দেড় বছরের বেশি সময় ধরে পুরো দেশ বা জাতি যেন অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। সবখানে ছিল নানা অস্থিরতা, শঙ্কা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সেখানে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সব ধোঁয়াশা কেটে গেছে। জনগণের মাঝে ফিরে এসেছে স্বস্তি। আজ মঙ্গলবার নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের (এমপি) শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে আরেকটি ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সংসদ সদস্যদের শপথের সঙ্গেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ সম্পন্ন করা হবে।
ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিরা। নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যোগ দিতে ঢাকায় এসেছেন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান বা সরকারের প্রতিনিধিরা। এ শপথ ঘিরে সংসদ ভবন এলাকা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ আশপাশে নেওয়া হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে দেশে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছিল চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, অবিশ্বাস-আস্থাহীনতা, বিভিন্ন আন্দোলন, মব সন্ত্রাসসহ নানা প্রেক্ষাপট। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে জুলাই অভ্যুত্থানের পর বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এবারের ভোট এবং গঠন হতে যাওয়া নতুন সরকারের দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি রেখেছে সারা বিশ্ব। সংসদের যে স্থবির অবস্থা ছিল, সেটিও কেটে গিয়ে প্রান্তবন্ত হবে। এতে দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়ন গতিশীল হবে।
সাধারণত নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে এবার সেই রীতি বা প্রথা ভেঙে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনে বা সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে। শপথের স্থান বদল হলেও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফলে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
বঙ্গভবনের পরিবর্তে সংসদ ভবন এলাকায় শপথের আয়োজনের কারণ জানিয়ে গত রবিবার অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছিলেন, ‘নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী বিএনপির অভিপ্রায়ে সংসদ ভবন প্রাঙ্গণে শপথের আয়োজন করা হচ্ছে।’
আজ নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিদের শপথ
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ায় দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিনের অন্তরালে যাওয়া এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় নতুন এমপিদের শপথ পড়ানোর বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। তবে গতকাল নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে জানানো হয়েছে, এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী এমপিদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।
গতকাল সোমবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ জানান, নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ পড়ানোর জন্য সংসদ সচিবালয়ের পক্ষ থেকে সিইসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে সিইসিকে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সরকার গঠন করতে যাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকে গতকাল বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সংসদ ও সরকার গঠন হতে যাচ্ছে। এ জন্য আজ (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে দলীয় এমপিরা শপথ নেবেন। পরে সংসদ সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর নামের প্রস্তাব গৃহীত হবে। সে অনুসারে বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকায় বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান বা প্রতিনিধিরা
নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সার্কভুক্ত দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান বা তাদের প্রতিনিধিরা ঢাকায় এসেছেন। শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য মোট ১৩টি দেশের সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকছেন এমন উল্লেখযোগ্য বিদেশি অতিথিরা হলেন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা (প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতিনিধি হিসেবে), পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল, শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. নলিন্দ জয়তিসসা, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মা, যুক্তরাজ্যের ইন্দো-প্যাসিফিকবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি সীমা মালহোত্রা প্রমুখ। এ ছাড়া চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের প্রতিনিধিরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এর বাইরেও ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা ওই শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
সংসদ ভবন ঘিরে নিরাপত্তা বলয়
আজ নতুন সরকার ও নবনির্বাচিত এমপিদের শপথ ঘিরে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংসদ ভবন ছাড়াও মানিকমিয়া অ্যাভিনিউ, চন্দ্রিমা উদ্যান এলাকা, মিরপুর রোডের আসাদ গেট, কলেজ গেট ও ধানমন্ডি এলাকায় গতকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গতকাল সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও সামনের মাঠসহ আশপাশে সেনাবাহিনীকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। ওই এলাকায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়তে নানা রকম তল্লাশি ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছিল। পাশাপাশি ওই এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়া আজ সেখানে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সেরও (এসএসএফ) নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। সব মিলে শপথ অনুষ্ঠান ঘিরে ওই এলাকায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
ইতিহাস গড়বেন তারেক রহমান
জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপির নেতৃত্বে আজ নতুন সরকার গঠিত হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে আরেকটি রেকর্ড বা ইতিহাস সৃষ্টি হবে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে জিয়া পরিবারের তিনজন সদস্য পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের গুরুদায়িত্ব পালনকারী হবেন, অর্থাৎ বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সদ্য প্রয়াত মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর এবার নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন তাদের ছেলে তারেক রহমান।
ফিরে দেখা দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন
মাত্র দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) টানা চতুর্থবারের মতো জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছিল। পরে ১০ জানুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন এবং পরের দিন ১১ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেয়। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল ব্যাপক বিতর্কিত। রাতের ভোট বা ‘ডামি’ প্রার্থীসহ নানা রকম কথা বা সমালোচনা হয় ওই নির্বাচন নিয়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের যে কয়েকটি মর্যাদাপূর্ণ স্থাপনায় অরাজকতা চালানো হয়েছিল, তার মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবন অন্যতম।
প্রসঙ্গত, সংবিধান অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের তিন দিনের মধ্যে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) গত শুক্রবার রাতে ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৭টিতে বিজয়ীদের গেজেট প্রকাশ করে। আর উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসনের ফলাফল স্থগিত রেখেছে সংস্থাটি।