‘এলপি গ্যাস নেই চার দিন ধরে। ডিলাররা ফোন ধরেন না। দোকান বন্ধ করে বসে আছেন। ফোন ধরলেও বলেন যে গ্যাস নেই। কবে পাওয়া যাবে তাও বলতে পারেন না। বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। আমিও দোকান বন্ধ করে বসে আছি।’ রাজধানীর মোহাম্মদপুরের এলপি গ্যাস বিক্রেতা মো. নুরুল মোল্লা এভাবেই এলপি গ্যাসের সংকটের কথা জানান।
তার কথার সত্যতা জানার জন্য পেট্রোম্যাক্সসহ বিভিন্ন কোম্পানির ডিলার মোহাম্মদপুরের এমএন ট্রেডার্সে গতকাল যোগাযোগ করা হলে দেখা যায় দোকান বন্ধ। ফোনে যোগাযোগ করা হলে ম্যানেজার মো. আকাশ আলী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এলপি গ্যাসের অবস্থা খুবই খারাপ। এক সপ্তাহ ধরে সমস্যা চলছে। কিন্তু কয়েক দিন ধরে সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বারবার যোগাযোগ করলেও কোম্পানি থেকে নিশ্চয়তা দিচ্ছে না কবে গ্যাস পাওয়া যাবে। শুধু যে আমার অবস্থা এই রকম তা নয়, সারা দেশের একই চিত্র।’
এলপি গ্যাসের সংকটে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এক রকম হাহাকার পড়ে গেছে। ভোক্তাদের ভোগান্তি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এদিকে তিতাস লাইনের গ্যাসও রাজধানীতে ঠিকমতো পাওয়া যায় না। দিনের বেশির ভাগ সময় মেলে না গ্যাস। চুলায় পাতিল উঠলেও রান্না শেষ হয় না। গ্যাসের সংকটে পড়ে অনেকেই হোটেল থেকে কেনা খাবার খেয়ে দিন পার করছেন।
বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা মহিউদ্দিন আলমগীর খবরের কাগজকে বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন দোকানে বেশি দামে গৃহস্থালির এলপি গ্যাস বিক্রি করতে দেখা যায়। ১২ কেজির এক সিলিন্ডার এলপিজি পাওয়া গেলেও দাম দিতে হয়েছে ১ হাজার ৮০০ টাকা। নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ টাকা বেশি গুনতে হয়েছে। অথচ ডিসেম্বরে সরকার তথা গ্যাসের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গৃহস্থালিতে রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার। ৩৫ কেজির সিলিন্ডার থাকলেও বাসাবাড়িতে তা কমই ব্যবহার করা হয়। হোটেল-রেস্তোরাঁয় অবশ্য ব্যবহার হয়।’
শুধু মোহাম্মদপুর বা বাড্ডা এলাকা নয়, মালিবাগসহ পুরো ঢাকা শহরে দেখা গেছে এলপি গ্যাসের জন্য হাহাকার। মেরুল বাড্ডা থেকে তহিদুর জানান, ২ হাজার টাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।
এদিকে পাইপলাইনে তিতাস গ্যাস সরবরাহ করলেও কয়েক দিন ধরে সংকট দেখা যাচ্ছে। মধুবাগের বাসিন্দা ও গৃহিণী নাসরিন আক্তার খবরের কাগজকে অভিযোগ করে বলেন, ‘চুলায় মাংসের পাতিল বসানো হয়। কিন্তু আড়াই ঘণ্টাতেও রান্না হয়নি। এমনকি শাক রান্নাও শেষ করা যায়নি।’
২০২১ সালের এপ্রিল থেকে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে দেয় বিইআরসি। সর্বশেষ তারা ১২ কেজি এলপিজির দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা নির্ধারণ করে দেয় ভোক্তাপর্যায়ে। কিন্তু বাস্তবে ১২ কেজির সিলিন্ডার ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় এ পরিমাণের গ্যাসের সিলিন্ডার ২ হাজার টাকা, ২ হাজার ২০০ টাকা, কোথাও আরও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। অনেক জায়গায় আবার বাড়তি দাম দিয়েও সিলিন্ডার মিলছে না। এতে বাসাবাড়িতে খাবার রান্না করা নিয়ে ব্যাপক ভোগান্তিতে পড়েছেন এলপিজি ব্যবহারকারীরা। পাইপলাইনের গ্যাস নেই কিংবা চাপ না থাকায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেই অনেকে এলপিজি ব্যবহার করে থাকেন। কয়েক দিন ধরে সংকট চলতে থাকায় বেশি দামে বিক্রি হয়েছে বলে বিক্রেতারা জানান। কিন্তু দুই-তিন দিন ধরে কোথাও এলপিজি মিলছেই না। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রাহকরা।
সূত্র বলছে, শীতের সময় বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যায়। এতে দামও কিছুটা বাড়তি থাকে। এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে এলপিজি আমদানির জাহাজসংকট। নিয়মিত এলপিজি পরিবহনের ২৯টি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়েছে। পরিবহন খরচ বেড়ে গেছে। তার পরও চাইলেই জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আগের মাসের তুলনায় গত মাসে এলপিজি আমদানি কমে গেছে। প্রতি মাসে গড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়। গত ডিসেম্বরে আমদানি করা হয়েছে ৯০ হাজার টন। তাই আমদানি বাড়াতে গত বৃহস্পতিবার এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবকে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। কমিশনের আদেশ অনুসারে, এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ, ডিস্ট্রিবিউটর এবং ভোক্তার কাছে খুচরা বিক্রেতার কোনো পর্যায়েই বাড়তি দামে বিক্রি করা যাবে না। তাই সব পর্যায়ে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সাধারণত ওমান, কাতার, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এলপিজি আমদানি করে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র এলপিজি পরিবহনকারী কয়েকটি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় পরিবহনসংকট দেখা দিয়েছে। ফলে কিছু কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না, যা বাজারে ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট স্বল্পমেয়াদি নাকি দীর্ঘমেয়াদি, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ বসুন্ধরা, বেক্সিমকোসহ অনেক কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ রয়েছে।
গ্যাসের সংকটের ব্যাপারে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘একেবারে এলপিজি না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে আগের মতো চাহিদা অনুযায়ী পাওয়া যাবে না। এটাও স্বাভাবিক। কারণ বসুন্ধরা, বেক্সিমকোসহ কয়েকটি কোম্পানির এলপিজি আমদানি বন্ধ রয়েছে। আমরা পাঁচ থেকে সাতটি কোম্পানি আমদানি করে বাজারজাত করছি। তাই সরকার আমদানি বাড়াতে তাগিদ দিয়েছে। আমরা সেই চেষ্টায় আছি।’
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘চাইলেই হঠাৎ করে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব না। প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে এলপিজি আসে। তারপর আমরা ডিলারদের কাছে সরবরাহ করি। এ জন্য হঠাৎ করেই সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব না। সে পর্যায়ে আসতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে। যারা বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করছে তাদের ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হতে হবে, তাদের ধরতে হবে।’
লোয়াবের সহসভাপতি ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের মূল সমস্যা দুটি—একদিকে সোর্স থেকে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে জাহাজও পাওয়া যাচ্ছে না। এ জন্য আগে ১ লাখ ৩০ হাজার টন আমদানি হলেও গত মাসে কমে ৯৬ হাজার টনে নেমেছে। এ সুযোগ নিচ্ছে দুষ্টচক্র। বেশি দামে বিক্রি করছে।’ পরিস্থিতি কীভাবে স্বাভাবিক হবে–এ ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘বিকল্প উৎস থেকে এলপিজি আনার পাশাপাশি জাহাজ খোঁজার চেষ্টা চলছে। আশা করি চলতি মাসের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। আমাদের মাসে চাহিদা দেড় লাখ টন হলেও সক্ষমতা রয়েছে তিন লাখ টনের।’
অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধিতে ক্যাবের তীব্র প্রতিবাদ
এলপিজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। একই সঙ্গে এই মূল্য কারসাজির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ক্যাব জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বাজারে এলপিজি, সয়াবিন ও পাম তেলের দামে ধারাবাহিক বৃদ্ধি সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে চরম হতাশা, উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। সরকার ও বিইআরসির নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে। চাহিদা বৃদ্ধির অজুহাতে আমদানিকারক ও পরিবেশকদের একটি অংশ বাজারে কারসাজি করছে। এটি বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও কার্যকর নজরদারির অভাবেরই প্রতিফলন।