ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করতে পারে। তবে প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো–ভূমিকম্পে মানুষ সাধারণত কম্পনের কারণে মারা যায় না; বরং ভবন, সেতু ও অন্যান্য কাঠামো ধসে পড়ার কারণেই অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটে।
একই মাত্রার ভূমিকম্পে কোনো কোনো ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে, আবার কোনো ভবন সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পার্থক্যের মূল কারণ ডিজাইনের মান, নির্মাণের গুণগত মান এবং প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে কাজ করা হয়েছে কি না। তাই বলা যায়–ভূমিকম্প নয়, দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ভবনই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।
কেন ডিজাইন এত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পনের কারণে ভবনের ওপর বিভিন্ন ধরনের বল কাজ করে। ভবনের নিজস্ব ওজনের পাশাপাশি অতিরিক্ত গতিশীল বল (Dynamic Force) সৃষ্টি হয়।
প্রধানত দুই ধরনের বল গুরুত্বপূর্ণ: অনুভূমিক বল (Lateral Force)। ভূমিকম্পে মাটি ডানে-বামে কাঁপে। ফলে ভবনের ওপর অনুভূমিক বল কাজ করে। সাধারণত ভবনগুলো উল্লম্ব লোড (নিজস্ব ওজন) বহনের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকে, কিন্তু ভূমিকম্পের অনুভূমিক লোড ভবনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। গতিশীল বল (Dynamic Load)। ভূমিকম্প একটি গতিশীল ঘটনা। কম্পনের ফলে ভবনের বিভিন্ন অংশে ত্বরণ (Acceleration) সৃষ্টি হয়, যা অতিরিক্ত বল তৈরি করে। ভবনের ওজন যত বেশি, তত বেশি ভূমিকম্পীয় বল সৃষ্টি হয়।
খারাপ ডিজাইনের প্রধান সমস্যাসমূহ
Soft Storey (দুর্বল নিচতলা): বাংলাদেশে অনেক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ, দোকান বা খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে নিচতলায় দেয়াল কম থাকে এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ভূমিকম্পের সময় ওপরের তলাগুলো তুলনামূলক শক্ত থাকলেও নিচতলা অতিরিক্ত বিকৃত হয়।
একে বলা হয়: Soft Storey Failure। এর ফলে পুরো ভবন একসঙ্গে নিচের দিকে ধসে পড়তে পারে। অনেক ভূমিকম্পে দেখা গেছে যে, পার্কিং ফ্লোরযুক্ত ভবনগুলো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। Irregular Shape (অসামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতি): স্থাপত্যগত সৌন্দর্যের জন্য অনেক সময় L-Shape, U-Shape বা অন্যান্য জটিল আকৃতির ভবন নির্মাণ করা হয়।
সমস্যা কোথায়
ভূমিকম্পের সময় ভবনের সব অংশ সমানভাবে নড়াচড়া করে না। ফলে ভবনের ওপর Torsion (মোচড়) Uneven Stress Distribution Concentrated Damage সৃষ্টি হয়। ফলে একটি অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে কাঠামোগত ব্যর্থতা ঘটতে পারে। নিম্নমানের উপকরণ ও নির্মাণকাজ: ডিজাইন যত ভালোই হোক, নিম্নমানের নির্মাণকাজ পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার, অপর্যাপ্ত রড, অপর্যাপ্ত কংক্রিট কভার, ভুল রড বাঁধাই, পর্যাপ্ত curing না করা। এর ফলে কংক্রিটের শক্তি কমে যায় এবং ভূমিকম্পের সময় কাঠামো ভেঙে পড়ে। সঠিক Load Path না থাকা। Roof→Beam→Column→Foundation. যদি Load Path সঠিক না হয় তাহলে স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কিছু অংশ হঠাৎ ব্যর্থ হয় অর্থাৎ Progressive Collapse শুরু হতে পারে। ফলে পুরো ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্বল কলাম–শক্তিশালী বিম সমস্যা।
ভূমিকম্পপ্রতিরোধী ডিজাইনের একটি মৌলিক নীতি হলো: Strong Column–Weak Beam
অর্থাৎ কলাম হবে শক্তিশালী এবং বিম তুলনামূলক দুর্বল। ভূমিকম্পের সময় বিম ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবন সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কলাম ব্যর্থ হলে পুরো ভবন ধসে পড়তে পারে। তাই আধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনে কলামকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কীভাবে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়? Ductility (নমনীয়তা): ভূমিকম্পের সময় একটি ভালো ভবন সম্পূর্ণ শক্ত ও অনমনীয় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ভবন এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত যাতে এটি: শক্তি শোষণ করতে পারে। কিছুটা বাঁকতে পারে। হঠাৎ ভেঙে না পড়ে: এটাই Ductility। Redundancy (বিকল্প লোড বহন ব্যবস্থা): ভালো ডিজাইনে একাধিক Structural System থাকে। একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো লোড বহন করতে পারে। ফলে সম্পূর্ণ ধসের সম্ভাবনা কমে যায়।
Regularity (সুষম বিন্যাস): সুষম আকৃতির ভবনে Stress Distribution ভালো হয়। Torsion কম হয়। ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে। Code Compliance (কোড অনুসরণ): ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনের জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে: BNBC (Bangladesh National Building Code)। আন্তর্জাতিকভাবে: ACI, ASCE, ,IBC. Eurocode-এর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: বিশেষ করে ঢাকা শহর একটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। বর্তমানে অনেক প্রধান সমস্যাগুলো অনুমোদিত ডিজাইন অনুসরণ না করা। প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানের অভাব। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। অতিরিক্ত তলা নির্মাণ। পুরোনো ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন না করা। সঠিক Soil Investigation না করা। এসব কারণে ভূমিকম্পের সময় ক্ষতির ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।
নেপাল ভূমিকম্প ২০১৫–একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল। তদন্তে দেখা যায় দুর্বল নকশা, অপর্যাপ্ত রড, নিম্নমানের কংক্রিট, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ ছিল। অন্যদিকে সঠিক প্রকৌশল নীতিতে নির্মিত অনেক ভবন উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে ছিল। এটি প্রমাণ করে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়। প্রকৌশলীদের করণীয়: Structural Analysis নিশ্চিত করা, Static Analysis, Dynamic, Analysis, Response Spectrum Analysis, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। Seismic Load বিবেচনা করা: ডিজাইনের শুরু থেকেই ভূমিকম্পীয় লোড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। Proper Detailing নিশ্চিত করা, Beam-Column Joint, Stirrup Spacing, Anchorage Length, Lap Splice সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। Construction Supervision জোরদার করা। ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
ভূমিকম্প থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৌশল নকশা, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী এবং দক্ষ তদারকির মাধ্যমে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
একটি নিরাপদ ভবন কেবল ইট, বালি, সিমেন্ট ও রডের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক।
লেখক: প্রকৌশলী বিভাগীয় প্রধান, প্রকৌশল বিভাগ, স্টুডিও ডিএনএ, প্রতিষ্ঠাতা, হেলদি কংক্রিট ও হেলদি এডুকেশন