ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মহেশখালীতে হিটস্ট্রোকে জেলের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: ইসরায়েলের হাতে বিকল্প কী লতাপাতায় ঢাকা ২ কোটি টাকার সেতু, পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি প্রকল্প গরমে কমেছে কাজের গতি নিজেই নিজেকে গড়ছে এআই, শঙ্কা অ্যানথ্রোপিকের বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দিনাজপুরের: সুই-সুতো আর কি-বোর্ডে নির্যাতিত নারীদের নতুন স্বপ্ন পুতিনকে আলোচনায় বসতে জেলেনস্কির খোলাচিঠি রাজশাহী অঞ্চলে তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতাপার্টির’ বিক্ষোভ আজ ইসলামী ব্যাংকের কারণেই আরেকটি ৫ আগস্ট ঘটে যেতে পারে বায়ুদূষণে বদলে যাচ্ছে ভ্রূণের জিন জলাবদ্ধতা ও দুর্গন্ধে নাকাল ঘিওর বাজার ছায়ানটে শুরু হলো দুই দিনের নজরুল উৎসব রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে ৬ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ৬ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল মে মাসে মব হামলায় নিহত ৩২: এমএসএফ ‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের
Nagad desktop

দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ইসলামী ব্যাংক-সংক্রান্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এস. আলম গ্রুপকে জড়িয়ে উপস্থাপিত বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতিবাদে এস. আলম গ্রুপের বক্তব্য

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১১:০৬ এএম
আপডেট: ১৭ মে ২০২৬, ১১:২৪ এএম
দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত ইসলামী ব্যাংক-সংক্রান্ত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এস. আলম গ্রুপকে জড়িয়ে উপস্থাপিত বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রতিবাদে এস. আলম গ্রুপের বক্তব্য
এস. আলম গ্রুপ

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় ১১ ও ১২ মে প্রকাশিত ধারাবাহিক প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)-সংক্রান্ত বিষয়ে এস. আলম গ্রুপ-এর চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, ইঙ্গিত, বর্ণনা ও সিদ্ধান্তের অবতারণা করা হয়েছে, সেগুলো অনুমাননির্ভর, একপক্ষীয় ও অজ্ঞাত সূত্রনির্ভর।

প্রতিবেদনসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে তথ্য, ব্যক্তিগত অভিমত, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, শ্রুতকথানির্ভর অভিযোগ এবং বহু বছর পর প্রদত্ত কাল্পনিক স্মৃতিনির্ভর বক্তব্যকে একই কাঠামোর মধ্যে উপস্থাপন করে একটি পূর্বনির্ধারিত ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ এত গুরুতর অভিযোগ উপস্থাপনের পরও প্রতিবেদনে কোনো আদালতের চূড়ান্ত রায়, নিরপেক্ষ বিচারিক অনুসন্ধান, নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত ফরেনসিক অডিট রিপোর্ট কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত অনুপস্থিত।

‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘প্রযোজিত বোর্ডসভা’, ‘জোরপূর্বক পদত্যাগ’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘অর্থ পাচার’ ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুতর ও পক্ষপাতমূলক শব্দ ব্যবহার করা হলেও সেগুলোর পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ­– উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এবং যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকসহ কোনো আদালত-স্বীকৃত সিদ্ধান্ত, প্রামাণিক নথি বা আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হয়নি। ‘একাধিক সূত্র’, ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তা’, ‘ওয়াকিবহাল মহল’ বা অতীতের ঘটনা-সম্পর্কিত ব্যক্তিগত বক্তব্যের নামে বর্ণিত কল্পকাহিনির ওপর ভিত্তি করে ‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘জোরপূর্বক’, ‘অর্থ পাচার’ ইত্যাদি গুরুতর শব্দ ব্যবহার সাংবাদিকতার ন্যূনতম ভারসাম্য ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কার্যকলাপগুলোর উদ্দেশ্য হতে পারে একটি বিশেষ আবহ তৈরি করা–যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে না পারে।

ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন ও তথাকথিত ‘ব্যাংক দখল’ প্রসঙ্গে
দৈনিক প্রথম আলো ইসলামী ব্যাংকের ২০১৭ সালের বোর্ড পুনর্গঠনকে ‘ব্যাংক দখল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, যা সম্পূর্ণ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও পক্ষপাতদুষ্ট। বাস্তবতা হলো, কোনো ব্যাংকের শেয়ার অধিগ্রহণ, পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন কিংবা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ও তদারকি ছাড়া সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ নেই।

যদি প্রকৃতপক্ষে কোনো ‘অবৈধ দখল’ সংঘটিত হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে– গত প্রায় এক দশকে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ কি সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়েছে? প্রতিবেদনে এর কোনো সুস্পষ্ট উত্তর নেই।

প্রতিবেদনে এমন একটি ধারণা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে যেন ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড পুনর্গঠন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক ইচ্ছায় সংঘটিত হয়েছিল। অথচ বাস্তবে সে সময়কার নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কমপ্ল্যায়ান্স-প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের মাধ্যমেই এসব পরিবর্তন সম্পন্ন হয়েছিল বলে প্রমাণিত।

প্রতিবেদনে ২০১৭ সালের ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনায় পূর্বে ব্যবহৃত ভাষা ও পরিভাষার তুলনায় বর্তমান উপস্থাপনায় একটি ভিন্ন ব্যাখ্যামূলক অবস্থান গ্রহণ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। সে সময় যেসব পরিস্থিতিকে তুলনামূলকভাবে ‘শান্তিপূর্ণ’ বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, পরবর্তীতে একই ঘটনাক্রমকে ভিন্ন রাজনৈতিক ও ব্যাখ্যামূলক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বর্ণনাগত অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। ফলে অতীতের ঘটনাকে বর্তমান প্রেক্ষাপট থেকে পুনর্ব্যাখ্যা করে ভিন্ন অর্থ আরোপ করার এই প্রবণতা প্রতিবেদনের ধারাবাহিকতা, নিরপেক্ষতা ও উপস্থাপনার ভারসাম্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রাষ্ট্রীয় সংস্থা সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনজুড়ে বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা সংস্থা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ‘ডিজিএফআই-প্রযোজিত সভা’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘চাপ প্রয়োগ’ ইত্যাদি ভাষা ব্যবহার করা হলেও এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো দালিলিক সংযোগ, লিখিত প্রমাণ, আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন নেই।

কোন সভায় কে উপস্থিত ছিলেন, কে কাকে চিনতেন অথবা কে কোথায় গিয়েছিলেন– এসব পরিস্থিতিভিত্তিক বর্ণনা থেকে অবৈধ ষড়যন্ত্র বা জবরদস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা অগ্রহণযোগ্য এবং পেশাগতভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কথিত আচরণ এবং কোনো বেসরকারি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আইনগত দায় একেবারেই ভিন্ন বিষয়। এই দুই স্বতন্ত্র বিষয়কে একত্রে উপস্থাপন করা নিছক বিভ্রান্তিকর সংমিশ্রণ ছাড়া কিছু নয়।

আরাস্তু খান ও অন্য সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রসঙ্গে
সাবেক চেয়ারম্যান আরাস্তু খানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছিল– এমন দাবি প্রতিবেদনে নাটকীয়ভাবে উপস্থাপন করা হলেও এর পক্ষে কোনো দালিলিক প্রমাণ, অডিও, ভিডিও, লিখিত নির্দেশনা বা আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট সময়ে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ছিল ভিন্নধর্মী।

এ ছাড়া যে ধরনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যেমন– জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম ব্যক্তিগতভাবে আরাস্তু খানের বাসায় গিয়ে তাকে ‘স্টেপ ডাউন’ করতে বলেছেন– এ ধরনের আচরণ বা ব্যক্তিগতভাবে এ ধরনের চাপ প্রয়োগের চরিত্র এস. আলম গ্রুপের সম্মানিত চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলমের পরিচিত ব্যক্তিত্ব, করপোরেট আচরণ এবং ব্যবসায়িক কার্যপদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যারা তার দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত, তারা জানেন যে, তিনি এ ধরনের সরাসরি ব্যক্তিগত চাপ প্রয়োগ, কারও ব্যক্তিগত পরিসরে যাওয়া বা করপোরেট শৃঙ্খলার বাইরে গিয়ে কোনো ধরনের প্রভাব বিস্তার করার মতো আচরণে সম্পৃক্ত নন।

করপোরেট বাস্তবতায় চেয়ারম্যান, পরিচালক বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে পরিবর্তন, মতবিনিময় কিংবা নেতৃত্ব পুনর্বিন্যাস অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। বহু বছর পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেওয়া বিভ্রান্তিকর বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা স্পষ্টতই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

এখানে আরও উল্লেখযোগ্য যে, পরবর্তী সময়ে দেওয়া বক্তব্যসমূহ যদি পরিস্থিতিগত সুবিধা গ্রহণ বা পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপিত হয়ে থাকে, তবে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ববর্তী ঘটনাকে প্রমাণিত সত্যে পরিণত করে না। কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য, সমসাময়িক ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ থাকা আবশ্যক, যা আলোচ্য প্রতিবেদনে নেই।

একইভাবে প্রতিবেদনে বিভিন্ন সাবেক কর্মকর্তা বা পরিচালকের ব্যক্তিগত অভিমতকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন সেগুলো আদালত-স্বীকৃত প্রকৃত সত্য নিরূপণ। অথচ এসব বক্তব্যের কোনো স্বাধীন, নথিভিত্তিক বা বিচারিক যাচাই প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।

শেয়ার অধিগ্রহণ ও তথাকথিত ‘গোপন নিয়ন্ত্রণ’ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে আত্মীয়তা, ব্যবসায়িক পরিচিতি বা পূর্বপরিচয়ের ভিত্তিতে ‘একক গোপন নিয়ন্ত্রণ’-এর ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে, অথচ বাংলাদেশের কোম্পানি আইন অনুযায়ী প্রতিটি নিবন্ধিত কোম্পানি একটি স্বতন্ত্র সত্তা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামাজিক, পারিবারিক বা ব্যবসায়িক পরিচয় থাকা মানেই সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ একই উৎস থেকে পরিচালিত– এমন উপসংহার আইনসম্মত নয়।

প্রতিবেদনে যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো আইনগতভাবে নিবন্ধিত পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক সত্তা। শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় ও করপোরেট অংশীদারত্ব বিদ্যমান আইন ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হয়েছে।

‘বেনামি’, ‘প্রক্সি’, ‘গোপন নিয়ন্ত্রণ’ বা ‘একক প্রভাব’-জাতীয় শব্দ ব্যবহার করা হলেও এ বিষয়ে কোনো আদালতের রায়, উপকারভোগী মালিকানা নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োগমূলক ব্যবস্থা বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে নেই।

বিভিন্ন বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বিক্রি বা বিনিয়োগ প্রত্যাহারকে শুধু চাপ, ভয়ভীতি বা পরিকল্পিত প্রভাবের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে; অথচ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত সাধারণত বাজার পরিস্থিতি, মুনাফা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের মতো বহুবিধ বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতে শেয়ার অধিগ্রহণ, পরিচালক মনোনয়ন বা করপোরেট অংশীদারত্বের প্রতিটি ধাপই প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই, নথি দাখিল ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের আওতাভুক্ত। এতসব আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন কার্যক্রমকে পরবর্তীকালে ‘গোপন দখল’ হিসেবে বর্ণনা করা বাস্তবতার অপব্যাখ্যা ছাড়া কিছু নয়।

একাধিক ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে সাতটি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এস. আলম গ্রুপের ‘নিয়ন্ত্রণে’ ছিল। অথচ তালিকাভুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডিং কাঠামো, স্পন্সর অনুমোদন, পরিচালক নিয়োগ এবং মালিকানা বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়।

বেনামে শেয়ার ধারণ, গোপন নিয়ন্ত্রণ বা প্রক্সি মালিকানা-সংক্রান্ত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, যা বাংলাদেশে প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন বা কোম্পানি ও সিকিউরিটিজ আইন অনুযায়ী এসব বিষয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া, স্বচ্ছ মালিকানা কাঠামো ও নিয়ন্ত্রক তদারকির বাইরে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা অনুমাননির্ভরভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

প্রতিবেদনে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে, যেন বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, ব্যাংকের অডিট কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোসহ সমগ্র নিয়ন্ত্রক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাই একটি ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছে। বাস্তবে এটি দেশের ব্যাংকিং ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোকে অবমূল্যায়নের শামিল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা সম্পর্কেও অযৌক্তিক ও ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে।

ঋণসুবিধা ও ব্যাংকিং এক্সপোজার প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ঋণসুবিধাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ঋণের পরিমাণই অপরাধের প্রমাণ। অথচ শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, স্টিল, ভোগ্যপণ্য ও বৃহৎ আমদানিনির্ভর ব্যবসায় স্বাভাবিকভাবেই বড় অঙ্কের অর্থায়নের প্রয়োজন হয়। এ ধরনের ঋণ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের ক্রেডিট কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার আলোকে অনুমোদিত হয়ে থাকে।

দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ অনুমোদন, পুনঃতফসিল, বিনিয়োগ বা এক্সপোজার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই, অভ্যন্তরীণ কমিটি, পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত কাঠামোর আওতায় সম্পন্ন হয়। এই বহু পদক্ষেপভিত্তিক ও নিয়ন্ত্রিত-প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে একটিমাত্র ব্যবসায়িক গ্রুপকে সমগ্র সিদ্ধান্ত কাঠামোর নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতাবিবর্জিত।

এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– এসব ঋণ সব সময় নিয়মিত ছিল, যথাযথ ব্যাংকিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুমোদিত ছিল এবং জুলাই ২০২৪ পর্যন্ত গ্রুপটির কোনো ঋণ খেলাপি ছিল না। এই মৌলিক বাস্তবতা প্রতিবেদনে সচেতনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

২.২৫ লাখ কোটি টাকার তথাকথিত ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণ’-সংক্রান্ত উপস্থাপনাও বিভ্রান্তিকর। আমরা আগেও বলেছি যে, গ্রুপের সব ঋণ স্বচ্ছভাবে অডিটেড ফিন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্টে প্রতিফলিত এবং অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমেই গৃহীত। এস. আলম গ্রুপের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী (যেখানে নিরীক্ষকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি কনফার্মেশনের দ্বারা প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত সমর্থন হিসেবে বিদ্যমান), ব্যাংকিং ডকুমেন্টেশন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দাখিলকৃত তথ্যের সঙ্গে উপস্থাপিত এই অতিরঞ্জিত ঋণের পরিমাণ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান।

আমরা আরও লক্ষ্য করেছি যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে পরস্পরবিরোধী ঋণের পরিমাণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং তথাকথিত এক্সপোজার উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে যেসব ঋণ বা প্রতিষ্ঠানের নাম এস. আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, বাস্তবে সেগুলোর সঙ্গে গ্রুপটির প্রত্যক্ষ বা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক নেই। এ ধরনের যাচাইবিহীন সংখ্যা ও তথ্য উপস্থাপন সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর প্রভাব বিস্তারের ভিত্তিহীন অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার, প্রশাসনিক সুবিধা গ্রহণ বা বিশেষ অনুমোদন আদায়ের অভিযোগও সম্পূর্ণরূপে উপাখ্যানমূলক। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও বহু পদক্ষেপ নিয়ন্ত্রকব্যবস্থা অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। কোনো ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রতিনিধি নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, এটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই যোগাযোগকে বেআইনি প্রভাব হিসেবে উপস্থাপন করতে হলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন, যা প্রতিবেদনে অনুপস্থিত।

বাংলাদেশ ব্যাংক একটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে নির্ধারিত আইন, নীতিমালা, তদারকি ব্যবস্থা, পরিদর্শন কাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির আওতায় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এ ধরনের বহুস্তরীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে কোনো একক ব্যক্তি, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একতরফা প্রভাবাধীন হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতা ও বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যপ্রণালির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

আন্তব্যাংক ডিপোজিট ও তারল্য ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের অন্যান্য ব্যাংকে ডিপোজিট-সংক্রান্ত বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এসব সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়ম বা পক্ষপাতের প্রমাণ। ব্যাংকিং খাতে লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট এবং স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের অংশ হিসেবে আন্তব্যাংক আমানত একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত প্রথা। পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতার আলোকে অতীতের প্রতিটি ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে ‘ভুল’ বা ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে আখ্যায়িত করা মূলত মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতা ছাড়া কিছু নয়।

বাজার পরিস্থিতি, তারল্য সহায়তা, ইসলামী ব্যাংকিং কাঠামোর ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা এবং স্বল্পমেয়াদি তহবিল বিনিয়োগ/ব্যবহারের নীতিমালার ভিত্তিতে এ ধরনের স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগ সম্পন্ন হয়ে থাকে। তবে প্রতিবেদনে কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে সংশ্লিষ্ট সময়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসব প্লেসমেন্টকে অবৈধ বা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছিল কি না।

ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক তারল্য পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং নীতিগত পরিবর্তনের মতো বহুমাত্রিক কারণসমূহ উপেক্ষা করে এককভাবে একটি শিল্পগোষ্ঠীকে ব্যাংক খাতের সব সমস্যার উৎস হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

নিয়োগ, পদোন্নতি ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ, পদোন্নতি বা ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনকে ‘নিজেদের লোক বসানো’ হিসেবে উপস্থাপন করাও বিভ্রান্তিকর। নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তা, বিশেষ করে খাতুনগঞ্জ শাখা বা চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মকর্তাদের পদোন্নতিকে নেতিবাচক ইঙ্গিতসহ উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ দেশের বৃহৎ ব্যাংকগুলোতে সম্প্রসারণ, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং পরিচালনাগত পুনঃসমন্বয়ের অংশ হিসেবে ব্যাপক নিয়োগ ও দ্রুত পদোন্নতি অস্বাভাবিক নয়।

নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল বা জেলার ব্যক্তিদের নিয়োগকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা কেবল অনুমাননির্ভর নয়, বরং বৈষম্যমূলক ইঙ্গিতও বহন করে। কোন কর্মকর্তা বিশেষ অঞ্চল, জেলা বা সামাজিক পটভূমি থেকে এসেছেন– এটি অনিয়ম বা বেআইনি নিয়োগের প্রমাণ হতে পারে না। আঞ্চলিক পরিচয়কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা যোগ্যতা ও দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করে।

বাংলাদেশে ব্যাংকসমূহের নিয়োগ কার্যক্রম কঠোর আইন, বিধিমালা ও নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার আওতায় পরিচালিত হয় এবং এটি সব ব্যাংকের ক্ষেত্রেই সমভাবে প্রযোজ্য। ইসলামী ব্যাংকেও সব সময় প্রবেশনারি অফিসার, সিনিয়র অফিসার বা সমমানের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যথাযথ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, আবেদন যাচাই, লিখিত পরীক্ষা, সাক্ষাৎকার এবং বোর্ড/কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মতো স্বচ্ছ ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য নিম্ন ও উচ্চপদেও ব্যাংকিং আইন, নীতিমালা ও নির্ধারিত কমিটির সুপারিশ অনুসারেই নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। কোনো বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর পক্ষে তফসিলি ব্যাংকের নিয়োগ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বা এখতিয়ার নেই।

‘অর্থ পাচার’, ‘টু বিলিয়ন ডলার ম্যান’ ও অন্যান্য অভিযোগ প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে ‘অর্থ পাচার’, ‘বৈদেশিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার’, ‘টু বিলিয়ন ডলার ম্যান’ ইত্যাদি চাঞ্চল্যকর শব্দ ব্যবহার করা হলেও এ-সংক্রান্ত কোনো আদালতের দণ্ডাদেশ, তদন্ত সংস্থার চূড়ান্ত প্রমাণ নেই। অভিযোগ এবং প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। সংবাদমাধ্যম কোনো আদালত নয়, এবং চাঞ্চল্যকর শব্দ কোনো অভিযোগকে বিচারিক সত্যে পরিণত করে না।

প্রতিবেদনে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অর্থ পাচারের যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এস. আলম গ্রুপের প্রতিটি বৈদেশিক লেনদেন এবং ঋণপত্র (LC) দেশের প্রচলিত আইন, বিধিবিধান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের AML ডিউ ডিলিজেন্স-প্রক্রিয়ার আওতায় সম্পন্ন হয়েছে। এস. আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অর্থ পাচারের অভিযোগ কোনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিতও নয়। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সুস্পষ্ট ব্যাংকিং কমপ্লায়েন্স এবং নিয়ন্ত্রক তদারকির মধ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়।

এর আগেও বিভিন্ন সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমে এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিষয়ে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল– তার পরিপ্রেক্ষিতে যখন বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ তাদের কাছে প্রমাণাদি তলব করে, তখন তারা বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থাগুলোর সহায়তা লাভের জন্য বারবার প্রচেষ্টা চালিয়েও শেষ পর্যন্ত তা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। সেই পর্যায়েই এটি প্রমাণিত হয়ে যায় যে, এই প্রচারণার পেছনে কোনো অসৎ বা দুরভিসন্ধিমূলক উদ্দেশ্য নিহিত ছিল।

ইসলামী ব্যাংকের নিট মুনাফা-সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের তুলনামূলক নিট মুনাফার যে পার্থক্য বা পরিবর্তনের চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে, তা প্রসঙ্গচ্যুত ও বিভ্রান্তিকর। মুনাফা তুলনার ক্ষেত্রে এককালীন প্রভিশনিং, হিসাবনীতি পরিবর্তন, IFRS সমন্বয়, ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তন, জোরপূর্বক ঋণ শ্রেণিবদ্ধকরণ এবং পুনর্গঠিত ব্যালেন্সশিটের প্রভাবকে বিবেচনায় না নিয়ে সরলভাবে তুলনা করা বাস্তব অর্থনৈতিক চিত্রকে বিকৃত করে। তা ছাড়া যেমনটি আমরা আগেই উল্লেখ করেছি– বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ তাদের কতিপয় অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মকর্তার সহায়তায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে; তারা চাপের মুখে অধিকাংশ বিনিয়োগ বা ঋণকে নন-পারফর্মিং লোন’ (NPL)-এ পরিণত করেছে, যার ফলে দেশের অন্যতম শক্তিশালী এই ব্যাংকটি এমন শোচনীয় অবস্থায় নিপতিত হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

এ ধরনের উপস্থাপনা পাঠকের মধ্যে কৃত্রিম নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, যা আর্থিক বিশ্লেষণের ন্যূনতম পদ্ধতিগত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল) প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল)-সংক্রান্ত ঘটনাবলি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন ব্যাংকটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন কোনো বেআইনি, জোরপূর্বক বা রাষ্ট্রীয় প্রভাবনির্ভর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল। বিশেষত ‘ডিজিএফআই কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া’, ‘পদত্যাগে বাধ্য করা’, ‘চাপ প্রয়োগ’, ‘সরাসরি উপস্থিতি’ ইত্যাদি অভিযোগ উদ্দেশ্যমূলক। এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য দলিলভিত্তিক প্রমাণ বা ঘটনাকালীন নথিপত্র, আদালত-স্বীকৃত সাক্ষ্য বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়নি।

বরং পুরো বিবরণটি মূলত ‘একাধিক সূত্র’, ‘সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা’, ‘ওয়াকিবহাল ব্যক্তি’ কিংবা বহু বছর পর প্রদত্ত ধারা বর্ণনার ওপর নির্ভরশীল। কোনো প্রমাণ ছাড়া এ ধরনের শ্রুতনির্ভর অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা সাংবাদিকতার মৌলিক যাচাই মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মালিকানা বা পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠন বা পরিচালক পরিবর্তন প্রচলিত ব্যাংক কোম্পানি আইন, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন এবং অন্যান্য বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়ার আওতায় সম্পন্ন হয়। যদি বাস্তবিকভাবে কোনো বেআইনি অধিগ্রহণ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে সে বিষয়ে কোনো আদালত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ও নির্ধারিত সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না– প্রতিবেদনে তার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।

ব্যাংক খাতের সংকট ও বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতা প্রসঙ্গে
প্রতিবেদনে এমন ধারণা সৃষ্টি করা হয়েছে, যেন দেশের ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক সংকটের প্রধান বা একমাত্র কারণ একটি নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠী। বাস্তবে ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট, ডলারসংকট, মহামারি-পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপ, বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের অস্থিরতা, আমদানি-চাপ, নীতিগত কঠোরতা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জসহ বহুমাত্রিক কারণসমূহ দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যমান।

খেলাপি ঋণ, মুনাফা হ্রাস বা তারল্যসংকট– এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করে একক কোনো গোষ্ঠীর ওপর দায় চাপানো বাস্তবতাবর্জিত এবং বিভ্রান্তিকর।

রাজনৈতিক ন্যারেটিভ ও পূর্বনির্ধারিত আখ্যান
প্রতিবেদনজুড়ে ‘ব্যাংক দখল’, ‘ব্যাংক লুট’, ‘রাষ্ট্রীয় সহায়তা’, ‘রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা’ ইত্যাদি রাজনৈতিক অভিঘাতসম্পন্ন শব্দের পুনরাবৃত্ত ব্যবহার স্পষ্টভাবে ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর ইঙ্গিত বহন করে। কোনো ব্যক্তি বা শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা বা সামাজিক অনুষ্ঠানে ছবি থাকা কিংবা আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ থাকা বেআইনি সম্পর্কের প্রমাণ নয়।

এস. আলম গ্রুপ ১৯৮৪-৮৫ সাল থেকে দেশের শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ, ভোগ্যপণ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থান খাতে অবদান রেখে আসছে এবং বিগত সব রাজনৈতিক সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এই ব্যবসা পরিচালনা করেছে। এসব বাস্তব অবদান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শুধু নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত করে ধারাবাহিক ন্যারেটিভ তৈরি করা বাস্তবতার বিকৃতি।

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আলোচ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে অভিযোগ, ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, অজ্ঞাত সূত্রনির্ভর বয়ান এবং পরবর্তীকালের ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে তথ্যের নির্ভুলতা, যাচাই, নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতার বাধ্যবাধকতাও সমানভাবে প্রযোজ্য।

এস. আলম গ্রুপ সব সময় দেশের আইন, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং প্রক্রিয়াগত কমপ্ল্যায়ান্সের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। এস. আলম গ্রুপ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে দেশের ব্যাংকিং খাত-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগের বিচার হবে আদালত, আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে– বেনামি সূত্রনির্ভর মিডিয়া বয়ানের মাধ্যমে নয়। সংবাদপত্রের দায়িত্ব হলো বস্তুনিষ্ঠ, যাচাইযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা; কোনো পক্ষের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যানের বাহক হওয়া, পর্দার আড়ালের অযাচাইকৃত বর্ণনাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা কিংবা অভিযোগকে বিচারিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নয়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, আলোচ্য ধারাবাহিক প্রতিবেদনে একই সঙ্গে অভিযোগকারী, বিশ্লেষক, সাক্ষী ও সিদ্ধান্ত প্রদানকারীর ভূমিকা সংবাদমাধ্যম নিজেই গ্রহণ করেছে। অথচ কোনো বিষয়ে তদন্তাধীন তথ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য, ব্যক্তিগত অভিযোগ ও অসমর্থিত ধারণাকে একত্রে উপস্থাপন করে সংবাদপত্রের পক্ষ থেকে কার্যত ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ প্রদান সংবাদমাধ্যমের স্বাভাবিক সীমারেখা অতিক্রম করে।

আমরা আশা করি, দৈনিক প্রথম আলো এস. আলম গ্রুপ বা এর চেয়ারম্যান জনাব মোহাম্মদ সাইফুল আলম-সম্পর্কিত অসত্য, অসম্পূর্ণ বা বিভ্রান্তিকর অংশসমূহ অবিলম্বে সংশোধন বা প্রত্যাহার করবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ, যাচাইযোগ্য ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা নিশ্চিত করবে।

অন্যথায় এস. আলম গ্রুপ তার আইনগত অধিকার সংরক্ষণপূর্বক প্রযোজ্য আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। –এস. আলম গ্রুপ

রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে
এভাবেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীরা। ছবি: খবরের কাগজ

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল সকাল থেকে। তা উপেক্ষা করেই শহরতলির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা কাউসার। কারওয়ান বাজার মোড়ে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে বাসের দেখা পান। কিন্তু সেই বাসে ওঠার জো নেই, বাদুরঝোলা হয়ে গন্তব্যে ছুটছেন অনেক যাত্রী। সাভারের রেডিও কলোনি যেতে ফাতেমাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

এই চিত্র গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার। ফাতেমার মতো আরও অনেক যাত্রীকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে সাভার-নবীনগর, উত্তরা, টঙ্গী-কামারপাড়া, গাজীপুরসহ শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় যেতে যাত্রীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, প্রগতি সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর রোড, বিমানবন্দর সড়ক ঘুরে খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা দুর্ভোগের চিত্র দেখেছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ থাকায় রাজধানীবাসীর ‘বড় অংশ’ রয়ে গেছে ঢাকার বাইরে। ৭ জুন থেকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে। তাই আজ শনিবার রাজধানীমুখী যাত্রীদের ঢল দেখা যাবে। তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে সিটি বাসগুলোও বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।

খবরের কাগজের একজন প্রতিবেদক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে সাভারগামী ওয়েলকাম পরিবহনের বাসে উঠেন। সেই বাসে পা ফেলার জায়গাও ছিল না। পথে যেতে যেতে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব একজন যাত্রীর সঙ্গে।

তিনি জানান, নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে তিনি গুলিস্তান এসে পৌঁছান। সাভারগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। আরেকজন নারী যাত্রী বলেন, ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে অনেকটা জোর করে বাসে উঠেছি। বাসে সিট ছিল না বলে নারী যাত্রীদের উঠাতে চাইছিল না হেল্পার।’

ওই বাসে আসন না পেয়ে নারী যাত্রী দাঁড়িয়েই যাচ্ছিলেন হেমায়েতপুরে। বাসটির হেল্পার মিল্টন বলেন, ‘ঈদের পরে অনেক যাত্রীই তো রইয়া গেছে বাড়ি। তারা তো ফিরে নাই। আজকের (শুক্রবার) রাতের পরে তারা সবাই ফিরতে শুরু করবে। তাদের আনতে টাউন সার্ভিসের বাসগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।’

রাজশাহীর আলোকচিত্রী রায়হান বিশ্বাস গতকাল ঢাকায় এসেছেন জরুরি কাজে। তিনি জানান, সিরাজগঞ্জের এলেঙ্গার মোড়ে তিনি ঢাকার সিটি সার্ভিসের বেশ কয়েকটি মিনিবাসে ঢাকামুখী যাত্রী দেখেছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ঢাকার ‘টাউন সার্ভিস’ বাস দেখার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল রহমান। পথে-পথে সেসব বাস বিকল হয়ে থাকার কথাও জানান তিনি।

তাদের কথার সত্যতা পাওয়া যায় শুক্রবার বেলা ২টার দিকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও টাউন সার্ভিসগুলো গেটলক হয়ে রাজধানীর দিকে ফিরছিল। সাভার পরিবহন, সেলফি, মিরপুর লিঙ্ক, রাজধানী, নীলাচল নামের বেসরকারি বাসগুলো তো বটেই;  এমনকি শহরতলি রুটে চলাচল করা বিআরটিসির এসি বাসও দূরপাল্লায় যাত্রী পরিবহন করছে।

এসব বাসে ঢাকায় ফিরতে যাত্রীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ঈদের ফিরতি যাত্রার দ্বিতীয় পর্বে এসব অনিয়ম দেখার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা হাইওয়ে পুলিশের কোনো অভিযান নজরে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং ঢাকা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সদস্য সচিব শহিদুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বার্তা পেয়েও সাড়া দেননি হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে এখনো যারা বাড়ি রয়ে গেছেন, তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে দূরপাল্লার বাস পর্যাপ্ত নয়। তাই ঢাকার ভেতরে চলাচল করা অনেক বাস সুযোগ বুঝে দূরপাল্লার রুটে গেছে।

আরটিসির নিয়ম অনুযায়ী এসব বাস দূরপাল্লার রুটে চলাচলের অনুমতি পায় না। কিন্তু প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে অনেক মালিক বাস দূরের জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন স্থানীয় প্রশাসনও নীরব। কারণ, বাসগুলো তো যাত্রী পরিষেবা দিচ্ছে। আমরাও সমিতিতে আলোচনা করেছি, এসব বাস দূরপাল্লার রুটের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।’

রাজধানীর ভেতরে বা শহরতলিতে চলাচল করা অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই, চালকদেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ঈদযাত্রা বা ফিরতি যাত্রায় ঢাকার এসব টাউন বাসই দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণ।

পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আসিফ রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যদিও দুই চালকেরই ভারী যান পরিচালনার লাইসেন্স থাকে, কিন্তু ইন্টারসিটি চালক হুট করে মহাসড়কে নেমে এলে সেই সড়কের চরিত্র বুঝতে পারবেন না। দুই ধরনের সড়কের চরিত্র ভিন্ন। হুট করে চালকের যানবাহনের ধরন (ট্রান্সপোর্ট মুড) পরিবর্তন হলে বিপদের সমূহ শঙ্কা থাকে।’

প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী
আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিইআরসি

সরকার গত বুধবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম নির্ধারণের এক দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী (লাইফলাইন) প্রান্তিক গ্রাহক এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম আগের হারেই থাকছে। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্ন আয়ের বা বসতিতে বসবাস করা গ্রাহকরাও এই সুবিধা পাবেন না। কারণ তারা পরিবার নিয়ে কমপক্ষে দুটি ঘরে বসবাস করেন। অন্ধকার এড়াতে ও একটু স্বস্তি পেতে দুটি ফ্যান, দুটি লাইট, একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ ব্যবহার করেন। এতে মাসে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের ব্যবহার হয়, যা কমপক্ষে ১৯২ ইউনিটে গিয়ে দাঁড়াবে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

ডিপিডিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষ অনেক বিলাসী হয়ে গেছেন। কাজেই যে মানুষটি বসতিতে থাকেন বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন তিনিও দুটি রুম নিয়ে থাকেন। পরিবারের একটু স্বস্তির জন্য দুটি ফ্যান ব্যবহার করেন। ফ্রিজ ব্যবহার করেন। অধিকাংশ পরিবার সারা দিন টিভি দেখে। কাজেই পুরো মাসে এসব পরিবারে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতেই পারে। এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিল আসবে। এ জন্য তাকে প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।’

বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা বহাল থাকবে। জুন থেকে এ হার কার্যকর হবে। এর আগে গত বুধবার বিইআরসি খুচরা বিদ্যুতের যে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছিল, সেখানে প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে প্রান্তিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৬৯ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৯২ পয়সা বেশি গুনতে হতো।

বিইআরসি জানায়, বুধবার জারি করা আদেশে নির্ধারিত এ দুই শ্রেণির মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য ৪ জুন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো আবেদন করে। পরে শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ (খুচরা) ট্যারিফ প্রবিধানমালার বিধান অনুযায়ী বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না করে আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহারের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর আয় কমবে। সেই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করতে হবে। তবে বুধবার জারি করা খুচরা বিদ্যুতের নতুন দাম-সংক্রান্ত আদেশের অন্য সব অংশ অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। এর ফলে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ঘোষিত নতুন মূল্যহার বহাল থাকছে। শিল্প, বাণিজ্যিক, সেচ ও অন্যান্য গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রেও নতুন দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করে বিইআরসি। পরে বুধবার বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বেশি ইউনিট ব্যবহারকারীদের মতো আবাসিক গ্রাহকদের সব স্তরেই দাম বাড়ানো হয়েছিল। তবে প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এই দুই শ্রেণির বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। তার পরও নিম্ন আয়ের গ্রাহকরা সেই সুবিধা পাবেন না। কারণ সারা দেশে অধিকাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল আসে ৫০ থেকে ৭৫ ইউনিটের।

জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০১ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০২ পিএম
জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

আধুনিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ। ঘর-বাড়ি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয় ধ্বংস, গাছপালা নিধন, খাল-নদী-নালা ভরাট করে গড়ে ওঠা আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এর অপচয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এবং পরিকল্পনাহীন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এর আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে, যা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। বছর বছর বাড়ছে বিদ্যুতের দাম।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জনপ্রিয় ইংরেজি প্রবাদ ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’, এখনো যথেষ্ট পালনীয়। এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাও, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠো’। পাঠ্যবইয়ের এই শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, সব বয়সী মানুষের জন্যই এখন সমানভাবে প্রযোজ্য। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারা ও অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে মানুষ রাত জেগে থাকতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের জীবনেও। গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা বা অনলাইন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে তাদেরও সকাল শুরু হয় দেরিতে।

একসময় শিক্ষার্থীরা ভোরে উঠে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসে পড়াশোনা করত। কিন্তু এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর পড়তে বসে। ফলে ফ্যান, লাইট বা এসির ব্যবহার প্রয়োজন হয়। ফলে যে কাজ একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্পন্ন হতো, তা এখন অনেকটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে দিন-রাতে সমান তালে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।

এ ছাড়া বিদ্যুতের অপচয়ের আরেকটি বড় ক্ষেত্র সরকারি ও বেসরকারি অফিস। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা অফিসে পৌঁছানোর আগেই কক্ষের লাইট, ফ্যান এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালু করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অফিস শেষ হওয়ার পরও এসব যন্ত্র দীর্ঘ সময় চালু থাকে। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে লাখের বেশি অফিস রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য অপচয়ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একই চিত্র দেখা যায়– হাসপাতাল, ব্যাংক, মার্কেট, শপিং মল এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনেও। দিনের আলো পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম আলোর ব্যবহার অব্যাহত থাকে। অনেক ভবনে জানালা থাকা সত্ত্বেও ভারী পর্দা টেনে রাখা হয়, ফলে দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এতে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

নানা সংকটে ভবন নির্মাণের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। শহরাঞ্চলের নতুন অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে ক্রমেই কমে আসছে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এই দেশে শীতপ্রধান দেশের মতো ভবন নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বহু ভবন নির্মিত হচ্ছে শীতপ্রধান দেশের নকশার আদলে। ফলে পর্যাপ্ত বাতাস ও সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ থাকছে না সেসব ভবনে। এতে বাসিন্দাদের সারা বছর ফ্যান, এসি ও বৈদ্যুতিক আলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রবণতা কমে গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, উপাসনালয়ে মানুষের সংখ্যা কম থাকলেও একাধিক ফ্যান, এসি ও লাইট দীর্ঘ সময় ধরে চালু রাখা হয়। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের অপচয় উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। অনেক পরিবারে দিনে এবং রাতে অপ্রয়োজনীয় লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। ব্যবহারের পর টেলিভিশন, কম্পিউটার, চার্জার কিংবা অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করা হয় না। সবার মাঝে ধারণাটা এমন যে– ‘আমার বিল তো আমি দিই, সমস্যা কোথায়?’ প্রকৃত সত্য হলো, ভোক্তার এই বিল জমা দেওয়ার পরও রাষ্ট্রকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে জনগণের করের টাকা থেকে।

নগরবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে আহ্বান করা যেতে পারে। অযথা বিদ্যুৎ ব্যবহার থেকে সরে আসার জন্য সতর্কতামূলক প্রচারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ধনাঢ্যদের প্রতি বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির উৎসের সন্ধান করার আহ্বান জানানো যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার বাড়াতে এবং বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা দরকার। ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক করা, যাতে পাশের ভবন আলো-বাতাসে বাধা না দেয়। একই সঙ্গে ভবনের দেয়ালে জানালার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা, যা দিনের আলো ঘরের ভেতরে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। ভবনের উচ্চতা ও চারপাশের ফাঁকা জায়গার অনুপাত এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে ভবনের ভেতর, যা বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে দেবে।’

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা না গেলে সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয়। গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বৈঠকে জানানো হয়, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। 

প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও আর্থিক ক্ষতির সমাধান হচ্ছে না। গত বুধবারও নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। চলতি জুন মাস থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।

এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সময় পাইকারি পর্যায়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হবে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় কমানো গেলে জাতীয় পর্যায়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। 

সংকট সমাধান করতে লাভের চেয়ে গ্রাহককে গুরুত্ব দিতে বললেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে বড় সংকট রয়েছে। এ খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘চোরদের নিয়ন্ত্রণে’। এসব চোর ভোক্তাবিরোধী এবং গণবিরোধী। তাই সংকটের সমাধান হচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর জন্য বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু ঘাটতি কি কমেছে? উল্টো প্রতিবছর বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে কম খরচে উৎপাদন এবং সরকারকে মুনাফা অর্জনের চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। তারা দাম বাড়াতে চায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের হয়ে দাম কমানোর জন্যও আইন করা প্রয়োজন। আর যারা চুরি করে কাঠামোগতভাবে সংকট তৈরি করে রেখেছে সেই চোরদের ধরে ধরে বিচার করতে হবে, না হলে এই ঘাটতি থেকেই যাবে।’

খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম
খবরের কাগজে পদোন্নতি-বাণিজ্যের প্রতিবেদন প্রকাশ: তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়
ছবি: সংগৃহীত

ভূমি হস্তান্তরসংক্রান্ত নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীন ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের অস্থায়ী নকলনবিশদের পদোন্নতি ঘিরে ঘুষ লেনদেনের তদন্তে নেমেছে আইন মন্ত্রণালয়। গত ৭ এপ্রিল খবরের কাগজে ‘ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে পদোন্নতি-বাণিজ্য/টাকা দিলেই নাম ওপরের দিকে, না দিলে বাদ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্তের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ে ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স ভবন পরিদর্শনে যান তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইন ও বিচার বিভাগের সহকারী সচিব (সিভিল জজ) মো. জিয়া উদ্দীন। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদোন্নতি পেতে ইচ্ছুক নকলনবিশদের কাছ থেকে দফায় দফায় ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা দিলেই তালিকার ওপরের দিকে নাম উঠে আসে, আবার টাকা না দিলে তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। গত দুই বছরে কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও দাপ্তরিকভাবে দুটি তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। 

প্রতিবেদনটির ভিত্তিতে ঘুষ লেনদেন বিষয়ে পদোন্নতির তালিকায় থাকা নকলনবিশদের তাদের বক্তব্য লিখে এনে সরেজমিনে হাজির থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা মো. জিয়া উদ্দীন। যাতে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশরা নির্ভয়ে তাদের বক্তব্য পেশ করতে পারেন। নির্দেশনা অনুসারে অন্তত ১১ জন নকলনবিশ তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তদন্ত কর্মকর্তা উপস্থিত হওয়ার আগেই ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার অফিস থেকে নির্দিষ্ট ফরম্যাটে বক্তব্য দেওয়ার জন্য নকলনবিশদের মৌখিকভাবে জানানো হয়। ফলে নির্দিষ্ট ফরম্যাট মেনে একই ধরনের বক্তব্য পেশ করেছেন ১১ জন নকলনবিশ। 

খবরের কাগজে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শূন্যপদ থাকা সাপেক্ষে অস্থায়ী নকলনবিশরা রাজস্ব খাতে স্থায়ী নকলনবিশ হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে থাকেন। এ জন্য প্রতিটি জেলায় জেলা রেজিস্ট্রারের নেতৃত্বে নিয়োগ পদোন্নতি ও বাছাই কমিটি রয়েছে। ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সভাপতিত্বে ওই কমিটির বৈঠকে গত দুই বছরে পদোন্নতির যোগ্যদের কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হলেও গত বছরের ১৬ মার্চ দাপ্তরিকভাবে প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবিত পদোন্নতির ওই তালিকায় ১০ জন অস্থায়ী নকলনবিশের নাম আনা হয়। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নকলনবিশদের ১০ বছরের কাজের বিবরণ ও বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। কাগজপত্র সরবরাহের জন্য তিন দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। ওই তালিকায় নকলনবিশ মো. শামীম, মোসা. পারভীন আক্তার, মো. আতাউর রহমান, মোসা. কামরুন নাহার, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. শফিকুর রহমান, মোসা. আনোয়ারা আক্তার, মো. আবু সাঈদ মিয়া, মোসা. মাসুদা আক্তার ও মো. মারুফ আহম্মদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো কারণ উল্লেখ ছাড়াই কয়েক মাস পদোন্নতির বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখে আরও কয়েকটি খসড়া তালিকা করা হয়। তবে দাপ্তরিকভাবে ওই তালিকাগুলো প্রকাশ করা হয়নি। পরে একই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর দাপ্তরিকভাবে আরেকটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এবারও নকলনবিশদের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে পাঁচ দিন সময় বেঁধে সাব-রেজিস্ট্রারদের চিঠি দেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। এই তালিকায় ১১ জন নকলনবিশের নাম উল্লেখ করা হলেও আগের তালিকা থেকে মো. শামীম ও আতাউর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়। তালিকায় নতুন যুক্ত হন বেলাল হোসেন, মনির হোসেন ও পারুল আক্তার। এই তালিকা আবারও সংশোধনের উদ্যোগ নেন জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান। 

সে সময় ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ঘুষ লেনদেনের বিষয় অস্বীকার করে খবরের কাগজকে বলেন, ‘পদোন্নতি নীতিমালার আলোকে নকলনবিশদের ১০ বছরের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ প্রয়োজন হয়। কিন্তু তালিকায় যাদের নাম পাওয়া গেছে তাদের ধারাবাহিক কাজের বিবরণ সন্তোষজনক নয়।’

তারা (নকলনবিশ) কি কাজ করেন না? এমন প্রশ্নের উত্তরে জেলা রেজিস্ট্রার বলেন, নকলনবিশদের কাজই হলো ‘বালামে দলিল লিপিবদ্ধ করা, দলিলের অবিকল নকল (সার্টিফায়েড কপি) করা।’ কিন্তু সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে লোকবল কম থাকায় তাদের দিয়ে অন্য কাজও করা হয়। ফলে তাদের মূল কাজের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হয়। এখন মোহরার-টিসি মোহরারসহ অন্তত ১২টি পদ শূন্য রয়েছে। নীতিমালা অনুসারে প্রকৃত যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য নতুন তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি: জীবনযাত্রা হবে আরও ব্যয়বহুল
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও দেশে উল্টো বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানোর তীব্র সমালোচনা করেছেন অর্থনীতিবিদ ও ভোক্তা অধিকার কর্মীরা। তারা আশঙ্কা করছেন, এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তের ফলে দেশে চলমান ৮ শতাংশের ওপর থাকা মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়বে। 

বিদ্যুৎ খাতের অপচয় ও চুরি বন্ধ না করে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে তড়িঘড়ি করে সব শ্রেণির গ্রাহক পর্যায়ে এই দাম বাড়ানোকে ‘অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) আপত্তি সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) প্রস্তাবে প্রান্তিক গ্রাহক ও কৃষিতে দাম বাড়ানোর কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ক্ষুদ্রশিল্প বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শওকত আলী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে দেশে চলমান মূল্যস্ফীতি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

তিনি মনে করিয়ে দেন, দেশে এমনিতেই মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের ওপরে (বিগত মাসগুলোতে যা ছিল প্রায় ৮.২২ শতাংশ)। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে। খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘যুগোপযোগী নয়’ বলে আখ্যা দেন অধ্যাপক শওকত আলী। আগে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ছিল ৫ টাকা ২৬ পয়সা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সায়। এ ছাড়া কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতেও বিদ্যুতের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।

ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, মানসম্মত সেবার জন্য মানুষ কিছুটা বাড়তি টাকা দিতেও রাজি থাকে। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামীণ গ্রাহকরা বাড়তি দাম দিয়েও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন। বিদ্যুৎ গেলে আর আসার নাম থাকে না, সেবার মানও অত্যন্ত নাজুক। এই অবস্থায় যদি লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারে অকটেনের দাম প্রতি লিটারে ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে অধ্যাপক শওকত আলী বলেন, ‘কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি কমলেও আমাদের দেশে সেই অনুপাতে দাম কমানো হয়নি। উল্টো সরকারের পক্ষ থেকে দাম আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’

ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হলেও সার্বিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে কৃষি ও পরিবহন খাত রেহাই পাবে না বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর পাশাপাশি পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। আর পরিবহন খরচ বাড়লে তার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়বে সাধারণ পণ্যের ওপর, যার ফলে বাজারে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে।’

দফায় দফায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশেও তেলের দাম কমার কথা ছিল। কিন্তু তা না করে সরকার উল্টো অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করেছে।’ জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে হলে জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম অপরিবর্তিত রাখা জরুরি ছিল।

অধ্যাপক মুহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সিদ্দিকী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘এমনিতেই দেশের ইনফ্লেশন বা মূল্যস্ফীতি ৮ ডিজিটের (৮ শতাংশ) ওপরে, গত মাসের আগের মাসে যা ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। এখন নতুন করে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে বাজারে এবং ইনফ্লেশন আরও বাড়বে।’

খুচরা গ্রাহক পর্যায়ে (০ থেকে ৭৫ ইউনিট) প্রতি ইউনিটে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে নতুন দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণের প্রসঙ্গে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পিডিবির (পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড) আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আরইবির (পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড) প্রস্তাবে এই দাম বাড়ানো হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ড. শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘গ্রাহকরা ভালো সেবার জন্য বেশি টাকা দিতে রাজি থাকেন। কিন্তু আরইবির অধীনে থাকা গ্রামের সাধারণ গ্রাহকরা এমনিতেই ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের শিকার। বিদ্যুৎ গেলে আর আসতে চায় না। এই অবস্থায় সেবার মান না বাড়িয়ে হুট করে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ তিনি যোগ করেন, যদি এই বাড়তি দাম দেওয়ার পরও লোডশেডিং থেকেই যায়, তবে সাধারণ মানুষ তা মেনে নেবেন না।

কৃষি খাতে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ৪ পয়সা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) ১১ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই অধ্যাপক। তার মতে, কৃষকরা ইরিগেশন বা সেচব্যবস্থার জন্য ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। এই দুই খাতের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে। এসএমই খাতের অবস্থা দেশের বাজারে এমনিতেই নাজুক, তার ওপর এই বাড়তি বিদ্যুতের বিল তাদের আরও বড় সংকটে ফেলবে।

বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধির তীব্র প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। ক্যাবের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান খবরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ও পরিবহনসহ প্রতিটি খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কাঠামোর সমালোচনা করে এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘এবারের বিদ্যুতের দাম একদম নিম্নবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত–সব পর্যায়েই বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়বে।’ তিনি সরকারের দ্বিমুখী নীতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘একদিকে সরকার কৃষকদের ধান চাষ বা কৃষিকাজের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও টাকা দিচ্ছে, আর অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’