ব্যাপকহারে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পর চট্টগ্রামে যে কয়টি পাহাড় এখনো টিকে আছে সেগুলো অতি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কোনোটার চারপাশ ৯০ ডিগ্রি খাড়াভাবে কাটা হয়েছে। কোনোটার ওপর থেকে কাটা হয়েছে। এভাবে পাহাড় কাটায় ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে চট্টগ্রামের পরিবেশের ভারসাম্য। ভেঙে পড়ছে বাস্তুসংস্থান। তবে এই কাজটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একা করছে না। সম্মিলিতভাবে কাটা হচ্ছে পাহাড়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভূমিদস্যু, মাটিখেকো, শিল্পগ্রুপ এবং রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাহাড় কাটায় ভূমিকা রেখেছেন। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি সংস্থাগুলো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। এসব সংস্থা কোথাও কোথাও নিজেরাই পাহাড় কেটেছে। অর্থাৎ রক্ষক হয়েছে ভক্ষক।
ডিসির পাহাড় যেন লুটের মাল
চট্টগ্রামের শহরতলি জঙ্গল সলিমপুর সীতাকুণ্ড উপজেলায় পড়লেও তা শহরসংলগ্ন। অপরদিকে আলীনগরের কিছু অংশ শহরের মৌজায় পড়েছে। বিস্তীর্ণ এই এলাকা দুটি পাহাড়ি এলাকা। এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত হওয়ায় এসব পাহাড়ের মালিক চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। বর্তমানে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি পাহাড় কাটার মহোৎসব চলছে এই দুটি এলাকায়।
সলিমপুরে ছিন্নমূল আবাসনে অন্তত দেড় হাজার পরিবার বসবাস করে। তবে সেখানে দখলকারীর সংখ্যা ১২ হাজারের বেশি। দখলকারীরা চট্টগ্রাম শহর এবং আশপাশে নানা পেশায় যুক্ত। তারা শহরে এবং আশপাশের এলাকায় থাকেন। তবে তারা দখলীয় প্লট কিনে এক একটি পরিবারকে পাহারাদার হিসেবে বসিয়েছেন। আবার কিছু ভাড়াটিয়াও আছে। একইভাবে আলীনগরেও হাজারখানেক ব্যক্তি সেখানে দখলস্বত্ব কিনে নিয়ে কাঁচা বসতঘর নির্মাণ করেছেন। তারা ছুটির দিনে গিয়ে সেখান থেকে শাক-সবজি নিয়ে আসেন।
খোঁজ নিয়ে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এবং আলীনগরে প্রশাসন যতবার অভিযান চালাতে গিয়েছে ততবারই হামলার শিকার হয়েছে। এ যেন এক আলাদা রাজ্য। যেখানে পাহাড়খেকোদের রাজত্ব চলে। এই এলাকায় কোনো আগন্তুক প্রবেশ করতে পারেন না। প্রবেশপথেই আটকে দেওয়া হয়। সব শেষ গত বছরের ২৮ জানুয়ারি হামলার শিকার হন অভিযান চালাতে যাওয়া ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ। সেদিন সহকারী কমিশনার (কাট্টলী) মো. উমর ফারুক এবং সীতাকুণ্ড থানার তৎকালীন ওসি তোফায়েল আহমেদ, সাংবাদিকসহ কয়েকজন আহত হন। অভিযানে দুই শতাধিক পুলিশ ও আনসার সদস্য নিয়েও হামলার শিকার হওয়ার পর সেখানে আর অভিযান চালানো হয়নি। তারও আগে ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর অভিযান চালাতে গিয়ে আহত হন সীতাকুণ্ড উপজেলার ইউএনও, ওসিসহ অন্তত ১০ জন।
আলীনগরে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রবেশ করা যায় না। প্রবেশ করতে হলে যার কাছে যাবেন তাকে গেটে ঢেকে এনে কথা বলার পর তার সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করার সুযোগ দেওয়া হয়। বিশাল এই পাহাড়ি এলাকায় দিনরাত চলছে পাহাড় কাটা। এখানে এক্সক্যাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে আশপাশে মাটি বিক্রি করা হয়। প্লট তৈরি করে দখলস্বত্ব বিক্রি করে। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অনিবন্ধিত দলিলমূলে পাহাড়গুলো কেটে প্লট হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। একেকটি প্লট আড়াই, তিন, পাঁচ কাঠাসহ বিভিন্ন আয়তনের। একেকটি প্লটের দাম পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় এই এলাকায় রাজত্ব করতেন বনপ্রহরী আক্কাস। তাকে ক্রসফায়ারে দেওয়া হয়। তারপরে আসেন রোকন উদ্দিন। তিনি বর্তমানে পলাতক। তারপরে আসেন শহীদুল ইসলাম। এখন রাজত্ব করছেন বিএনপিপন্থি ইয়াসিন। তাকে সহযোগিতা করছেন স্থানীয় যুবদল নেতা রোকন। রোকন বিএনপির সাবেক এক কেন্দ্রীয় নেতার ঘনিষ্ঠ।
রক্ষক যখন ভক্ষক
সম্প্রতি নগরীর জালালাবাদ এলাকায় বিএস ৭০৫ নম্বর দাগে পাহাড় কাটে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। এনিয়ে সমালোচনা হলে চলতি বছরের ২০ মে পরিবেশ অধিদপ্তর নোটিশ দিয়ে সেই কাজ বন্ধ করে। ওই এলাকায় পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন। তার আবাসিকে যাতায়াতের জন্য সড়ক নির্মাণ করতেই সিটি করপোরেশন পাহাড় কাটে। একইভাবে সিটি করপোরেশনের লেকসিটি হাউজিং সোসাইটি গড়ে উঠেছে পাহাড় কেটে। পাহাড় কাটায় সিডিএও পিছিয়ে নেই। বায়েজিদ হতে ফৌজদারহাট পর্যন্ত লুপ রোড নির্মাণ করতে গিয়ে ১৮টি পাহাড় কাটে সিডিএ। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হলে পরিবেশ অধিদপ্তর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে সিডিএকে ১০ কোটি টাকা জরিমানা করে। পাহাড় কাটায় পিছিয়ে নেই পরিবেশ অধিদপ্তরও। বর্তমানে চট্টগ্রামে পরিবেশ অধিদপ্তরের যে অফিস রয়েছে সেটিও নির্মাণ করা হয়েছে পাহাড় কেটে। রেলওয়ে, গৃহায়ণ গণপূর্তসহ সব সরকারি সংস্থার কোদালের কোপ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পাহাড়ের ওপর পড়েছে। পাহাড় কেটেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালও। ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি হাসপাতাল নির্মাণের জন্য চমেক হাসপাতালসংলগ্ন গোয়াছিবাগানের পাহাড় কাটা হয়।
পাহাড়ে বিদ্যুৎ বন্ধ করেনি পিডিবি
চট্টগ্রামে বাসা-বাড়িতে কেউ বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে চাইলে তাকে জমির খতিয়ান, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অনেক কিছু জমা দিতে হয়, অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়। পাহাড়ে যারা অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিচ্ছেন তারা এসব না দিয়েও পাচ্ছেন। দিলেও জাল কাগজপত্র দিচ্ছেন। এক ঠিকানায় আবেদন করে আরেক ঠিকানায় বিদ্যুৎ নিচ্ছেন। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব সংযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার বৈধ মিটার থেকে সাব মিটারের মাধ্যমে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের সংযোগ দেওয়া হয়।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় পিডিবির প্রতিনিধি অজুহাত দেখান যে, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে তাদের ওপর হামলা হয়। বাস্তবতা হলো অফিসে বসেও বিদ্যুৎ মিটার লক করার সুযোগ আছে। কিন্তু পিডিবির লোকজন সেই কাজটি করেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এবং রাজনৈতিক লোকজন মিলেমিশে কাজটি করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রূপসী পাহাড় ও এর আশপাশের পাহাড়ে বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ রয়েছে। নাগিন পাহাড়, লালখান বাজার, আকবরশাহ এলাকার গ্যাসলাইন পাহাড়, গোলপাহাড়, বেলতলী ঘোনা, গাউছিয়া লেক সিটি, এক, দুই ও তিন নম্বর ঝিল, জিয়ানগর, বিজয়নগর, জসিম মার্কেটসংলগ্ন পাহাড়, সুপারি বাগান, সুপারি বাগান গ্যাস লাইন, সলিমপুর গ্যাসলাইন, কালীরছড়া দখল করে গড়ে তোলা বাড়িতেও বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিশ্ব কলোনি থানার পাশে কবরস্থানসংলগ্ন পাহাড়, মিরপুর শাপলা আবাসিক এলাকায় বিদ্যুৎ রয়েছে। এসব পাহাড়ের বেশির ভাগ সরকারি। বায়েজিদ চৌধুরী নগর, জালালাবাদ এলাকা, বায়েজিদ লিংক রোডের আশপাশসহ অনেক সরকারি পাহাড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে।
পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মিনি ওয়াসা
চট্টগ্রামে নলকূপ বসাতে হলে ওয়াসা থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু সেখানকার প্রতিটি পাহাড়ের ওপরে কিংবা নিচে যে-যার সুবিধামতো জায়গায় অবৈধভাবে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানির ব্যবসা করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, আকবরশাহ ১৫৩, ১৬১ ও ১৪৪ নম্বর দাগের সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়ে দুটি গভীর নলকূপ রয়েছে। জাহাঙ্গীরের ঘোনায় বসানো হয়েছে দুটি গভীর নলকূপ, যেখান থেকে পাশাপাশের ৮টি পাহাড় ও সমতল এলাকার দুই হাজারের বেশি পরিবারের কাছে এবং শতাধিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পানি বিক্রি করা হয়। এক একটি পরিবার ও প্রতিষ্ঠান থেকে মাসিক বিল নেওয়া হয় ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। এখানে যে মোটর ও বিদ্যুৎ মিটার ব্যবহার করা হয় তার কোনোটিরই অনুমোদন নেই। নলকূপ দুটি পরিচালনা করেন ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক (সম্প্রতি তার পদ স্থগিত করা হয়) মোহাম্মদ রাসেল। টাকার মালা গলায় দিয়ে আনন্দ মিছিল করায় দল তার পদটি স্থগিত করে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
মসজিদের নামে পানি ও বিদ্যুৎ-বাণিজ্য
চসিকের লেকসিটি হাউজিংয়ের পাশে পাহাড়ের পাদদেশে একটি জামে মসজিদ রয়েছে। ওই মসজিদ থেকে বিজয়নগর ও জিয়ানগরের পাহাড়ে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করেন মসজিদ নিয়ন্ত্রণকারীরা। এই মসজিদ থেকে টাকার বিনিময়ে কয়েকটি পাহাড়ের ছয় শতাধিক পরিবারকে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। শুধু পানি থেকে প্রতি মাসে দুই লক্ষাধিক টাকা আয় করেন স্থানীয় বিএনপি নেতা রেহান উদ্দিন প্রধান ও যুবদলের ইলিয়াস। মসজিদটি আগে নিয়ন্ত্রণ করতেন সাবেক কাউন্সিলর জহুরুল আলম জসিম। বর্তমানে তিনি জেলে আছেন।
তিন নম্বর ঝিলেও একটি গভীর নলকূপ রয়েছে মসজিদের নাম দিয়ে। ওই নলকূপ থেকে ২৫০ পরিবার পানি পায়। প্রতি পরিবার থেকে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পানির বিল তোলা হয়।
মসজিদের অন্য একটি মিটার থেকে প্রতি ঘরে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফ্যান ও বাতি জ্বালানোর জন্য প্রতি ইউনিট ১৭ থেকে ১৮ টাকা করে আদায় করা হয়। যে পরিমাণ গ্রাহক মসজিদের নলকূপ থেকে পানি কিনেন, একই পরিমাণ গ্রাহক বিদ্যুৎও কিনেন।
জানতে চাইলে বিএনপি নেতা রেহান উদ্দিন প্রধান খবরের কাগজকে বলেন, তারা মসজিদের জমিতে গভীর নলকূপ বসিয়ে পানি সরবরাহ করলেও এর থেকে মসজিদ কিংবা তারা কেউই লাভবান হচ্ছেন না। যারা পানি পাচ্ছেন মাস শেষে তাদের কাছ থেকে শুধু বিদ্যুৎ বিল আদায় করা হয়। নলকূপটি ওয়াসার অনুমোদন করা কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা ওয়াসা থেকে অনুমোদন নেননি।
এক নম্বর ঝিলে বেসরকারি সংস্থা দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র (ডিএসকে) একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করে দেয় ৯০টি পরিবারের জন্য। কিন্তু সেটি ব্যবহার করে হাজারও পরিবার। ডিএসকে নলকূপটি দিয়েছিল শুধু বিদ্যুৎ খরচ দিয়ে বসবাসকারীদের পানি ব্যবহারের জন্য। কিন্তু স্থানীয় আনোয়ারসহ কয়েকজন মিলে এর পানি বিক্রি করেন। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত মতে, সম্প্রতি নলকূপটি বন্ধ করা হলেও সপ্তাহখানেক পর সেটি আবার সচল হয়।
এক নম্বর ঝিলে ৬০ পরিবারের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসার একটি সংযোগ রয়েছে, যা সাড়ে তিন শতাধিক পরিবার ব্যবহার করছে। ৬০ পরিবারের টাকা ওয়াসায় গেলেও বাকি টাকা স্থানীয় বিএনপি নেতা আনোয়ারসহ কয়েকজন ভাগাভাগি করেন। এখানে ওয়াসার কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীও ভাগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে। অপরদিকে সুপারি বাগান গ্যাস লাইন এলাকায় সাত শতাধিক পরিবারের কাছে পানি বিক্রি করেন স্থানীয় প্রভাবশালী শুক্কুর আলী।
লালখান বাজারের পাহাড়ে অবৈধ গভীর নলকূপ আছে প্রায় এক ডজন। চট্টগ্রাম ওয়াসাও এই এলাকার কিছু অংশে পানি সরবরাহ করে।
অপরদিকে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানি রয়েছে, সেসব এলাকার মধ্যে অনেক বাড়িতে গ্যাস সংযোগও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে এসবের মধ্যে বেশির ভাগই অবৈধ। এভাবে প্রতিটি পাহাড়ে অবৈধভাবে ইউটিলিটি সেবা পাওয়ায় মানুষ সেখানে বসবাস করছেন।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান খবরের কাগজকে বলেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তিনি পিডিবি চট্টগ্রাম এবং কর্ণফুলী গ্যাসকে নির্দেশ দেবেন। পাহাড়ের অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পাহাড়ে বসবাসকারীরা আসলে কারা?
চট্টগ্রামে পাহাড়ের মূল দখলদারের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। কিন্তু এসব পাহাড়ে হাজার হাজার পরিবার বসবাস করে। এদের কেউ ভাড়ায় থাকেন অথবা পাহারাদার হিসেবে থাকেন। তারা এখানে পানি ও বিদ্যুৎ না পেলে ভাড়া নিয়ে অন্যত্র চলে যাবেন।
এক নম্বর ঝিলে চার হাজার পরিবার, দুই নম্বর ঝিলে এক হাজার, বিজয়নগর ও জিয়ানগরে প্রায় ৬০০, গ্যাস লাইন পাহাড় ৮৮, রূপসী পাহাড়ের দুই পাশে প্রায় ২০০ পরিবার, লালখান বাজারের পাহাড়ে প্রায় ৮ হাজার পরিবার, ষোলশহর বন বিভাগের পাহাড়ে ৪৫০ পরিবার, বেলতলী ঘোনার গোলপাহাড়ে ৪৫০ পরিবার, জালালাবাদ এলাকার সাতটি পাহাড়ে দেড় শতাধিক পরিবার বসবাস করছে বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
পাহাড় কাটার অভিনব কৌশল
মিরপুর শাপলা এলাকায় প্রায় দেড় হাজার ঘর দেখা গেছে। যার অধিকাংশ খালি। মূলত পাহাড় কাটার জন্যই ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে লোক নিয়োগ দেওয়া হয় পাহাড় কাটতে। অনেক সময় তারা ঘরের ভেতর থেকে কাটতে শুরু করেন। কখনো ঘরকে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাহাড় কাটেন। যাতে দূর থেকে কেউ দেখতে না পান।
আরেকটি কৌশলও পাহাড়খেকোদের অবলম্বন করতে দেখা গেছে, যে পাহাড়টি কাটা হবে প্রথমে সেটি উঁচু বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। যাতে ভেতরে কী চলছে, বাইরে থেকে কেউ যেন বুঝতে না পারেন। এভাবে বেশ কিছুদিন রেখে দেওয়ার পর ধীরে ধীরে কাটা শুরু করে। কয়েকটি উপায়ে তারা কাজটি করেন।
সবজি চাষ পাহাড় কাটার নতুন কৌশল
রূপসী পাহাড়ের চারপাশে চাষ করা হয়েছে নানাজাতের শাক-সবজি। দিনের বেলায় শাকসবজির জমিতে পাইপ দিয়ে সেচ দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষ কিংবা প্রশাসনের ধারণা জন্মে কৃষক হয়তো শাক চাষের জন্য সেচ দিচ্ছেন। বাস্তবতা হলো তারা পানি দিয়ে পাহাড়ের মাটি নরম করেন। রাতের বেলা অল্প করে কাটেন। কয়েক দিন পর আবার নতুন করে শাক-সবজি চাষের প্রক্রিয়া শুরু করেন। এভাবে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করা হয় পাহাড়।
ব্যবহার হয় ড্রেজার মেশিনও
প্রথমে পাহাড়ের ওপর গর্ত করা হয়। লম্বা পাইপের মাধ্যমে সেই গর্তে পানি ফেলা হয়। গর্তের ভেতর পানি জমা করে ওই গর্তে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে পাহাড়ের মাটি পাইপ দিয়ে নিচে নামিয়ে আনা হয়। চট্টগ্রামের অধিকাংশ পাহাড় যেহেতু বালুর পাহাড় তাই পাহাড়খেকোরা সহজেই কাজটি করতে পারেন।
পরিবেশের শর্ত দিয়ে দায় এড়ায় সিডিএ
ভবনের নকশা অনুমোদনের আগে ভূমির মালিককে সিডিএ থেকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র (এলইউসি) নিতে হয়। ওই ভূমির শ্রেণি যদি পাহাড়, টিলা, জলাশয় হয় তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছ থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত দিয়ে এলইউসি দেয় সিডিএ। ভূমির মালিক পরিবেশ ছাড়পত্র না নিয়েই সিডিএর ইমারত নির্মাণ কমিটির কাছে ভবনের নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন। ইমারত নির্মাণ কমিটি ছাড়পত্র ছাড়াই নকশা অনুমোদন করে দেয়। পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তটি কাগজেই থেকে যায়। বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ হয় না।
৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে পাহাড় মালিক
নগরের রূপসী পাহাড়সংলগ্ন এলাকায় অন্তত ১২টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এই পাহাড়ের জমির ক্রেতারা মাত্র ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে আনরেজিস্ট্রার্ড চুক্তিমূলে পাহাড় কিনে তা কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। সিডিএর একাধিক কর্মকর্তা ও পরিদর্শকের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ওই এলাকায় সিডিএর লোকজন কখনো যায়নি। এমনকি তারা এসব ভবনের বিষয়ে তথ্য নিতেও তেমন আগ্রহী নন। একইভাবে আকবরশাহ থানাধীন উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের উত্তর লেকসিটি চারটি ভবন, হারবাতলীতে সাতটি, মিতালী হাউজিংয়ে অন্তত ৬টি, গাউছিয়া লেকসিটিতে চারটি, বায়েজিদ থানাধীন নাগিন পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে অন্তত চারটি ভবন। দি নাগরিক কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটিতে পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে ১০ থেকে ১৫ তলা পর্যন্ত ভবন। এই পাহাড়ে ভবন নির্মাণের জন্য সিডিএ অনুমোদন দিয়েছে পরিবেশের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্তে। কিন্তু কেউ তা নেয়নি।
সিডিএ চেয়ারম্যানের বক্তব্য
সিডিএর চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, পাহাড় কাটায় বড় বড় মাফিয়া জড়িত। পাহাড় রক্ষার নেতৃত্ব দিয়ে থাকে পরিবেশ অধিদপ্তর। সিডিএ তথ্য দিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে সহযোগিতা করে। তবে ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় যদি কোনো আবেদনকারীর জমি পাহাড়ে পড়ে তখন আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়ার শর্ত দিয়ে থাকি, যা কেউ মানতে চায় না। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি পরিবেশের ছাড়পত্র নিয়েই সিডিএতে এলইউসির জন্য আবেদনের বাধ্যবাধকতা থাকত, তাহলে পাহাড় রক্ষা করা আরেকটু সহজ হতো।
তিনি বলেন, দেশে পর্যটন পুলিশ আছে। পাহাড়সহ পরিবেশের অনুষঙ্গগুলো রক্ষায় পরিবেশ পুলিশ গঠন করা এখন সময়ের দাবি। বায়েজিদ লুপ রোডে সিডিএর পাহাড় কাটা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সেখানে পাহাড় কাটা হয়েছে। এখন সিডিএর নিজস্ব অর্থায়নে সেসব পাহাড় সুরক্ষায় প্রকল্প গ্রহণ করা হবে।
ছলিমপুর আলীনগর এলাকায় ব্যাপকহারে পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, পাহাড়গুলোর মালিক জেলা প্রশাসন। শহরের মধ্যে অবস্থিত সরকারি পাহাড় কেটে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ বন্ধে সিডিএর ভূমিকা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের তথ্য পেলে তারা ব্যবস্থা নেন।
চসিকের বক্তব্য
চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার অভাবে চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলো অধিগ্রহণ করে সংরক্ষণ করতে হবে। চট্টগ্রামে যে হারে জমির দাম বাড়ছে, মামলা দিয়েও পাহাড়মালিকদের পাহাড় কাটা থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। এ কথা সত্য চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়ের চেয়ে সরকারি পাহাড় বেশি। বেশির ভাগ এক নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত। আর কিছু পাহাড়ের মালিক বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান। পাহাড়গুলোকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে বনায়ন করা যায়। নতুবা পর্যটন স্পট কিংবা পার্ক হিসেবে গড়ে তোলা যায়। সবচেয়ে জরুরি হলো- নিম্ন আয়ের মানুষের শহরে আসা বন্ধ করতে- গ্রামে কর্মসংস্থান এবং সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা জরুরি।
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির বক্তব্য
চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, বাস্তবে পাহাড় থাকলেও রেকর্ডিয় শ্রেণি নাল, ছনখোলা, আবাসিক, ভিটি বা অন্যকিছু থাকলেও তা পাহাড় হিসেবে গণ্য হবে। সিডিএ ভবনের নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে এসব যাচাই করে অনুমোদন দেবে। এ বিষয়ে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাহাড়ে অবৈধ নলকূপ বসিয়ে পানি ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্নকরণের বিষয়ে আগে থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া আছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং পিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিয়ে খুব শিগগিরই একটি মিটিং করা হবে।
ছলিমপুর এবং আলীনগর এলাকায় বেপরোয়াভাবে পাহাড় কাটা প্রসঙ্গে বলেন, বিষয়টি তিনি জেলা প্রশাসনকে বলে দেবেন। আর কাউকে পাহাড় কাটার সুযোগ দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের মোবাইলে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। তবে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, ছলিমপুর এবং আলীনগরে বেপরোয়াভাবে পাহাড় কাটার বিষয়টি তারা জানতেন না। সেখানে পাহাড় কাটা বন্ধে সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার বক্তব্য
চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে খবরের কাগজকে বলেন, রাজস্ব বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা তাকে তথ্য জানালে তিনি তা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানান। ম্যাজিস্ট্রেট তখন অভিযান চালান। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে মিনি ওয়াসার বিরুদ্ধে অভিযান না চালানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাঠকর্মীরা এই তথ্য তাকে দেননি। তবে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাহাড়ে পানির সংযোগ না দেওয়া এবং অবৈধ নলকূপ ও সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিষয়টি তিনি অবগত বলে জানান।
পরিবেশ অধিদপ্তরের বক্তব্য
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের (মহানগর) পরিচালক সোনিয়া সুলতানা খবরের কাগজকে বলেন, যখনই পাহাড় কাটার খবর পাচ্ছি ছুটে গিয়ে বন্ধ করছি। চট্টগ্রামকে ৫টি জোনে ভাগ করে পাহাড় কাটা বন্ধে কাজ চলছে। এখন বাণিজ্যিকভাবে কেউ পাহাড় কাটছে না। তবে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি মালিকানাধীন কিছু পাহাড় কাটার চেষ্টা চলছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ে যাদের জমি আছে তাদের অন্যত্র স্থানান্তর করা যায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে পুলিশ নেই। যারা পাহাড় কাটে তাদের কাছে পুলিশ ছাড়া যাওয়া কঠিন। রেলওয়ে, বন বিভাগের অনেক পাহাড় আছে। সেসব প্রতিষ্ঠান তাদের পাহাড়গুলো অবৈধ দখলমুক্ত রাখতে পারছে না। সেসব পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীরাও পাহাড় কাটেন। এখানে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। জমির মালিক মামলার ভয়কে উপেক্ষা করে পাহাড় কেটে বাড়ি নির্মাণ করছেন। পাহাড়ে কোনো ধরনের সেবা না দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি সেটা অনুসরণ করছে না। যে কারণে পাহাড় কাটা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যেসব পাহাড় অবশিষ্ট আছে, তা বন বিভাগের মাধ্যমে বনায়ন করে সংরক্ষিত বন এলাকা ঘোষণা করা যেতে পারে। অথবা যে সংস্থা পাহাড়ের মালিক তারা পাহাড়কে অক্ষত রেখে পার্ক বা পর্যটন স্থান করতে পারে। কিন্তু কেউ তো কোনো ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের একার পক্ষে পাহাড় রক্ষা করা সম্ভব না।
বিশিষ্ট নগরবিদ ও সনাক-টিআইবি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামের সব পাহাড়ের মালিক আছে। সরকারি সংস্থাগুলোর পাহাড় দেখভাল করার জন্য তাদের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ আছে। জেলা প্রশাসনের পাহাড়গুলো তারা নিজেরাই দেখভাল করে। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন পাহাড়গুলোর মালিক তো রয়েছেই। পাহাড়ের শহর চট্টগ্রামে এখন পাহাড় নেই বললেই চলে। পাহাড়গুলো কখন কাটা হয়, তা প্রশাসন দেখে না। কারণ তাদের চোখে টাকার পট্টি লাগানো থাকে। যে সংস্থার পাহাড় কাটা হয় সেই সংস্থা্র দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে মামলা করে গ্রেপ্তার করতে হবে। এমনকি জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন পাহাড় কাটা হলে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে মামলা করে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এভাবে কাজ না করলে যেটুকু পাহাড় অবশিষ্ট আছে তাও রক্ষা করা যাবে না। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে সেবা সংস্থাগুলোর সেবা কীভাবে পৌঁছে যাচ্ছে? যারা এসব সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সিলেটে পাথর লুটের পর তা ফিরিয়ে আনার অন্তত চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু একটি পাহাড় একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আর কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রামের পরিবেশকর্মী মো. শফিকুল ইসলাম খান খবরের কাগজকে বলেন, পরিবেশ আইনের প্রয়োগ সব সংস্থার হাতে ন্যস্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা থাকলে আরও সুফল মিলত। তা ছাড়া পাহাড়-টিলা-জলাশয় শ্রেণির ভূমিতে ইমারত নির্মাণের অনুমোদন না দেওয়া, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ভূমি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়া, সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত পাহাড়, টিলা, জলাশয় দখলমুক্ত করে সরকারিভাবে ব্যবহারের আওতায় আনতে হবে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের কারণে হওয়া মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। রেলওয়ে, গৃহায়ণ, বন বিভাগ, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভূমি নিয়ে মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা বেঁধে দিয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি শাখাকে কার্যকর করলে সুফল মিলত। তা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের কেউ বা পরিবারের সদস্যরা যেন উত্তরাধিকার সূত্র ছাড়া চাকরিকালীন বা অবসরের পরও পাহাড়-টিলা-জলাশয় শ্রেণির ভূমি মালিকানায় আসতে না পারে, সে শর্ত চাকরি বিধিমালায় প্রণয়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সিডিএ, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, বিদ্যুৎ, ওয়াসাসহ পাহাড় সুরক্ষায় যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পাহাড় কাটা প্রতিরোধ করতে গিয়ে পরিবেশখেকোদের দ্বারা প্রভাবিত হন ও অনৈতিক সুবিধা নেন। এটি চরম অপরাধ। এতে করে পাহাড় সাবাড় ত্বরান্বিত হয়।
এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান খবরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো একবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না, যা অন্যগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভব। সম্প্রতি আমরা দেশের সব পাহাড়-টিলার দাগ-খতিয়ান অনলাইনে এনেছি। পাহাড় রক্ষায় দেশের বিভিন্ন জেলায় মিটিং করেছি। পাহাড় কর্তনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া আছে। তার পরও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি পাহাড় রক্ষা করতে না পারে, তাহলে স্থানীয় কমিউনিটিকে তারা সম্পৃক্ত করতে পারে। এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠন করে দিলে স্থানীয় লোকজন তখন প্রশাসনকে খবর দিতে পারবে। দ্রুত খবর পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। তিনি বলেন, পরিবেশ আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি এই আইন প্রয়োগ সব দপ্তর-বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে আনতে। এতে সমন্বয়হীনতা কমবে এবং যখন যে দপ্তরের কাছে তথ্য আসবে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। পাহাড়গুলোকে একটি সমন্বিত বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা এবং সুরক্ষিত করার ব্যাপারে নির্দেশনা জারি আছে। প্রশাসনের মধ্যে যদি পাহাড় ধ্বংসের হোতা বা সহযোগী থাকে তারও একজন সাধারণ মানুষের মতোই আইনের আওতায় আসার কথা। সিডিএ, ওয়াসা, পিডিবি, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশনসহ সব সেবা সংস্থাকে সমন্বিতভাবে এই বিষয়ে কাজ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বিভাগীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ভূমি সার্কেলভিত্তিক পাহাড় সুরক্ষায় জোন কমিটি করা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি অংশীজনদের সমন্বিত এই জোন কমিটির মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যেন পাহাড় কর্তন রোধসহ স্থায়ীভাবে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেই লক্ষ্যেই কমিটিগুলো করা হয়েছে। আশা করছি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পাহাড়গুলো সুরক্ষিত থাকবে।