ত) প্রধান শিক্ষক সুলতানা কাজী খবরের কাগজকে বলেন, প্রধান শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদ শূন্য থাকলে বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষা কার্যক্রম তদারকি, শিক্ষক মূল্যায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সরকারি নির্দেশনা কার্যকর করার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা সৃষ্টি হয়। 

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের শূন্য পদ দ্রুত পূরণ না করা, পদোন্নতি ও বদলিসংক্রান্ত জটিলতা, নিয়োগ কার্যক্রমে প্রশাসনিক ধীরগতি, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সে অনুপাতে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়ায় এ সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
 
প্রবীণ শিক্ষক আবু তালেব বেলাল বলেন, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই শিক্ষক সংকট নিরসন করতে হবে। একটি অঞ্চলের শিক্ষার মান নির্ভর করে পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের উপস্থিতির ওপর। শিক্ষক ঘাটতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা কমে যায়, যা ভবিষ্যতে জাতীয় উন্নয়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শূন্যপদ পূরণের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ, প্রশাসনিক পদে যোগ্য ব্যক্তিদের পদায়ন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখতে বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে সংকট: বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় হয় না

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
স্বাস্থ্য খাতে সংকট: বরাদ্দের অর্ধেকও ব্যয় হয় না
বাজেট ২০২৬-২০২৭

সংকটে দেশের স্বাস্থ্য খাত। এ খাতের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করার সুযোগ থাকলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্ধেকও খরচ করেনি। আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে চলতিবারের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত বিভাগগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে দ্বিতীয় অবস্থানে রাখা হয়েছে। 

• অন্তর্বর্তী সরকার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের মাত্র ৩০-৪০% খরচ করেছে
• আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় ১২,১৬৭ কোটি টাকা
• শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, সঠিক ব্যয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে

স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, শুধু বরাদ্দ রাখলেই হবে না। বরাদ্দ ব্যয় করার বিষয়েও নজর দিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের সরকার ছিল না, তাই জবাবদিহিও ছিল না। স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কাজ না করলেও চলেছে। কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আশা করি, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের সবটা ব্যয় করে এ খাতের উন্নয়ন করবে। সবার জন্য গুণগত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। 

ওষুধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব, বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও ডেল্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক চিকিৎসক জাকির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার এ পর্যন্ত বরাদ্দের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই খরচ করতে পারেনি। দেশে হামের মতো একটি সাধারণ রোগের টিকা পর্যন্ত আমদানি করা হয়নি। শুধু হাম নয়, আরও অনেক রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সরকারের অর্থ ব্যয় করে সাধারণ পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে তেমন কোনো কাজ হয়নি। 

ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা অর্থ ফেরত যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ দেশে একজন মানুষ নিজের চিকিৎসার মোট খরচের ৬০-৭০ শতাংশ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করেন। এ দেশে সরকারি অর্থ চিকিৎসা খাতে খরচ হবে না–এটি ঠিক নয়। নির্বাচিত সরকারের কাছে আবেদন জানাব, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করবেন না, কোথায় কীভাবে কারা কতটা খরচ করছে, তাও খতিয়ে দেখবেন। এ দেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’ 

আওয়ামী লীগ সরকার প্রণীত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা (প্রায় ৪১৪০৮ কোটি টাকা) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল ওই বাজেটের মোট আকারের প্রায় ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। ওই বাজেটে বিনামূল্যে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। 

পরে অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে সময়ে অর্থ খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সব নাগরিককে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে সেবার পরিধি বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দক্ষ জনবল নিয়োগে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের শূন্য পদ পূরণে চিকিৎসক, সেবিকা, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট ও স্বাস্থ্য সহকারীদের নিয়োগ ত্বরান্বিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টির সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। 

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা আরও বলেছিলেন, বাজেটে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য অতিরিক্ত ৪ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা এবং সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রেফারেল হাসপাতালগুলোর পাশাপাশি ৫০ শয্যার বেশি সব হাসপাতাল স্থাপনের জন্য সুবিধা থাকছে। 

ওষুধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব জাকির হোসেন বলেন, সাবেক অর্থ উপদেষ্টার পরিকল্পনাগুলোর প্রায় সব কটি কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ আছে। দেশে হামের কারণে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে অথচ হামের টিকা আমদানি করাই হয়নি। 

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের জন্য বরাদ্দ টাকা ব্যয় করতে না পারার অন্যতম কারণ স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্পের বেশির ভাগ মহাপরিচালক, পরিচালকের অভিজ্ঞতা থাকে না। বরাদ্দ ব্যয় করা না হলে কোনো জবাবদিহি চাওয়া হয় না। আমাদের মতো গরিব দেশে স্বাস্থ্য খাতের সরকারি বরাদ্দ ব্যয় না করা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত। অথচ দেখেন হামের টিকা না আনার কারণে কার কী শাস্তি হয়েছে?’ 

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১ শতাংশের মতো হলেও কী পরিবর্তন হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে? মোট বাজেটের অন্তত ৭ থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন এবং তা সঠিকভাবে ব্যয় করতে হবে। বিনামূল্যে সরকারি স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। আগামী বছরের বাজেটে যে ১০ মন্ত্রণালয় বা বিভাগে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ দ্বিতীয়। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্তের তালিকায় সাত নম্বরে ছিল। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৩১ হাজার ২২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আগামী বাজেটে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ বাড়ছে ১২ হাজার ১৬৭ কোটি টাকা। মোট বাজেটের আকার হিসাবে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে দশমিক ৬৭ শতাংশ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এ হিসাবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে জিডিপির দশমিক ৬৩ শতাংশের সমান বরাদ্দ থাকছে। অর্থাৎ জিডিপির ভিত্তিতেও আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে বরাদ্দ বাড়ছে।

বিদ্যুতে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক
বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যুগ যুগ ধরেই লোকসানে রয়েছে। চুরি, সিস্টেম লস, অপচয়, দুর্নীতি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরে এই খাতে রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। উপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা, অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ চুরির অন্যতম প্রধান উৎস হলো অবৈধ সংযোগ বা ‘হুকিং’। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট, বাজার এবং অস্থায়ী স্থাপনায় সরাসরি বিদ্যুতের লাইন থেকে সংযোগ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া মিটার টেম্পারিং, বাইপাস সংযোগ, বিলিং জালিয়াতি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং স্টেশন থেকেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হলেও এর বড় অংশের কোনো বৈধ হিসাব থাকে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের কারসাজিতে হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই সব অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুতুড়ে বিল, মিটার জালিয়াতি, অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লসের নামে অনিয়ম এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির নজির না থাকায় পরিস্থিতিরও তেমন উন্নতি হচ্ছে না। অন্যদিকে, বছর বছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হলেও খাতটির আর্থিক সংকট কাটছে না। 

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে তা ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো অবকাঠামো, দুর্বল ট্রান্সফরমার, জরাজীর্ণ লাইন এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রযুক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি চুরি ও অনিয়ম মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৯ হাজার ৫৪৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে ৮ হাজার ৮১৯ কোটি ইউনিট। ফলে ৭২৪ কোটির বেশি ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হিসেবে অপচয় হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য হিসাব করলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।

বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডেসকোর বিদ্যুৎ অপচয়ের হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ডিপিডিসির ৫ দশমিক ৬, পিডিবির ৬ দশমিক ৬৮, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৭ দশমিক ২৬ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

একই সময়ে বিপিডিবির আর্থিক অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে ৯৪ শতাংশেরও বেশি।

বিদ্যুৎ সরবরাহে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবির মোট ব্যয় ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হয়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঘাটতি কমাতে অর্থ বিভাগ থেকে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকার নিট লোকসান হয়েছে সংস্থাটির।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে বেসরকারি আইপিপি কেন্দ্রগুলো থেকে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছিল ৫৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার। অথচ জাতীয় বাজেটে এ খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন ধরা হয়েছিল মাত্র ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় দাম পড়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা, যা আগের বছরের তুলনায় ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা বেশি। ফলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচও বেড়ে ১২ টাকা ১০ পয়সায় পৌঁছেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১১ টাকা ৩৫ পয়সা।

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নিয়েও রয়েছে তথ্যগত অসংগতি। বিপিডিবির হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এক নথি অনুযায়ী একই সময়ে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বকেয়াসহ বিদ্যুৎ খাতে মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এর প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমানো না গেলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও কমবে না। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হলেও আর্থিক সংকট কাটছে না। চলতি মাসে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ এবং পাইকারি দর ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। 

বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পেছনে বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের ‘চুরি’র কারণে সংকট কাটছে না বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত একটি অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের লাগামহীন দুর্নীতি ও চুরির কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের কারণেও এই সংকট বাড়ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা ভোক্তাবিরোধী ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিচারের কোনো নজির নেই। ফলে সংকটও কাটছে না।

অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি কমানোর কথা বলে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও বাস্তবে আর্থিক ঘাটতি কমছে না, বরং প্রতিবছরই তা বাড়ছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া, মুনাফা অর্জন নয়। তাই শুধু দাম বাড়ানোর নীতি অনুসরণ না করে সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন।