মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যরা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক শ্রমিকের বেকার হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার অন্তত ১০ প্রবাসীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে খবরের কাগজ। প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা এখন সেখানকার যুদ্ধ নিয়ে উৎকণ্ঠিত। সবার মাঝে দুশ্চিন্তা। এই দুশ্চিন্তা শুধু মৃত্যু ভয়ের নয়। অনেকের আছে চাকরি হারানোর শঙ্কা। ফটিকছড়ি পৌরসভার বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী মো. আজম রিটার্ন টিকিট নিয়ে দেশে এসেও যুদ্ধের কারণে যেতে পারেননি। এদিকে তার ভিসার মেয়াদও শেষ হতে চলেছে। তিনি কয়েকদিনের মধ্যে যেতে না পারলে আর যেতে পারবেন না। শনি ও রবিবার চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী ১০টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
মোবাইল ফোনে কথা হয় মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম মার্কিন ঘাঁটি আল উদেইদের অদূরে একটা রেস্টুরেন্টের কর্মচারী মো. রায়হানের সঙ্গে। রায়হান চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া উপজেলার বাসিন্দা। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) মাগরিবের আজানের সময় ইফতার করতে বসি, তখন আল উদেইদ ঘাঁটিতে একের পর এক মিসাইল আছড়ে পড়ছিল। মিসাইলের বিকট শব্দে এবং বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। একটি মিসাইল ঘাঁটির বাইরে এসে একটি গাড়ির ওপর পড়ে বিস্ফোরিত হয়। আমরা দ্রুত ইফতার শেষ করে নিরাপদ কোনো আশ্রয়ে যাব, না রেস্টুরেন্টেই থাকব, নিরাপত্তার জন্য কি করব বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল মৃত্যু খুব কাছে চলে এসেছে। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে।’
আলাপকালে রায়হান জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি না থেকেও তিনিসহ তার আশপাশের শতাধিক বাংলাদেশি প্রচণ্ড ভয়ের মধ্যে আছেন। কখন কোন দিক থেকে মিসাইল কিংবা ড্রোন উড়ে এসে বিস্ফোরণ ঘটাবে, তা নিয়ে সবাই শঙ্কিত। তবে তার চেয়েও বেশি উৎকণ্ঠায় আছেন তাদের পরিবার-পরিজনরা। রায়হান একথা উল্লেখ করে জানান, দিনে অনেকবার ফোন আসছে বাংলাদেশ থেকে। পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজনরা আমাদের খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।
আবুধাবিতে থাকেন ফটিকছড়ি পৌরসভার বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন। খবরের কাগজকে মুঠোফোনে তিনি জানান, সেখানে বেশ কয়েকবার মিসাইল হামলা হয়েছে। যতবার মিসাইল আঘাত হেনেছে ততবারই মনে হয়েছে ভূমিকম্প হচ্ছে। মিসাইলের আঘাতে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। বাংলাদেশ থেকে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়-স্বজনরা একাধিকবার ফোন করে তাদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাড়িতে বলে দিয়েছি দুশ্চিন্তা না করতে।’
ফটিকছড়ি পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দৌলত মিয়া খবরের কাগজকে জানান, তার তিন ভাই এবং ভাইপো থাকে আরব আমিরাতে। যুদ্ধের দামামা যেভাবে বাজতে শুরু করেছে তাতে তাদের পরিবারের সবাই চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছেন। তারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছেন যেন প্রবাসে থাকা তার পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিরাপদ থাকেন।
আরব আমিরাতে থাকেন ফটিকছড়ির বাসিন্দা এনামুল হক। মুঠোফোনে তিনি খবরের কাগজকে জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে সংশ্লিষ্ট দেশে দায়িত্বরত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো। সতর্ক বার্তায় সামরিক স্থাপনা ও সংবেদনশীল এলাকা থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে। অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের না হওয়া এবং নিরাপদ স্থানে অবস্থানের নির্দেশনা রয়েছে। গুজব ছড়ানো বা ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা এবং জমায়েত, সভা-সমাবেশ এড়িয়ে চলা, সবসময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সামগ্রী হাতের কাছে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ওই বার্তায়।
দুবাইয়ের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও রাঙ্গুনীয়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সৈয়দ বাড়ির বাসিন্দা কোরবান আলী সিআইপি খবরের কাগজকে বলেন, এই যুদ্ধ বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের জন্যই একটা ভয়াবহ উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরতা, রিজার্ভ স্বল্পতা, অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বাংলাদেশি নাগরিকের অবস্থানের কারণে চলমান সংঘাত বাংলাদেশের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
ম্লান হতে পারে ঈদ-আনন্দ
রোজার ঈদে চট্টগ্রামের গ্রামীণ অর্থনীতি বেশ চাঙা হয়ে ওঠে। প্রধান ভূমিকা রাখেন প্রবাসীরা। তারা নিজে খেয়ে, না-খেয়ে পরিবারের আনন্দের জন্য ঈদের আগে পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা পাঠান। পরিবারের সব সদস্যের জন্য নতুন জামা-কাপড় কেনা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা চলে। এবার যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেক প্রবাসী। তারা জানান, যারা দৈনিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন যুদ্ধের কারণে তাদের অনেকেই বাসা থেকে বের হতে পারছেন না। আয় বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এর প্রভাব পড়বে ঈদে। কারণ অনেক প্রবাসী ঈদের আগে বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারবেন না। তাতে ম্লান হবে স্বজনদের ঈদের আনন্দ।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক (অফিস প্রধান) মহেন্দ্র চাকমা খবরের কাগজকে জানান, চট্টগ্রাম থেকে প্রতিবছর ৬৫ থেকে ৭০ হাজার শ্রমিক যান। বেশির ভাগই যান মধ্যপ্রাচ্যে। সরকার প্রবাসীদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখছে।