গণভোট সামনে রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে দেশজুড়ে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মাঠ প্রশাসনে দায়িত্বরত একাধিক জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
গণভোটের প্রচারের শুরু থেকেই সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালায়। একপর্যায়ে গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিতদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’র পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রচার চালানোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে।
ইসির নিষেধাজ্ঞার পরও সচিবালয়ের বিভিন্ন ভবন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের ৪ নম্বর ভবন এবং তথ্য অধিদপ্তর ভবনের সামনেও গতকাল দেখা গেছে ‘হ্যাঁ’ ব্যালটে ভোট দেওয়ার আহ্বানসংবলিত প্রচারসামগ্রী। গতকাল রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সচিবালয়ে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে।
গত ১৮ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মো. সারওয়ার মোর্শেদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গণভোট ২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরকে তাদের সেবাগ্রহীতা এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
এই নির্দেশনার আওতায় সরকারের প্রায় ২০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত পদসংখ্যা ১৯ লাখ ১৯ হাজার ২১১) গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত করা হয়। সচিব থেকে শুরু করে প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারী পর্যন্ত সবাইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি অর্ধশিক্ষিত, কম শিক্ষিত ও অশিক্ষিত জনগণের কাছেও গণভোটের বিষয়টি সহজ ভাষায় তুলে ধরতে। প্রচারে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং ‘না’ ভোট দিলে কোন বিষয়গুলো অর্জিত হবে না, তা ব্যাখ্যা করার জন্য বলা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করা কেন গুরুত্বপূর্ণ, জনগণ তা যথাযথভাবে বুঝতে পারছেন কি না, এ নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। সে কারণেই সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে গণভোটের প্রচারে। এই কার্যক্রম কতটা অগ্রসর হচ্ছে, তা নজরদারিতে রাখতে অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবদের সমন্বয়ে ৩১টি মনিটরিং টিম গঠন করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নির্দেশনার পরও সরকারি কর্মচারীরা সরকারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে জেতাতে প্রচারে রয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি কর্মচারীরা সরাসরি কাউকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ বা প্রভাবিত করছেন না। তবে সভা-সমাবেশ, ভোটার গাড়ি, ডকুমেন্টারি কিংবা আঞ্চলিক গান ব্যবহার করে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে এবং ‘না’ ভোট দিলে কী পরিবর্তন আসবে না–এসব বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা হচ্ছে।
‘হ্যাঁ’ বা ‘না’র পক্ষে প্রচার না চালাতে ইসির সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করে মাঠ প্রশাসনে কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে ঊর্ধ্বতন এই কর্মকর্তা বলেন, তফসিল ঘোষণার পর থেকে সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও মাঠ প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনেই কাজ করে। ইসি যে নির্দেশনা দেয়, তা মানাই সরকারের দায়িত্ব। ফলে আলাদা করে নতুন কোনো চিঠি দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি।
গণভোটের প্রচারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাও ছিল সক্রিয়। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন যেন উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, এ লক্ষ্যেই জনসচেতনতা বাড়ানোর নির্দেশ ছিল। তিনি বলেন, সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের আহ্বান না জানিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন টিভিসি ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়েছে। এসব প্রচারে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ড, সীমান্তে ফেলানী হত্যার মতো ঘটনাসহ শহিদ আনাসের মায়ের লেখা বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান বলেন, মন্ত্রণালয়ের অধীনে সুপার ক্যারাভান ও ক্যারাভানসহ মোট ৪০টি গাড়ির মাধ্যমে ৩৭০টি উপজেলা ও দেশের প্রায় সব ইউনিয়নে গণভোট বিষয়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। প্রচারের সময় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেওয়ার সরাসরি আহ্বান না জানিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী পরিবর্তন আসতে পারে এবং ‘না’ ভোট দিলে কী পরিবর্তন হবে না, তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তিনি জানান, সরকারের দেওয়া দায়িত্ব অনুযায়ী ৩১ জানুয়ারি এই প্রচার কার্যক্রম শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আর গণভোটের প্রচারে যুক্ত নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, গণভোটে উপদেষ্টাদের একটি পক্ষে সমর্থন দেওয়া নৈতিকভাবে ঠিক হয়নি। যদিও আইনে কোনো বাধা নেই। তবে সরকারের উপদেষ্টারা যেহেতু ‘হ্যাঁ’কে জয়ী করতে প্রচার করছেন, তাই সুষ্ঠু ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও ভবিষ্যতে এই ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
সচিবালয়ের ভবনগুলোতে ব্যানার প্রদর্শনের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক এ সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো সরকারি ভবনে প্রচারের উদ্দেশে টাঙানো এসব ব্যানার দ্রুত সরিয়ে ফেলা উচিত। কারণ এতে সাধারণ মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে বিভ্রান্ত হতে পারেন।