পাহাড়ের মালিক জেলা প্রশাসন কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমে। এদিকে পাহাড়ের মাটি কেটে সমতল করে প্লট বিক্রি আর আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চট্টগ্রামের শহরতলি সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এবং আলীনগরের পাহাড়খেকো দুই গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থানে। হামলা-পাল্টাহামলার পাশাপাশি তারা সংবাদ সম্মেলন এবং গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে একে অপরকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি পাহাড় দখলের জন্য ৬০ লাখ টাকার অস্ত্র কেনার একটি অডিও ফাঁস হয়েছে। অডিওতে রোকন নামের একজনের কথা শোনা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অন্যদিকে রয়েছেন ইয়াছিন। ইয়াছিনের বিরুদ্ধে রয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার একাধিক মামলা।
এদিকে যেসব পাহাড় নিয়ে দুই পক্ষের লড়াই চলছে, সেই পাহাড়ের মালিক জেলা প্রশাসনের কোনো খবর নেই। তারা দেখেও কিছু দেখে না। অথচ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে পাহাড় কাটা হলে প্রথমে মালিকের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। এখন জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করবে কে, এই প্রশ্ন ফিরছে মানুষের মুখে মুখে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও চট্টগ্রাম পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব মো. সাদি উর রহিম জাদিদ খবরের কাগজকে বলেন, জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর এলাকায় একাধিকবার অভিযানের চেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু বারবার বাধা এসেছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা দেখান। ওই নির্দেশনায় আছে, তাদের পুনর্বাসন না করে উচ্ছেদ করা যাবে না। কিন্তু আদালত তাদের পাহাড় কাটার অনুমতি দেননি। বিষয়টি আলোচনার জন্য আসন্ন পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এজেন্ডা হিসেবে রাখা হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে গত শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে আলীনগরের ইয়াছিনকে ভূমিদস্যু, মাদক ব্যবসায়ী ও শীর্ষ সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছেন মিজানুর রহমান রাজু। রাজু যুবদল নেতা রোকনের লোক হিসেবে পরিচিত। রাজু অভিযোগ করেন, ইয়াছিন হামলা করে তার দুটি দোকান এবং বসতবাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করেছে। এতে তার প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
নিজেকে চট্টগ্রাম মহানগর বাস্তুহারা দলের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দেওয়া রাজু সন্ত্রাসী ইয়াছিনকে দ্রুত গ্রেপ্তার এবং তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে বলেন, নোয়াখালীর সুবর্ণচর থেকে প্রায় দুই দশক আগে ইয়াছিন ও তার সহযোগী ফারুক চট্টগ্রামে আসেন। শুরুতে অটোরিকশা চালালেও পরে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে থাকতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অবস্থান পোক্ত হয়। শুরু করেন পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি, অবৈধ প্লট বানানো এবং বিদ্যুৎ সংযোগের চাঁদাবাজি। এতে অতি অল্প সময়েই কোটি টাকার মালিক বনে গিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন এবং নাম দেন ‘আলীনগর’।
তিনি জানান, আলীনগর যেন ইয়াছিনের আলাদা এক রাজত্ব। সেখানে কেউ প্রবেশ এবং বের চাইলে তার অনুমতি লাগে। বাইরের কেউ এলে ভোটার আইডি কার্ড এবং মোবাইল ফোন জমা দিতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ পাস কার্ডেরও ব্যবস্থা করেছেন তিনি। অপকর্ম করতে গিয়ে ইতোমধ্যে অসংখ্য মামলার আসামি তিনি।
অন্যদিকে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চট্টগ্রামের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের কাছে রোকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইয়াছিন। তিনি নিজেকে আলীনগর বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক উল্লেখ করে বলেন, গত ৩০ আগস্ট সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে অস্ত্রের কারখানার সন্ধান পেয়েছে। অস্ত্রসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। কিন্তু অস্ত্র-গোলাবারুদসহ ফকিরহাটের রোকন উদ্দিন, রাজু, জিয়া, নাজিম, লোকমান ও সাদুর নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জন আলীনগরের দিকে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। এলাকাবাসী বাধা দিলে তারা নৈরাজ্য সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষকে মারধর করে। টাকা এবং মূল্যবান জিনিস ছিনিয়ে নেয়। সেদিন সন্ত্রাসীরা আলীনগরের দুই ব্যক্তির পায়ে গুলি করে।
জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক অ্যাডভোকেট আকতার কবির চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘অতীতে চট্টগ্রামে যারা প্রশাসনে ছিলেন, পাহাড় রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন, তাদের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের সন্দেহ ছিল। কিন্তু বর্তমানে যিনি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, তাকে পরিবেশ আন্দোলনের পথিকৃত বলা যায়। অথচ তার আমলে চট্টগ্রামে যে হারে পাহাড় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তা আমাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের আমলে যে হারে পাহাড় নিশ্চিহ্ন হচ্ছে, তা অতীতে অন্য কোনো জেলা প্রশাসকের আমলে হয়েছে কি না, স্মরণে আসছে না। প্রশাসনের অনিচ্ছায় বা প্রশাসনের আশকারা পাওয়া ছাড়া এভাবে পাহাড় কাটা সম্ভব নয়। সেনাবাহিনী সারাক্ষণ প্রশাসনকে সহযোগিতা করছে। প্রশাসন চাইলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিতে পারে। জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ যেসব প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের একটাই কথা- কেউ অভিযোগ করেনি। আমাদের কথা হলো, অভিযোগ করতে হবে কেন? দায়িত্বশীল লোকগুলো কি চোখ বন্ধ করে চলাচল করেন? পাহাড় কাটার কারণে চট্টগ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে। সেটি হলো জলাবদ্ধতা। বালি, পাহাড়, যতই কাটা হবে ততই খাল-নালা ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা হবে। এখানে লক্ষ কোটি টাকা খরচ করলেও কাজ হবে না। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর যারা এসব মনিটরিং করেন, সেই সব দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমিয়ে থাকলে তো হবে না; তাদের ঘুম ভেঙে জেগে উঠে ব্যবস্থা নিতে হবে।’