ভোজ্যতেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। বোতলজাত, খোলা সব ধরনের তেলে ২ টাকা থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথচ নির্ধারিত দামের চাইতেও বেশি দামে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যটি বিক্রি করছেন খুচরা ব্যবসায়ীরা।
গত রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈঠক হয়। বৈঠকে ভোজ্যতেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়। বৈঠক শেষে ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল ওয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে ৬ টাকা বাড়িয়ে ১৯৫ টাকা, খোলা সয়াবিনে ২ টাকা বাড়িয়ে ১৭৬ টাকা ও পাম অয়েলে দাম ১৫০ টাকা থেকে ১৬ টাকা বাড়িয়ে ১৬৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাছাড়া পাঁচ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলে ৩৩ টাকা বাড়িয়ে ৯৫৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল সোমবার থেকে নতুন দাম বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তও হয়েছে।
গতকাল চট্টগ্রাম মহানগরের হালিশহর, কাজীর দেউড়ি, আগ্রাবাদ, নাসিরাবাদ, দুই নম্বর গেট ও নিউমার্কেট এলাকায় সড়কের পাশে ও বিভিন্ন অলিগলির মুদি দোকান সরেজমিন খোঁজ নিয়েছে খবরের কাগজ। সেখানে দেখা গেছে, খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতি লিটার ৫০০ মিলিলিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১০০ টাকা, এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ২০০ টাকা, এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১৮০ টাকা ও পাম অয়েল ১৭০ টাকা দাম চাইছেন, যা সরকার নির্ধারিত দামের চাইতে বেশি।
বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে অধিকাংশ খুচরা ব্যবসায়ী কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। কেউ কেউ বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। তবে নগরের আগ্রাবাদ এলাকার আল মদিনা স্টোরের মালিক মো. নাছির উদ্দিন বলেন, ভোজ্যতেলের সরবরাহে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের বাড়তি দামেই কিনতে হচ্ছে। তাই বাড়তি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে ক্রেতারাও আমাদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন।
জানা গেছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ছে- এমন অজুহাতে গত কয়েক মাস ধরেই তেলের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন ব্যবসায়ীরা। সবশেষ গত ১০ নভেম্বর বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনে চিঠি পাঠিয়ে ব্যবসায়ীরা জানায়, তারা প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৯ টাকা বাড়াবেন। যা ২৪ নভেম্বর থেকে কার্যকরের কথা জানানো হয়। এদিকে কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোয় ক্ষুব্ধ হয় সরকার। গত ৩ ডিসেম্বর সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দীন বলেন, কোম্পানিগুলো একত্রিত হয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে। তারা যা করেছেন, তার আইনগত কোনো ভিত্তি নেই।
ক্ষুব্ধ ভোক্তারা
নগরের পূর্ব নাসিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করেই ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাম বাড়ানোর চেষ্টা নতুন কিছু নয়। কিন্তু তারা এ ধরনের সাহস কোথা থেকে পায়? তারা সরকারকে তোয়াক্কা না করে দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়, পরে তা খুচরা বাজারে কার্যকর হয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষ খুব বিপাকে পড়েন। এখন বিভিন্ন ধরনের ভোজ্যতেলের লিটারে ২ টাকা থেকে ১৬ টাকা বাড়ানো হয়েছে। দুঃখের বিষয়- এর চাইতেও বেশি দাম দিয়ে আমাদের কিনতে হচ্ছে।
নগরের ঈদগাঁ এলাকার বাসিন্দা মো. আবু জাফর বলেন, আধা লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের গায়ে ৯৭ টাকা লেখা আছে। কিন্তু দোকানি আমার কাছ থেকে ১০০ টাকা দাম রেখেছে। মূল বিষয় হলো- বাজার তদারকি ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে না। এ কারণে খুচরা পর্যায়ে কোনো শৃঙ্খলা নেই। যে যেভাবে পারছে সেভাবে বাড়তি দাম আদায় করছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে দাম বাড়ায় কম আয়ের মানুষ আরও চাপে পড়বেন। যখন শাস্তি হবে না, আইন প্রয়োগ হবে না- তখন ভোজ্যতেল আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে দাম বাড়ানোর সাহসটা দেখায়। খুচরা ব্যবসায়ীরাও নিজেদের মতো করে বাড়তি অর্থ আদায় করে। আমরা মনে করি, শৃঙ্খলা ফেরাতে আইন প্রয়োগ এবং কঠোর শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ফয়েজ উল্যাহ বলেন, ‘আমাদের জনবল কম। তবুও আমরা আন্তরিকভাবে ভোক্তার স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছি। নিয়মিত আমাদের অভিযানও চলমান আছে।’