নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্র্যান্ড ফুডেলা সয়াবিন তেলের একটি সিল করা বোতলের ভেতরে মাছি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। এতে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ভোক্তাদের মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
পারিলা বাজারের ভুক্তভোগী ক্রেতা শাহরিয়ার সায়েম বলেন, ‘গত শনিবার পারিলা বাজারের রবিউল স্টোর নামে মুদি দোকান থেকে দুই লিটারের একটি ফুডেলা সয়াবিন তেলের বোতল কিনি। বাড়িতে নিয়ে ব্যবহারের প্রস্তুতির সময় আমার মা বোতলের ভেতরে একটি মৃত মাছি দেখতে পান। বিষয়টি দেখে তিনি অবাক হয়ে আমাকে জানান। পরে প্রমাণ হিসেবে বোতলটি আর খুলি নাই।’
- রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নে ফুডেলা সয়াবিন তেলের একটি সিল করা বোতলের ভেতরে মৃত মাছি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা স্থানীয়ভাবে উদ্বেগ ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
- ভুক্তভোগী ক্রেতা বোতলটি না খুলেই প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করেছেন; দোকানদাররা বলছেন, আগে এমন ঘটনা ঘটেনি এবং এতে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
- সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ (ভোক্তা অধিকার, বিএসটিআই, স্বাস্থ্য বিভাগ) জানিয়েছে- লিখিত অভিযোগ ও নমুনা পেলে তদন্ত, ল্যাব পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্ট দোকানের মালিক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কার্টনে সাধারণত ছয়টি বোতল থাকে। আমরা ডিলারের মাধ্যমে পণ্য এনে খুচরা বিক্রি করি। সম্প্রতি একটি বোতলের ভেতরে মাছি বা পোকা পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এর আগে কখনো এমন কোনো অভিযোগ পাইনি। আমরা গ্রাম এলাকায় ছোট পরিসরে ব্যবসা করি। আর গ্রামের ব্যবসা বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই এমন একটি ঘটনায় এলাকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’
ওই বাজারের অপর এক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গ্রামে সবাই একে অপরকে চেনেন। তাই এমন ঘটনায় ক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেকেই এখন গ্রামের দোকান থেকে পণ্য কিনতে ভয় পাচ্ছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত কারণ উদঘাটনে দ্রুত তদন্ত হওয়া জরুরি। এতে প্রকৃত দোষী চিহ্নিত হবে এবং আমাদের মতো সাধারণ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে।’
স্থানীয় কয়েকজন ক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাজারে নানা ব্র্যান্ডের ভোজ্যতেল থাকলেও এ ধরনের ঘটনা ভোক্তাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কেননা আমরা যেসব পণ্য কিনি, সেগুলো নিরাপদ হবে—এটাই প্রত্যাশা। এমন ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক।
নাম প্রকাশ না করে স্থানীয় এক যুবক বলেন, স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন ও বোতলজাত করা হলে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয়। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নেওয়ার পর অধিক মুনাফার আশায় স্থানীয়ভাবে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদন ও বোতলজাত না করলে এমন ঘটনা ঘটার কথা নয়।
এ বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজশাহী জেলার সহকারী পরিচালক বিপুল বিশ্বাস বলেন, ‘ভুক্তভোগী যদি লিখিত অভিযোগ দেন এবং প্রমাণাদি উপস্থাপন করেন, তাহলে আমরা ওই কারখানা পরিদর্শনের মাধ্যমে বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
তিনি আরও জানান, এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জরিমানা থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের বক্তব্য
রাজশাহী জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আব্দুল হান্নান বলেন, সিল করা বোতলের ভেতরে মাছি পাওয়া যাওয়া একটি স্পষ্ট দূষণের ঘটনা। আর দূষিত তেল ব্যবহারে খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি থাকে। মাছির মাধ্যমে ক্ষতিকর জীবাণু ছড়িয়ে মানবদেহে বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হলে প্রথমে স্যাম্পলিং ও ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বোতলটি প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করা এবং একই দোকান থেকে একই ব্র্যান্ডের আরও কয়েকটি বোতল সংগ্রহ করে পরীক্ষায় পাঠানো প্রয়োজন, যাতে পুরো লটটি দূষিত কি না, তা নির্ণয় করা যায়। এ ধরনের বিষয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আওতায় পড়ে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার রিপোর্ট দেবে। রিপোর্টে ভেজাল বা দূষণের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আব্দুল হান্নান আরও বলেন, বোতলে বিএসটিআইয়ের সিল থাকলে সাধারণত সেটিকে নিরাপদ ধরা হয়। কিন্তু দৃশ্যমানভাবে মাছি থাকার কারণে এই পণ্যকে আর নিরাপদ বলা যায় না। এ ক্ষেত্রে কীভাবে এমন পণ্য বাজারে এল, তা তদন্ত করা বিএসটিআইয়ের দায়িত্ব। তবে তার আগে প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্ট লট শনাক্ত করে বাজার থেকে ওই পণ্য প্রত্যাহার ও বিক্রি বন্ধে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া যেতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় জরুরি।
বিএসটিআই কর্মকর্তার বক্তব্য
বিএসটিআই বিভাগীয় অফিস রাজশাহীর সহকারী পরিচালক (মেট্রোলজি) মো. আজিজুল হাকিম বলেন, ‘সয়াবিন তেল একটি মাননিয়ন্ত্রিত পণ্য। এ ধরনের পণ্য বাজারজাতের আগে নির্ধারিত বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করে সার্টিফিকেশন নিতে হয়। পাশাপাশি বিএসটিআই নিয়মিতভাবে বিভিন্ন স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে এবং সেই অনুযায়ী মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। কিন্তু বাজার থেকে কেনা একটি সয়াবিন তেলের সিল করা বোতলের ভেতরে মাছি বা পোকা পাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যাচের পণ্যের নমুনা বাজার থেকে সংগ্রহ করব ও ল্যাবে পরীক্ষা করব। পরীক্ষার ফলাফলে গুণগত মানে কোনো ব্যত্যয় প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিএসটিআই সরাসরি নির্ধারণ করে না। আমরা পণ্যের মান যাচাই করি; স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মূল্যায়ন করবেন।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় সামান্য ত্রুটিও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সিল করা বোতলের ভেতরে এ ধরনের দূষণ পাওয়া গেলে তা উৎপাদন পর্যায়ের গাফিলতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, সিল করা ভোজ্যতেলের বোতলের ভেতরে মাছি পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা। এ ধরনের দূষণ খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে। কেননা মাছি বা এ ধরনের পোকামাকড় খাদ্যে জীবাণু বহন করতে পারে, যা মানবদেহে প্রবেশ করলে খাদ্যবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও তদারকি সংস্থাগুলোর আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়া জরুরি, যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং ভোক্তাদের আস্থা অটুট থাকে।
নাবিল গ্রুপের বক্তব্য
সার্বিক বিষয়ে জানতে নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কৃষিবিদ আমিনুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকায় মিটিংয়ে আছেন জানিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
পরে নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের হেড অব মার্কেটিং মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ফুডেলা সয়াবিন তেল আমাদের চট্টগ্রামের কারখানায় অত্যন্ত আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদন ও বোতলজাত করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি উচ্চমাত্রার স্বাস্থ্যসম্মত (হাইজিনিক) পরিবেশে পরিচালিত হয়, যেখানে এ ধরনের কোনো দূষণ হওয়ার কথা নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘সিল করা একটি বোতলের ভেতরে মাছি পাওয়ার ঘটনাটি স্বাভাবিক নয় এবং এটি কীভাবে ঘটেছে, তা অবশ্যই তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যদি তদন্ত ও পরীক্ষার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো ব্যাচ বা লটে ত্রুটি প্রমাণিত হয়, তাহলে ভোক্তাদের নিরাপত্তা ও আস্থা বজায় রাখতে সেই লটের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার (উইথড্র) করা হতে পারে—এটাই আমাদের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।’