প্রায় ছয় মাস ধরে শূন্য পড়ে আছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর অন্যতম এপিডি (অ্যাপয়েনমেন্ট, পোস্টিং অ্যান্ড ডেপুটেশন বা নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ) পদ। এটি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদ।
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ এই পদ দীর্ঘদিন খালি থাকায় দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে যথেষ্ট জটিলতা পোহাতে হয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত চলতি সপ্তাহে এপিডি পদে নিয়োগের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এপিডি পদ শূন্য থাকলেও একই সময়ে প্রশাসনে একদিকে বড় আকারের রদবদল এবং অন্যদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার কাজ থেমে থাকেনি। এর মধ্যে কিছু চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে নতুন চুক্তিতে সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ফলে প্রশাসনে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, উঠেছে নানা প্রশ্ন। প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।
প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের ১০ অক্টোবর মো. এরফানুল হককে বদলির পর থেকেই এপিডি পদটি শূন্য রয়েছে। দীর্ঘ এই সময়েও সরকার স্থায়ীভাবে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ এ পদটিতে নিয়োগ দিতে পারেনি। ফলে এপিডির মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বর্তমানে সিনিয়র সচিব এহছানুল হক নিজেই সামলাচ্ছেন। অথচ এই অনুবিভাগ থেকেই সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে খুলনার বিভাগীয় কমিশনার মো. ফিরোজ সরকারকে এ পদে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের আপত্তির মুখে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরে ফিরোজ সরকারকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে এপিডি পদটি ফাঁকাই থেকে যায়। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১ ডিসেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. ফিরোজ সরকারকে পদোন্নতি দিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে নিয়োগ দেয় সরকার।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি আস্থাহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ‘পছন্দের কর্মকর্তা’ বসানোর প্রতিযোগিতার কারণেও এই পদে নিয়োগ আটকে এখনো ঝুলে আছে। পাশাপাশি এপিডি পদে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সিনিয়র সচিবের অনাগ্রহ নিয়েও আলোচনা রয়েছে প্রশাসনে।
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর এপিডি পদ ঘিরে ‘প্রতিযোগী’দের মধ্যে নতুন করে দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। প্রশাসনের ২০তম ব্যাচের অন্তত সাত-আটজন কর্মকর্তা এই পদ পেতে সক্রিয় তদবির করছেন বলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মাঝে গুঞ্জন রয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের একজন অতিরিক্ত সচিব এ দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, একই ব্যাচের আরেক কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিতে সরকারের আগ্রহ রয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, সম্ভাব্য প্রার্থীদের শিক্ষা, চাকরিজীবন ও পারিবারিক বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই এপিডি পদে নিয়োগ হতে পারে এমন সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে এপিডি পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে যেমন স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তেমনই পদোন্নতি ও পদায়ন প্রক্রিয়া ধীর হওয়ার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের মাঝে বেড়েছে অসন্তোষও। পাশাপাশি অনেক কর্মকর্তা আবার বিতর্ক এড়াতে এই পদে বসতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক একজন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব খবরের কাগজকে বলেন, এপিডি পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এপিডি প্রশাসনের উপসচিব পদের কর্মকর্তা এবং মাঠ প্রশাসনের সব পদে পদায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ পদটিতে সাধারণত চৌকস নবীন কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি সমপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চেনেন এবং জানেন। এ কারণেই অনেক যাচাই-বাছাই শেষে এপিডি পদে একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। কারণ এপিডি সরাসরি মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে যেগাযোগ রাখেন এবং দায়িত্ব পালনরত প্রায় সব কর্মকর্তাকে সরাসরি জানেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বর্তমান সিনিয়র সচিব এখন এই পদটিতে দেখভাল করছেন। অনেক আগে অবসরে যাওয়া এই প্রজ্ঞাবান সচিবের সঙ্গে এখন মাঠ কর্মকর্তাদের কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে। তার পক্ষে দায়িত্ব বণ্টনের সময় দায়িত্বশীল অনেক চৌকস কর্মকর্তাকে যথাযথ অবস্থানে পদায়ন করা অনেক সময়ই সম্ভব হয়ে উঠবে না। তা ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ এই পদটি দীর্ঘদিন খালি রাখায় নতুন সরকারের আমলে মাঠ প্রশাসনের কর্মকাণ্ড আরও গতিশীলতা দাবি করে।
এদিকে এর মধ্যেই গত ২৫ মার্চ মধ্যরাতে ১২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বড় ধরনের রদবদল করেছে সরকার। ৯ জনকে পদোন্নতি দিয়ে সচিব করা হয়েছে এবং ৩ জন সচিবের দপ্তর বদল করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ জন সচিবকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে এস এম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব করা হয়েছে। মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়াকে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, ইয়াসমিন পারভীনকে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মোখতার আহমদকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া একাধিক সচিবের চুক্তি বাতিল করে। তবে পরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার ও কৃষি এই চার মন্ত্রণালয়ে নতুন করে চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল, অন্যদিকে নতুন চুক্তিতে নিয়োগের ফলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনের নিয়মিত কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক পদোন্নতি ও নিয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আবার একই সঙ্গে শীর্ষ থেকে একবারে নিচের দিকের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, একটি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পরবর্তী কয়েকটি ধাপের স্বাভাবিক পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
এপিডি পদটি দীর্ঘদিন শূন্য থাকার প্রভাব সম্পর্কে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, কোনো কর্মকর্তা যদি এই পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেন, তবে সমস্যা নেই। কারণ অনেক সময় যোগ্য কর্মকর্তা পাওয়া এবং বিতর্কিত নয় এমন কর্মকর্তা পেতে সময় লাগে।
সাবেক এই সচিব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এপিডি ও যুগ্ম সচিব পদের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির কথা শোনা গেছে। যেহেতু অনেক বিতর্ক হয়েছে, তাই সরকার হয়তো ‘দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো’ এই নীতি অনুসরণ করছে। তাই বিতর্ক ও দুর্নাম কাটানোর জন্য হয়তো সরকার একটু সময় নিচ্ছে।
তবে পদ শূন্য থাকা উচিত নয় জানিয়ে আব্দুল আউয়াল মজুমদার বলেন, সতর্ক হয়ে এই পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এতে প্রশাসনে গতিশীলতার প্রবাহ ঠিক থাকে।