আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে–এমন সব দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার ঘোর বিরোধী। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এ সুযোগ দিয়ে এলেও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরই তা বাতিল করে। তারেক রহমানের সরকার এ সুযোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবির মুখে তা পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিশেষ সুবিধায় অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দেওয়া যায় কি না তা খতিয়ে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
- আগামী বাজেটে সীমিত পরিসরে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে কি না তা পুনর্বিবেচনা করছে সরকার। এ বিষয়ে এনবিআর প্রতিবেদন তৈরি করেছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে।
- বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, রাজস্ব ঘাটতি ও ডলার সংকট মোকাবিলায় কিছু খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আইএমএফ এ ধরনের সুবিধার বিরোধিতা করছে।
- ২০২০-২১ অর্থবছরে বিশেষ সুবিধা দিয়ে রেকর্ড ২০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা কালো টাকা সাদা করা হয়েছিল, যেখান থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রণয়ন করেছে। প্রতিবেদনে কোন খাতে কতটা ছাড় দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে কত টাকার রাজস্ব আদায় বাড়বে, তা হিসাব কষে দেখানো হয়েছে। এসুবিধা দেওয়া হলে সমগ্র অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, সৎ ব্যবসায়ীরা রাজস্ব পরিশোধে নিরুৎসাহিত হবে কি না তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে। এনবিআরের এই প্রতিবেদন নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যানসহ বাজেট প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন।
এসব বৈঠকে দেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের পক্ষেই আলোচনা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার বিপক্ষে থাকায় সরকার এখনো পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি।
বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করা হবে। আর ওই বৈঠকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ কোন খাতে কতটা ছাড় দেওয়া যায় বা আদৌ সুযোগ দেওয়া হবে কি না সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হতে পারে ১১ জুন।
এনবিআরের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান খবরের কাগজকে বলেন, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সহজ সুযোগ দেওয়া হলে সৎ ব্যবসায়ীরা নিয়মিত কর পরিশোধে নিরুৎসাহিত হবে। আবার দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সংকট কাটিয়ে উঠতেও কিছু ছাড় দিতে হবে। সরকার সবদিক ভেবেই সিদ্ধান্ত নেবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, এনবিআর থেকে অপ্রদর্শিত অর্থ নিয়ে প্রতিবেদন প্রণয়ন করে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে দেওয়া হয়েছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে খতিয়ে দেখে যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে তাই চূড়ান্ত বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সরকারের আয় কমেছে। নিয়মিত অনেক খরচও কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এরমধ্যে রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি। দেশে ডলার উচ্চমূল্যেই স্থির। বাংলাদেশে ডলার সংকটের কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীদের অনেকে এলসি খুলতে পারছেন না। আমদানি-রপ্তানিতে স্বাভাবিক ধারা নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সরকারের আয় বাড়াতে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগে সীমিত সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত জানিয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, এখন সরকারকে কঠোর অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। আইএমএফসহ বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে ওইসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতি ও দেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকট তুলে ধরে আলোচনা করতে হবে।
রাজস্ব খাতের বিশ্লেষক এনবিআরের আরেক সদস্য আমিনুল করিম খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হলে দেশের অর্থনীতির মূল ধারায় যোগ হবে। এতে সরকারের অর্থ সংকট কমবে। ঋণ নেওয়ার চাপ কমবে। তবে এ সুযোগ ঢালাওভাবে দেওয়া যাবে না। এতে সৎ ব্যবসায়ী যারা নিয়মিত রাজস্ব দেন, তাদের ওপর অবিচার করা হবে।
সূত্র বলেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতে এবং শিল্পের বিশেষ কিছু খাতে নিয়মিত করের চেয়ে কিছুটা বাড়িয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে এনবিআর।
বিদ্যমান আয়কর আইন
বিদ্যমান আয়কর আইনে একটি স্থায়ী ধারা করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আছে, ‘যেকোনো সময়ে নির্ধারিত করের (উচ্চ কর) পাশাপাশি জরিমানা হিসেবে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা (অপ্রদর্শিত অর্থ) প্রদর্শন করা যাবে। এটা অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতে যতদিন এই ধারা বিলুপ্ত না হবে ততদিন থাকবে।’ এ ধারা অনুযায়ী উচ্চ হারে কর দিয়ে ফ্ল্যাট কিনে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আছে। তবে রাজস্ব আইনের বিধান অনুযায়ী বিনিয়োগকারীর অর্থের উৎস নিয়ে এনবিআর কিছু না বললেও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) সরকারের যেকোনো সংস্থা জবাবদিহি আনতে পারবে। আইনি জেরার মুখে পড়ার ভয়ে অনেকে কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করায় আগ্রহী হয় না।
স্বাধীনতার পর ২০২০-২১ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা সাদা করা হয়। ওই অর্থবছরের বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা মূলধারার অর্থনীতিতে আনতে বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ সুবিধা দেওয়ায় সে অর্থবছরে রেকর্ড প্রায় ২০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ বা সাদা করা হয়। এর মধ্যে নগদ টাকা সাদা করা হয়েছিল ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি। বাকি অর্থ বিনিয়োগ হয় জমি/ফ্ল্যাট কেনা এবং পুঁজিবাজারে। দেশের ইতিহাসে স্বাধীনতাত্তোর কোনো এক অর্থবছরে যা ছিল সর্বোচ্চ পরিমাণ। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে ২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।