মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেল-গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলেও চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশেও। দেশে ভোক্তাদের মধ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে শুরু হয়েছে আতঙ্ক, হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চাপ পড়েছে মজুতের ওপর। তেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে দেশের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আমদানিও হচ্ছে। তবে গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ কমছে না।
বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি পেট্রলপাম্প বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও কালোবাজারে বেশি দামে তেল বিক্রির ঘটনাও ঘটছে। আবার কিছু অসাধু ব্যবসায়ী পাম্প থেকে তেল সরিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। গত বুধবার থেকে দেশের বিভিন্ন পাম্পে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পাম্পগুলোতে তেলের চাহিদা হঠাৎ করে দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে গেছে। অনেক স্থানে এক থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। গত তিন দিনে অনেক মানুষ তেল না পেয়ে পাম্প থেকে ফিরে গেছেন। তেল ঘিরে উত্তেজনাও বাড়ছে। কোথাও কোথাও হাতাহাতির ঘটনাও দৈনন্দিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঝিনাইদহে পাম্পকর্মীর মারধরে এক মোটরসাইকেলচালকের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
এদিকে বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রবিবার থেকে প্রতিদিন প্রায় ৯১৩ টন করে অকটেন সরবরাহ করা হচ্ছে। বর্তমানে অকটেনের মজুত রয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৫৫ টন। এই হারে সরবরাহ চললে প্রায় ২৫ দিনের মতো অকটেন দিয়ে চাহিদা মেটানো সম্ভব।
দেশে পেট্রলের দৈনিক গড় চাহিদা প্রায় ১ হাজার ৩০০ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন, যা দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টনের সমান। বর্তমান হিসাবে দেশে ডিজেলের মজুত প্রায় ১১ দিনের চাহিদা পূরণের মতো এবং পেট্রলের মজুত প্রায় ১২ দিনের জন্য যথেষ্ট। তবে প্রতিবেশী ভারতসহ অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জ্বালানি মজুত সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম।
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সরবরাহ করা হয়। কিছু পরিশোধিত তেল আসে ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।
সরকার জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানি বাড়িয়েছে সরকার। চট্টগ্রাম বন্দরে তেল ও গ্যাস নিয়ে মোট ১০টি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। এসব জাহাজে পৌনে চার লাখ টন জ্বালানি রয়েছে। এর মধ্যে কাতার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে দুটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে। এ ছাড়া আজ সোমবার আরও দুটি জাহাজ বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে।
এদিকে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে, তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি সরবরাহ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম আমদানি করা হয়, সেসব অঞ্চলে সংঘাত চলায় সরবরাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং মজুত তেল সাশ্রয়ীভাবে ব্যবহারের জন্য রেশনিং পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ইতোমধ্যে সমুদ্রে থাকা কয়েকটি তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এসব জাহাজ থেকে তেল খালাস শুরু হলে দেশের জ্বালানি মজুত আরও বাড়বে। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশের কিছু পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ লাইনের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তবে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল মজুত করার কোনো প্রয়োজন নেই। সরকার আপাতত জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাই দাম বাড়ার আশঙ্কায় বাড়তি তেল সংগ্রহ না করার জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যদি কোনো কারণে তেল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটে বা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে দেশের শিল্প উৎপাদন, পরিবহনব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় বড় ধরনের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে কৃষি, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তেলের ওপর নির্ভরশীল বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এদিকে এলপিজি খাতেও সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কা রয়েছে। দেশে বছরে প্রায় ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি প্রয়োজন হয়, যা পুরোপুরি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণে তেল বিক্রি হয়েছে। অপচয় ও পাচার রোধে সাময়িকভাবে ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেল নিয়ে আতঙ্কের কারণ নেই। নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি জানান, প্রয়োজনে শনিবারও ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে বিপিসির চিঠিতে বলা হয়, দেশে জ্বালানি তেল বিপণন পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক সংবাদ প্রচারের ফলে ভোক্তাদের মধ্যে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে চাপ বাড়ছে।
বিপিসি জানায়, ভোক্তাদের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ডিলাররা আগের তুলনায় বেশি পরিমাণ জ্বালানি তেল ডিপো থেকে সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি কিছু ভোক্তা প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি তেল কিনে অননুমোদিতভাবে মজুত করার চেষ্টা করছেন বলেও বিভিন্ন মাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে ক্রেতাদের সঙ্গে কর্মচারীদের মধ্যে অনভিপ্রেত ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে চিঠিতে।